কতই না বৈচিত্র্যে ভরা মানুষের জীবন!
নানা সূত্র থেকে সংগৃহীত কিছু দৃষ্টান্ত। আশা করি পাঠকেরা এতে কিছু ভাবনার খোরাক পাবেন।
(কাহিনী এক)
মাত্র ১০টি ডলার নিয়েছি আমি
মহিলার মনটা ক’দিন ধরে খুবই খারাপ, বিষন্ন মন নিয়ে দিনগুলো কাটাচ্ছেন। গত সপ্তাহে সুপারমার্কেটে শপিং করতে গিয়ে বহু নগদ ডলার ও জরুরী ডকুমেন্টসে পূর্ণ পার্সটি তিনি কোথায় যে ভুলে ফেলে রেখে এসেছেন মোটেই স্মরণ করতে পারছেন না। বহু আর্থিক ক্ষতির আশংকা তো আছেই, তদুপরি হারানো ডকুমেন্টস রিনিউ করার ঝামেলা-জটিলতাও তার মনটাকে অশান্ত করে রেখেছে। কি যে করবেন সেটা ভেবে উঠতে পারছেন না।
দুপুর বেলা। দরজায় কেউ একজনের করাঘাত শুনে দরজাটা খুলে দেখলেন যে তাদের এলাকার রেগিউলার মেইলম্যান তার সামনে দাঁড়িয়ে, তার হাতে একটা বড়সড় প্যাকেজ। সেটা ডেলিভারী নিয়ে খুলে চোখে পড়ল তার সেই হারানো পার্সটা! বুকের ভেতরে ধক্ করে উঠল। তাড়াতাড়ি সেটা খুলতেই পেলেন একটা ছোট্ট কাগজের টুকরা, তাতে অপরিচিত হাতে লেখা, “Here is your purse, m’am. I have taken just ten dollars to pay for the necessary postal charges. Everything else inside is OK. I hope you will understand.”
কোন নাম-ঠিকানা নেই তাতে।
পার্সটা চেক করে দেখলেন যে সেই ১০টি ডলার ছাড়া বাকি সবকিছুই ঠিক আছে, কিছুই খোয়া যায়নি। বুক থেকে ভারী বোঝাটা নেমে গেল নিমেষেই। কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধন্যবাদ জানানোর কোন রাস্তা তো খোলা নেই সেই সৎ মানুষটিকে।
(কাহিনী দুই)
Halloween Angels
কোন এক অকটোবর মাসের ৩১ তারিখের সন্ধ্যা। চিরাচরিত Halloween Night. Treats নিতে বাচ্চারা আসবে, সেটা হাতে নিয়ে Thank you জানিয়ে হাসিমুখে বিদায় নেবে, পাশের বাসায় যাবে, আবার বলবে Trick-or-treat?
আমি ঘরে চুপচাপ বসে আছি। অসুস্থ, মরণাপন্ন স্ত্রী চোখ বুঁজে বিছানায় শুয়ে। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। ৬০ বছরের বিবাহিত জীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে অচিরেই। আমার চোখে পানি।
এমনি সময়ে ১৪-১৫ বছর বয়সী তিনটি মেয়ে এসে বলল Trick-or-treat?”
শুনে বলল, “নো প্রোব্লেম।” বিদায় নিল কিন্তু পাঁচ মিনিট পরই ফিরে এল। একটি মেয়ের হাতে বেশ কিছু পরিমাণ treats ভর্তি একটা প্লাস্টিক ব্যাগ। সেটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল। বলল, এগুলো তোমার জন্য। অন্যরা আসলে ওদের খালিহাতে ফিরিয়ে দিও না। তোমার ওয়াইফ খুব শিঘ্রই সেরে উঠবে।” তারপর ওরা চলে গেল।
কান্নাভরা কণ্ঠে বললাম, “সরি, গার্লস! আমরা এতই গরীব যে treats কেনার মত পয়সা আমাদের নেই। আমার ওয়াইফ খুবই অসুস্থ।”
তাদের এই simple act of kindness আমার সেই অন্ধকার দিনেও আমার মনে আশার আলো জ্বালিয়ে গেল।
আমার ওয়াইফ বাঁচেনি। কিন্তু সেই মেয়ে তিনটিকে আমি আজো ভুলিনি। May God bless them.

(কাহিনী তিন)
Happy Holidays!
একটা সুপারমার্কেটে একজন মহিলা কাস্টমার তার Credit Card-টা তার ক্যাশিয়ারের সামনে রাখা reader -এ tap করে দেখতে পেল Not Approved. সেটা দেখে সে খুব ঘাবড়ে গেল। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়! গতকালই সে তার Welfare থেকে পাওয়া monthly cheque টা ব্যাংকে ডিপোজিট করেছে। দু’মিনিট অপেক্ষা করার পর সে আবার tap করল। নাহ! আবারও Not Approved.
