কানাডিয়ানদের অনেকেই কয়েকটি ধর্মকে সমাজের জন্য ক্ষতিকর মনে করেন!
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক : কানাডিয়ানদের মধ্যে অনেকে বিশ্বাস করেন ক্যাথলিক ধর্ম, ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টবাদ এবং ইসলাম সমাজের জন্য যতটা উপকারী তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। সারাদেশে ধর্ম থেকে মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেয়া অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে এক নতুন সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গ্লোবাল নিউজ গত ১৮ এপ্রিল এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটির রচয়িতা অ্যাশলে স্টুয়ার্ট।
ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি প্রকাশিত এঙ্গুশ রেইডের এক সমীক্ষায় মহামারি-উত্তর কানাডায় নির্দিষ্ট কিছু ধর্মের বিষয়ে মানুষের ধারণার ওপর আলোকপাত করা হয়। এটা এমন সময় করা হলো যখন দেশটিতে ধার্মিকতা সর্বকালের সর্বনিম্নে।
ক্যালগেরি ইউনিভার্সিটির একজন সমাজতাত্ত্বিক এবং জাতিতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান আবদি কাজেমিপুর ব্যাখ্যা করে বলেন, “ধর্ম নিয়ে কী করবেন সে বিষয়ে বৃহত্তর সমাজ এখনও পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ ও পরিষ্কার নয়, সেজন্যেই তাঁদের মধ্যে অস্বাচ্ছন্দ্যের কিছু লক্ষণ দেখা যায়।”
“এটা অসহিষ্ণুতা নয়, এ হল অস্বাচ্ছন্দ্য।”
সমীক্ষায় প্রকাশ পায় যে, সমীক্ষার আওতায় আসা সব ধর্মীয় গোষ্ঠীই ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টবাদকে সমাজের জন্য উপকারীর চেয়েও বেশি ক্ষতিকারক বলে মনে করে, অন্যদিকে ইসলামকেও প্রধানত নেতিবাচক ধারণা থেকেই দেখা হয়। ওই উভয় ধর্মীয় গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যারা সমীক্ষায় অংশ নেন তাদের বেশিরভাগই অনুভব করেন যে, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কানাডার সমাজে কোনওরকম জায়গা দেয় না।
অ্যাকশন ফর হিউমানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মুসলিম অ্যাসেসিয়েশন অব কানাডার সাবেক মুখপাত্র মিজ. রনিয়া লওয়েন্ডি গ্লোবাল নিউজকে বলেন, কানাডায় ব্যাপকভাবে ইসলামভীতি বিদ্যমান থাকাই ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার কারণ এবং মুসলিমরা অনুভব করেন যে, তাদের ধর্মের সঙ্গে “কানাডার সার্বজনীন মূল্যবোধের কোনওরকম সঞ্চালনমূলক সম্পর্ক” এখনও তৈরি হয়নি।
লওয়েন্ডি বলেন, “অন্য সবাই যখন আপনাকে ‘অপর’ (the others) হিসাবে অনুভব করতে বাধ্য করবে তখন আপনি নিজেকে কেবল ‘অপর হয়ে যাওয়া’ (othered) মানুষ বলেই বোধ করবেন।”

তিনি আরো বলেন, “যখন বিল ২১ নামের আইন বিদ্যমান তখন আমি কীভাবে নিজেকে ‘অপর হয়ে যাওয়া’ মানুষ বলে না ভেবে পারি?”
(কুইবেকে ধর্মনিরপেক্ষাতার এই আইনটি (বিল-২১) পাস হয় ২০১৯ সালে। ঐ আইনে বলা আছে কুইবেক প্রভিন্সে সরকারী চাকরীজীবীরা বিশেষত যাঁরা কর্তৃত্বের অবস্থানে আছেন তাঁরা কর্মস্থলে কোন ধর্মীয় পোষাক বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারবেন না। এঁদের মধ্যে আছেন শিক্ষক, বিচারক, পুলিশ বাহিনীর সদস্য প্রমুখ। আর পোষাকের মধ্যে আছে হিজাব, বোরখা, পাগড়ী ইত্যাদি।)
গ্লোবাল নিউজ জানায়, এই সমীক্ষা এমন সময় করা হলো যখন ২০২১ সালের শেষদিকে স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে যে, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কানাডিয়ানদের মধ্যে মাত্র ৬৮ শতাংশ ধর্মের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন। ১৯৮৫ সাল থেকে স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে শুরুর পর এবারই প্রথম ধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন মানুষের সংখ্যা ৭০ শতাংশের নিচে নেমে আসে।
কানাডিয়ানরা এখন মুখ্যত ‘আধ্যাত্মিকভাবে অনিশ্চিত’
এঙ্গুশ রেইডের নতুন সমীক্ষাটি হলো ২০২২ সালের দুটি সমীক্ষার ফলাফলের সমন্বয়। একটি সমীক্ষা চালানো হয় ২১ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যাতে বৃহত্তর চারটি অখ্রিস্টীয় ধর্মের (মুসলিম, শিখ, হিন্দু ও ইহুদি) ১,২৯০ জন কানাডিয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্য সমীক্ষাটি চালানো হয় ৫ এপ্রিল থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত। এতে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে ১,৭০৮ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
উপাত্তে দেখা যায়, এক-পঞ্চমাংশ (১৯ শতাংশ) কানাডিয়ান এখন নিজেকে “অবিশ্বাসী” শ্রেণির মানুষ বলে চিহ্নিত করেন।
কানাডিয়ানদের বৃহত্তম গোষ্ঠীটি হলো “আধ্যাত্মিকভাবে অনিশ্চিত” লোকেদের, যে দলে আছেন ৪৬ শতাংশ কানাডিয়ান। এক-তৃতীয়াংশ (৩৪ শতাংশ) নিশ্চিতভাবেই সৃষ্টিকর্তা বা একটি পরম শক্তিতে বিশ্বাস করেন, অন্যদিকে ৩১ শতাংশ কানাডিয়ান মনে করেন একটি পরম শক্তির অস্তিত্ব আছে তবে তারা এ বিষয়ে সামান্যই নিশ্চিত।
যারা নিজেদেরকে রোমান ক্যাথলিক বলে দাবি করেন তাদের অর্ধেকেরও বেশি (৫২ শতাংশ) এবং মূল ধারার প্রটেস্টান্টদের ৫৬ শতাংশ ‘আধ্যাত্মিকভাবে অনিশ্চিত’দের ভাগে পড়েন।
মাত্র ১৬ শতাংশ কানাডিয়ান নিজেদেরকে “ধর্মীয় দিক থেকে অঙ্গীকারাবদ্ধ” বলে মনে করেন। এরা বেশি বেশি এবাদত বন্দেগী বা উপাসনা করেন এবং ইশ^র বা সৃষ্টিকর্তার ওপর তাদের পূর্ণ বিশ্বাস আছে। অন্যদিকে ১৯ শতাংশ কানাডিয়ান “একান্ত জীবনে ইশ^রে বিশ্বাসী।”
খোদ ধর্মের ক্ষেত্রে, চারভাগের তিনভাগ ইভাঞ্জেলিকান খ্রিস্টান (৭৪ শতাংশ) এবং ৪৬ শতাংশ মুসলিম নিজেকে ধর্মীয় দিক থেকে অঙ্গীকারাবদ্ধ বলে মনে করেন। অন্যদিকে শিখ ও হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে বেড়ে ওঠা মানুষেরা “একান্ত জীবনে ইশ^রে বিশ্বাসী”Ñ এরা হলেন সেইসব মানুষ যারা আনুষ্ঠানিকভাবে বা প্রায়শ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে যোগ দেন না, কিন্তু নিজের ধর্মের সঙ্গে এখনও এক ধরণের জোরালো ব্যক্তিগত সংযোগ স্বীকার করেন।
ইভাঞ্জেলিকান ও ইসলাম কেন ‘ক্ষতিকর’
এঙ্গুশ রেইডের বরাত দিয়ে গ্লোবাল নিউজ জানায়, কার্যত সবচেয়ে বেশি মানুষ অঙ্গীকারাবদ্ধ এমন দুটি ধর্মকে (ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টান এবং ইসলামকে) জরিপে অংশগ্রহনকারীরা সমাজের জন্য উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেছেন।
অবশ্য জবাবদাতার ধর্মীয় সংশ্লিষ্টতার ওপর ভিত্তি করে এসব মূল্যায়নে ব্যাপক ভিন্নতা দেখা যায়।
সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট করে নাস্তিকরা সমাজে ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টানদের প্রভাবের বিষয়ে নিরঙ্কুশভাবে সমালোচনামুখর। কিন্তু তারা শিখ ও হিন্দুদের ধারণাগত প্রভাব সম্পর্কে বহুলাংশে ইতিবাচক।
কানাডার বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী রোমান ক্যাথলিকরা মনে করেন ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টান, মুসলিম ও শিখরা দেশের সামাজিক কাঠামোতে উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। তবে তারা অন্য ধর্মগুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখে।
সমাজতাত্ত্বিক মি. কাজেমিপুর এ বিষয়ে গ্লোবাল নিউজের কাছে ব্যাখ্যা করে বলেন, “বিভিন্ন গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যে ধরণের অনুভূতি ব্যক্ত করা হয়েছে তার পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ সক্রিয়।
“মুসলিমদের ক্ষেত্রে এবং কিছু পরিমাণে শিখদের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক মনোভাবের কারণ হলো তাদের অস্তিত্বের দৃশ্যমানতা এবং সেইসঙ্গে বৈশ্বিক বিতর্ক। ইভাঞ্জেলিকালদের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় এটা তাদের অস্তিত্বশীলতার চেয়েও বেশি কিছু এবং মানুষের কাছে নিজেকে তুলে ধরার তাদের আগ্রাসী ভঙ্গিটাই মানুষকে শঙ্কিত করে তোলে… এই ধরণের শৃঙ্খলা এবং এমন পীড়াপিড়ি মানুষকে উদ্বিগ্ন করে।
কারণ তারা মনে করে এসবের পেছনে ধর্মের বাইরেও নিশ্চয়ই অন্য কোনও শক্তিশালী উদ্দেশ্য আছে।”
কাজেমিপুর বলেন, শিখ ধর্ম ও ইসলামের দৃশ্যমানতা স্পষ্ট তাদের ধর্মীয় প্রতীকে, যেমন
হিজাব কিংবা পাগড়ি পরার কারণে।
রনিয়া লওয়েন্ডি বলেন, ইসলাম আসলে কী সে বিষয়ে কানাডিয়ানদের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। অনেক সময় তারা মনে করে ইসলাম চরমপন্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সহিংস ধর্ম। এর কারণ গণমাধ্যমে ইসলামকে চিত্রিত করার বিশেষ ধরণ।”
তিনি বলেন, “মুসলিম হবার মানে কী সেটা যদি কানাডিয়ানরা প্রকৃত অর্থেই জানতো তাহলে তারা মুসলিমদের অভিবাসী করে আনার বিষয়ে উৎসাহ দিতো।”
কিন্তু সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, যারা কোনও ধর্মের সঙ্গেই সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছেন তাদের দৃষ্টিতে কেবল হিন্দু, শিখ ও ইহুদি ধর্মই কানাডার জন্য বেশি ইতিবাচক।
ইভাঞ্জেলিকালরা বলেন তাদেরকে ‘বিপথগামী’ হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে
ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টবাদ (ব্যাপ্টিস্ট, পেন্টাকোস্টাল ও মেনোনাইট এবং এর ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত সম্প্রদায়গুলি)হলো একমাত্র ধর্ম যা উপকারীর চেয়ে বরং বেশি ক্ষতিকর বলে মনে করে স্বনামচিহ্নিত ও অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলি।
কানাডার ইভাঞ্জেলিকাল ফেলোশিপের গবেষণা বিষয়ক পরিচালক রিক হিমস্ট্রা গ্লোবাল নিউজকে বলেন, “কিছু লোক আত্মপরিচয় অনেকটা বর্জন করছে, অনেক গীর্জায় দেখা যায়, তারা নিজেদেরকে সম্প্রদায়গত ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে এবং সামাজিক গীর্জায় (community churches) পরিণত হচ্ছে, তারা ব্যাপ্টিস্ট বা পেন্টাকোস্টাল পরিচয় ঝেড়ে ফেলছে, যেমন, অটোয়ার কমিউনিটি চার্চ।”
তিনি বলেন, এর কারণ হলো, তাদের ধর্মের মত নিবেদিত ধর্মগুলোকে গণমাধ্যমে বা লোকপ্রিয় সংস্কৃতিতে প্রায়শ নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করা হয়- এগুলোর সঙ্গে পেডোফিলিয়াগ্রস্ত (শিশুদের প্রতি যাদের যৌন আকষর্ণ বিদ্যমান) বা খারাপ আচরণ করা লোকেদের জড়িয়ে ফেলা হয়” Ñ একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে চরমপন্থী ইভাঞ্জেলিকাল ধর্মের রূপ দেখা যায় তার সঙ্গেও।
আরও বৃহৎ প্রেক্ষাপটে দেখলে, তিনি এটাও বিশ্বাস করেন যে, ধর্মপ্রাণ হিসাবে বিবেচিত হলে একসময় যেমন “সামাজিক সুবিধা” পাওয়া যেতো, এখন সেটির জন্য “সামাজিক মূল্য” দিতে হয়।
তিনি বলেন, “আমি অন্যদের মতই নেটফ্লিক্স দেখি। এতে ইভাঞ্জেলিকাল বা খ্রিস্টান অথবা ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকদের সম্পর্কে তাদের সাধারণ ধারণা যদি সত্যি লক্ষ্য করেন, দেখবেন… নিষ্ঠাবান ধর্মীয় লোকজনকে সচরাচর উপস্থাপন করা হচ্ছে বিচ্যুত মানুষ হিসাবে।”
“আমি মনে করি, এটি সত্যি যে, সাধারণভাবে ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্পর্কে মানুষ তাদের ধারণার অনেকটাই পাচ্ছে ওখান থেকে এবং নিজেদের মতামত তৈরি করে নিচ্ছে। জনগণের এই অভিমত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং এর ভিত্তি হল তাদের সামনে যা তুলে ধরা হয় তার ওপর।”
আত্ম-উপলব্ধির প্রশ্ন এলে, সমীক্ষায় দেখা যায়, স্বাভাবিকভাবেই, ধর্মপ্রাণ হিসাবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই মনে করেন যে, কানাডিয়ান সমাজে ধর্ম নেতির চেয়ে ইতিবাচক অবদানই রাখছে। দুই-তৃতীয়াংশ (৬৭ শতাংশ) ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টান বিশ্বাস করেন, ধর্ম সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে, সেই তুলনায় রোমান ক্যাথলিকদের ২৯ শতাংশ একই রকম বিশ্বাস পোষণ করেন।
হিমস্ট্রা বলেন, এর কারণ হলো, ইভাঞ্জেলিকাল ধর্মের লোকেরা অনুদান ও স্বেচ্ছামূলক কাজে বেশি অকৃপণ।
অবশ্য সামগ্রিকভাবে, ৩১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ভালো ধর্ম সমাজে মন্দের প্রভাব দমিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে, আর ২২ শতাংশ উত্তরদাতা এর বিপরীত বক্তব্য দিয়েছেন। কানাডিয়ান জনগণের প্রায় অর্ধেকই (৪৭ শতাংশ) বলেন, সমাজে ভালো ও মন্দ দুই অবদানই সমপরিমাণে রাখে ধর্ম।
এই ধারণাই সম্ভবত নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠীর মনে এমন উপলব্ধি সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে যে, তাদের ধর্মবিশ্বাসকে কানাডিয়ান সমাজ স্বাগত জানায় না। ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টানদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৬ শতাংশ) বলেছেন, তারা অনুভব করেন যে, ধর্মবিশ্বাসের কারণে সমাজ তাদের জন্য দরজা বন্ধ করে রেখেছে, একই ধরণের অনুভূতি প্রকাশ করে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মুসলমানরা, তাদের ২৬ শতাংশ এমন অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
হিমস্ট্রা বলেন, এক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের অবদান আছেÑ অতি সাম্প্রতি মহামারির সময় উপাসনালয়গুলোকে অনাবশ্যক পরিষেবা হিসাবে বিবেচনা করে বন্ধ রাখা হয়।
হিমস্ট্রা বলেন, “এক্ষেত্রে যে ভাষা ব্যবহার করা হয় তা ছিল অনেকটাই দুর্ভাগ্যজনক।”
“এজন্যেই আমি মনে করি, বিপুল সংখ্যক ইভাঞ্জেলিকাল এবং সাধারণভাবে ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ সমাজে তাদের অবস্থান বিষয়ে এই পরোক্ষ রায়ের প্রতি এক ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।”
মুসলিম অ্যাসেসিয়েশন অব কানাডার সাবেক মুখপাত্র রনিয়া লওয়েন্ডি গ্লোবাল নিউজকে বলেন, সমাজের দরজা তাদের জন্য বন্ধ এমন অনুভূতি লালনকারী মুসলিমের সংখ্যা ২৬ শতাংশের চেয়ে “অনেক বেশি” হতে পারে।
তিনি বলেন, “আমাকে আমার মসজিদ ঘিরে সব সময়ই ছোটখাটো আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের (microaggressions) মোকাবেলা করতে হয়, আর এসব গদবাঁধা দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটে প্রধানত মিডিয়ার লোকদের থেকে, অংশত রাজনৈতিক বক্তব্য, শ্বেতাঙ্গ জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদী গোষ্ঠী এবং পক্ষপাতপূর্ণ রাজনীতিকদের কাছ থেকে। আর এসব ট্রাম্প-জমানার আগেও ঘটেছে।”
“যখন কোনও মসজিদে যাই তখন আমাকে কোন না কোন ধরণের বিপদের আশঙ্কায় থাকতে হয়, এটা একটা সমস্যা।”
তিনি বলেন, মুসলমানরা নিজেদেরকে সমাজে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য বলে অনুভব করবে তখনই যখন কানাডায় পদ্ধতিগত বৈষম্যের প্রতিকার করা হবে। পদ্ধতিগত বৈষম্যের প্রতিকারের কাজটি হল সামাজিক সংহতি উৎসাহিত করা এবং আন্তঃধর্ম সংলাপের যেসব বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করছেন তারই অংশ।
“লক্ষ হল সমাজের সঙ্গে অঙ্গীভূত হওয়া, তবে তারপরও আপনার স্বতন্ত্র পরিচয় থাকতে হবে। আমরা কানাডিয়ান সমাজকাঠামোর অংশ হতে চাই।”
কানাডায় অভিবাসন কীভাবে ধর্ম টিকিয়ে রাখে
যাই হোক, সমাজতাত্ত্বিক কাজেমিপুর গ্লোবাল নিউজকে বলেন, ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর প্রতি এই নেতিবাচক অনুভূতি কার্যত ধর্মীয় অসহিষ্ণুতায় পর্যবসিত হয় না, তবে আধুনিক যুগের সমাজের দিক থেকে এক ধরণের “স্নায়ুদৌর্বল্য” বা “অস্বাচ্ছন্দ্য” রয়েছে, কারণ সে জানে না কীভাবে ধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করবে।
কাজেমিপুর বলেন, এই অস্বস্তি সময়ের সাথে সাথে এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে সমাজে একীভূতকরণের সঙ্গে কমে আসতে পারেÑ অবশ্য যদি সেটা কখনও না ঘটে তাহলে ধর্ম-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি কখনও অভিবাসনবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিণত হতে পারে। এ বিষয়ে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে ফ্রান্সের বিতর্কিত অভিবাসন নীতির উদাহরণ তুলে ধরেন।
সমীক্ষায় দেখা যায়, অন্য দেশে জন্ম গ্রহণকারী কানাডিয়ানরা ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকার কথা জানিয়েছেন এদেশে জন্মানো কানাডিয়ানদের চেয়ে কম (২৭ শতাংশের বিপরীতে ১৮ শতাংশ)। মুসলিম, হিন্দু বা শিখ হিসাবে পরিচয় দানকারীদের কমপক্ষে অর্ধেকই জন্মেছেন কানাডার বাইরে।
একইরকম প্রবণতার কথা বলেছে স্ট্যাটক্যানের তথ্য, কারণ খ্রিস্টীয় ধার্মিকতা যখন নজিরবিহীন নিম্নে পৌঁছে গেছে তখন সংখ্যালঘু ধর্ম যেমন, ইসলাম, শিখ, হিন্দু এবং বৌদ্ধধর্ম অভিবাসনের ইন্ধনে অব্যাহতভাবে বিকশিত হচ্ছে।
স্ট্যাটক্যান পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে, ২০৩৬ সালের মধ্যে অখ্রিস্টীয় ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হবে।
অভ্যন্তরীণ ভৌগলিক দিকের বিবেচনায়, প্রেইরি অঞ্চল কানাডার সবচেয়ে ধর্মপ্রাণ প্রদেশ হিসাবে বহাল থাকবে, কারণ, আলবার্টা, সাসকাচুন ও ম্যানিটোবার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ নিজেদেরকে “ধর্মীয় দিক থেকে অঙ্গীকারাবদ্ধ” বলে পরিচয় দিয়েছেন। এর অর্থ হলো লোকেরা সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর আস্থা রাখেন এবং উপাসনা ও প্রার্থনা সভায় উচ্চহারে উপস্থিত থাকেন।
কুইবেকের মানুষ ধর্ম বর্জনের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। কাজেমিপুর বলেন, এর মূল কারণ কুইবেকের বাসিন্দারা “সমজাতীয় শহর বা মহল্লায় বাস করেন”, “বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে তাদের যথেষ্ট পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া” নেই।
৫৫ বছরের বেশি বয়সী নারীরা বেশি ধর্মপ্রাণ
এঙ্গুশ রেইডের বরাত দিয়ে গ্লোবাল নিউজ জনায়, সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে যে, প্রথম প্রজন্মের কানাডিয়ানদের ধর্মপ্রাণ হিসাবে পরিচয় দেবার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং কানাডায় ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা সাধারণ ঘটনা হয়েই আছে।
৭২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা ধর্মীয় শিক্ষা পেয়ে বড় হয়েছেন। এদের মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি সংখ্যক (৫৪ শতাংশ) হলেন সেইসব ব্যক্তি যাদের এখন ধর্মের সঙ্গে কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই।
ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে বেড়ে ওঠার ঘটনা অন্য সব ধর্মের চেয়ে মুসলিম (৮৬ শতাংশ) অথবা রোমান ক্যাথলিক (৮২ শতাংশ) হিসাবে পরিচয় দানকারীদের ক্ষেত্রে অতি সাধারণ ঘটনা।
তরুণতর কানাডিয়ানদের অবিশ্বাসী হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ (২৬ শতাংশ) পুরুষ এবং ২২ শতাংশ নারী এই ভাগে পড়েন। যে কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীরই ৫৫ বছরের বেশি বয়সী নারীরা অধিকতর ধর্মপ্রাণ, তাদের অবিশ্বাসী হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম।
হিমস্ট্রা বলেন, ধার্মিকতার এই অবনয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে মহামারির কারণে। অনেক গীর্জা এসময় তাদের সদস্যদের ২০ শতাংশকে হারিয়েছে।
সমীক্ষার উপাত্তে এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। মহামারি শুরুর পরে পরে ২০২০ সালের এপ্রিলে অবিশ্বাসী অথবা আধ্যাত্মিক দিক থেকে অনিশ্চিত বলে পরিচয় দেওয়া লোকের সংখ্যা সামান্য বাড়ে, অথচ ধর্মীয়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ অথবা ব্যক্তিগত জীবনে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা সামান্য হলেও হ্রাস পায়।
বিবেকের স্বাধীনতা তথা নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী আদর্শ বা ধর্ম বেছে নেবার স্বাধীনতা জোরদার হবে কি হবে না সে বিষয়ে কানাডিয়ানরা বিভক্ত। উত্তরদাতাদের এক-তৃতীয়াংশ বিশ্বাস করেন, দেশে বিবেকের স্বাধীনতা অবনতিশীল, তবে অনেকেই (২৮ শতাংশ) মনে করেন এটি এখনও আগের মতই রয়েছে। এক-চতুর্থাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন, ধর্ম ও বিবেকের স্বাধীনতা জোরালো হয়ে উঠছে।
