টরেটক্কা টরন্টো

ক্যারিয়ার গঠন- ৪

কাজী সাব্বির আহমেদ

যেদিন সকাল বেলাতে অফিসে গিয়েই কানাঘুষা শুনতে পেলাম যে ‘ডিসিশনিং সল্যুশন’ বিক্রি হয়ে গেছে সেদিন ছিল পহেলা এপ্রিল। ছোট বেলায় এই দিনটিতে আমরা স্কুলের বন্ধু-বান্ধবদেরকে বোকা বানিয়ে বলে উঠতাম, ‘এপ্রিল ফুল’। নির্ভেজাল আনন্দের জন্যই এই বোকা বানানোর খেলা চলত তখন। কিন্তু বড় হওয়ার পর বুঝতে পেরেছিলাম যে এটি একটি শিশুতোষ খেলা হলেও এর পিছনে যে ইতিহাসটি প্রচলিত আছে তা মোটেও শিশুতোষ গোছের কিছু নয়। তাই এই দিনে যখন বোকা বনে যাওয়ার মতন কোন ঘটনা ঘটে বড়রা তখন সেটাকে ‘এপ্রিল ফুল’-এর সাথে তুলনা করে। আমাদের অবস্থাও অনেকটা ‘এপ্রিল ফুল’ হয়ে বসে থাকার মতন হলো সেদিন। তবে কিছুক্ষণ পরেই আমাদের কোম্পানীর মালিক এবং সিইও ড্যারেন তার ওয়াইফ লরি অ্যান সহ এসে আমাদেরকে নিশ্চিত করল যে ‘এক্সপেরিয়েন’ নামক এক ক্রেডিট ব্যুরো কোম্পানী ‘ডিসিশনিং সল্যুশন’-কে কিনে নিয়েছে। ক্রেডিট ব্যুরো কোম্পানীর প্রধান কাজ হচ্ছে কোন এক নির্দিষ্ট দেশ কিংবা রিজিওন-এর সবার সব ধরণের ফিনানশিয়াল ট্রানজেকশনের খুঁটিনাটি হিসাব রাখা, অনেকটা আমাদের আমলনামার মতন। কোন ব্যক্তির যদি কোন ক্রেডিট ব্যুরো রেকর্ড পাওয়া না যায় তবে সেই ব্যক্তির পক্ষে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোন ধরণের ফিনানশিয়াল সেবা পাওয়া সম্ভব হবে না। গোপনীয়তা রক্ষার বিধি নিষেধের কারণে ‘ডিসিশনিং সল্যুশন’-এর এই বিক্রি হয়ে যাওয়ার খবর আমাদেরকে আগে জানাতে পারেনি বলে ড্যারেন দুঃখ প্রকাশ করল। সেই সাথে বিক্রির কারণ হিসেবে সে ব্যাখ্যা করল যে তার পক্ষে কোম্পানীকে যতটুকু টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল সে তা করেছে, এক সময় সে বুঝতে পেরেছে যে তার পক্ষে এই কোম্পানীকে আর নেক্সট লেভেলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তাই সে ক্রেডিট ব্যুরো ইউরোপীয়ান মার্কেটের অন্যতম সেরা কোম্পানী ‘এক্সপেরিয়েন’-এর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে তাদের কাছে ‘ডিসিশনিং সল্যুশন’-কে বিক্রি করেছে। ‘এক্সপেরিয়েন’-এর এক্সিকিউটিভেরা কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের জন্য ‘গুডি ব্যাগ’ নিয়ে হাজির হবে। আমি আগে কখনো এই কোম্পানীর নাম শুনিনি, কারণ কানাডিয়ান ক্রেডিট ব্যুরো মার্কেটে তাদের কোন পদচারণা ছিল না তখন। তবে ‘এক্সপেরিয়েন’-এর নাম শুনে আমার পাশের ডেস্কে বসা কারমিনের চেহারা পাংশুবর্ণ ধারণ করেছিল। মালেয়শিয়ার জোহরবারুর মেয়ে কারমিন, হাজবেন্ডের সাথে মাত্র কয়েকমাস আগে ইমিগ্রেশন নিয়ে টরন্টোতে এসেছে। ডিসিশনিং সল্যুশনে জয়েন করেছে মাসখানেক আগে। সে আমাকে ফিসফিসিয়ে বলল যে সে মালেয়শিয়াতে এই ‘এক্সপেরিয়েন’-য়েই ডেভেলপার হিসেবে কাজ করত। কানাডাতে আসার