বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্যালগেরি’র বনভোজন ২০২৬ উদযাপন
শৈলেন কুমার দাশ : আজ তেরই সেপ্টেম্বর নর্থ আমেরিকান বর্ণালী সৌন্দর্য্যের শরতের স্নিগ্ধতা জড়ানো অমিয় মুগ্ধতায় উদযাপিত হল বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্যালগেরি (বিএসসি) এর বার্ষিক বনভোজন। ক্যালগেরি শহরের পাশের এক সাজানো গুছানো ছোট্ট শহর এয়ারড্রি (Airdrie), যে শহরের শ্যামল সুন্দরে সাজানো অপূর্ব Nose Creeck National Park এর সবুজের সমারোহে সেজেছিল এই আনন্দ উৎসব। ক্যালগেরি শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রিয় তিনশত মানুষের আনন্দ কোলাহলে দিনব্যাপী মুখরিত হয়েছিল এই সবুজ অঙ্গন । শিশু, কিশোর, নারী পুরুষ সবাই বর্ণময় পোষাকে সজ্জিত হয়েছিলেন যা ছিল চোখে পড়ার মত এবং মনের কোণে বসন্তের এক পশলা সোনামাখা রং জড়ানো সিগ্ধ সকালের মত। সবাই থরে থরে সাজানো ছোট্ট ছোট্ট আসরে মেতে ছিলেন নানাবর্ণের আলাপনে। শৈশবের স্মৃতি জড়ানো বনভোজনের আলোচনা এই শ্যামল গালিচাকে উচ্ছাসের আবেশে জড়ায়। আমিও আলাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি ইকরাম উল্লা চৌধুরী ও দুই তরুণ মঞ্জুরুল ইসলাম ও আলী হাসান আহম্মেদ এর সাথে। মঞ্জুরুল আমার বাড়ি নবীগঞ্জ জেনেই বলে সে নবীগঞ্জের গুমগুমিয়া গ্ৰামে গিয়েছে। আমি তাকে বলি এইটি তো আমার গ্ৰাম। সে সাথে সাথে লন্ডনে একজনকে ভিডিও কল দিয়ে কথা বলতে বলে। চেয়ে দেখি আমাদের রহমত আলী। সে আমার ছোটভাইয়ের প্রাইমারি স্কুলের সহপাঠী। আমাকে সে এত লোকের মধ্যে দেখে মনঞ্জুরুলকে বলে তুমি আমার শৈশবের প্রিয় দাদাকে কোথায় পেয়ছো? যে দাদা উনার বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে নবীগঞ্জে মিষ্টির দোকানে একটা মিষ্টি কিনলে আমাকে অর্ধেক মুখে তুলে খাইয়েছেন। এই হচ্ছেন আমার এই দাদা। তাছাড়া দাদার বড় ভাই আমাদের ইউনিয়নের একাধারে পয়ত্রিশ বছর নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। অতীতের সুন্দর দিনের কথা স্মরণের মধ্য দিয়ে আমার প্রিয় গ্ৰামের ছোট ভাই রহমত আলীও আমাদের পিকনিকের সাথে যুক্ত হল। মনে মনে বললাম বেঁচে থাকুক এমন সম্পর্ক সবার প্রাণে প্রাণে অনন্তকাল।

নারীরা ছিলেন ব্যস্ত হারানো দিনের স্মৃতির অলিন্দে হরেক প্রীতির আলাপনে। প্রান্তরজুড়ে দলে দলে নবীণ প্রবীণ বিভিন্ন আলোচনার পসরা সাজিয়েছিলেন আন্তরিক প্রীতির পরশে। বনভোজনের বর্ণাঢ্য এই আয়োজনের শ্যামস্নিগ্ধ ভূমিতে সবার মাঝে যারা আলাপনের দীপ্তি ছড়িয়েছিলেন তাঁরা হলেন সায়মা জামাল, নাজনীন নেওয়াজ, নাফিজা রহমান (ডলি), ফাহমিদা নাজনীন, রোকেয়া সুলতানা, তসলিমা রউফ, আদিবা বেগম, সাইদা বেগম, ডা. ফারহানা, কল্যাণী দাশ, শান্তা নওরিন, শাহানা বেগম, সায়মা মওলা, মাসুদ খান, ইকরাম উল্লা চৌধুরী, আলী আশরাফ লস্কর, জাহিদ খান, মাসুদ হোসেন, শাহিন আহম্মেদ, মঞ্জুরুল ইসলাম, আলী আহম্মদ হাসান, ড. আহম্মদ আল ইমরান নিক্কন প্রমুখ। পার্কের একপ্রান্তে শিশুরা ফুটবল খেলায় দীপ্তিময় প্রহর সাজিয়েছে নিরন্তর। যাদের চাঞ্চল্য রং ছড়িয়েছে এখানে তারা হল ইবাদ, আয়ান, আইয়ান, সাহিল, দেবার্জুন, রাজন, রাদভিন, রাশভিন, মুশনাদ, ইনায়েত, ইলহান ও ফারহিন।