এদিকে তার পেছনে অন্য কাস্টমারদের লাইনটা ক্রমে লম্বা হচ্ছে, ওদিকে তার পাশে ছোটছোট পাঁচটা বাচ্চা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে; ছোট্ট দু’টি বলছে, Mummy, I am hungry!” একটা embarrassing situation বটে!
তৃতীয় বারেও যখন Not Approved দেখা গেল, তখন মহিলার পেছনে দাঁড়ানো কাস্টমার (একজন মহিলা) তাকে ভদ্রভাবে বলল, “I can see you have a problem there. I am in a hurry to meet an appointment. If you don’t mind, let me pay your bill. How much is it?”
প্রথম মহিলা বলল, “One hundred and five dollars.”
No problem বলে দ্বিতীয় মহিলা তার Credit Card টা reader -এ tap করে পেমেন্টটা করে দিলো। বললো, ” Your children, they are so sweet. Happy Holidays! Enjoy your Christmas.”
প্রথম মহিলা অপ্রস্তুত এবং হতভম্ব হয়ে কান্নাভরা চোখে বললো, ” God bless you”. স্বামী পরিত্যক্তা single mother. সেই দয়ালু মহিলা সেই দুঃখী পরিবারের মুখে হাসি ফোটিয়ে বিদায় নিলেন।
(কাহিনী চার)
পরিবারের ষোলতম সন্তান।
কাহিনীটা ভদ্রলোক নিজ মুখেই সেই আড্ডায় উপস্থিত আমাদের সবাইকে শুনালেন। তার জীবনেরই অতীতের কথা। বয়স ৮৮ বছর। মুসলিম। প্যালেস্টাইনিয়ান। বহু বছর ধরে ক্যানাডাবাসী। বর্তমানে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন একটা সরকারী সিনিয়র্স রেসিডেন্শিয়াল বিল্ডিংয়ে।
“ক্যানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে অতীতে প্রায় প্রতিটি পরিবারে সচরাচর ১২টি থেকে ১৬টি সন্তানের দেখা পাওয়া যেতো। সেখানের অধিবাসীদের জীবিকা ছিল কৃষি কাজ এবং মাছ ধরা। জন্মনিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক পন্থাটা তখনো আবিষ্কৃত হয়নি। সুতরাং বিরল দৃষ্টান্ত ছাড়া সেদেশে প্রতিটি পরিবারেই বছর-দু’বছরে নিয়মিত একটি করে সন্তান জন্ম নিতো। ওদের ভরণপোষণ করতে গিয়ে সংসারে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। ফলে ১২-১৪ বছর বয়স হলেই ছেলেরা স্বাধীন জীবিকার সন্ধানে পরিবার ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতো। ঘরে থাকতো শুধু মেয়েরা। জীবন ছিল সংগ্রামময়। কদাচিৎ সেই ছেলেরা গ্রামে ফিরে আসতো, ভাইবোনদের মাঝে বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি হতো, একে অন্যকে চিনতো না।”
“ভবঘুরে আমি ক্যানাডায় ইমিগ্রেশান পাওয়ার পর চলে গেলাম নিউফাউন্ডল্যান্ডে। একটা বাসস্থান ও একটা কাজ জোগাড় করে নিলাম। স্ত্রী মৃত, সন্তানেরা আপন-আপন ঠিকানা বেছে নিয়েছে। যোগাযোগ নেই বললেই চলে। একাকী জীবন। একজন স্ত্রীর বড় প্রয়োজন।
খোঁজাখুঁজি করে যার সন্ধান পেলাম সেই মেয়েটি ছিল ওর পরিবারের ১৬তম সন্তান। মাবাবা বর্তমান কিন্তু বড় ভাইবোনেরা প্রায় সবাই নিউফাউন্ডল্যান্ডের বাইরে। মেয়েটি বড় হয়ে ওদের নাম শুনেছে কিন্তু দেখেনি প্রায় কাউকেই!”
