আলবার্টায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অভিবাসীদের প্রতি বাড়ছে বর্ণবাদ
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, অগাস্ট ৩০, ২০২৬ : আলবার্টায় দৃশ্যমান সংখ্যালঘুদের কেউ কেউ বলছেন যে, প্রদেশটিতে ক্রমবর্ধমানভাবে তারা অভিবাসী-বিরোধী মনোভাবের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। মুসলিম ও শিখ উভয় গোষ্ঠীই জানিয়েছে যে, তারা অনলাইনে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছে এবং অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, ঘৃণার এই বৃদ্ধি আসন্ন referendum এর সাথে সম্পর্কিত। খবর গ্লোবাল নিউজের।
ক্যালগেরির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিজের বাড়ি থেকে সাইমা জামাল নামের একজন শহরে একটি মুসলিম অনুষ্ঠানের আগে অনলাইনে পোস্ট করা প্রায় এক ডজন বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য দেখছিলেন।
তিনি বলেন, “একজন বলেছে, ‘আরে, ওদের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া উচিত।’ আরেকজন বলছে, ‘দয়া করে ওদের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করুন, গ্রেপ্তার করুন এবং দেশ থেকে বের করে দিন’।”
ক্যালগারি ইমিগ্র্যান্ট সাপোর্ট সোসাইটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা জামাল প্রায় ৩০ বছর ধরে আলবার্টায় বসবাস করছেন। এই সংস্থাটি এক দশকেরও বেশি আগে সিরীয় শরণার্থীদের ক্যালগারির জীবনে থিতু হতে সাহায্য করার জন্য প্রথম গঠিত হয়েছিল।

জামাল আরো বললেন, “এখন আলবার্টায় বর্ণবাদ ও ঘৃণা চরমে উঠেছে এবং অভিবাসী সম্প্রদায়গুলোর প্রতি এই মাত্রার ঘৃণা আমি আগে কখনো দেখিনি।”
উল্লেখ্য যে, শহরের মুসলিম হেরিটেজ ডে উৎসবের প্রচারমূলক একটি সাম্প্রতিক পোস্টে হুমকি থেকে শুরু করে কুরুচিপূর্ণ বিভিন্ন অনলাইন মন্তব্য দেখা যায়। ক্যালগারি পুলিশ জানিয়েছে, জননিরাপত্তার জন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য হুমকি ছিল না, তবে অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত থাকার জন্য উর্দিধারী কর্মকর্তাদের নিযুক্ত করা হয়েছিল। এডমন্টনের একটি শিখ মন্দিরে দুই ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনার একদিন পর এটি অনুষ্ঠিত হয়। এডমন্টন পুলিশ এখনও নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে যে মন্দিরে ওই হামলাটি বিদ্বেষমূলক অপরাধ ছিল কি না।
শিখ সম্প্রদায়ের নেতারা মনে করেন, প্রদেশটিতে শিখ-বিরোধী বিদ্বেষ বাড়ছে।
ওয়ার্ল্ড শিখ অর্গানাইজেশন অফ কানাডার আলবার্টা আঞ্চলিক সভাপতি হারমান কানডোলা বলেন, “আমরা অনলাইন ফোরামগুলোতে বিদ্বেষ ছড়াতে দেখেছি। আর যখন আপনি দেখেন যে সেই বিদ্বেষ সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে বাস্তব জগতে চলে আসে, যেখানে প্রকৃত আঘাতের ঘটনা ঘটেছে, তখন তা অত্যন্ত, অত্যন্ত মর্মান্তিক।”
এডমন্টন পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১৩৯টি বিদ্বেষমূলক ঘটনা এবং ৪৩টি বিদ্বেষমূলক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ক্যালগারি পুলিশ জানিয়েছে, এই বছর সন্দেহভাজন বিদ্বেষমূলক অপরাধ বা ঘটনার ২৭২টি প্রতিবেদনের মধ্যে তদন্তের পর ৪৪টিকে বিদ্বেষ-প্রণোদিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে নবাগত বা অভিবাসীদেরই সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
এদিকে শিখ মন্দিরে সাম্প্রতিক হামলার পর এডমন্টন পুলিশ প্রধান ওয়ারেন ড্রিচেল ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা এই ঘটনাকে রাজনীতিকরণ করতে পারি না, কিন্তু এডমন্টন পুলিশ সার্ভিসের প্রধান হিসেবে আমি দেখছি যে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মেরুকরণ স্থানীয়ভাবেও প্রতিফলিত হচ্ছে।”
আগামী ১৯শে অক্টোবর, আলবার্টার অধিবাসীরা আলবার্টা সরকার কর্তৃক উত্থাপিত ১০টি গণভোটের প্রশ্নে ভোট দেবেন, যার মধ্যে পাঁচটি অভিবাসন নীতি সম্পর্কিত।
আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জ্যারেড ওয়েসলি বলেছেন, আলবার্টার গণভোট বিতর্ক বর্তমান পরিস্থিতির পিছনে ভূমিকা রাখছে।
তিনি জানান, একটি প্রশ্নে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে: “অভিবাসনকে আরও টেকসই পর্যায়ে নামিয়ে আনা, অর্থনৈতিক অভিবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগে আলবার্টার বাসিন্দাদের প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়ার উদ্দেশ্যে আলবার্টা সরকারের অভিবাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করার পদক্ষেপকে আপনি কি সমর্থন করেন?”
