ভাড়ার সঙ্কট আরও বাড়ছে কানাডায়

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, ৬ জুন ২০২৩ : কানাডাজুড়ে সরকারগুলো যখন আরও আবাসন নির্মাণ করছে এবং সাধ্যের মধ্যে আনার পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন ভাড়া বাড়িতে বসবাসকারী কিছু কানাডীয় বলছেন, তারা নিজেদেরকে বিস্মৃত বলে বোধ করছেন। তারা চান আগামী মাসে প্রিমিয়াররা যখন বৈঠকে মিলিত হবেন তখন তারা যেন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেন। খবর সিন প্রেভিল – গ্লোবাল নিউজ।

টরন্টো এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ভাড়াটে মিজ. বেভারলি হেনরি বলেন, “আমরা এদেরকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছি, তবু তারা আমাদের জন্য কিছুই করেন না।”

হেনরি বলেন, তিনি ৩৩ কিং স্ট্রিটে তার অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন প্রায় এক দশক ধরে, কিন্তু অবসরে যাওয়া একজন নির্দিষ্ট আয়ের সিনিয়র নাগরিক হিসাবে তিনি আর ক্রমবর্ধমান বাড়ি ভাড়া বইতে পারছেন না, তিনি বলেন, গত নয় বছরে তার বাড়িভাড়া বেড়েছে ৪০০ ডলারেরও বেশি।

তিনি বলেন, “আমি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করেছি, অথচ এখন মাথার ওপর ছাদটুকু ধরে রাখারও সামর্থ্য নেই।” 

Rentals.ca’র সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে দেখা যায়, সারাদেশে গত এপ্রিলে গড় বাড়িভাড়া ছিল মাসে ২,০০০ ডলারের বেশি।

সারাদেশে গত এপ্রিলে গড় বাড়িভাড়া ছিল মাসে ২,০০০ ডলারের বেশি। ছবি : প্রবাসী কণ্ঠ

দেশের বৃহত্তম শহরগুলিতে এক শয়নকক্ষের একটি আবাসনের ভাড়া হ্যালিফ্যাক্সের মত প্রায় ১,৮৬০ ডলার থেকে শুরু করে যে কোনও অঙ্কের, যেমন টরন্টোতে ২,৫০০ ডলার এবং ভ্যাঙ্কুভারে এমনকি ২,৮০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কোনও শহরে এই অঙ্কটা প্রায় ১,০০০ ডলার বেড়ে যায় দুই শয়নকক্ষের ইউনিটের ক্ষেত্রে, আর ভ্যাঙ্কুভারে কোনও ইউনিটের ভাড়া দাঁড়ায় মাসে গড়ে ৩,৭৪০ ডলার।

দাম বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সংগঠন সামনের মাসের কাউন্সিল অব ফেডারেশনে প্রিমিয়ারদের মিটিংসহ প্রাদেশিক ও টেরিটোরির সরকার এবং একইসাথে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আহবান জানাচ্ছে।

কানাডিয়ান সেন্টার ফর হাউজিং রাইটস-এর (CCHR) নীতি ও যোগাযোগ বিষয়ক পরিচালক মিজ. বাহার সাদপুর গ্লোবাল নিউজকে বলেন, “আমাদের সকল স্তরের সরকারগুলোর, সেটি কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক এবং পৌর সরকার হলেও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা সত্যি জরুরী।”

“এই বাস্তবতাকে একক সঙ্কট হিসবে গ্রহণ করে এর সমাধানের জন্য তাদের সবার সহযোগী হিসাবে তাদেরকে কাজ করতে হবে।”

তিনি বলেন, কানাডীয়দের বসবাসের স্থানভেদে ভাড়া বৃদ্ধির বিধিবিধান ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তিনি চান সারা দেশে ভাড়াটেদের “ন্যূনতম মৌলিক সুরক্ষা” নীতি গ্রহণে আইনপণেতারা একযোগে কাজ করুন।

হেনরির মত কিছু ভাড়াটে বলেন, নির্দেশনা ছাড়িয়ে যাওয়া (AGI) ভাড়া বৃদ্ধির মুখোমুখি হয়েছেন যেখানে মালিক বা বাড়িওয়ালা প্রদেশের অনুমোদিত সর্বোচ্চ ভাড়ার পরিমাণের চেয়েও বেশি পরিমাণে ভাড়া বাড়ানোর অনুমতি দেবার জন্য বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে বোর্ডের কাছে আবেদন করেন।

অন্টারিওতে বর্তমানে বছরে আড়াই শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর নির্দেশনা রয়েছে। বাড়িওয়ালা শুধু তখনই প্রাদেশিক নির্দেশনা অনুযায়ী ভাড়া বাড়তে পারেন যদি তিনি ভাড়ার সম্পত্তিতে কোনও পরিবর্তন এনে থাকেন বা আনবেন অথবা কোনও নতুন বা অতিরিক্ত পরিষেবা দিয়ে থাকেন।

৩৩ কিং স্ট্রিটের ভাড়াটে সমিতির চেয়ারপারসন শার্লিন হেনরি বলেন, “বাড়িওয়ালার নোটিশের খাম খুলে এসব ক্রমবৃদ্ধি দেখামাত্র আপনার পেট কামড়ানি শুরু হবে।” তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে তারা এজিআইয়ের ২২ শতাংশ বৃদ্ধি দেখেছেন।

ওই ভবনে নির্মাণ কাজের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের মজুরি বাড়ছে না, কিন্তু জায়গা কমে যাচ্ছে।”

“কিন্তু একজন মানুষকে যখন মাসের শেষে তার ভাড়া শোধ করা এবং টেবিলে খাবার পরিবেশনের মধ্যে একটা বেছে নিতে হয় তখন সেটি সমস্যা, খুব বড় সমস্যা, সরকারগুলোর এটা জানা দরকার। কারণ মানুষ সবার আগে সময়মত ভাড়া পরিশোধ করতে গর্ব বোধ করে।

৩৩ কিং স্ট্রিটের মালিক কোম্পানি ‘ড্রিম’ এক বিবৃতিতে বলেছে, “আর্থিক চাপ কমাতে সাহায্য করার জন্য তারা ভাড়াটেদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করছে” যাতে তারা অর্থ পরিশোধের ব্যক্তিগত পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন।

আবাসিক অপারেশন্স ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিরো মোহতাদি আরও বলেন, “আগে ভবনের ভাড়া বাড়ানো হতো সেটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা” নিশ্চিত করার জন্য অধিকতর নির্মাণকাজ করা হলে।

জুলাই মাসে কাউন্সিল অব ফেডারেশন মিটিংয়ের আগে সাদপুর বলেন, জনগণের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন আছে এটা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারগুলির কাজ করা দরকার। 

প্রিমিয়ারদের বৈঠকের সময় বাড়িভাড়ার বাজার সমস্যার সমাধান করা হবে কিনা জানতে চাইলে কাউন্সিলের চেয়ার ম্যানিটোবার প্রিমিয়ার মিজ. হিদার স্টিফানসন এক বিবৃতিতে বলেন, জনগণের সামর্থ্যরে ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে তার সমাধানে প্রিমিয়াররা কাজ করছেন।

তিনি লিখেন, “এটি অব্যাহত মনোযোগের এলাকা হিসাবে রয়েছে, কারণ কানাডীয়রা মূল্যবৃদ্ধির মুখে রয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং আবাসন নিয়ে উদ্বেগ বিরাজ করছে।”

তবে আসন্ন সম্মেলনে বাড়িভাড়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উত্থাপন করা হচ্ছে কিনা সেটা তিনি বলেননি।

