কানাডার বিমানবন্দরে লাগেজ বদলের অপকৌশল মাদক ব্যবসায়ীদের : ফাঁদে পড়ে সাধারণ যাত্রীদের কেউ কেউ অভিযুক্ত হতে পারেন মাদক চোরাচালানের দায়ে

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, মে ২৮, ২০২৬ : গত এক বছরে কানাডা থেকে বিদেশে যাওয়া  অন্তত ১৭ জন যাত্রীকে বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে আটক করা হয়। কারণ তাদের ব্যাগেজে মাদকদ্রব্য পাওয়া গিয়েছিল। আটককৃতদের মধ্যে কয়েকজনকে বিদেশে কারারুদ্ধ করা হয়, অথবা জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু সত্য ঘটনা হলো, এরা কেউই মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তারা তাদের লাগেজে মাদক পাচার করছিলেন না।

গত এক বছরে কানাডা থেকে বিদেশে যাওয়া  অন্তত ১৭ জন যাত্রীকে বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে আটক করা হয়। ছবি : সিটিভি

তাহলে ব্যাগেজের মধ্যে মাদক আসলো কোথা থেকে? সিটিভি নিউজের ‘W5’ প্রোগ্রামের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত বিস্তরিত তথ্য। দেখা গেছে টরন্টো পিয়ারসন বিমানবন্দরের কয়েকজন কর্মী এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তারা আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ীদের এজেন্ট হিসাবে কাজ করে আসছিলেন। সিটিভি নিউজের W5-এর তদন্ত অনুযায়ী, গত এক বছরে ব্যাগ বদলের কথিত পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আরসিএমপি টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ছয়জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে।

এম্পায়ার প্রোটেকশনের সিইও মিতেশ শাহের ভাষ্যমতে, বিমানবন্দরের বিপথগামী কর্মীরা অবৈধ মাদকসহ নিজেদের ব্যাগ বিমানবন্দরে নিয়ে আসে এবং নিরীহ যাত্রীদের ব্যাগের ট্যাগের সাথে সেগুলোর ট্যাগ বদলে দেয়।

কানাডা থেকে বিদেশে যাওয়া  যে ১৭ জন যাত্রীকে বিভিন্ন দেশে আটক করা হয়েছিল সেই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে, ডোমিনিকান রিপাবলিক, জার্মানি, মরক্কো, প্যারিস, বারমুডা, ফিলিপাইন এবং দক্ষিণ কোরিয়া। এই দেশগুলোতে মাদক পাচারের অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে।

যেভাবে মাদক পাচারকারীদের এই পরিকল্পনাটি কাজ করে

তদন্তকারীরা বলছেন, এই পদ্ধতিটি আশ্চর্যজনকভাবে দ্রুত লাগেজ ট্যাগ অদলবদলের ওপর নির্ভর করে। W5-এর মতে, দুর্নীতিগ্রস্ত বিমানবন্দরের ব্যাগেজ বা র‍্যাম্প কর্মীরা অসতর্ক যাত্রীদের চেক-ইন করা ব্যাগ থেকে লাগেজ ট্যাগ খুলে নিয়ে মাদক বোঝাই স্যুটকেসে লাগিয়ে দেয়। ব্যাগগুলো যদি কাস্টমস পার হয়ে যায় এবং ধরা না পড়ে, তবে অপরাধীদের সহযোগীরা গন্তব্যস্থল থেকে সেগুলো সংগ্রহ করে। আর কর্তৃপক্ষ যদি লাগেজটি আটক করে, তবে ট্যাগে যার নাম থাকে, সেই যাত্রীকে পরিণতির সম্মুখীন হতে হতে পারে।

NOWTORONTO- কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এম্পায়ার প্রোটেকশনের সিইও মিতেশ শাহ বলেন, “এটা অবিশ্বাস্য, কারণ আপনি যদি আপনার পরিবারের সাথে ডোমিনিকান রিপাবলিকে বেড়াতে যান, তাহলে আপনি কখনও কল্পনাও করতে পারবেন না যে আপনার সাথে এমন কিছু ঘটতে পারে।”

শাহ বলেন, “এটা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। মানুষ বিষয়টি ধরতে পারছে কেবল ইদানিং।”

টরন্টো এলাকার নিকোল নামে পরিচিত এক যাত্রী W5-কে জানিয়েছেন যে, ভ্যাঙ্কুভারে যাত্রাবিরতির সময় নিউজিল্যান্ডগামী একটি ফ্লাইট থেকে তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়, কারণ বর্ডার এজেন্টরা তার নামে ট্যাগযুক্ত লাগেজ থেকে ২০ কিলোগ্রামেরও বেশি সন্দেহজনক মাদকদ্রব্র ‘মেথামফেটামিন’ উদ্ধার করে।