আরেকটি প্রশ্নে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে : “আপনি কি আলবার্টা সরকারের এমন একটি আইন প্রবর্তনকে সমর্থন করেন, যার মাধ্যমে শুধুমাত্র কানাডীয় নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা এবং আলবার্টা অনুমোদিত অভিবাসন মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অন্যান্য সামাজিক পরিষেবার মতো প্রাদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত কর্মসূচিগুলোর জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন?”
আলবার্টার অধিবাসীরা এ বিষয়েও ভোট দেবেন যে, প্রদেশটি কানাডায় থাকবে কি না, তা জানতে ভবিষ্যতে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হোক, নাকি তারা বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবেন।
দুই বছর ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনটি নিয়ে গবেষণা করার পর ওয়েসলি মনে করেন যে, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই স্বাধীন আলবার্টকে প্রধানত শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান অধ্যুষিত একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়।
ওয়েসলি বলেন, “সেটা ইচ্ছাকৃত হোক বা অবচেতনভাবে প্রকাশ পাক, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চ্যাটরুমে, সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন সাইটে এমনকি সমাবেশেও এই ধরনের বার্তাই দেখা যায়।”
তবে আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথের একজন মুখপাত্র এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, আসন্ন গণভোটের প্রশ্নগুলো অভিবাসী-বিরোধী মনোভাব বা ঘৃণা বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।
আলবার্টা সরকারের গণমাধ্যম সম্পর্ক পরিচালক এবং প্রিমিয়ারের প্রেস সচিব স্যাম ব্ল্যাকেট বলেছেন, “টেকসই অভিবাসন বিষয়ে গণভোটের প্রশ্নগুলো বর্ণবাদের শামিল—এমন যে কোনো অভিযোগ মিথ্যা ও উস্কানিমূলক।”
স্যাম ব্ল্যাকেট বলেছেন, এই প্রশ্নগুলো কানাডায় বর্তমান অস্থিতিশীল অভিবাসন হারকে তুলে ধরে, যা গুরুত্বপূর্ণ জনসেবাগুলোর ওপর প্রকৃত চাপ সৃষ্টি করছে।
উল্লেখ্য যে, Ipsos poll এর একটি নতুন জরিপ দেখা গেছে, ২০২৬ সালের শুরুর তুলনায় বর্তমানে আলবার্টা বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। খবর গ্লোবাল নিউজের। জরিপটি চালানো হয়েছিল এই নিউজ চ্যানেলের পক্ষেই।
গত ২৮শে মে থেকে ১লা জুনের মধ্যে পরিচালিত Ipsos poll এর ঐ সমীক্ষায় দেখা গেছে, আলবার্টার ১৯ শতাংশ বাসিন্দা বলেছেন যে তাঁরা ফিউচার বাইন্ডিং রেফারেন্ডমে বিচ্ছিন্নতাবাদের পক্ষে ভোট দেবেন। অন্যদিকে ৭২ শতাংশ আলবার্টাবাসী বলেছেন তারা কানাডায় থাকার পক্ষে ভোট দেবেন। বাকিরা সিদ্ধান্তহীন, ভোট দেবেন না অথবা কোনো উত্তর দেননি।
কিন্তু তারপরও আলবার্টায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অভিবাসীদের প্রতি বাড়ছে বর্ণবাদ।