“যাক, যথারীতি বিয়েটা হয়ে গেল। কিন্তু সুখটা কপালে সইলো না। মাত্র পাঁচ বছর পরই ঠান্ডায় নিউমোনিয়াতে ভুগে মারা গেল বৌটা আমার। ঘরে আর মন টিকলো না, আবার বের হয়ে পড়লাম নিরুদ্দেশের পথে। চলতে চলতে অবসন্ন আমি। বর্তমানে ঠাঁই নিয়েছি এই সরকারী বৃদ্ধাশ্রমে। বাকি আল্লাহ মালিক।”
এই বলে থামলেন তিনি।
A Footnote about 16 children in the family
পরিবারে ১৬টি সন্তান আমি আগেও দেখেছি আমার নিজের জীবনে, সেই সম্পর্কে দু’টি কথা।
প্রথম দৃষ্টান্ত ১৯৪৬ সন। আমি তখন ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া কলেজিয়েট স্কুলে ক্লাস সেভেনের ছাত্র। আমার এক সহপাঠীর নাম ছিল ওয়াদুদ। আমাদেরই স্কুলের আরবী টিচারের ছেলে। ওয়াদুদরা ছিল ১৬ ভাইবোন, একই বাবামার সন্তান- ৮ ভাই, ৮ বোন। ওদের বাড়িতে আমি মাঝেমাঝে বেড়াতে যেতাম ওদের গাছের কদবেল খাওয়ার লোভে।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত ১৯৬১ সন। তখন আমি বগুড়া জেলার জয়পুরহাট শুগার মিলের একান্টস্ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করি। সেখানে ছিল আমার এক সহকর্মী, নাম মন্জুর। সে বলতো যে ওর নানানানীর মোট সন্তান সংখ্যা ১৬ জন- ৮ ছেলে, ৮ মেয়ে। ওর মা ছিলেন ভাইবোনদের মাঝে সবার বড়।
(কাহিনী ছয়)
আপনার কপালে দুঃখ আছে।
গত জুন ১৬, ২০২৬-এর টরন্টো স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত একটা চিঠি ও সেটার জবাবের উপর ভিত্তি করে রচিত আমার এই গল্প। আমি শুধু বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছি মাত্র, কোন কথা যোগও করিনি, কোন কথা বাদও দিইনি। কাহিনীটা সংক্ষেপে এই :
এক ভদ্রলোক পত্রিকাটার Marriage Counsellor -কে চিঠি দিয়ে জানালেন যে তার স্ত্রী তার কাছে অকপটে প্রকাশ করলো যে সে বিগত ছ’টি মাস ধরে তার অজান্তে, অজ্ঞাতে অন্য এক পুরুষের সংগে নিয়মিত যৌনজীবন যাপন করছিলো। মহাসুখে দিনগুলো কাটছিলো। এক পর্যায়ে সে তার স্বামীকে ছেড়ে সেই লোকটাকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে লোকটা সেই প্রস্তাবটা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করলো। সে বললো, “না, আমি তোমার মত চরিত্রহীন, বিশ্বাসঘাতক নারীকে কখনো বিয়ে করে স্ত্রী হিসাবে আমার ঘরে নেবো না। আনন্দফুর্তি করতে চাও, রাজী আছি। কিন্তু বিয়ে? No. Never?”
“সেকথা শুনার পর থেকে আমি নার্ভাস ব্রেকডাউনে ভুগছি, খুবই অশান্তিতে আছি। এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমি বাকি জীবনটা তোমাকে নিয়েই কাটাবো। তুমি আমাকে একটা সুযোগ দেবে কি?”
সেই ভদ্রলোক Marriage Counsellor -কে প্রশ্ন করলেন : “আমি এখন কি করবো? কি জবাব দেবো তাকে?”
জবাবে তিনি জানালেন যে-
“ ১) ঘটনার বিবরণ থেকে একথাটা স্পষ্ট যে আপনার স্ত্রী আপনাকে মোটেই ভালোবাসে না।
২) সে চরিত্রহীনা, বিশ্বাসঘাতিনী। She cheated you.
৩) সে অসৎপথে সুখভোগের প্রত্যাশী।
৪) সে চঞ্চলমতী এক নারী। সুযোগ পেলেই সে অন্য পুরুষের কাছে চলে যাবে।
এতসব জানার পরেও তাকে একটা সুযোগ দেয়ার কথা ভাবছেন? বরং বিপরীতটা ভাবুন। কোন ল’ ইয়ারের কাছে যান, ডির্ভোসের ব্যবস্থা করুন। এই সুযোগটা হাতছাড়া করবেন না কিছুতেই। তার চরিত্রহীনতা ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণটা তাজা থাকতেই তাকে বিদায় করুন আপনার জীবন থেকে। ”
“আর যদি এখনি তা না করেন, তাহলে আপনার কপালে দুঃখ আছে।”
আমি আমাগো প্রিয় ঢাকাইয়্যা কুট্টি ভাইদের জবানে কইতে আচি : সাবের নসীবে খারাবী আছে হালায়!
সাইদুল হোসেন
মিসিসাগা, ক্যানাডা
