অন্য গল্প ১

“বিভীষিকা”


এ কে এম ফজলুল হক

বেশ ক’বছর আগের কথা। আমি চাকরি করি এক ব্যাংকে। ‘কাস্টমার সার্ভিস রিপ্রেজেন্টেটিভ’ সংক্ষেপে বলে ‘সি,এস,আর’। ব্যাংকে সি,এস,আর’দের অনেক কাজ। ক্লায়েন্টদের একাউন্টে লেনদেন, মর্টগেজ পেমেন্ট, বিল পেমেন্ট ইত্যকার সব কাজ। এর ফাঁকে আছে সেলস। মোদ্দা কথা সেলসটা-ই আসল। আমরা চার জন সি,এস,আর সেদিন। আমি, এলেক্স, মিশেল আর মেরি-পাশাপাশি বসা। আমি আর এলেক্স মাঝখানের ডেস্কে। মিশেল একদম ভিতরে আর মেরি সবার শুরুতে। আমরা ডেস্ক কভার করে দাঁড়ালাম। ব্যাংকের ভাষায় এ ডেস্কগুলোকে বলে ‘উইকেট’। শুধু মেরি’র উইকেট’টা লো হাইট; বৃদ্ধ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য। আর সব গুলো হাই। হাই উইকেটে কাজ করতে কষ্ট লাগে- পা ঝুলিয়ে বসতে হয়, তারপর ও কি করা?
এর মধ্যে ক্লায়েন্টরা একে একে এসে লাইন করে দাঁড়ালো। সেদিন ক্লায়েন্টও হালকা। সপ্তাহের এ’দিনটাতে সকালে ক্লায়েন্ট হালকা-ই থাকে। এগারোটা’র দিকে মোটামুটি খালি হয়ে যায়। আবার তিনটার দিকে চাপ বাড়ে। ক্লায়েন্ট আসার এ চরিত্র আমাদের মুখস্ত।
আমরা একে একে সার্ভ শুরু করলাম। শুরুটা এ’রকম। ক্লায়েন্টকে বলতে হয় “হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?” তারপর ক্লায়েন্ট তার প্রয়োজনটা বলে ও আমরা সেমতো ট্রাঞ্জেকশন শেষ করে আস্তে করে সেলসের কথাটা বলি ঠিক এভাবে “হাউ ডু ইউ ওয়ান্ট টু এনজয় ইওর রিটায়ারমেন্ট?” ক্লায়েন্ট হয়তো বলবে ‘ভ্যাকেশন’। এই সুযোগ- আমরা তুষার চিলের শিকার ধরার মতো তাকে নিয়ে যাবো সামনের রুম গুলোতে বসে থাকা ক্লায়েন্ট ম্যানেজারদের কাছে। তারপর তারা যা করার করবে। এর মাঝে মিশেল কি কারণে জানি বাইরে যাবে, জিজ্ঞেস করলো “আমি কিছু চাই কিনা, ফেরার পথে নিয়ে আসবে- এই কফি, চা. ডোনাট এসব। আমি না করলাম। এমনিতেই যে কোন কারণে সেদিন আমার মন খারাপ, তাই অবচেতন মনেই না বললাম। কিন্তু এলেক্স “হাঁ” বললো। তার চাই ব্ল্যাক কফি, মিডিয়াম। মিশেল ফরমায়েশ নিয়ে বাইরে পা দিলো। বাইরে তখন ঝিমানো রৌদ। দরজা দিয়ে ক্লায়েন্ট আসছে, যাচ্ছে। আমরা তিনজন সার্ভ করছি, চুপচাপ। চুপচাপ কারণ, সকালের দিকের ক্লায়েন্টদের সাথে বেশী কথা বলা যায় না। সবার মধ্যে একটা তাড়া হুড়া ভাব থাকে, তারপরে আবার শীত শুরু হয়েছে। শীতে মানুষ এমনিতেই একটু বিষন্ন থাকে।

ব্যাংক ডাকাতির প্রতীকী ছবি। ছবি : ইন্টারনেট


এই সময় আমার সামনে আসলো পরিচিত এক ক্লায়েন্ট। “লরেন্স”। ব্রাঞ্চের সবাই তাকে এক নামে চিনে। বাড়ি কেনা বেচার ব্যবসা করে। তার কাজ- দিনের কিছু সময় ব্রাঞ্চে এ’সে লেনদেন শেষ করে ম্যানেজারের রুমে বসে গল্প করা। আজ ম্যানেজার নেই। হেড অফিসে গেছে মিটিংএ, দেরি করে আসবে। লরেন্স’কে নিয়ে আমি তঠস্থ থাকি। হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্ট, কখন কি ভুল করি? লরেন্স একাউন্ট থেকে হাজার দশেক টাকা তুললো, আমি টাকাটা ড্র করে তার সামনে গুনলাম। প্রথম বার গোনা ঠিক হয় নি। দ্বিতীয় বার গুনতে যাবো, এমন সময় সে বললো “ও’কে আই ডোন্ট কেয়ার, টাকাটা দাও”। এই বলে টাকা নিয়ে চলে গেলো, গুনাগুনির নাম নাই। লরেন্স এ’রকমই। টাকা পয়সা নিয়ে খুব একটা কেয়ার করে না। লরেন্স চলে যাবার পর লাইনের মাথায় আসলো শ্যামলা করে এক লোক, লম্বা, কালো হুডি পরা ও পরনে নীল প্যান্ট। হাত দু’টো হুডির পকেটে। তারপর এক চাইনিজ। চাইনিজ লোকটাকে আমি চিনি। রেগুলার ক্লায়েন্ট। বেতনের চেক জমা দেয়। কিছু টাকা একাউন্টে রেখে বাকীটা তুলে নেয়। একদিন জিজ্ঞেস করলাম “তুমি চেকের বদলে ডাইরেক্ট ডিপোজিট নাও না কেন?” সে বললো সে চেকেই প্রেফার করে। করুক। কিন্তু চেক ডিপোজিটে যে আমাদের ভোগান্তি একথা তাকে কে বোঝাবে? কেননা, দিন শেষে এসব চেক আবার ক্লিয়ারেন্সে পাঠাতে হয়, বিরাট ঝামেলা। সর্টিং করো, কাউন্ট করো। ভুল হলে আবার কর। এভাবে কখনো পাঁচ সাত বার করতে হয়। হুডি পরা লোকটা তখন লাইনের একদম সামনে। ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আমার কাছে আসার কোন তাড়া নেই। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো ব্রাঞ্চে কি যেন দেখছে। হয়তো খুঁজছে কাউকে। আবার এ’ও হতে পারে, সে আমার সার্ভিস পছন্দ করছে না, তাই এভোয়েড করছে। আমি গা করলাম না। যা ইচ্ছা করুক। তাকে বাদ দিয়ে পরের ক্লায়েন্ট চাইনিজের দিকে তাকালাম। চাইনিজটা আমার কাছে আসতে চাইছে। তার ভাব দেখে হুডি পরা লোকটা বললো “ ইউ ক্যান গো”। চাইনিজ এসেই কোন রাখ ঢাক নাই; চেক একটা দিয়ে শুধু বললো “গিভ মি টু”। বুঝলাম টু থাউজেন্ড, আমি চেকটা নিয়ে পোস্টিং দিতে লেগে গেলাম সিস্টেমে।
ব্রাঞ্চ জুড়ে অখণ্ড নীরবতা। হঠাৎ কি মনে করে আড়চোখে তাকালাম দুই পাশে। দেখি.. এলেক্সের উইকেটে হুডি পরা লোকটা একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলো.. আর মেরির উইকেটে এক বুড়ি…অনেকক্ষণ ধরে। মেরি ক্রেডিট কার্ড বুজাচ্ছে তাকে। বুড়ি শুনছে না… কেবলই বলছে “ আমি একা মানুষ, বাঁচা মরার ঠিক নাই। আমি ক্রেডিট কার্ড দিয়ে করবো?” মেরি একটা ‘পেম্পলেট’ মেলে ধরলো বুড়ির সামনে। বুড়ি হাই পাওয়ারের চশমা দিয়ে কুটি কুটি করে দেখছে সে পেম্পলেট। বিরক্তি তার চোখে।