আগে সেখান থেকে চাকরী ছাড়তে তার নাকি বেশ ঝামেলা হয়েছিল। ভাগ্যের ফেরে তাকে যে আবার এই এক্সপেরিয়েনের পাল্লায় পড়তে হবে সেটা ছিল তার দূরতম কল্পনারও অতীত। যা হোক, ড্যারেন যখন তার সংক্ষিপ্ত বিদায়ী বক্তৃতা দিচ্ছিল, আমি আড় চোখে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের দীর্ঘদিনের ম্যানেজার টেট আর অপেক্ষাকৃত নতুন ডেভ ম্যানেজার সেথ-এর চেহারাতে এক ধরণের কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাব ফুটে উঠেছে। কেন জানি আমি তাদের জন্য দুঃখ বোধ করলাম।
আমি যখন ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে ‘ডিসিশনিং সল্যুশন’-এ যোগ দেই তখন সেটা ছিল প্রায় পনেরো জনের একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠান। আজ ২০১৩ সালে এসে ‘ডিসিশনিং সল্যুশন’-এর জনবল হয়ে দাঁড়িয়েছে পঞ্চাশ জনেরও বেশী। এই দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছরে আমি নিরলসভাবে কাজ করে গেছি এই কোম্পানীর মূল প্রোডাক্ট ‘ডিসিশনিং ইঞ্জিন’ সফটওয়্যারের সাথে। পাঁচ ছয়জনের একটা টিমকে লিড দিয়ে এই সফটওয়্যারে নতুন নতুন কার্যকারীতা যোগ করাই ছিল আমার অন্যতম কাজ। আজ হঠাৎ যখন জানতে পারলাম যে এখন থেকে আমি ‘এক্সপেরিয়েন’ নামক অন্য এক অজানা-অচেনা কোম্পানীর এমপ্লয়ী, সবকিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল। ড্যারেন আর লরি অ্যান বিদায় নিতেই রাজার হাতি যেমন হৈ হৈ করে বিজিত রাজ্যে প্রবেশ করে, অনেকটা সেভাবেই এক্সপেরিয়েন-এর এক্সিকিউটিভরা আমাদের অফিসে এসে প্রবেশ করল। আর আমাদের অবস্থা তখন সেই পরাজিত সৈন্যদলের মতন যাদের ভাগ্য অনিশ্চয়তায় দোলাচালে ঝুলছে। প্রথমেই তারা আমাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে গুডি ব্যাগ দিল যাতে মূলত এক্সপেরিয়েনের লোগো লাগানো কলম, প্যাড, কফি-মাগ এই ধরণের জিনিষপত্র দিয়ে ভরা। সেই কফি-মাগ আমি অবশ্য যতদিন এক্সপেরিয়েনে কাজ করেছি ততদিন অফিসে ব্যবহার করেছি। এক্সপেরিয়েন ছাড়ার পর একটু কোনা ভাঙ্গা অবস্থায় সেটার জায়গা হয়েছে আমাদের বাসার বেজমেন্টে একটা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।
এক্সপেরিয়েন মূলত ইংল্যান্ড বেইজড কোম্পানী যাদের মূলত ইউরোপ এবং এশিয়া প্যাসিফিক মার্কেটে একচেটিয়া আধিপত্য। তারা তাদের ব্যবসা নর্থ আমেরিকাতে বিস্তার করার জন্য ইতিমধ্যেই আমেরিকাতে অফিস করেছে। সেই আমেরিকা অফিসের এক্সিকিউটিভরা এসেছে আমাদের এখানে। হেড কোয়ার্টার থেকে খুব শীঘ্রই একটি টিম আসবে আমাদেরকে ব্রিফ করতে। এক্সপেরিয়েন-এর আমেরিকা শাখার প্রধান আমাদেরকে প্রথমেই আশ্বস্ত করল এই বলে যে আমাদের কারোরই চাকুরী হারানোর ভয় নেই। আমরা এই মুহুর্তে যেসব প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছি, সেসব প্রজেক্ট