ভাড়া সুরক্ষার অভাব ‘ভয় ও অনিশ্চিয়তা’র জন্ম দেয়

কানাডার ছয়টি প্রদেশে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ নীতি আছে। অন্যগুলোতে কেবল ভাড়া কখন কীভাবে বাড়ানো যাবে সে বিষয়ে বিধি আছেÑ যদিও ভাড়া বাড়ানোর পরিমাণ সম্পর্কিত কোনও কঠোর সীমা নেই।

ভাড়া ও এ সম্পর্কিত বিধিবিধানগুলি প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক সরকারগুলির মাধ্যমে

পরিচালিত হলেও, সাদপুর বলছেন যে, তারপরও কেন্দ্রীয় সরকার প্রিমিয়ারদের একত্র করতে পারে এবং ভাড়ার ভালো বিধিবিধান কেমন হতে পারে সে বিষয়ে নির্দেশনা দিতে পারে।   

টরন্টোর একটি ভবনে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়াই বসবাসকারী বাবাজিদে (অ্যান্থনি) আলাও বলেন, এ ধরণের নিয়মের অভাব মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।

গ্লোবাল নিউজকে তিনি বলেন, “এটি তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে (এবং) কার্যত ভবনে বসবাসকারী প্রত্যেকের জন্য যথেষ্ট ভীতি ও অনিশ্চয়তা নিয়ে আসে।”

আলাও বলেন, তিনি চান প্রিমিয়াররা ভাড়াটেদের পক্ষে অ্যাডভোকেসি গ্রুপগুলিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবেন এবং প্রাদেশিক নির্দেশনার অতিরিক্ত ভাড়া বাড়ানোর অনুমতি দেয় আইনের এমন ফোঁকড় বন্ধ করবেন।

সাইমন ফ্রেজার ইউনিভার্সিটির নগর কর্মসূচির পরিচালক অ্যান্ডি ইয়ানের মতে, কেন্দ্রীয় সরকার জড়িত হতে পারে এমন আরেকটি উপায় হলো অনেকটা কানাডার স্বাস্থ্য আইনের মত।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমাদের (কানাডা) স্বাস্থ্য আইন আছে, যার উদ্দেশ্য হলো, সব প্রদেশের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের মান নিশ্চিত করা।” “এমন একটা কিছু হতে পারে আবাসন খাতে যেসব ঘটছে তার প্রেক্ষিতে। আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারের স্তরে একটি হাউজিং ইকুইটি আইন থাকা উচিৎ।”

কানাডার স্বাস্থ্য আইন “আর্থিক বা অন্য কোনও বাধা ছাড়াই স্বাস্থ্য পরিষেবায় যুক্তিসঙ্গত প্রবেশাধিকার” এর মানদণ্ড নির্ধারণ করে, এর অর্থ হলো, কানাডীয়দেরকে সরাসরি অর্থ দাবি করা ছাড়াই অপরিহার্য যত্নের জন্য বীমাকৃত স্বাস্থ্য পরিষেবা অবশ্যই দিতে হবে।

তাহলে, যুক্তিসঙ্গত ভাড়ায় বসবাসের সুযোগ পাবার জন্য কেন ওই রকম একটি মানগত ভিত্তি তৈরি করা যাবে না?    

বাজার এখন কোথায় দাঁড়িয়ে  

কানাডার মর্টগেজ ও হাউজিং করপোরেশন (CMHC) দুই মাস আগে একটি পূর্বাভাস প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায়, আগামী কয়েক বছর কানাডার ভাড়াটেদের কঠিন সময় যাবে। সংস্থাটি উল্লেখ করে যে, ভাড়ার আবাসনের সরবরাহ ইতিমধ্যে কম এবং কানাডায় অভিবাসীর স্তর জোরদার হওয়ায় ওইসব আবাসনের জন্য প্রতিযোগিতা উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ২০২২ সালের রিপোর্টে সংস্থাটি জানায়, “কানাডায় বসবাসরত প্রত্যেকের জন্য আবাসনের প্রাপ্যতা অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে দুই কোটি ২০ লাখ আবাসিক ইউনিট দরকার হবে।