সকালের ব্র্যাকফাস্ট, চা, মুড়ি, দুপুরের খাবারসহ সমস্ত আয়োজন যাদের হাতে নিপুণ পরিকল্পনার ছাপ রেখেছে তাঁরা হচ্ছেন বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্যালগেরি’র নতুন এক্সিকিউটিভ কমিটির প্রাণবন্ত সদস্যবৃন্দ যথা হাসান আব্বাস, ওবায়দুর রহমান, জামাল উদ্দিন, খলিলুর রহমান, মাহবুবুল হক খোকন, শৈলেন কুমার দাশ, রিয়াজ মোর্শেদ, মো: জাহাঙ্গীর, রবিন রউফ, ফয়সল রিজভী, শাহানারা খাতুন, সায়মা মওলা, হারুনুর রশিদ, শাহরিয়ার হোসেন, তনিম ইমতিয়াজ, আরিফ শাহরিয়ার, আলী আহম্মেদ ও জাকির হোসেন। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে প্রাণবন্ত এই আসর প্রীতির মাধবী রংগের আবির ছড়িয়েছে নিরন্তর হাসি, উচ্ছাস আর নির্ভেজাল আড্ডার অপরূপ সৌন্দর্য্যে।
দুপুরের খাবারের আয়োজনে কোরমা, পোলাও, মাংস, সবজি, ফল আর শেষে ফিরনি-পায়েস রসনার এক মুগ্ধতর আবেশ ছড়িয়েছে প্রায় তিন শত নূরু, বুলু, পুশি, আয়শা, মিতা, শফি, শান্তদের মনে। চমৎকার আয়োজনে ভরপুর খাবারের স্বাদেও যুক্ত ছিল অনন্য মাত্রা। খাবার শেষে খেলাধুলার আয়োজনে যারা সাবলীল দক্ষতার রং ছড়িয়েছেন তারা হলেন শিশুদের খেলা পরিচালনায় হারুনুর রশিদ ও শৈলেন কুমার দাশ, নারী ও পুরুষদের খেলা আয়োজনে শাহানারা খাতুন, শৈলেন কুমার দাশ ও শান্তা নওরিন এবং রাফেল ড্র আয়োজন ও পরিচালনায় নাফিজা রহমান (ডলি), ওবায়দুর রহমান, হাসান আব্বাস, মাহবুবুল হক, ও আলী আশরাফ লস্কর। আপ্যায়নের জটিল কাজ দশহাতে যিনি আন্তরিকতায় সাজিয়েছেন তিনি হচ্ছেন এ কাজে বিএসসি ‘র দক্ষ একজন ডিরেক্টর জামাল উদ্দিন। বনভোজনের মূল আয়োজন মধ্যাহ্ন ভোজনের কূপন ব্যবস্থাপনার জটিল হিসাব সঠিকভাবে পরিচালনা করেছেন ফয়সল রিজভী, তনিম ইমতিয়াজ, আরিফ শাহরিয়ার, আলী আহম্মেদ, শাহরিয়ার হোসেন ও জাকির হোসেন। সার্বিক আয়োজন, আপ্যায়ন ও জনসংযোগে অতি কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছেন হাসান আব্বাস, ওবায়দুর রহমান, মাহবুবুল হক ও খলিলুর রহমান।
পরিশেষে পুরস্কার ও বিদায় আসর পরিচালনা করেন বিএসসি এর সাংস্কৃতিক সেক্রেটারি শাহানারা খাতুন। বিজয়ীদের হাতে প্রীতি ও আশিষের রংগে পুরস্কার তুলে দেন ইকরাম উল্লা চৌধুরী (মুক্তিযোদ্ধা), জাহিদ খান (রাজনীতিক), ডা. আলী আশরাফ লস্কর ও সায়মা জামাল (RSW)। পরে সবাই একে একে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এই প্রীতির বনভোজনের আয়োজকদের পরিকল্পিত সাজানো গুছানো আয়োজনের ভূয়সী প্রসংশা করেন। নগরীর বাংলাদেশী কমিউনিটির পরিচিত মুখ ও প্রফেশনাল সমাজকর্মী সায়মা জামাল ধন্যবাদ প্রদান আসরে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখতে গিয়ে অক্টোবরে আলবার্টার রেফারেনডাম এর প্রসঙ্গ এনে বলেন আমরা ইমিগ্রান্টরা সবাই কানাডার সাথে থাকতে চাই, আমরা আলবার্টাকে আলাদা দেশ হিসাবে দেখতে চাই না। পরে সবাইকে তিনি ভোটে অংশগ্রহণ করে আলবার্টাকে কানাডার সাথে যুক্ত থাকার পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য অনুরোধ জানান।
পরে বিদায়ের সানাই বাজলো বেদনা আনন্দের এক চিলতে রংগিন আলো ছড়িয়ে সবার মনে। ধীরে ধীরে শূন্য হয়ে গেল Nose Creeck Park এর সবুজ প্রাঙ্গণ। আমরাও বিদায়ের মুহূর্তে পিছনে তাকিয়ে হাত উঁচিয়ে শেষ বিদায় জানালাম এই সবুজের মিলনভূমিকে আগামী বছরের এমনি এক সুন্দর নির্মল আয়োজনের প্রত্যাশায়।
(ছবি : বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্যালগেরি)