নিয়েই আমাদেরকে কাজ করে যেতে বলা হল, যেন কিছুই ঘটেনি। আমাদের কাজের ভূয়সী করে সে বলল যে আমাদের কাজের জন্যই এক্সপেরিয়েন ‘ডিসিশনিং সল্যুশন’কে কিনে নিয়েছে। তাই আমরা তাদের জন্য মূল্যবান সম্পদ, বোঝা নই। আমাদের অফিসের নতুন সিইও হিসেবে আমেরিকা অফিস থেকে যার আগমন তার নাম হল ক্রিস ব্রিস। ল্যাটিন আমেরিকার কলম্বিয়ার বংশোদ্ভূত ক্রিস ছিল একজন হাসিখুশী মেজাজের লোক। টরন্টোর এই নতুন অফিসে তার প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল ট্রান্সফরমেশন। আমাদেরকে ‘ডিসিশনিং সল্যুশন’ থেকে বের করে এনে ‘এক্সপেরিয়েন’-এ পরিণত করা। এই ট্রান্সফরমেশনের অংশ হিসেবে আমাদের প্রথম দিনের বিস্ময়ের ধকলকে তারা বেশ ডেলিকেটলি হ্যান্ডেল করেছিল। তারপরও আমি লক্ষ্য করলাম যে পরদিন ডেভ ম্যানেজার সেথ সহ অনেকেই ‘সিক কল’ দিয়ে কাজে আসল না।

এক্সপেরিয়েনের ইয়ার এন্ড পার্টিতে স্ত্রী সহ লেখক। হাসিখুশী মেজাজের ক্রিস ব্রিস বেশ জমকালো পার্টির আয়োজন করেছিল। ছবি : লেখক


ক্রিস তার কাজ শুরু করল তার সাথে আসা হিউম্যান রিসোর্সের একজন মহিলাকে নিয়ে। আমাদের সবাইকে এক্সপেরিয়েনের পে-রোল সিস্টেমে আনাটাই ছিল এই ট্রান্সফরমেশনের প্রথম পদক্ষেপ। সেই সাথে আমাদের সবার ডেস্ক কম্পিউটারে কিছু সিকিউরিটি প্যাচ ইন্সটল করার জন্য আনা হল ডেল কোম্পানী থেকে একদল এক্সপার্ট। আর একই সাথে আনা হলো এক নতুন কফি মেশিন যা থেকে আমরা যখন ইচ্ছে তখন নিজের পছন্দ মাফিক ফ্লেভারের কফি কিংবা অন্য কোন হট ড্রিংক্স বানিয়ে খেতে পারব। সেই সাথে চালু হলো কিছু নতুন ধরণের মিটিং, যেমন প্রতি দুই সপ্তাহে একবার ‘অল হ্যান্ডস অন ডেক’ মিটিং। সকাল বেলার এই মিটিং-এ থাকত বিশাল ব্রেকফাস্টের আয়োজন। সেই ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে শুনতে হত ক্রিসের বক্তৃতা। এই বক্তৃতার বিষয়বস্তু মূলত আমাদের টরন্টো অফিসের হিউম্যান রিসোর্স সংক্রান্ত আপডেটস, কোম্পানীর গ্লে­াবাল স্টাটাস ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই ব্রেকফাস্টের আইটেম এত বেশী থাকত যে আমাদের আর আলাদা করে লাঞ্চ করতে হত না, এমনকি আমরা বাড়ী ফেরার সময় বক্সে করে ব্রেকফাস্টের জন্য আনা বিভিন্ন ধরণের স্যান্ডউইচ কিংবা ফলমূল সাথে নিয়ে আসতাম। এই হানিমুন পিরিয়ড অবশ্য বেশী দিন স্থায়ী হলো না। ইংল্যান্ডের হেড অফিস থেকে একদল এক্সিকিউটিভ এলো প্রায় মাস খানেক পর আমাদেরকে ব্রিফ করার জন্য। সেই বিশাল ব্রেকফাস্ট সহ ‘অল হ্যান্ডস অন ডেক’ মিটিং ঠিকই রইল কিন্তু আস্তে আস্তে বদলে যেতে শুরু করল সবকিছু। এই বদলটা তারা বেশ সূক্ষ্মভাবে করার চেষ্টা করল কিন্তু প্রতিটি ধাপে আমরা টের পেলাম সেই পরিবর্তনের। মানুষ সহজাত প্রবৃত্তির কারণে হয়ত পরিবর্তন পছন্দ করে না। সেই ব্যাপারটা মাথায় রেখেই আসলে এই পরিবর্তনগুলো আনা হয় খুব সূক্ষ্মভাবে যাতে সবাই তার সাথে মানিয়ে নিতে পারে। আবার এই পরিবর্তনগুলি নিজ ক্যারিয়ারের জন্য ভালো কি মন্দ সেটা সঠিক সময়ে অনুধাবন করাটাও কিন্তু বিশেষ জরুরী। কারণ ক্যারিয়ারের সাথে কম্প্রোমাইজ করে যদি সেই পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেই তবে একসময় হয়ত নিজের অবস্থা সেই ‘বয়েলিং ফ্রগ’-এর মতন হবে যে কিনা পানির উষ্ণতার সাথে সাথে নিজের দেহের তাপমাত্রার পরিবর্তন করতে গিয়ে নিজের সমস্ত এনার্জি খরচ করে ফেলেছে। শেষে সে যখন বুঝতে পারে যে তার লাফ দিয়ে পানির পাত্র থেকে বেরুনো ছাড়া গত্যন্তর নেই, কিন্তু তখন তার আর লাফ দেওয়ার মতন শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। পরিনতিতে তাকে সিদ্ধ হয়ে মরতে হয়, অথচ সে কিন্তু প্রথমেই লাফ দিয়ে স্বচ্ছন্দে নিজের জীবন বাঁচাতে পারত।
ইংল্যান্ডের হেড অফিস থেকে আসা এক্সিকিউটিভদের এই দলটি দুই সপ্তাহ পর পর নিয়মিত আসা শুরু করল আর প্রতিবারে দুই থেকে তিন দিন করে থাকত টরন্টোতে। তারা প্রথমে আমাদেরকে এক্সপেরিয়েনের গ্লে­াবাল টিমের সাথে পরিচয় এবং সেই সাথে ইন্টিগ্রেট করার কাজে হাত দিল। আমাদের কনফারেন্স রুমে বসানো হল অত্যাধুনিক অডিও ভিডিও সিস্টেম যার মাধ্যমে আমরা এক্সপেরিয়েনের হেড অফিস কিংবা বুলগেরিয়াতে অবস্থিত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের সেন্ট্রাল অফিসের সাথে সহজেই যোগাযোগ করতে পারি। কনফারেন্স রুমের মধ্যে কেউ কথা বলা শুরু করলে এই অত্যাধুনিক অডিও ভিডিও সিস্টেমের ক্যামেরা নিজ থেকেই সেই ব্যক্তির মুখের দিকে ঘুরে যায় ফলে তার ছবি পর্দাতে ফুটে উঠে। আমরা বেশ অবাক হয়েছিলাম এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করে। পরে অবশ্য আমরা এই কনফারেন্স সিস্টেমের সাথে অভ্যস্থ হয়ে উঠলাম কারণ আমাদেরকে নিয়মিত বুলগেরিয়ার একটি টিমের সাথে মিটিং করতে হত। বুলগেরিয়া থেকে এক সময় তিনজনের একটা দল আসে আমাদেরকে সফটওয়্যার তৈরির জন্য এক্সপেরিয়েনের নিজস্ব প্রটোকল সম্পর্কে ট্রেইন আপ করতে। সফটওয়্যার তৈরির কিছু ধাপ থাকে, সেই ধাপ ধরে ধরে রিকুয়ারমেন্ট থেকে পর্যায়ক্রমে ফিনিশড সফটওয়্যার তৈরি হয়। প্রতিটি ধাপের কিছু লক্ষ্য থাকে, যেমন প্রাথমিক পর্যায়ের ধাপগুলির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে রিকুয়ারমেন্টগুলিকে সঠিকভাবে অনুধাবন করে তাকে কোডের মাধ্যমে সফটওয়্যারে ইমপ্লিমেন্ট করা। এই পর্যায়ে মূলত প্রডাক্ট ওউনার, সিস্টেম এনালিস্ট আর ডেভেলপাররা একসাথে কাজ করে। তারপর কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স টিমের কাজ হচ্ছে সেই কোডকে নিখুঁতভাবে টেস্ট করা। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে টেস্টিং হচ্ছে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট লাইফ সাইকেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। টেস্টিং টিমের গ্রীন সিগন্যাল ছাড়া কোন সফটওয়্যারই প্রোডাকশনে যেতে পারে না। কারণ ডিফেক্টওয়ালা সফটওয়্যার ব্যবহারকারীর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে ক্রুটিপূর্ণ সফটওয়্যার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের বিমান দূর্ঘটনার পিছনে যে ক্রুটিপূর্ণ সফটওয়্যারই যে দায়ী তা কিন্তু বিভিন্ন এজেন্সীর তদন্তে উঠে এসেছে। তারপরও টেস্টিং-এর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়াটা অনেক সময় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় যখন সফটওয়্যার রিলিজের ডেডলাইন কাছে চলে আসে। তাই ডেভেলপমেন্ট লাইফ সাইকেলের প্রতিটি ধাপকে সুচারুভাবে ম্যানেজ করাটা একটি কোয়ালিটি সফটওয়্যার তৈরি করার পূর্বশর্ত। সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে দুই ধরণের প্রটোকল আছে এই ধাপগুলিকে ম্যানেজ করার জন্য – ওয়াটার-ফল এবং অ্যাজাইল। ওয়াটার-ফল পদ্ধতিতে রিকুয়ারমেন্ট সংগ্রহ এবং এনালাইসিস, কোড ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট এবং তারপর কোড টেস্টিং এই ধাপগুলি আলাদাভাবে সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু অ্যাজাইল পদ্ধতিতে সফটওয়্যার তৈরির মোট সময়কালকে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট অংশ বা ‘স্প্রিন্ট’-এ ভাগ করা হয়। একেকটি স্প্রিন্টে মূল সফটওয়্যারের একেকটি ক্ষুদ্র অংশ পরিপূর্ণভাবে তৈরি করা হয় এমনকি টেস্টিংও এই স্প্রিন্টের অন্তর্ভূক্ত থাকে। ফলে শেষ স্প্রিন্টটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে সফটওয়্যার তৈরি কাজও শেষ, রিলজের জন্য রেডি। অ্যাজাইল পদ্ধতি বেশ অ্যাগ্রেসিভ, সবসময় সবাইকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হয়। পুংখানুভাবে সবার কাজের অগ্রগতির হিসেব রাখতে হয় বিভিন্ন চার্টের মাধ্যমে এবং প্রতিদিন প্রত্যেকের কাছ থেকে তাদের কাজের অগ্রগতির রিপোর্ট নিয়ে এই চার্টগুলিকে হাল নাগাদ করে রাখতে হয়। যে এইসব তদারকির কাজ করে তাকে বলা হয় স্ক্রাম মাষ্টার। স্ক্রাম মাষ্টারের আরেকটি দায়িত্ব হচ্ছে স্প্রিন্টের যে কোন ইমপেডিমেন্ট বা অবস্ট্রাগল দূর করা। আধুনিককালে ইন্ডাস্ট্রিতে অ্যাজাইল পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয় যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে সঠিকভাবে ইমপ্লিমেন্ট করতে না পারলে অ্যাজাইল প্রজেক্ট খুব সহজেই পরিণত হয়ে যায় একটি ফ্র্যাজাইল প্রজেক্টে।
সফটওয়্যার তৈরির জন্য এক্সপেরিয়েন অনুসরণ করে অ্যাজাইল পদ্ধতি যা আমাদের জন্য নতুন। তাই তারা ধীরে ধীরে আমাদেরকে এই পদ্ধতির সাথে অভ্যস্থ করে তুলতে চাইল। ‘ফ্যালকন’ নামের যে টিমের টিম-লীড আমি, সে টিমকেই তারা বেছে নিল অ্যাজাইল পদ্ধতি শুরু করার জন্য। আর আমাকে বানানো হলো স্ক্রাম মাষ্টার। আমাকে গাইড করার জন্য স্থায়ী ভাবে লন্ডন অফিস থেকে এলো নতুন ম্যানেজার জেমস যাকে আমরা জিম নামে ডাকতাম। কিছুটা কালচারাল কারণে এবং কিছুটা ওয়ার্ক এথিকসের কারণে জিমের সাথে আমার প্রথম থেকেই বনিবনা হচ্ছিল না। এছাড়া আমার উপর চাপিয়ে দেয়া আমার নতুন রোল স্ক্রাম মাষ্টারের কাজও আমার পছন্দ হচ্ছিল না। কারণ আমার মনে হচ্ছিল যে সফটওয়্যার ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে আমার মূল স্কিলসেট যেটা স্ক্রাম মাষ্টারের দায়িত্ব পালনে কোন কাজে আসে না। তাই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম যে ‘বয়লিং ফ্রগ’-এর অবস্থা হওয়ার আগেই আমাকে আরেকটি চাকরী যোগাড় করতে হবে। ‘লিংকড ইন’-এর প্রোফাইল আপডেট করে বিভিন্ন জায়গায় রেজুমী পাঠানো শুরু করলাম। একদিন ফোন পেলাম কানাডার অন্যতম একটি সেরা ব্যাংকের হিউম্যান রিসোর্স থেকে। তারা আমাকে ‘সফটওয়্যার সল্যুশন ডিজাইনার’ পদের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করে তাদের ক্রীকসাইড অফিসে টেকনিক্যাল ইন্টারভিউ-এর জন্য অ্যাপয়মেন্ট পাকা করে দিল। নির্ধারিত দিনে সেখানে গিয়ে ফ্রন্ট ডেস্কে বসা গার্ডকে আমার ইন্টারভিউর কথা বলতেই সে টেলিফোনে ভিতরে খবর পাঠাল। একটু পর হায়ারিং ম্যানেজার মার্ক নেমে এসে আমাকে তিনতলাতে তার রুমে নিয়ে গেল। মার্কের লাস্ট নেম দেখে মনে মনে অনুমান করেছিলাম জার্মান কেউ হবে, কিন্তু চেহারা দেখে মনে হলো মিডিল ইস্টার্ন, সম্ভবত ইসরাইলী। কিন্তু পরে জেনেছি সে আসলে ইরাকী, বিবাহ সূত্রে সে তার স্ত্রীর লাস্ট নেম নিয়েছে। আর তার আসল নাম আমির অনেক আগেই হারিয়ে গেছে মার্কের আড়ালে। আমার ইন্টারভিউ নেয়ার জন্য আরেকজন এলো তার নাম ডিমিট্রি। ইউক্রেনিয়ান কিন্তু জীবনের একটা অংশ কাটিয়েছে ইসরাইলে। পরবর্তীতে আমার সাথে বেশ খাতির হয়ে যায় ডিমিট্রির। ইসরাইলের একটি এয়ারফিল্ডের পাশে ছিল তাদের অ্যাপার্টমেন্ট। ভোর না হতেই এয়ারফিল্ডের যুদ্ধবিমানগুলির ইঞ্জিন বিকট গর্জনে চালু হত মহড়ার জন্য। তাই ইসরাইল ছেড়ে কানাডাতে এসে সে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তারা আমাকে ইন্টারভিউতে তেমন কোন টেকনিক্যাল প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল না, বরং জানতে চাইল আমি বর্তমানে কী নিয়ে কাজ করি। তারপর তারা আমাকে তাদের সিস্টেম সম্পর্কে একটা ধারণা দিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমি এতদিন ডিসিশনিং সল্যুশনে যে সফটওয়্যার তৈরি করেছি তারা এখানে ঠিক একই ধরণের সফটওয়্যার তৈরি করে ব্যবহার করছে। ব্যাংকে যখন কেউ কোন লোনের জন্য অ্যাপ্লাই করে তখন তাদের এই ‘ক্রেডিট লিংক’ সিস্টেম সেই অ্যাপ্লিকেশনকে যাচাই করে অ্যাপ্রুভ কিংবা ডিক্লাইনের ডিসিশন দেয়। আমি যে এরকম একটি সফটওয়্যার তৈরির সাথে বিগত আট বছর ধরে জড়িত জানাতে মার্ক মুচকি হেসে বলল, সেই জন্যই তো আমরা তোমাকে ইন্টারভিউতে ডেকেছি। মার্ক আমাকে জানাল যে শীঘ্রই ব্যাংকের হিউম্যান রিসোর্স আমাকে একটা অফার লেটার পাঠাবে।
যথা সময়ে অফার লেটার আমার হাতে এলো। আর এলো মার্কের ফোন, কবে আমি জয়েন করতে পারব সেটা সে জানতে চাইল। আমি শুধু একটা ব্যাপারেই মার্কের সাথে নেগোসিয়েট করতে চাইলাম, সেটা হলো ডাউনটাউন লোকেশনে আমি কাজ করতে চাই। মার্কের তাতে কোন আপত্তি নেই, আমার প্রবিশন পিরিয়ড পার হলে আমি ইচ্ছে করলে ডাউনটাউন লোকেশনে কাজ করতে পারব। তবে সে আমাকে এটাও জানালো যে আমি কিন্তু তখন নিজেই আর যেতে চাইব না। তার যুক্তি হলো ডাউনটাউন লোকেশনে আমার নির্দিষ্ট কোন সিট থাকবে না, আমাকে প্রতিদিন ‘ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ’-এর ভিত্তিতে সিটের দখল নিতে হবে। এছাড়াও আমার পুরো টিম যখন ক্রীকসাইডে, আমি সেখানে একা ফিল করব। আমি তারপরও আমার ডাউনটাউনের অপশন হাতে রেখে অফার লেটার একসেপ্ট করলাম। দীর্ঘ আট বছর ধরে ডাউনটাউন লোকেশনে কাজ করে করে কেন যেন একটা মায়া পড়ে গেছে। বিশেষ করে লাঞ্চ টাইমে এখানকার কিছু পুরানো বইয়ের দোকানে ঢুঁ মারাটা আমার এমন এক নেশায় পরিণত হয়ে গেছে যা ছাড়তে মন চাইছিল না।
এক্সপেরিয়েন ছেড়ে ব্যাংকে জয়েন করার কথা সবার আগে জানালাম আমার দীর্ঘদিনের ম্যানেজার টেটকে। তারপর জানালাম সেথকে। যদিও তারা কেউই এখন আর আমার ডাইরেক্ট ম্যানেজার না। তাদের কাছে পরামর্শ চাইলাম কিভাবে আমার ম্যানেজার জিমকে পাশ কাটিয়ে আমি নোটিশ দিতে পারি। তারা উভয়েই আমাকে সরাসরি হিউম্যান রিসোর্সকে জানাতে বলল। জিম যখন হিউম্যান রিসোর্সের কাছ থেকে জানতে পারল আমি চলে যাচ্ছি তখন তার চেহারা হয়েছিল দেখার মতন। আমি অবশ্য হিউম্যান রিসোর্সের সাথে আমার এক্সিট ইন্টারভিউতে বলে এসেছিলাম যে জিম যদি টরন্টো অফিসকে লন্ডন অফিস মনে করে তবে হয়ত আমার অনেকেই এক্সপেরিয়েন ছেড়ে চলে যাবে। তবে আমি এক্সপেরিয়েন ছাড়ার বছর দুইয়ের ভিতর এক্সপেরিয়েন নিজেই টরন্টো ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আমার অনেক কলিগই আমাকে তখন ইমেইল করে জানিয়েছিল যে আমি নাকি জাহাজ ডোবার আগেই জাহাজ ছেড়ে চলে এসে বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলাম। তবে জাহাজ যে ডুবতে বসেছে সেটা সেথ ঠিকই টের পেয়েছিল। তাই আমি এক্সপেরিয়েন ছাড়ার ঠিক দুই সপ্তাহ পরে সেও জয়েন করল আমার ব্যাংকেরই ডাউনটাউন লোকেশনে। হাসিখুশী মেজাজের ক্রিস ব্রিসকেও এক্সপেরিয়েন ছাড়তে হলো এক সময়। সে জয়েন করল কানাডার সবচেয়ে চালু ক্রেডিট ব্যুরো কোম্পানীতে মার্কেটিং সিইও হিসেবে। (চলবে)
কাজী সাব্বির আহমেদ
টরন্টো