রবীন্দ্র থেকে নির্মলেন্দু: পংক্তি ঝরা সন্ধ্যা

মোয়াজ্জেম খান মনসুর : গত ২৮শে জুন, ২০২৮ রবিবার `বাংলা সাহিত্য পরিষদ টরন্টো, ক্যানাডা’র উদ্যোগে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান ও নির্মলেন্দু গুণ এই পঞ্চ কবিকে নিয়ে অনবদ্য এক ‘পংক্তি ঝরা সন্ধ্যা’র আয়োজন করা হয়। টরন্টোতে গ্রীষ্মের রবিবাসরীয় এক তপ্ত দুপুর যখন গড়িয়ে -গড়িয়ে   আধো- আধো সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে  যাচ্ছিল তখন  এই শহরের এক দল কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, গবেষক, সাংবাদিক, কাব্য প্রেমিক এবং সংস্কৃতিমনা বাঙালি সংস্কৃতির পরশ মেখে হাজির হতে শুরু করেন ১৬৮৪ ভিক্টোরিয়া পার্ক এভেন্যুর লুথেনিয়ান চার্চের হল রুমে। হাতে হাতে চা কফি আর জল খাবারের আড্ডায় আনন্দ কোলাহলে মেতে উঠেন সকলে। আজকের ফিফা  বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচে ক্যানাডার জয় এই সন্ধ্যায় বাড়তি আনন্দ উচ্ছ্বাসের মাত্রা যোগ করে।

মিট অ্যান্ড গ্রিটস পর্ব শেষে সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হয় অনুষ্ঠান। শুরুতেই সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত  হয় বাংলাদেশ এবং ক্যানাডার জাতীয় সংগীত। এরপর আহ্বায়ক মোয়াজ্জেম খান মনসুরের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। তিনি তার বক্তব্যে বাংলা  সাহিত্য গগনের পাঁচ নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান ও নির্মলেন্দু গুণের কবিতা এবং সাহিত্য কর্ম, আমাদের দেশ কাল রাজনীতি জীবন দর্শন এবং আমাদের  আনন্দ ভালবাসা বিরহ বেদানায় কত নিবিড় ভাবে প্রভাবিত হয়ে তাদের কাছে ফিরে যেতে হয় বার বার সে কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন  শিকড়ের টানে, সংস্কৃতির টানে হাজার মাইল দূরে থেকেও  আমাদের অন্তরে নিত্য ধ্বনিত হয়  রূপসী বাংলার কবির অমর পঙক্তি ‘আবার আসিব ফিরে এই বাংলায় ।’

এর পর শুরু হয় আলোচনা ও প্রবন্ধ পাঠ পর্ব। আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন: লেখক গবেষক প্রাবন্ধিক সোনা কান্তি বড়ুয়া, বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক সালমা বাণী,  অধ্যাপক কথাশিল্পী ফরিদা রহমান, কবি গীতিকার কলামিস্ট ড. মৌ মধুবন্তী এবং কবি অনুবাদক মম কাজী।

সোনা কান্তি বড়ুয়া বলেন, কবি জীবনানন্দ দাশ জীবন সংসারে একজন ব্যর্থ মানুষ। সেই আমলের অতি উচ্চ শিক্ষিত ইংরেজিতে  এম এ পাশ করা ব্যক্তিটি জীবন যাপনের জন্য একটি চাকুরি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ব্যক্তি জীবনের অভাব অনটন  ও ভালোবাসাহীন সংসারে বসবাস করে  তিনি আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন  কালজয়ী কবিতা সম্ভার । বনলতা সেন, আবার আসিব ফিরে , নিলাঞ্জনার মতন অন্তর ছুঁয়ে যাওয়া কবিতা। জীবনের সমস্ত বিষ পান করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন রুপসি বাংলার কবি। সালমা বাণী নির্মলেন্দু গুণকে নিয়ে একটি  প্রবন্ধ পাঠ করেন। ঢাকা শহরে এসে জীবন সংগ্রাম অভাব অনটন নিত্য সাথী করে তিনি তিনি রচনা করেছেন প্রেম দ্রোহ  ভালবাসা বিরহের অসাধারণ কবিতা। কবি তার কবিতায় রাজনীতির কালজয়ী মহান পুরুষের ইতিহাস গেঁথে রেখেছেন। সালমা বাণী আবৃত্তি করেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ঘুমিয়ে পড়েছে ভাষা।’

 ড. মৌ মধুবন্তী তার প্রবন্ধে বলেন,  আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমান যিনি  নাগরিক চেতনার প্রধান স্থপতি । তাঁর কবিতায় শহরের জীবন, কোলাহল, রিক্সা, বৃষ্টি, প্রেম ভালবাসা মিলেমিশে একাকার। দেশপ্রেম এবং  রাজনীতির প্রতি অগাধ ভালবাসা ও দায়বদ্ধতার ফসল হিসেবে  ‘স্বাধীনতা তুমি এবং তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’  উপহার দিয়ে বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী হয়ে  আছেন।

ফরিদা রহমান তাঁর আলোচনায় বলেন নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহী কবিই নন। তিনি ছিলেন সাম্যের কবি। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের সমান অধিকারে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী কবি দ্রোহ ও প্রেমের কবিতায় ও  গানে তিনি অমর হয়ে আছেন আমাদের হ্নদয় গভীরে।

মম কাজী রবীন্দ্রনাথের গান ‘আগুনের পরশমণ’ নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন। তিনি বলেন এই আগুন কোনো  ধ্বংসের প্রতীক নয়। এটি একটি জীবন দর্শন। আত্ম উপলব্ধি, আত্মশুদ্ধি ও নির্মাণের প্রতীক। এটা গানের চেয়েও একটি গভীর প্রার্থনা সংগীত ।

কবিতা আবৃত্তিতে অংশ গ্রহণ করেন  জালাল কবীর,  ড: জান্নাতুল নাইম, শামিম ইকবাল, সৈয়দা রুকসানা, তাপস কর্মকার, মাহমুদা নাসরিন, নিয়াজ খান ও  রাশিদা এলাহী।

সঙ্গীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন টরন্টোর জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী নাবিউল হক বাবলু , সূমি বর্মন, সুপ্রিয়া বিশ্বাস, সংগীতা মুখার্জী, নব প্রজন্মের শিল্পী কাশফিয়া চৌধুরী ও ইন্দিরা বড়ুয়া।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন কবি মোয়াজ্জেম খান মনসুর এবং লেখক অধ্যাপক মাহমুদা নাসরিন।

ছবি : কাজী সরোয়ার / পিযুষ বর্মন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *