করোনা মহামারী থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র পথ এখন ভ্যাকসিন
খুরশিদ আলম
কানাডার সিংহভাগ নাগরিকই এখন করোনা প্রতিরোধের জন্য নতুন আবিস্কৃত ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী। এই ভ্যাকসিনের প্রতি তাঁদের ভীতি আগের তুলনায় কমে এসেছে উল্লেখযোগ্য হারে। তবে এখনো কিছুসংখ্যক লোক বলছেন তাঁরা ভ্যাকসিন নেওয়ার আগে এক থেকে দুই মাস অপেক্ষা করবেন। Ipsos/Radio-Canada ’র সাম্প্রতিক এক জরিপে এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। রিপোর্ট সিবিসি নিউজের।
জরিপে অংশ নেয়া কানাডিয়ানদের মধ্যে ৬৪% বলেছেন তাঁরা সম্ভবত বা নিশ্চিতভাবেই (probably or certainly) ভ্যাকসিন নিবেন। অন্যদিকে ১৬% কানাডিয়ান বলেছেন তাঁরা অবশ্যই ভ্যাকসিন নিবেন না। আর ২০% নাগরিক এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
ম্যাক্গিল বিশ^বিদ্যালয়ের Interdisciplinary Initiative in Infection and Immunity বিভাগ এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক Dr. Don Sheppard সিবিসি নিউজকে বলেন, “এটি আমার কাছে বেশ আশাব্যঞ্জক বলে মনে হচ্ছে যে, এক তৃতীয়াংশ কানাডিয়ান কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন নিতে চাচ্ছেন এখনই।”
তিনি আরো বলেন, “ সিংহভাগ কানাডিয়ান যে শুধু ভ্যাকসিন নিতে রাজী আছেন তা নয়, তাঁরা অনুভব করছেন করোনার এই মহামারী থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ এখন এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করা।”
জরিপে আরো যে তথ্য এসেছে তাতে দেখা যায়, সিংহভাগ কানাডিয়ান ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে রাজী হলেও অনেকে আছেন যাঁরা এখনি তা নিতে চাচ্ছেন না। যাঁরা ভ্যাকসিন নিতে রাজী আছেন তাঁদের মধ্যে ৩৬% বলেছেন তাঁরা যত শীঘ্র সম্ভব ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী। অন্যদিকে ৩৮% বলেছেন তাঁরা এক বা দুই মাস অপেক্ষা করবেন এটি দেখার জন্য যে ভ্যাকসিন ঠিক মত কাজ করছে। আর ১৫% বলেছেন ভ্যাকসিন নেওয়ার আগে তাঁরা কয়েক মাস অপেক্ষা করবেন ফলাফল দেখার জন্য।
কুইবেক প্রভিন্সের বৃহত্তম স্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র CHUM এর মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ Dr. Cécile Tremblay সিবিসি নিউজকে বলেন, “এটি অবাক হওয়ার মত কোন বিষয় নয়। সবাই তাৎক্ষণিকভাবে ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন না এটাই স্বাভাবিক। তবে জরিপ ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পর্যাপ্ত সংখ্যক কানাডিয়ান ভ্যাকসিন গ্রহণ করবেন যা দেশের সবাইকে রক্ষা করার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ হয়ে উঠবে। আর হার্ড ইমিউনিটি (herd immunity) অর্জনের জন্য দেশের প্রত্যেক মানুষকে ভ্যাকসিন নিতে হবে এমন কোন কথা নেই।”
উল্লেখ্য যে, দেশের ৮৩ থেকে ৯৪% লোক ভ্যাকসিন নিলে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন হতে পারে। হার্ড ইমিউনিটি হলো, যখন ভ্যাকসিনের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠির মধ্যে বিশেষ কোন ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা তৈরী হয়।

জরিপে আরো দেখা গেছে অধিকাংশ লোক কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের পাশর্^ প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারেও উদ্বিগ্ন। ভ্যাকসিন নিলে কি কি পাশর্^ প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা নিয়ে আগে থেকেই এই উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে তো গুজবের অন্ত নেই। এমনকি অতি উচ্চপদস্থ লোকদের মধ্যেও কাউকে কাউকে দেখা গেছে গুজব ছড়াতে। উদাহরণ হিসাবে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো’র কিছু চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও কথাবার্তার বিষয় উল্লেখ করা যায়। তিনি ফাইজার/বায়োএনটেক ভ্যাকসিন নিয়ে তাঁর দেশের জনগণকে সতর্ক করতে গিয়ে ইতিপূর্বে বলেছিলেন “পাশর্^ প্রতিক্রিয়ার ফলাফল হিসাবে কেউ যদি কুমির হয়ে যান তবে তার জন্য সরকার দায়বদ্ধ থাকবে না। আপনি যদি অতিমানব হয়ে যান, কোন নারীর যদি দাড়ি গজায় কিংবা কোন পুরুষ যদি নারী কণ্ঠে কথা বলা শুরু করেন তাহলেও সরকারের কিছুই করার থাকবে না।”
প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো এর আগেও করোনা মহামারির ঝুঁকিকে খাটো করে মন্তব্য করায় সমালোচিত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, পৃথিবীতে যে কয়টি দেশে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক লোক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তার মধ্যে ব্রাজিলের অবস্থান তৃতীয়। প্রথম হলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। দ্বিতীয় স্থানে আছে ভারত।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট করোনা নিয়ে হঠকারী ও অবিবেচকের ন্যায় কথাবার্তা বলে লোক হাসিয়েছেন বটে, তবে একপর্যায়ে তিনি নিজেও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আক্রান্ত হয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তিনিও করোনা ভাইরাস নিয়ে হঠকারী কথাবার্তা কম বলেননি। যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পিছনে তাঁর দায়িত্বহীনতাই প্রধান কারণ বলে অনেকে মনে করেন।
তবে করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে সাধারণ লোকজনের মধ্যে যে উদ্বেগ ও আশংকা সৃষ্টি হয়েছে সে ব্যাপারে ভাইরাস বিশেষজ্ঞদেরও কিছু করার আছে। Dr. Cécile Tremblay এবং Dr. Don Sheppard বলেন “ভাইরাস বিশেষজ্ঞদেরকে এগিয়ে আসতে হবে জনগণের মধ্যে এই উদ্বেগ ও আশংকা দূর করার জন্য।”
Dr. Tremblay সিবিসি নিউজকে বলেন, “ভ্যাকসিন ডাটা থেকে আমরা এ পর্যন্ত যে সকল তথ্য পেয়েছি তাতে দেখা যাচ্ছে এগুলো খুবই নিরাপদ। কোন গুরুতর ইস্যু নেই নিরাপত্তার বিষয়ে। এ পর্যন্ত যাঁরা করোনা ভ্যাকসিন নিয়েছেন তাঁদের মধ্য খুবই সামান্য পাশর্^ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে যার মধ্যে আছে হাতে সামান্য ব্যথা, জ¦র বা দুর্বলতা। এই পাশর্^ প্রতিক্রিয়াগুলো সাধারণ ফ্লু ভ্যাকসিন নিলেও হয়।
কানাডায় ইতিমধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ভ্যাকসিন অনুমোদন লাভ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে Pfizer-BioNTech, Moderna, AstraZeneca-Oxford এবং Johnson & Johnson। ভ্যাকসিন প্রদানও শুরু হয়ে গেছে গত বছর ১৪ ডিসেম্বর থেকে। কিন্তু ভ্যাকসিন বিরোধী প্রচার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে অনলাইনে। অন্টারিও মেডিক্যাল এসোসিয়েশন এর প্রেসিডেন্ট সামান্থা হিল বলেন, “করোনা ভ্যাকসিন সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপজ্জনক ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে যা এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে কানাডার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করবে।”
এই এসোসিয়েশন এর পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ৬৫ হাজার পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের যে ধারণা একবার উঠেছিল তার ছাড়াছড়ি এখনো রয়েছে ব্যাপকভাবে। তাছাড়া করোনা ভ্যাকসিন বিপজ্জনক এবং তা যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি এমন কথাও ব্যাপকভাবে ছড়ানো হচ্ছে অনলাইনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যাদের বয়স ৩৫ এর নিচে তাঁদের মধ্যেই এই অপপ্রচারগুলো বেশী হচ্ছে। দি কানাডিয়ান প্রেস এর এক খবরে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়।
টরন্টোর সিককিডস (SickKids) হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান ডা: উপটন এ্যালেন দি কানাডিয়ান প্রেসকে বলেন, “ভ্যাকসিন এর বিষয়ে অনিহা বা দ্বিধা কখনো কখনো বেশী মাত্রায় দেখা যাচ্ছে করোনায় যে সকল কমিউনিটির লোক অধিক মাত্রায় আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে। এই অনিহা বা দ্বিধা করোনা পরিস্থিতিকে আরো বিপজ্জনক করে তুলছে।”
উল্লেখ্য যে, কানাডার আদিবাসী এবং এথনিক কমিউনিটির লোকেরা করোনায় বেশী আক্রান্ত হয়েছেন সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত বৈষম্যের কারণে। কানাডায় কৃষ্ণাঙ্গ ও অধিবাসীদের উপর করোনার প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণার নেতৃত্ব দানকারী ডা: উপটন এ্যালেন দি কানাডিয়ান প্রেসকে বলেন, “ প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা গেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র এক তৃতীয়াংশ কৃষ্ণাঙ্গ করোনার ভ্যাকসিনের উপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। কানাডায়ও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখানকার প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্য করোনা ভ্যাকসিন এর বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, করোনার ভ্যাকসিন নিরাপদ এবং খুবই নিরাপদ সকল এথনিক সম্প্রদায়ের জন্যও।”
এর মধ্যে অবশ্য প্রশ্ন উঠেছে করোনার পরিবর্তিত নতুন রূপ নিয়েও। ব্রিটেন ও দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনার নতুন রূপের যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত অনুমোদনপ্রাপ্ত ভ্যাকসিনগুলো কতটা কার্যকর তা জানতে চাচ্ছেন সবাই। কিন্তু এর সঠিক বা নিশ্চিত জবাব পাচ্ছেন না কেউই। এমন কি ভ্যাকসিনের আবিস্কারক বা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও নিশ্চিত করে এখনো বলতে পারছেন না নতুন রূপের বিরুদ্ধে তা কার্যকর কি না। বা কার্যকর হলেও সেটা কত মাত্রায়। Pfizer-BioNTech এবং Moderna অবশ্য দাবী করে আসছে তাদের আবিস্কৃত ভ্যাকসিন নতুন রূপের করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কিন্তু নিশ্চিত করে বলতে পারছে না তা কতটা কার্যকর। অর্থাৎ এ ব্যাপারে আরো গবেষণা বা নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
অবশ্য অতিসম্প্রতি ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের নতুন রূপ নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম ফাইজার ও বায়োএনটেকের ভ্যাকসিন। মার্চ মাসের ৯ তারিখে প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। ঐ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ফাইজার ও বায়োএনটেকের বিজ্ঞানীরা এবং ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস মেডিক্যাল ব্রাঞ্চ ওই গবেষণা পরিচালনা করেন।
আসলে করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার যেন শেষ নেই। করোনা প্রতিরোধের জন্য অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন এর ব্যবহার নিয়ে গত কিছুদিন ধরে বেশ বিতর্ক লক্ষ্য করা গেছে। এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করে কয়েকজনের শরীরে রক্ত জমাট বেঁধেছে – এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তার ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করে দিয়েছিল বেশ কয়েকটি দেশ। কানাডাও এই ভ্যাকসিন ব্যবহার করবে কি করবে না তা নিয়ে দিন কয়েক দ্বিধায় ছিল। পরে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন এর ব্যবহার নিরাপদ ও কার্যকর বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। কানাডাও বলছে, এই ভ্যাকসিন নিরাপদ। বার্তা সংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই বলে চূড়ান্ত ছাড়পত্র দিয়েছে যে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত করোনার ভ্যাকসিন মানবশরীরের জন্য নিরাপদ এবং কার্যকরী। সংস্থাটির প্রধান এমার কুক সংবাদ এক বিবৃতিতে জানান, অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রয়োগের সাথে সাম্প্রতিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কোনও সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংস্থাটি আরো বলেছে, রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উৎপাদিত ভ্যাকসিনের যোগসূত্র থাকার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
তবে, গ্রহীতাদের শরীরে অন্যান্য শারীরিক সমস্যা থেকে এমনটা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কার কথাও উড়িয়ে দেননি সংস্থাটির প্রধান এমার কুক।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মানবদেহে টিকার পরীক্ষার পর অ্যাস্ট্রাজেনেকা বলেছে, তাদের টিকাটি বয়স্ক মানুষের শরীরে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে ৮০ শতাংশ কার্যকর। আর গুরুতর অসুস্থতা বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো পরিস্থিতি ঠেকাতে শতভাগ কার্যকর। একই সঙ্গে টিকাটি প্রয়োগে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে মানবদেহে টিকার তৃতীয় পর্যায়ে (চূড়ান্ত পর্যায়ে) পরীক্ষা শেষে গত ২২ মার্চ এ তথ্য জানানো হয়।
পাশাপাশি কানাডার স্বাস্থ্য বিভাগও সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন নিরাপদ। এই ভ্যাকসিনে এখন পর্যন্ত কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ঘটনা লক্ষ্য করা যায়নি।
এদিকে কানাডার চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করছেন জনসন এ্যান্ড জনসন এর আবিস্কৃত ভ্যাকসিন কানাডায় অনুমোদন পাবার ফলে দেশটির করোনা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটতে পারে। হয়তো এই ভ্যাকসিন গেম চেঞ্জার হিসাবেও কাজ করতে পারে। গত ৫ মার্চ হেলথ কানাডা এই ভ্যাকসিনটির অনুমোদন দেওয়ার খবর জানায়। এই ভ্যাকসিনের বড় সুবিধাটি হলো, এটি এক ডোজ নিলেই হবে। অন্য ভ্যাকসিনের মত দুই দফা নিতে হবে না। কানাডা আশা করছে জনসন এ্যান্ড জনসন কর্তৃক উৎপাদিত করোনা ভ্যাকসিনের ১০ মিলিয়ন ডোজ আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে পেয়ে যাবে। প্রয়োজনে জনসন এ্যান্ড জনসন থেকে আরো ২৮ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন ক্রয় করার বিকল্প সুযোগও থাকছে কানাডার।
টরন্টো জেনারেল হসপিটাল এর চিকিৎসক আইজাক বোগোচ সিবিসি নিউজকে বলেন, “জনসন এ্যান্ড জনসন এর আবিস্কৃত ভ্যাকসিন এর সুবিধাগুলো স্পষ্ট। অল্প সময়ের মধ্যে অধিক মানুষকে এই ভ্যাকসিন প্রদান করা যাবে। দ্বিতীয় ডোজের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। এক ডোজেই কাজ হয়ে যাবে। তাছাড়া এই ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করার জন্য সাধারণ ফ্রিজারই যথেষ্ট। -২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দুই বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে এটি। আর রেফ্রিজারেটরের + ৪ (চার) ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণ করা যাবে অন্তত তিন মাস।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, কানাডায় ইতিমধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ভ্যাকসিন অনুমোদন লাভ করেছে। এই চারটি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায় তা হলো : Pfizer-BioNTech এর উৎপাদিত ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৯৫%, Moderna এর উৎপাদিত ভ্যাকসিনের এর কার্যকারিতা ৯৪% , AstraZeneca-Oxford এর উৎপাদিত ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৭০% এবং ঔড়যহংড়হ ্ ঔড়যহংড়হ এর উৎপাদিত ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৬৬%। বলা হচ্ছে, এইসব ভ্যাকসিনের যে কোন একটি নেওয়ার পর করোনায় আক্রান্ত হলেও হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে না বা মৃত্যুর আশংকাও নেই শতকরা একশতভাগ। উল্লেখ্য যে, এই তথ্যসমূহ পাওয়া গেছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সময়। বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে নয়। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আর বাস্তব জীবনে প্রয়োগ এর ফলাফলে আকাশ-পাতাল পার্থক্য হওয়ার কথা নয়। হয়তো সামান্য পার্থক্য হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।
তবে এখনো অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়ে গেছে, করনোর ভ্যাকসিন কি সত্যি সত্যি নিরাপদ? বা কতটুকু নিরাপদ? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, অতীতে অন্যান্য যে সব ছোঁয়াচে রোগের ভ্যাকসিন আবিস্কার হয়েছে এবং মানব দেহে তা প্রয়োগ হয়েছে তার কোনটাই কিন্তু কোন বিপদ ডেকে আনেনি। বরং অনেক ভয়াবহ ছোঁয়াচে রোগ থেকে মানব জাতিকে দিয়েছে মুক্তি। উদাহরণ হিসেবে গুটি বসন্তের কথা বলা যায়। এই রোগে একসময় কোটি কোটি মানুষ মারা গেছে। পরে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে ভ্যাকসিনের কল্যাণেই।
বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভ্যাকসিনের একটি আদি রূপ আবিষ্কৃত হয়েছিল ১০ম শতকে চীনে। তবে ১৭৯৬ সালের আগে এটি স্বীকৃতি পায়নি। সেবছর এডওয়ার্ড জেনার নামে এক ইংরেজ চিকিৎসা বিজ্ঞানী দেখেন যে, গোবসন্ত রোগের মৃদু সংক্রমণ গুটি বসন্ত রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। তিনি তাঁর এই তত্ত্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দুই বছর পর গুটি বসন্তের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন এবং তখন থেকে ল্যাটিন শব্দ “ভ্যাকা” থেকে ভ্যাকসিন শব্দটির উৎপত্তি হয়। ল্যাটিন ভাষায় ভ্যাকা শব্দটির অর্থ হচ্ছে গরু।
মূলত, আধুনিক বিশ্বের চিকিৎসা জগতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ধরা হয় ভ্যাকসিনকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ভ্যাকসিন বা টিকার কারণে বিশ্বে প্রতিবছর অন্তত ২০-৩০ লাখ মৃত্যু প্রতিরোধ করা যাচ্ছে এবং ২০টির বেশি রোগ থেকে মানব জাতিকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বলছে যে, কোন ভ্যাকসিন বাজারে আনার আগে সেগুলো নানা ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মানবদেহে প্রয়োগের আগে সেগুলো ল্যাবে প্রাণীর উপর পরীক্ষা করা হয় এবং সেটা নিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের অনুমোদন নেয়া হয়। সুতরাং ওষুধে ঝুঁকি আছে, কিন্তু ঝুঁকির তুলনায় সুবিধাই বেশি।
তবে বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের সাফল্য অর্জন করতে কয়েক দশকও লেগে যায়। গত বছরের অগাস্টে মাত্র আফ্রিকাকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এই রোগের ভ্যাকসিন প্রদানের কর্মসূচি সারা বিশ্বে শুরু হয়েছে আরো ৩০ বছর আগে।
এদিকে করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হওয়ার পর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, সারা বিশ্বের মানুষকে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন দেয়া এবং এর মাধ্যমে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে কয়েক মাস এমনকি বছরও লেগে যেতে পারে।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বের কোথাও এখনো ভ্যাকসিন নেয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে কোন ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা না থাকলে সবাইকেই এই ভ্যাকসিন নিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
সিডিসি বলছে, নতুন আবিস্কৃত ভ্যাকসিনসমূহ করোনায় আক্রান্ত হওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। সেই সাথে অন্যকে সুরক্ষিত রাখতেও সহায়তা করে। এই ভ্যাকসিনগুলোকে করোনা মহামারি থেকে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেও উল্লেখ করা হচ্ছে।
বিবিসি জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনা সংক্রমণ ছড়ানোকে বাধাগ্রস্ত করতে হলে ৬৫% থেকে ৭০% মানুষকে ভ্যাকসিন নিতে হবে।
তবে যে দ্রুততার সাথে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করা হয়েছে সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বিজ্ঞানীরা একটা ভ্যাকসিনের নকশা ও ট্রায়াল করতে কয়েক বছর পার করে দেন। তবে করোনা পরিস্থিতি খুব দ্রুত মাহামারী আকার ধারণ করায় এর ভ্যাকসিন উৎপাদনও দ্রুততর করা হয়েছে। আর এই কাজটি করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিজ্ঞানী, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর কাজের সমন্বয় করেছে।
তবে ভ্যাকসিন নিলেই যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে এখনি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকা যাবে তাও কিন্তু নয়। এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এখনো শতভাগ গ্যারান্টি দিচ্ছেন না। ভ্যাকসিনের প্রভাব মানব দেহে কতদিন কার্যকরী থাকবে বা প্রতিবছরই এই ভ্যাকসিন নিতে হবে কি না তা এখনো কেউ জানেন না। সুতরাং ভ্যাকসিন নিলেও মানুষকে আরো কিছুদিন সতর্ক থাকতে হবে এমনটাই বলছেন চিকিৎসা বিশেজ্ঞরা। তবে আশার কথা এই যে, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সিডিসি বলেছে, দেশটিতে যাঁরা করোনাভাইরাস প্রতিরোধের জন্য দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছেন, তাঁরা একজন আরেকজনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় মাস্ক না পরলেও চলবে। ছোট আকারে জমায়েতও করতে পারবেন। তবে একই সঙ্গে অবশ্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সিডিসি আরো বলছে, ফাইজার-বায়োএনটেক ও মর্ডানার ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে দুই ডোজ গ্রহণের পর এবং জনসনের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে একটি ডোজ গ্রহণের দুই সপ্তাহ পর মাস্ক না পরলেও চলবে। রয়টার্স এর এক খবরে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
সিডিসির গাইডলাইনে আরো বলা হয়েছে, ভ্যাকসিন গ্রহণকারী প্রবীণদের সঙ্গে স্বজনেরাও দেখা করতে পারবেন। যারা ভ্যাকসিন নিয়েছেন তাঁরা পারস্পরিক দূরত্ব বজায় না রেখেই এক জায়গায় জড়ো হতে পারবেন। আর প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা ভ্যাকসিন নিয়েছেন তাঁরা পরিবারের সদস্যদেরও জড়িয়ে ধরতে পারবেন। এ তথ্য জানিয়েছে এবিসি নিউজ।
তবে এরপরও সিডিসি কিছু সতর্কবার্তা দিয়েছে। ঐ সতর্কবার্তায় বলা হয়, ভ্যাকসিন নেওয়া ব্যক্তিদের উচিত বড় কিংবা মধ্য আকারের সমাবেশ এড়িয়ে চলা। এ ছাড়া যাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ তাঁদের সাথে দেখা করার সময় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। আর কোনো স্থানে যদি একধিক বাড়ি থেকে আসা মানুষ জড়ো হন তবে সে ক্ষেত্রেও মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
আজকে বিশ^ব্যাপী করোনা পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ভ্যাকসিন ছাড়া দ্বিতীয় আর কোন পথ খোলা নেই। বিশ^ব্যাপী ২২ মার্চ পর্যন্ত করোনায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১২ কোটি ৪৭ লাখ। এর মধ্যে মৃত্যু সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২৭ লাখ ৪৫ হাজার। সূত্র : সিএনএন। আর পাবলিক হেলথ এজেন্সী অব কানাডার হিসাব অনুযায়ী (২২ মার্চ পর্যন্ত) কানাডায় মারা গেছেন ২২,৭২৯ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ৯৪০,৯২০ জন। ভাইরাস আতংক, লকডাউন, জরুরী অবস্থা ঘোষণা সব মিলিয়ে বিশ^ অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মারাত্মকভাবে। এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে হলে এখন ভ্যাকসিনই একমাত্র ভরসা।
কানাডার পরিকল্পনা রয়েছে চলতি বছর মার্চের মধ্যে তিন মিলিয়ন অধিবাসীকে ভ্যাকসিন দেয়া হবে। জুনের মধ্যে দেয়া হবে আরো দশ মিলিয়ন অধিবাসীকে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব কানাডিয়ানকে ভ্যাকসিন দেয়া হবে।
খুরশিদ আলম
সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রবাসী কণ্ঠ
