মূল্যস্ফীতি : নতুন অভিবাসীদের জন্য কানাডায় জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক : নিকারাগুয়ায় জন্মগ্রহণকারী ফ্রাঙ্কো রায়ো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসাবে ২০১৭ সালে যখন নিউ ব্রান্সউইকে আসেন তখন তিনি খোলা মনেই কানাডাকে নিজের দেশ বানিয়ে নেয়ার চিন্তা করতেন।
ফ্রাঙ্কো ২০১৮ সালে নিউ ব্রান্সউইক ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন এবং অডিটর হিসাবে চাকরি পান যাতে তার বার্ষিক বেতন ছিল ৪৫,০০০ ডলার। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুটি ডিগ্রি অর্জনকারী ফ্রাঙ্কো বলেন, চাকরি পাওয়া ছিল কঠিন, আর তাকে যে বেতন দেয়ার প্রস্তাব করা হয় তা ছিল হতাশাজনক।
তিনি বলেন, “ঘটনা হলো তারা আমাকে চাকরি শুরুর পর্যায়ের বেতন দেয়ার প্রস্তাব দেন। আমি জানি না এটা কী একারণে যে, আমি অন্য দেশ থেকে এসেছি।”
স্ত্রী ও একটি ছোট ছেলে নিয়ে ফ্রাঙ্কোর সংসার। তিনি বলেন, পরিবারের জন্য যে জীবনযাত্রাপ্রণালী চেয়েছিলেন তা ধরে রাখতে তার সঞ্চয় ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে আসছিলো।
তারা এমন পরিস্থিতিতে পড়েন যে ফ্রাঙ্কো (৩৩) ও তার স্ত্রী নাটালি রায়োকে (২৯) তাদের জীবনধারায় বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে হয়। প্রায় এক বছর ধরে মহামারির মধ্যে কাটিয়ে তিনজনের এই পরিবারটি তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিকারাগুয়ার পথে রওয়ানা করে।
মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৬.৭ শতাংশে দাঁড়ানোর ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সব কানাডিয়ানর ওপর প্রভাব ফেললেও বাস্তবতা হলো, নতুন অভিবাসীদের আয় এখনও সাধারণ জনগণের চেয়ে কম।
এই মুহূর্তে কানাডিয়ান সিটিজেনশিপ ইন্সটিটিউশনের সঙ্গে মিলে লেগার-এর পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে বলা হয়, সংকোচন নীতি অভিবাসীদের ধরে রাখা কঠিন করে তুলতে পারে।
ইন্সটিটিউট অব কানাডিয়ান সিটিজেনশিপ-এর (আইসিসি) সিইও ডেনিয়েল বার্নহার্ড বলেন, “কানাডা নিজেকে নবাগতদের জন্য স্বর্গ বলে গল্প শোনায়, আর আমরা দেখতে চাই, এ গল্প কতটা সত্য।”
ছেড়ে যাবার পরিকল্পনা
অভিবাসীদের কতজন এখানে থেকে যায় কেন্দ্রীয় সরকার সে পরিসংখ্যান রাখে না। তবে স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ডিগ্রি অর্জনের এক বছর পরও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশের ট্যাক্স পরিশোধের কোনও রেকর্ড নেই। এর অর্থ হলো তারা এদেশ ছেড়ে গেছে।
আইসিসির সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী ২৩ শতাংশ নতুন কানাডিয়ান বলেছেন, তারা আগামী দুই বছরের মধ্যে কানাডা ত্যাগের পরিকল্পনা করছেন।
৩৫ বছরের কম বয়স্ক ৩০ শতাংশ নতুন কানাডিয়ান একই জবাব দিয়েছেন।
২০১৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটি অনলাইন প্যানেলের মাধ্যমে এ সমীক্ষা চালানো হয়।
ফ্রাঙ্কো এখন তার দেশের রাজধানী মানাগুয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং নিজের ব্যবসায় চালাচ্ছেন। অবশ্য তিনি কানাডায় তার পারমানেন্ট রেসিডেন্টের মর্যাদা ধরে রেখেছেন। তার স্ত্রী নাটালি রায়ো বেড়ে উঠেছেন নিউ ব্রান্সউইকে। তিনি বলেন, তারা নিউ ব্রান্সউইকের চেয়ে ভালো মানের জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে পারছেন, অর্থনৈতিক চাপও অপেক্ষাকৃত কম বোধ করছেন।
তিনি বলেন, “আমি নিকারাগুয়ায় আসবো ভাবিনি, কিন্তু যখন আমাদের, আমি, আমার স্বামী ও সন্তানের, ভবিষ্যতের প্রসঙ্গ আসে তখন এটিই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প।
অভিবাসীরা যদি এদেশে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন তাহলে জাতীয় পর্যায়ে জটিলতা দেখা দেবে। দেশে শ্রমিক সঙ্কট বিদ্যমান, আর অভিবাসীরা শ্রমশক্তির শূন্যতা পূরণ করতে সহায়ক হবে এমন ভাবনা থেকে নীতি নির্ধারকরা চলতি বছর চার লাখেরও বেশি অভিবাসীকে পারমানেন্ট রেসিডেন্ট করার পরিকল্পনা নিয়েছেন।
২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশে শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সীদের সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে ছয় গুণ বেশি। এটি এমন এক তথ্য অর্থনীতির ওপর যার গুরুতর প্রভাব বিদ্যমান।
নতুন আদমশুমারিতে দেখা যাচ্ছে কানাডার জনগণ বয়ঃবৃদ্ধ হয়ে পড়ছে। এর ফলে দেশের শ্রমশক্তি ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যপ্রযত্নের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে উদ্বেগ বিরাজ করছে।
জীবনযাত্রায় ব্যয় অভিবাসীদের দেশত্যাগের দিকে ঠেলে দেবে, সমীক্ষার পর্যবেক্ষণ
অভিবাসীরা অবশ্য ঐতিহাসিকভাবেই চাকরিবাকরি নিয়ে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিলেন। বিদেশের শিক্ষাসনদ ইত্যাদি থাকার পরও অনেকে স্বল্প বেতনের কাজে যোগ দিতে বাধ্য হন। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্যমতে, কানাডায় আসার এক বছরের মাথায় একজন অভিবাসীর মাঝারি পর্যায়ের আয় ছিল ২০১৮ সালে ৩১,৯০০ ডলার। যদিও ১৯৮১ সাল থেকে শুরু করে ওই সময় পর্যন্ত এটাই ছিল তাদের সর্বোচ্চ আয়সীমা, তবুও এটাই কিন্তু জনগণের অন্য সব অংশের মাঝারি আয়ের চেয়ে ছিল ১৮ শতাংশ কম।
বর্তমানে নবাগতরা চাকরির পাশাপাশি সাধ্যের মধ্যে আবাসন খুঁজে পেতেও সমস্যায় পড়ছেন। আর উচ্চ মাত্রার মূল্যস্ফীতি এই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে, অভিবাসীদের কাছে কানাডার এখন কতটা আবেদনময়?
ডেনিয়েল বার্নহার্ড বলেন, সমীক্ষার উদ্ঘাটনের পর কানাডিয়ানদের উচিৎ হবে ভাববার জন্য কিছুটা “অবকাশ” নেওয়া। তিনি বলেন, “আমাদের উচিৎ নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করা যে, কানাডা অভিবাসীদের জন্য কী সুবিধা দিতে পারছে? কারণ আমরা এ বিষয়ে অবশিষ্ট বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছি।”
“লোকেরা তাদের প্রকৃত সম্ভাবনা অনুযায়ী আয় করতে পারছে না।” তিনি বলেন, “তারা যৌক্তিকভাবে জীবনযাত্রার যে মান আশা করে এমনকি তাদের নিজ দেশে যে জীবনমান তারা রক্ষা করেছে ততটুকুও অর্জন করা দিন দিন নিম্নগামী হচ্ছে।”
সমীক্ষায় দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ নব্য কানাডিয়ান এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন
যে, “কানাডায় জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের অর্থ হলো, অভিবাসীদের কানাডায় অবস্থানের সম্ভাবনা কমে যাওয়া।”
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য বলছে, সাম্প্রতিককালে আসা অভিবাসীদের ৩১ শতাংশ তাদের আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি ব্যয় করছেন আবাসন খাতে, যেখানে অন্য সবাই এই খাতে ব্যয় করেন মাত্র ১৮ শতাংশ।
অভিবাসীদের ধরে রাখার বিষয়ে খুব বেশি তথ্যউপাত্ত নেই
ওয়াটারলু ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ মাইকেল স্কাটেরুড বলেন, আগের বছরগুলির তথ্য-উপাত্ত না থাকায় এই সমীক্ষা থেকে কোনওরকম উপসংহারে পৌঁছা কঠিন।
তিনি বলেন, এই সমীক্ষা কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য কত মানুষ এদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং কেন চলে যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
স্কাটেরুড বলেন, “উচ্চ স্তরের মানবিক পুঁজি দিয়ে অভিবাসীদের কেবল আকৃষ্ট করাই নয়, বরং তাদেরকে ধরে রাখাও কানাডা ও এর নীতিনির্ধারকদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জের একটি দিক।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের দক্ষ অভিবাসীদের হারানোর একটি ঝুঁকি আমাদের রয়েছে কারণ সেখানে বেতনভাতা আকর্ষণীয়।
তবে স্কাটেরুড মনে করেন না যে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অভিবাসীরা দলে দলে কানাডা ত্যাগ করবে।
তিনি বলেন, “মানুষ যখন কোথাও যাওয়ার বা আদৌ যাবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় তখন তারা একটি জায়গার সঙ্গে অন্য জায়গাগুলির অর্থনৈতিক কল্যাণের বিষয়টি মূল্যায়ন করে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, বিশ্বজুড়ে অনেক দেশই এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জর্জরিত।
তিনি বলেন, “অভিবাসন অত্যন্ত ব্যয়বহুল, আর মূল্যস্ফীতি একটি সাময়িক ব্যাপার। লোকেরা হঠাৎ করেই কোনও জায়গা থেকে নিজের শেকড় উপড়ে ফেলতে যাচ্ছে এমন ধারণা বিশ্বাসযোগ্য মনে করি না।”
অভিবাসীদের অভিজ্ঞতার উপস্থাপন
২০১৮ সালে মানপ্রীত সিং ও হারমিৎ কাউর যখন কানাডায় আসেন তখন নতুন অভিবাসী হিসাবে কীভাবে তারা এই দেশটিতে এগিয়ে যাবেন সে বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া এই দম্পতির জন্য কঠিন ছিল। এটি তাদের একটি নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলতে উদ্বুদ্ধ করে।
সিং বলেন, “আমরা ভিডিও করে আমাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চেয়েছি।”
এই দম্পতির ইউটিউব চ্যানেল ‘কানাডিয়ান কাপল ব্লগ’এর সাবসক্রাইবারের সংখ্যা পাঁচ
লাখেরও বেশি। এই চ্যানেলে কীভাবে কানাডায় আসা যায় থেকে শুরু করে অভিবাসনের পর এখানকার জীবন কেমন হতে পারে সেই সবকিছু নিয়েই ভিডিও রয়েছে। এমনকি অভিবাসীরা কেন কানাডা ছেড়ে যেতে চাচ্ছে সে বিষয়েও একটি ভিডিও আছে তাদের।
সিং বলেন, “কেউই তাদের ব্যর্থতার বিষয়ে কিংবা কানাডায় তাদেরকে যেসব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয় সে বিষয়ে কিছুই শেয়ার করে না।”
তিনি বলেন, কানাডায় তীব্র ঠাণ্ডা শীতকাল থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার ব্যয় পর্যন্ত বহু চ্যালেঞ্জ আছে যেগুলি অভিবাসীদেরকে মোকাবেলা করতে হয় এবং এখানে আসার আগেই সেগুলি তাদের জানা দরকার।
সিং ও কাউর দম্পতি এসব চ্যালেঞ্জের কিছু বিষয়ে নিজেদেরকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিলেন। তারা ধারণা করেছিলেন যে সবার আগে অর্থনৈতিক আঘাতটাই তাদের মোকাবিলা করতে হবে। এই দম্পতি যদিও এখানে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই কাজ খুঁজে পান, তবু সিং বলেন, কানাডিয়ান কর্মঅভিজ্ঞতা না থাকা চাকরি পাবার ক্ষেত্রে বাধা হিসাবে দেখা দেয়। তিনি বলেন, ভারতে ওয়ালমার্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার জন্য কানাডার ওয়ালমার্টে কাজ পেতে সহায়ক হয়।
সিং বলেন, তাদের চাকরি যদি আইটি সেক্টরে না হতো তাহলে চাকরির পাশাপাশি ইউটিউব চ্যানেল চালানো তাদের জন্য কঠিন হতো।
কানডিয়ান সিটিজেনশিপ ইন্সটিটিউটের বার্নহার্ড বলেন, নবাগতরা যে দক্ষতা ও মূল্যবোধ কানাডাকে দিতে পারে তার পূর্ণ “স্বীকৃতি” দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা আছে। আর অনেক চাকরিদাতাই যখন বলছেন তারা শ্রমিক খুঁজে পান না তখন অভিবাসীরা যে দক্ষতা নিয়ে আসছেন তার স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজন আছে।
তিনি বলেন, “এটা নিছক নৈতিক বা জাতিগত দিক থেকে অত্যাবশ্যকীয় নয়। বরং বাজারের প্রতিযোগিতায় দেশের সক্ষমতার ক্ষেত্রেও এটি সুবিধা দেবে।”
-সূত্র : নজুদ আল মলিস/সিবিসি নিউজ