আমি আবারো চাইনিজের দিকে মন দিলাম। মেশিন থেকে টাকা বের করে গুনে দিবো এমন সময় এলেক্স-কে বলতে শুনি ‘হোয়াট?’। তাকিয়ে দেখি এলেক্স কড়া চোখে তাকিয়ে আছে হুডি পরার দিকে। অবাক হলাম। কি হয়েছে? ভালো করে তাকিয়ে দেখি ‘ওহ মাই গুডনেস’ এলেক্সের ডেস্কের উপরে পিস্তল। চকচকে পিস্তল। এতো চকচকে আমি এর আগে কখনো আর দেখিনি। হুডি পরা আবারো কি যেন বলছে উইকেটে মাথা ঝুঁকে। এলেক্স শুনছে না। সে অনড় হয়ে বসে আছে। কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে লোকটার মুখের দিকে। লোকটা বললো “গিভ মি অল দা মানি”। এবার বুঝলাম ‘ডাকাতি’। ব্যাংকের ভাষায় এ’কে বলে “হেল্ড আপ”। লোকটা আবারো টাকা চাইছে। এলেক্স দিবে না। আমি এলেক্সকে চিনি। ভীষণ ঘাড়তেড়া এক ছেলে। সহজে হার মানতে চায় না, তারপর আবার জোর করে টাকা নিবে এ’ যে অসম্ভব। এ পর্যায়ে হুডি পরা পিস্তলটা হাতে তুলে নিলো। একদম কাউবয় স্টাইলে, এ দেখে চাইনিজ লোকটা পয়সা পাতি রেখে যেন পালিয়ে যাবে, এমন অবস্থা। আবার ভয়ে নড়ছে না। আমতা আমতা করছে। আমারও হাত পা অবশ হয়ে গেছে।
এবার হুডি পরার হাত পিস্তলের ট্রিগারে। কয়েক সেকেন্ড। সবাই ঠান্ডা হয়ে এ দৃশ্য দেখছে। কি ভয়াবহ। হঠাৎ পেছেন থেকে ক্যাশ ম্যানেজার (এ,বি,এম) বলে উঠলো ‘গিভ ইট’। এলেক্সের কড়া চাহনি এ’সময় নরম হয়ে এলো, সে হড় হড় করে সব টাকা বের করে দিলো ড্রয়ার থেকে। হুডিপরা সব গুলো টাকা বেগে ভরে ব্রাঞ্চ থেকে সোজা বেরিয়ে গেলো। আমাদের ব্রাঞ্চের ঠিক সামনেই রাস্তায় সিগন্যাল। তার ভাগ্য ভালো। সিগন্যাল সাদা হয়ে গেছে তখন মানুষজন পারাপার করছে। ব্যাস, এর ফাঁকে সে’ও হাওয়া।
সে হাওয়া হয়ে যাওয়ার পরই শুরু হলো “কি হয়েছে কি হয়েছে”। এলেক্স মুখ শক্ত করে বসে আছে। হাসিখুশি উচ্ছল একটা ছেলে হঠাৎ যেন কালো অন্ধকার। তাকে নিয়ে যাওয়া হলো পেছনের লাঞ্চ রুমে। আমাকেও যেতে বললো। বললাম” ‘আসছি”। এই ফাঁকে ভাবলাম ‘চাইনিজটাকেও নিয়ে যাই’। দেখি, সে দৌড়ে পালাচ্ছে, সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি ক্লায়েন্টরাও। ক্লায়েন্ট চলে যাবার পর ব্রাঞ্চ লক ডাউন করে দে’য়া হলো। এবার শুরু হলো জেরা। এলেক্স কথা বলছে না, কুল কুল করে ঘামছে। পুলিশে খবর দেয়া হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে পেঁ পুঁ করে চলে আসলো পুলিশ। সাথে একটা অ্যাম্বুলেন্স। তারা এসেই সিসি ফুটেজ, ফিঙ্গার প্রিন্ট এসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তারপর ডাকলো এলেক্সকে।
দু-তিন জন পুলিশের মুখোমুখি বসা এলেক্স। তার সামনে কাঁচের গ্ল­াসে ঠান্ডা পানি। শীতল পানির কারণে বিন্দু বিন্দু শিশির গ্ল­াসের বাইরে। এলেক্স এক ঢোক দুই ঢোক করে পানি খাচ্ছে। পুলিশ বললো “ক্যান ইউ রিমেম্বার হোয়াট হ্যাপেনড”। এলেক্স সংক্ষেপে যা ঘটেছে তাই বললো। পুলিশ বললো “ক্যান ইউ রাইট ডাউন প্লিজ”। এলেক্স-কে কাগজ-কলম দেয়া হলো। সে লিখছে কাঁপা কাঁপা হাতে। এই ফাঁকে আমার পালা। পুলিশ বললো “তোমার নাম কি?”
