শ্রমের মর্যাদা
নজরুল ইসলাম
কানাডা শীত প্রধান দেশ, এ দেশের উত্তরাংশ যেমন ইউকোন (Yukon), নুনাভাট (Nunavut), ইয়েলোনাইফ (Yellowknife) প্রভৃতি এলাকায় অত্যধিক ঠান্ডা ও অনেকদিন বরফ থাকে, সে জন্য লোকবসতি কম। ঠান্ডা আবহাওয়া (-৫০ সেলসিয়াস থেকে -৬০ সেলসিয়াস) এর মধ্যেও লোকজন বাইরে কাজ করে। এ ঠান্ডা আবহাওয়াতে মাইনিং, কনস্ট্রাকশন, কল কারখানা, অফিস, কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি সবই রীতিমতো চলে। শীতের সময় নদী, হ্রদ, সব কিছু বরফে ঢেকে যায়। বাড়ির চারিদিক এবং রাস্তায় পাহাড় পরিমাণ বরফ জমা হয়, বরফ পরিষ্কার না করলে বাসা থেকে বের হওয়া যায় না। প্রতিটি পরিবারকে স্নো ব্লোয়ার (snow blower) দিয়ে নিজেদের ড্রাইভওয়ের বরফ পরিষ্কার করতে হয় ঘর থেকে বের হয়ে কাজে যাবার জন্য ।
(Beaver) বীভার কানাডার এক বন্য প্রাণী যা এই কঠোর ঠান্ডার মধ্যে শক্ত দাঁত দিয়ে বনে জঙ্গলে গাছ কেটে নদীতে বা হ্রদে টেনে নিয়ে রাখে। এখানকার মানুষও বীভার এর মতো কঠোর পরিশ্রমী। যে জন্য এখানে অনেক অর্গানাইজেশন এর নাম Beaver Engineering, Beaver Construction বা Beaver lumber রাখা হয়। এই প্রচন্ড শীত ও বরফের মধ্যে এখানকার মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে সড়ক ও হাইওয়েতে কন্সট্রাকশনের কাজ করে। রাস্তা পরিষ্কার না করলে লোকজন ঘরে আবদ্ধ হয়ে যাবে।
গ্রীষ্মে এ দেশে প্রতি বাড়ির সামনে ঘাস কাটার মেশিন দিয়ে (Lawn Mower ) ঘাস কেটে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে। তা ছাড়া প্রতিটি বাড়ির সামনে বিভিন্ন রং বেরঙের ফুলের সমারহ দেখলে মনে হয় এ কোন ভূ-স্বর্গে বাস করছি! গ্রীষ্মকালে সারা দেশ সবুজ আর ফুলে সাজানো থাকে। কানাডা সত্যিই পৃথিবীর এক অপূর্ব সুন্দর দেশ, মনেই হয় না এ দেশে শীতকালে ভয়াবহ ঠান্ডা নামে আর বরফ পড়ে।
এখানে কি পুরুষ, কি মহিলা সবাই কর্মঠ এবং নিজেদের বাড়ির টুকিটাকি মেইনটেনেন্স এর কাজ নিজেরাই করে। প্রতিটি বাড়িতে ছোট খাটো মেশিনারিজ (টুল বক্স) থাকে যা দিয়ে সাময়িক পানির লাইন বা ইলেক্ট্রিক ফল্ট সময় /অসময় নিজেরাই ঠিক করে। বাইরে থেকে লোক ডাকানো হলে বহু পয়সা দিতে হয়, সে জন্য সবাই কিছু না কিছু কাজ শিখে নেয়।
প্রতিটি বাড়ির ব্যাকইয়ার্ড বা পিছনে গার্ডেনিং এর ব্যবস্থা আছে। গ্রীষ্মকালে বিভিন্ন সবজি যেমন লাউ, কুমড়া, করল্লা, টমোটো, সিম, বরবটি এবং আরও অনেক ধরণের সবজির বাগান করে, নিজেরা খায় এবং বন্ধু বান্ধবকে দেয়। আমি এবং আমার স্ত্রী দুইজনেই বাগান করতে ভালোবাসি। ভোর হলেই বাগানে আসা যাওয়া শুরু, বাগানের পাশে দোলনা, চেয়ার এবং বারবাকিউ (barbacue) রয়েছে। পাশেই প্রতিবেশী মি: সালভাতরে বারবাকিউ নিয়ে ব্যস্ত এবং মা মারিয়া বাগানে, মাঝে মধ্যে আমার স্ত্রীর সঙ্গে রসালাপ ও বাগান থেকে এটা সেটা দেয়া নেয়া করে ।
পরিশ্রম করে মানুষ ধন সম্পদ, সুনাম সুখ্যাতি অর্জন করে।
ভারতীয় সিনেমা জগতের কৌতুক অভিনেতা জনি ওয়াকার এর নাম অনেকেই শুনে থাকবেন । জনি ওয়াকার এর ভালো নাম বদরুদ্দীন জামালুদ্দিন কাজী। তাঁর বাবা ছিলেন একজন কারখানা শ্রমিক এবং পরিবারে ১০ ভাই বোনের মধ্যে তাঁর স্থান ছিল দ্বিতীয়। বাবার চাকুরী চলে যাওয়ার পর, সংসারের রুটি রোজগারের দায়িত্ব তাঁর উপর পড়ে। তিনি বাস কন্ডাক্টর হিসাবে প্রথম কাজ শুরু করেন এবং তাঁর ফাঁকে ফাঁকে আইসক্রিম,ক্যান্ডি,সবজি,ফল মহল্লায় মহল্লায় বিক্রি করতেন। জনি ওয়াকার সব সময় বাসে প্যাসেঞ্জেরদের আনন্দ দেয়ার জন্য এবং মহল্লায় মহল্লায় আইসক্রিম ,ক্যান্ডি এবং সবজি,ফল বিক্রির সময় লোকদের আকর্ষণ করার জন্য গান ও অভিনয় করে লোক সমাগম করতেন। তবে তাঁর স্বপ্ন ছিল মুভিতে অভিনয় করা। তাঁর কথা বার্তার মধ্যে কমেডি ও অন্য রকম প্রতিভা দেখে, অভিনেতা বলরাজ সানি সেই সময়কার বিখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক গুরু দত্তের নিকট তাঁকে নিয়ে যান। গুরু দত্ত ওর নাম পাল্টিয়ে জনি ওয়াকার নামে সিনেমায় লাগিয়ে দেন এবং এরপর জনি ওয়াকারকে আর পিছু ফিরতে হয় নি। তিনি সর্বমোট ৩০০ বা তাঁরও কিছু বেশি মুভিতে অভিনয় করেছেন। বড়ো বড়ো অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের মধ্যে সবাই তাঁর মতো একজন কৌতুক অভিনেতাকে নিয়ে কাজ করতে আনন্দ বোধ করতেন। তিনি মুভিতে অনেক সময় মাতালের অভিনয় করতেন। কিন্তু জীবনে কোনো দিন মদ স্পর্শ করে নি। পরে তিনি হিন্দি সিনেমা জগতের প্রখ্যাত অভিনেত্রী সাকিলার ছোট বোন নুরজাহানকে বিয়ে করেন। সংসারে তাঁর তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। অনেক পরিশ্রম করে তিনি নিজের সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং জীবনে তাঁকে আর অভাবে পড়তে হয় নি। সারাজীবন জনগণের নিকট একজন কৌতুক অভিনেতা হিসাবে বেঁচে ছিলেন।
এবারে অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক। আমার এক প্রতিবেশী আছেন যার নাম কার্লো। তাঁকে আমি চিনি গত ১৫ বৎসর ধরে। একজন কঠোর পরিশ্রমী লোক তিনি। তাঁর স্ত্রী ফিলোমিনা এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে আমাদের পারিবারিক প্রতিবেশী ও বন্ধু। প্রতিবেশী হিসাবে কার্লোর সঙ্গে মাঝে মধ্যে আমি আমার অবসর সময়ে আলাপ করি। কার্লো ৭৯ বৎসর বয়স্ক একজন কাজের মানুষ যাকে ওয়ার্কওহলিক বলা যায়। সে অবসরপ্রাপ্ত ,কিন্তু কাজ ছাড়া থাকেনা। আমি যখনই তাঁকে দেখি, কিছু না কিছু একটা নিয়ে সে ব্যস্ত। ওর অতীত ইতিহাস জানার আগ্রহ অনেক দিনের।
কার্লোর জন্ম ইতালির কোনো এক ছোট্ট শহরে (১৯৩১)। তাঁর বাবার সংসারের অবস্থা ভালো ছিল না। ছোট বয়সে সে কাঠ কেটে বিক্রি করে বাবার সংসারে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর তিনি জার্মানিতে ৮ বছর কন্সট্রাকশনের কাজ করেন । যুদ্ধের সময় তিনি ইতালিতে ছিলেন,তবে কাজ করতে গিয়ে জার্মানির ধ্বংসাবশেষ তাঁর নজরে পড়েছে। তাঁর কাছ থেকে আমি জার্মানির ধ্বংস সম্পর্কে বাস্তব অনেক কিছু জানতে পারি। তিনি বলেন, শুধু জার্মানি নয়, ইউরোপের সব কটা দেশ ধ্বংস হয়েছিল। আর জার্মানি হয়েছিল সব চেয়ে বেশি। বহুদেশের লোক জার্মানির পুনর্গঠনে কাজ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির বাড়ি,ঘর, কল-কারখানা, রাস্তা-ঘাট সব কিছুই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশ এগিয়ে এসে জার্মানির পুনর্গঠনে সাহায্য করে। বিভিন্ন দেশের আর্থিক সাহায্যে এবং লোকজন দিয়ে অনেক বৎসর কাজ করে দেশকে দাঁড় করিয়ে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ৪০ হাজারেরও অধিক কানাডিয়ান সৈন্য প্রাণ হারান। লক্ষ লক্ষক্ষ লোক সর্বস্ব হারিয়ে আমেরিকা/ কানাডায় রিফুজী হিসাবে চলে আসেন। এ সব লোক যারা বেঁচে আছেন এবং তাদের ছেলে মেয়েরা অনেকেই প্রিয় জন হারানো স্মৃতি স্বরণ করতে গিয়ে আজও চোখের জল ফেলেন ।
কার্লো ষাটের দশকে ইমিগ্রেশন নিয়ে এ দেশে আসেন ও কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার হিসাবে কাজ শুরু করেন। সে সময় এ দেশে কাজ পাওয়া অনেক কঠিন ছিল। অনেক সময় কার্লো বরফের রাস্তায় হাটতে গিয়ে চিৎ পটাং হয়ে পড়ে আঘাত পেতো। একবার তিনি শক্ত বরফের (আইস) ওপর হাটতে গিয়ে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান এবং হাসপাতালে যেতে হয়। প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে বাইরে দৈনিক ৮ ঘন্টা কত যে কষ্টের কাজ, সেটি যারা দেখেননি বা করেননি তাঁরা বিশ্বাস করতে পারবে না। মেশিন দিয়ে মাটি কেটে রাস্তা তৈরী করা, আবার কখনও বাড়ি ঘর নির্মাণ, সব ধরনের কাজই তিনি করেছেন। কয়েক বছর কাজ করে কিছু ডলার জমিয়ে দেশে গিয়ে বিয়ে করেন তিনি। স্পন্সর করে স্ত্রীকে নিয়ে এসে দুইজনে কাজ শুরু করেন। আস্তে আস্তে অনেক বছর কাজ করে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বাড়ি কিনেন। এ ভাবেই কাজ করতে করতে একদিন অবসর নেন। এ কাহিনী বলতে গিয়ে তাঁর দু’চোঁখ জলসিক্ত হয়ে উঠে। সে যুগে একজন কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কারের মজুরি ছিল সপ্তাহে ৩৫ ডলার। আমি প্রশ্ন করলাম, আপনি তো জার্মানিতেও থাকতে পারতেন। উত্তরে তিনি বলেন যে, “আমি জার্মানিতে ছিলাম বটে। তবে ঐ সময় আমার এক বোন কানাডায় থাকতো। আমার ঐ বোনের মতে কানাডা একটি শান্তিপ্রিয় দেশ। সে আমাকে স্পনসর করে। তাই এ দেশে এসে সেটল হয়েছি।”
আমি বহু বছর ধরেই কার্লোসকে দেখে আসছি। তাঁকে অলস ভাবে বসে থাকতে কখনও দেখি না। আমার মতে, তিনি একজন পারফেক্ট কাজের মানুষ। বাড়ি ঘর রেনোভেশন সংক্রান্ত সব ধরণের কাজ তিনি জানেন। আমি তাঁকে কখানো কোনো কাজ নিয়ে বিরক্ত হতে দেখি নি। তাঁকে কোনো কাজ দিলে তিনি বসবেন না যে পর্যন্ত কাজটি শেষ না করবেন। তাঁর স্ত্রী ফিলোমিনা এক রেস্টুরেন্ট শেফ এবং বহু বৎসর কাজ করে এখন অবসর নিয়েছেন। তাঁর ছেলে মেয়েরা তাঁর সঙ্গে থাকে না। ওদের নিজস্ব কাজ ও আলাদা পারিবারিক জীবন। তবে প্রায় উইক এন্ডে মা বাবাকে দেখতে আসেন। অত্যন্ত হাসি খুশি জীবন, দুইজনের ইতালিতে বাড়ি আছে এবং যখন যান, ঘরের দরজা খুলে দুই এক মাস থেকে আবার ঘরের দরজা বন্ধ করে চলে আসেন। কারো কোনো লোভ লালসা নাই,জোর দখল করার।
আমার বাড়ির পিছনে এক প্রতিবেশী আছেন যার নাম স্যাম। বয়সে কার্লোর চেয়ে ২/৩ বছরে বড়ো, তিনিও ইতালির সিসিলি’র অরিজিনাল বাসিন্দা। ১৯৫৬ সালে কয়েক শত লোকের সঙ্গে একত্রে ইতালি থেকে রিফিউজি হিসাবে জাহাজে করে এসে কানাডার হ্যালিফ্যাক্স এ ঢুকেছিলেন। যখন যা পেতেন সে ভাবেই কাজ শুরু করেছিলেন তাঁরা। হ্যালিফ্যাক্স, আলবার্টা প্রভৃতি স্থানে সুবিধা করতে না পেরে টরন্টো এসে স্থায়ী ভাবে বাস করতে শুরু করেন। পরে সিসিলি গিয়ে বিয়ে করেন। মাঝে মধ্যে গল্প করি। তিনি জানান, সে সময় এক ঘন্টা কাজ করলে ৭৫ পয়সা মজুরি পাওয়া যেত।
কার্লো আর স্যাম আমার খুবই প্রয়োজনীয় বন্ধু মানুষ। অনেক সময় তাঁরা আমার বাড়ির কাজে অনেক উপকারও করেন। স্যাম বাসায় একা থাকেন। তাঁর দুই ছেলে দূরে আলাদা ভাবে বৌ, নাতি, নাতনি নিয়ে থাকেন। স্যামের স্ত্রী অসুস্থ এবং সিনিয়র নার্সিং হোম এ থাকেন। তিনি মাঝে মধ্যে গিয়ে দেখে আসেন স্ত্রীকে।
আমাদের আর এক প্রতিবেশি ফ্লোরা। ৮৫ বছর বয়ষ্কা এই মহিলা একাকী থাকেন। আজ থেকে ১৫ বৎসর পূর্বে তাঁর স্বামী এবং দুই বছর হলো তাঁর জ্যৈষ্ঠ ছেলেকে হারিয়েছেন ক্যান্সারে। তাঁর দুই ছেলে খানিকটা দূরে থাকেন বৌ আর নাতি নাতনি নিয়ে। হাসব্যান্ড ইতালি থেকে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর পর এখানে এসে সেটলড হয়েছিলেন। তিনি বলেন,“এ বাড়ি তৈরী হওয়ার সাথে সাথে আমরা কিনেছি। এখানে আমার ছেলেরা হয়েছে, এ বাড়ির সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক। আমি একা হলেও নিজেকে একা মনে করি না।”