নিকোল জোর দিয়ে বলেন, ব্যাগগুলো তার নয়। তিনি আরও বলেন, “কিন্তু যেহেতু ট্যাগে আমার নাম রয়েছে তখন আমি কীভাবে অস্বীকার করব যে ওটা আমার নয়?” W5-কে তিনি এ কথা  বলেন।

কয়েক ঘণ্টা হেফাজতে থাকার পর অবশেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি বলেন যে এই অভিজ্ঞতা তার ভ্রমণের পদ্ধতিকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে।

সিটিভি নিউজের W5 বিমানবন্দরের কর্মী এবং প্রাক্তন তদন্তকারীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যারা কর্মী যাচাই-বাছাই এবং সংরক্ষিত এলাকায় তাদের প্রবেশ বা বের হয়ে আসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সিকিউরিটির ঘাটতির কথা বর্ণনা করেছেন। পিয়ারসন বিমান বন্দরের একজন দীর্ঘদিনের র‍্যাম্প কর্মী দাবি করেছেন যে, বিমানবন্দরের সুরক্ষিত এলাকা ছাড়ার সময় কর্মীদের খুব কমই তল্লাশি করা হয়।

W5-এর সাথে সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন তদন্তকারীরা যুক্তি দিয়েছেন যে বিমানবন্দর পরিচালনায় কর্মচারীদের প্রবেশ পথের সিকিউরিটিতে একটি উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা  রয়ে গেছে। যার ফলে নিয়ন্ত্রিত লাগেজ জোনে কারা প্রবেশ করছে তা ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইয়র্ক আঞ্চলিক পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত পরিদর্শক ডিটার বোহাইম W5-কে বলেছেন যে সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচারের জন্য বিমান বন্দরের অভ্যন্তরীণ প্রবেশাধিকারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।

ভ্রমণকারীরা কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারেন

W5 এর তদন্তটি তুলে ধরে যে কীভাবে ভ্রমণকারীরা নিজেদের কোনো দোষ ছাড়াই অজান্তেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন। বিশ্বজুড়ে আইন ব্যবস্থায় ব্যাপক পার্থক্যও রয়েছে। কিছু দেশে, মাদক পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত ভ্রমণকারীদের নির্দোষ প্রমাণ করার আগে দীর্ঘ সময় আটক থাকতে হতে পারে।

লাগেজ চেক-ইন করার আগে ভ্রমণকারীরা যে কয়েকটি বাস্তবসম্মত সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেন, সে সম্পর্কে W5 কয়েকটি রূপরেখা দিয়েছে যা নিন্মরূপ : –

*আপনার লাগেজ হস্তান্তর করার আগে সেটির ছবি বা ভিডিও তুলে রাখুন।

*বারকোড এবং গন্তব্যসহ আপনার ব্যাগেজ ট্যাগের একটি স্পষ্ট ছবি তুলুন।

*সম্ভব হলে চেক-ইন করার সময় আপনার লাগেজের ওজন লিখে রাখুন।

*কনভেয়র বেল্টে ব্যাগটি রাখার আগে নিশ্চিত করুন যে ব্যাগেজ ট্যাগগুলো ভালোভাবে লাগানো আছে।

*আপনার ভ্রমণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যাগেজ রসিদ এবং ক্লেইম ট্যাগগুলো নিজের কাছে রাখুন।

*ব্যাগের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে এয়ারট্যাগসের মতো লাগেজ ট্র্যাকার ব্যবহার করুন।

বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ হুমকির ওপর ক্রমবর্ধমান মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন

বিমানবন্দরগুলোতে অভ্যন্তরীণ হুমকি এবং বিমান চলাচল সরবরাহ শৃঙ্খলে সংগঠিত অপরাধ চক্রের অনুপ্রবেশ নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে W5-এর এই তদন্তটি সামনে এসেছে। অবসরপ্রাপ্ত আরসিএমপি তদন্তকারী উলিসেস বোতেলহো W5-কে বলেছেন যে, ৯/১১ এর পর বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়েছিল, কিন্তু তিনি মনে করেন যে এখন অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির দিকেও একই ধরনের মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এটা বিশাল এক সমস্যা।

আর যদি আমরা সংগঠিত অপরাধকে সহায়তাকারী সেই আভ্যন্তরীন কর্মীদের দমন করতে না পারি, তাহলে আমরা বড় বিপদে পড়ব।

বিমানবন্দরের দুর্নীতি সম্পর্কে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে, avery.haines@bellmedia.ca অথবা joseph.loiero@bellmedia.ca-তে একটি গোপনীয় ইমেল পাঠাতে পারেন।

তথ্যসূত্র : সিটিভি, নাউটরন্টো, ট্রাভেলপ্লাস.সিএ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *