বাংলাদেশ  পল্লী উন্নয়ন একাডেমি  ও  ড. আখতার হামিদ খান   

মাহবুবুর  রব চৌধুরী

বিশিষ্ট  সমাজ  বিজ্ঞানী,   মনীষী ,  সমাজ সেবক ,  আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন  উন্নয়ন কর্মী    ও    শিক্ষক  ড. আখতার  হামিদ খান  ১৫ জুলাই ১৯১৪ সালে  ভারতের  উত্তর প্রদেশে  আগ্রা   শহরে  জন্ম  গ্রহণ করেন।  তিনি  বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি  বার্ড এর  প্রতিষ্ঠাতা I  (Bangladesh academy for rural development  –  BARD  )  
১৯৩৪ সালে  আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি  অর্জনের পর  তিনি  ইংরেজ  শাসন  আমলে  ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (আই সি এস)  এ  যোগ দেন। পরবর্তীতে আইসিএস-এর শিক্ষানবিশ হিসেবে তিনি ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  সাহিত্য এবং ইতিহাস অধ্যয়ন করেন  এবং  তিনি  এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।  চাকুরী জীবনে তার  প্রথম  পোস্টিং  ছিল তৎ  কালীন পূর্ব  বঙ্গের  বর্তমান বাংলাদেশের  কুমিল্লায়। 

১৯৪৩-এর মহা  দুর্ভিক্ষ বা  মহা মন্বন্তরের  সময় তিনি  ছিলেন নেত্রকোনার  মহকুমা প্রশাসক I ( S.D.O ) .  সে  সময় ঔপনিবেশিক শাসকদের  খামখেয়ালিপনা  ও প্রচণ্ড উদাসীনতা তাঁকে এতটাই ব্যথিত করে যে তিনি  ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সরকারি চাকুরী থেকে পদত্যাগ করেন।  আকর্ষণীয়, গুরুত্বপূর্ণ এই জব তখন আর তাকে সরকারে ধরে রাখতে  পারেনি।

ড. আখতার  হামিদ খান। ছবি : বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি

দেশের  মানুষের  বিশেষ করে  দেশের কৃষকের বহুমাত্রিক সমস্যা গুলি  বাস্তবে  হাতে  হাতে  জানতে  এবং  নিজ জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে চাকুরী ছেড়ে নেত্রকোনা থেকে   তিনি  আলীগড়ের  নিকট ‘মামুল’ নামের  একটি গ্রামে এসে  কৃষি কাজ শুরু করেন। কৃষি কাজের ন্যূনতম আয় দিয়ে জীবনধারণের অসহায়ত্ব এবং  দেশের  কৃষকের বহুমাত্রিক সমস্যা নিজের জীবন দিয়ে  তখন  তিনি হাড়ে  হাড়ে উপলব্ধি করতে পারলেন। অতঃপর   এই সমস্যাসমূহ সমাধানের পথ হিসাবে এখান থেকে  পাওয়া  জ্ঞান  ও বুদ্ধি  থেকেই তাঁর মাথায় ‘গ্রাম ভিত্তিক সমবায়ের’ মাধ্যমে  ‘পুঁজি গঠন’  ও  আয় বাড়িয়ে কৃষকদের ‘শোষণ মুক্তির’ চিন্তা । এই  বুদ্ধি  ও  চিন্তার  বাস্তব  প্রয়োগ  কল্পে  পরবর্তী  সময়ে  আবারও   তিনি  কুমিল্লাতে ফিরে  আসেন। 

প্রথমে  তিনি  কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ-এ অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এ কলেজে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত চাকুরি করেন।  ওই  সময় কালে  কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষের অধিকাংশই ছিলেন সত্যিকারের  নম্র  , ভদ্র  অগাধ পান্ডিত্যের  অধিকারী, উৎসর্গীকৃত, প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পন্ন একই সাথে সত্যিকারের   দুর্দান্ত  ব্যক্তিত্ব  সম্পন্ন  মানুষ।

 অতঃপর   পল্লী উন্নয়নের উপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য তিনি মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন।  প্রশিক্ষণ  শেষে এই প্রশিক্ষণ বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে ১৯৫৯ সালে তিনি কুমিল্লায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রথম কার্যকরী পরিচালক  হিসাবে  দায়িত্ব  গ্রহণ  করেন ।  এই একাডেমি, ‘সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচীকে’ একটি প্যাকেজে একীভূত করে, এক সেট পাইলট প্রকল্প  হিসাবে দেশবাসীর  সামনে  তুলে  ধরেন   যেটি বিস্তৃতভাবে ‘কুমিল্লা মডেল’ নামে পরিচিতি  লাভ করে । কুমিল্লা মডেলের প্রধান চারটি উপাদান হচ্ছেঃ   ১- থানা ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (টিটিডিসি), ২ – রুরাল ওয়ার্কস প্রোগ্রাম (আরডব্লিউপি),  ৩ –  থানা ইরিগেশন প্রোগ্রাম (টিআইপি) ও  ৪ – প্রতিটি থানায় (যা এখন উপজেলা) টু-টায়ার কো-অপারেটিভ সিস্টেম (কেএসএস)  এ চারটি  স্তর  তখন সারা  দেশজুড়ে  করা হয়েছিল। 

বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড) আখতার হামিদ খানকে কিংবদন্তিতে পরিণত  করেছিল। এবং  এটি  তখন  তাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।

পল্লী উন্নয়নে তাঁর অগ্রণী ভূমিকার জন্য ১৯৬১ সালে  তাঁকে সিতারা-ই-পাকিস্তান  প্রদান করা হয়। ১৯৬৩ সালে ড. আখতার হামিদ খান তাঁর কুমিল্লা মডেলের জন্য এশিয়ার  নোবেল পুরস্কার খ্যাত ‘রামোন ম্যাগসেসে’ পুরস্কার’ পান । মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৪ সালে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লজ’ এ ভূষিত করেন  ।   

চাকুরী  সুবাদে  কর্ম  ক্ষেত্রে  এসে  বাংলাদেশের  মানুষকে  তিনি  অন্তর  থেকে  ভালোবেসে  ছিলে ন।  এ  দেশের  মানুষের  আন্তরিকতা  ও  সরলতা  দেখে  তিনি  মুগ্ধ  হয়েছিলেন   এবং  তাদেরকে  তার  আপন জন  ভেবে  নিয়েছিলেন।  তাই  তিনি  এদেশে বার বার  ফিরে  এসেছেন।

পরবর্তীতে  তিনি  লায়ালপুরস্থ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও  করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো হিসেবে ১৯৭২-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। ১৯৭৩-৭৯ সালে তিনি মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি বগুড়ায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সুইডেনের লুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উড্র উইলসন স্কুল, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন। রেলফ  শুমেখার তার বইয়ে লিখেছেন: “তার স্কেন্ডিনেভিয়ান   বিশিষ্ট  প্রভাবশালী  সহকর্মী এবং  তার  বন্ধু অন্যান্য উপদেষ্টারা তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারর জন্য মনোনীত করেছিলেন।” তবে পঞ্চাশের  মহা মন্বন্তর  নামে পরিচিত ১৯৪৩-এর মহা  দুর্ভিক্ষ  কালীন  সময়  নেত্রকোনার  মহকুমা প্রশাসকের  ( S.D.O ) পদ থেকে পদত্যাগ  করে  বাংলার  মানুষের পক্ষে  যে  প্রতিবাদী আওয়াজ  তিনি  দিয়েছেন  ঔপনিবেশিক  ইংরেজ  সেটিকে  সহজ ভাবে  নেয়নি। এটিকে  তারা  নেটিভের  এক  ধরনের  ঔদ্ধত্য মনে করেছেন। তারই  প্রচ্ছন্ন  ছায়া নোবেল পুরস্কার কমিটির  বিবেচনার টেবিলেও  পড়েছে বলে অনেকে  মনে  করে  থাকেন। 

 একটি  বিষয়  মানতেই  হয় , এক সময়  যে  বাংলাদেশের  পাঁচ কোটি  মানুষের  জন্য  খাদ্যের  চাহিদা মেটাতে  ১০ লক্ষ  টন খাদ্য  আমদানি  করতে  হত  আজ    সে  একই  বাংলাদেশের  ২০ কোটি  বাংলাদেশির  খাদ্য  ভান্ডারের  ভারসাম্য  বজায়  রাখতে  বাংলাদেশ  পল্লী উন্নয়ন একাডেমি সহ  বাংলাদেশের  কৃষি  বিশ্ববিদ্যালয় , কৃষি কলেজ ও  কৃষি প্রতিষ্ঠান  গুলি  যে  অবদান  রেখে  চলেছে  তা  অস্বীকার  করা  যায় না।  যাবে না। 

ইংরেজি, বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু ও হিন্দি ভাষায়  সমভাবে  দক্ষ আখতার হামিদ খান বহু নিবন্ধ, প্রতিবেদন ও গ্রন্থ রচনা করেছেন। বার্ড  তাঁর লেখাগুলিকে তিনটি খন্ড”  দা ওয়ার্কস অব আখতার হামিদ খান”  এই  শিরোনামে(১৯৮২)তে  প্রকাশ করেছে।

মহাপ্রাণ ড. আখতার হামিদ খান ০৯ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করেন। (১৫ জুলাই ১৯১৪- ৯ অক্টোবর ১৯৯৯)  জীবন শেষে  করাচীর আওরঙ্গ জেব ক্যাম্পাসে তাকে  কবর দেওয়া  হয়েছে।  সব শেষে মৃত্যুহীন এই  প্রাণ আজ সেখানেই  শায়িত।

মাহবুবুর রব চৌধুরী, টরন্টো    I

লেখক পরিচিতি: ইতিহাস গবেষক, রাজনীতি বিশ্লেষক I