আমরা প্রতিবেশী সবাই তাঁর খেয়াল রাখি। ফ্লোরার সব চেয়ে অসুবিধা উইন্টারে যখন হেভি স্নো শুরু হয়। আমার ঘরের দরজা আর তাঁর ঘরের দরজা সামনা-সামনি। অনেক সময় সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে যদি তাঁর ঘরের দরজা একটু পরিষ্কার করে লবন ছিটিয়ে দেই। প্রচন্ড শীতে তিনি ঘর থেকে বড় একটা বের হন না। সামারে আস্তে আস্তে বাইরে এসে তাঁর বাড়ির সামনের বেঞ্চে বসে থাকেন। লোকজন আসা যাওয়ার পথে তাঁর খবর নেন। তবে হাসপাতালে বা ডাক্তারের নিকট যেতে হলে মাঝে মধ্যে আমি গাড়ি দিয়ে নিয়ে যাই যদি কোনো কাজে কর্মে ব্যস্ত না থাকি। নতুবা তিনি ট্যাক্সি করে চলে যান।
আমাদের আর এক প্রতিবেশী মারিয়া। বয়স ৮৫ বা ৮৬ হবে। তিনিও গত ৬০ বৎসরেরও বেশি সময় ধরে আমার পেছনের বাড়িতে থাকেন। অনেকদিন হয় তাঁর স্বামী মারা গেছেন। তাঁর দুই মেয়ে একটু দূরে নাতি/নাতনি নিয়ে থাকেন এবং তাঁর একমাত্র ছেলে তাঁর সঙ্গে থাকেন। মারিয়া প্রচন্ড ঠান্ডা আর গরমে প্রতিদিন বাইরে হাঁটেন। গরমে প্রায়ই সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত নিজের বাগানে কাজ করেন, দুই বা তিন বারও একটা ব্যাগ ও লাঠি নিয়ে বাজারে যান, উদ্দেশ্য বাজার করা নয়, উদ্দেশ্য হাঁটা হাঁটি করা এবং নিজেকে ব্যস্ত ও সুস্থ রাখা। তিনি খুব সামাজিক। এই এলাকার লোকজনের খোঁজ খবর রাখেন।
মারিয়ার স্বামী মারা গেছেন ১৯৯৪ সালে। আজ থেকে ২৫/২৬ বৎসর হবে। এখনও তিনি তাঁর স্বামীর সেমেটারিতে (সমাধি) মাসে অন্তত একবার ফুল দিতে যান। তিনি ফুল নিয়ে ভালো করে সেজে গুঁজে বাসা থেকে বের হয়ে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকেন। অনেক সময় এত ঠান্ডা ও বরফ থাকে যে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা খুবই কষ্টকর। দুই একবার আমি ও আমার স্ত্রী বের হয়েছি শপিং বা আত্মীয় স্বজনকে দেখতে, উনি দাঁড়িয়ে আছেন বাসের জন্য। উনাকে দেখে আমার ওয়াইফ জিজ্ঞেস করে, “হ্যালো মারিয়া কোথায় যাবে? ” তিনি জবাব দেন, “ আমি আমার স্বামীর সেমেটারিতে যাবো।”
আমার স্ত্রী ও ছেলে মেয়েরা তাঁকে খুব ভালো বাসে। আমার স্ত্রী আমার দিকে তাকায়, আমি সায় দিলে ও ডাকে,“ মারিয়া আমরা ওই দিকেই যাবো।” তিনি খুশি হয়ে গাড়িতে উঠেন। আমরা তাঁকে সেমেটারিতে নামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করি, “আমরা কি কিছু সময় অপেক্ষা করবো?”
তিনি বলেন- “না, আমার ফিরতে দেরি হবে। তোমরা চলে যাও।” নিজে ভাবি, কতখানি ভালোবাসা থাকলে একজন বৃদ্ধা মহিলা কানাডার প্রচন্ড বরফ আর ঠান্ডার মধ্যে তাঁর স্বামীর সমাধির পাশে ফুল নিয়ে কিছু সময় অতিবাহিত করতে পারেন। “একেই বলে প্রেম, একেই বলে ভালোবাসা।”
সব মানুষের মারিয়ার মতো প্রেম,ভালোবাসা থাকুক বা থাকা উচিৎ। এক গুচ্ছ ফুলের মূল্য তাঁর নিকট কয়েক ডলারের চেয়েও অনেক বেশি। যখনই তাঁর স্বামীর সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করি, তাঁর চেহারার দিকে তাকালে বুঝতে পারি তাঁর স্বামীর প্রতি গভীর অগাধ ভালোবাসা ছিল।
আমাদের ঘরে কোনো কিছু স্পেশাল হলে, আমার স্ত্রী বা মেয়ে তাকে ডেকে আনে। বিশেষ করে আমার মেয়ে ওকে দেখলে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলে,“Maria I love you” সে ও বলে “ I love you too” তাঁর সবজির বাগান, ফুলের বাগান আমাদের পাশা পাশি। সে বাগানে আসবে আর আমাদের বাগানের লনেও একটু কাজ করবে। তাঁর বাগানের সবজি, আঙ্গুর অবশ্যই আমার ছেলে মেয়েদের জন্য শেয়ার করবে। শুধু সে একা নয়! কার্লো এবং ফ্লোরা তাদেরও একই অবস্থা। ইতালিয়ানরা অত্যন্ত অতিথি পরায়ণ। তাদের সমাজ ব্যবস্থা আমাদের সঙ্গে অনেক খানি মিল রয়েছে।
এখানে ক্যারাবিয়ান, সোমালিয়ান,পাকিস্তানীসহ আরও অনেক দেশের লোকই রয়েছেন। বেশির ভাগ লোক এদেশে প্রায় খালি হাতে এসেছেন এবং পরে অনেক কষ্ট করে আস্তে আস্তে ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে বাড়ি করেছেন। প্রায় সবার অবস্থাই,“হ্যান্ড তো মাউথ।” কাজ করেন আর কোনো রকমে সংসার চালান। দুই এক বার দেশে পরিবার নিয়ে গেলে, অনেকেরই ব্যাংক থেকে লোন করতে হয়। তা পরিশোধ করতে কয়েক বছর লেগে যায়।
এই যে লোকগুলি নিয়ে আলোচনা করলাম তাঁদের কারও একটার বেশি থাকার বাড়ি নাই বা দুইটা বাড়ি করার চিন্তা ভাবনা নাই। ছেলে মেয়েরা স্টুডেন্ট লাইফ থেকে কাজ করে পড়া শুনা করে নিজেরা যার যার মত কাজে ব্যস্ত। সময় পেলে (ছুটিতে) এখানে সেখানে বা কটেজে নিজের পরিবার নিয়ে সময় কাটায় বা একটা কিছু কোর্স করে, নিজেকে ব্যস্ত রাখে। সবাই যখন একত্রে ছিল এই বাড়িটা সবার জন্য দরকার ছিল। মনে হত বাড়িটা অনেক ছোট। এখন কেউ থাকেনা, একজন বা দুইজন থাকে, কাজেই অনেকে বাড়ি বিক্রি করে এপার্টমেন্টে চলে যায়। এতে শীতে বরফ পরিষ্কার করা আর গ্রীষ্মে লন পরিষ্কার করার (মেইনটেনেন্স) ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা যায়। আমাদের প্রতিবেশি ফ্লোরা তাঁর বাড়িতে একা থাকেন। মাঝে মধ্যে জিজ্ঞাসা করি- “তুমি কি একা একা থেকে ক্লান্ত (বোরে) হও?” সে বলে, “নাহঃ আমার কোনো অসুবিধা হয় না।” কাল বিকেলে আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল, “কফি শপ কি খোলা আছে কি?” আমি বললাম, “ করোনার কারণে সব বন্ধ।” তবে ড্রাইভ উইন্ডো দিয়ে কফি নেয়া যায়। সে বললো “শপে গিয়ে বসে বসে একটু কফি পান করতে পারলে ভালো হত।” আমি বললাম “সে অবস্থা কবে হবে বলা মুশকিল।”
পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা গেছে, যারা হিজরত বা ইমিগ্রেশন/রিফিউজি হিসাবে অন্য দেশে যান তাঁরা ভালো থাকেন। এর মূল কারণ হলো, এ সব লোক পেছনে সর্বস্ব হারানো, অনেক পরিশ্রম করে তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। এ ছাড়া তাঁরা ছেলে মেয়েদের শিক্ষা দেয়ার পিছনে অনেক সময় ব্যয় করেন। কানাডাতে যে সব লোক দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর এসেছেন তাঁরা ছিলেন সর্বস্ব হারানো এবং শিক্ষিত জ্ঞানী লোক। তাঁরা নিজেদের জীবনকে বিসর্জন দিয়ে ছেলে মেয়েদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন (এডুকেশন), লোভ, লালোসা শিখাননি, তাঁরা কৃতকার্য (সাকসেসফুল) লোক।
এখানকার বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, বা উচ্চ শিক্ষিত,ব্যারিস্টার, ডাক্তার অথবা পার্লামেন্ট সদস্য, মন্ত্রী যারা এ দেশের পলিসি মেকার, তাদের অধিকাংশের পূর্বপুরুষ ইউরোপিয়ান ব্যাকগ্রাউন্ড এর। মূলতঃ এ সব লোক এ দেশের কর্ণধার। ইউরোপের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট আর এখনকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট দেখলে মনে হবে অনেকটাই কার্বন কপি। এরা সর্বস্ব হারিয়ে আসলেও তাঁদের ধ্যান ধারণা ছিল একই।
কানাডাকে রিফিউজি কান্ট্রিও বলা হয়। সারা পৃথিবীর প্রতিটি দেশের লোক এ দেশে পাওয়া যাবে। এ দেশের সরকার প্রতিটি কমুনিটির নিজস্ব ভাষাকে ধরে রাখার জন্য সচেষ্ট। এখানে কমিউনিটি স্কুলগুলিতে ছেলে মেয়েদের নিজস্ব ভাষা শিক্ষাদানের ব্যবস্থা রয়েছে। আগ্রহী পরিবারের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা প্রতি উইকেন্ডে স্কুল গুলিতে নিজস্ব ভাষা শিখে। এ ছাড়া এখানে প্রতিটি কমিউনিটিতে তাদের নিজস্ব ভাষার সংবাদপত্র রয়েছে। রেস্টুরেন্ট ও নিজস্ব দেশীয় দোকানে দেশী খাওয়া দাওয়া পাওয়া যায়, শুকনা মাছ, মিষ্টি, দেশীয় তাজা মাছ, তরকারি, সবই পাওয়া যায়। বাজার থেকে কিনে আনো, রান্না করো, আর খাও। এ দেশের সরকার সংখ্যা লঘু (ভিসিবল মাইনোরিটি) লোকদের দাবিকে মর্যাদার সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রতিটি কমিউনিটি তাদের নিজস্ব দেশীয় অনুষ্ঠানে নিজেদের দেশ থেকে শিল্পী ও নামিদামী লোকদের দাওয়াত করে তাঁদের গান ও মূল্যবান বক্তব্য উপভোগ করেন। প্রতি সামারে কমিউনিটি বনভোজন (পিকনিক) হয়ে থাকে, তাঁর সঙ্গে সব ধরণের গান বাজনা ও মূল্যবান বক্তব্য উপভোগ করা হয়।
আমাদের বাংলাদেশ থেকে যদি কেউ এ দেশে আসতে চান, অবশ্যই তাঁকে এখানকার ভাষা,কাজের দক্ষতা,এবং সেই সাথে হার্ড ওয়ার্কিং এ প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হতে হবে। তাছাড়া দেশী মিথ্যা,বানোয়াট আর ধোকাবাজ লোকদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে কানাডিয়ান হাই কমিশনে সরাসরি কাগজপত্র প্রসেস করার জন্য পাঠানো সব চেয়ে সহজ ও ঝামেলা মুক্ত। এতে টাকা পয়সা অপচয় হওয়ার ভয় থাকে না। মনে রাখবেন, এ দেশে সব সময় দক্ষ কাজের লোক দরকার আছে। অযথা হয়রান হয়ে মা বাবার টাকা পয়সা দালাল কে দিয়ে সর্বস্ব হারাবেন না।
-নজরুল ইসলাম
টরন্টো