নাম বললাম। “ক্যান আই সি দা আইডি?” আমি দিলাম।
“তুমি কি করছিলে তখন?”
আমি বললাম “ক্লায়েন্ট সার্ভ করছিলাম।”
“কি হয়েছে; তুমি কি কিছু দেখছো”
আমি বললাম “হাঁ দেখেছি” -তারপর সংক্ষেপে বললাম। এবার পুলিশের প্রশ্ন “এর আগে কি হয়েছিল” ?
আমি বললাম “আমি ঠিকভাবে দেখি নি”। “এ কেমন কথা, তোমার পাশে এতো বড়ো ঘটনা, আর তুমি বলছো দেখো নি”
“আমি কি করবো? আমার সামনে তখন ক্লায়েন্ট। আমি তো ক্লায়েন্ট রেখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি না।” “তা ঠিক, তারপর ও তুমি যা দেখছো তা কি লিখে দিতে পারবে?”
আমি বললাম “পারবো”। আমি লিখলাম। যতটুকু পারা যায়।
পুলিশ আমাদের স্টেটমেন্ট নিয়ে চলে গেলো। এবার ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার, হেড অফিসের হিউমেন্ রিসোর্সেস একের পর এক ইন্টারভিউ। পরে হিউমেন্ রিসোর্সেস’কে দেখলাম এলেক্সকে ভীষণ সহযোগিতা করতে। তাদের সহযোগিতায় এলেক্স প্রথম প্রথম ক’দিন ব্যাংকে আসলো। আসলেও খুব গম্ভীর, কাজ কর্মে মন নেই, কেমন যেন দিশেহারা ভাব। উইকেটে কিছুক্ষন বসে। কিন্তু বেশীক্ষণ থাকতে পারে না – লাঞ্চ রুমে চলে যায়, সারাক্ষণ কি যেন ভাবে? আমরা তাকে স্বাভাবিক করার জন্য কত চেষ্টা করলাম। কিছুতেই কিছু হলো না। তারপর এলেক্সকে তিন মাসের ছুটি দিলো ব্যাংক। ভাবলাম তিন মাস পরে সে ফিরে আসবে। কিন্তু এলেক্স আর ফিরে আসে নি।
তারপর অনেকদিন চলে গেছে। সেদিনের কথা ভাবলে এখনো শিউরে উঠি। মহান আল্লাহ কি করে যে সেদিন আমাদের রক্ষা করেছেন! হয়তো সেদিন অন্য কিছুও ঘটতে পারতো … এ যেমন না থাক ….খারাপ সময়ের কথা না ভাবি। শুধু এলেক্সটার জন্যই খারাপ লাগে। অস্ত্রের বিভীষিকা তার জীবনটাকে শেষ করে দিলো। সে বিভীষিকা এখনো তো থামেনি- চলছে … আর কতদিন চলবে কে জানে ?

এ কে এম ফজলুল হক
টরন্টো