প্রবাসে পরহিতকর্ম -৮১

ইউরোপের পথে পথে

রীনা গুলশান
(পূর্ব প্রকাশের পর)

“কিছুই – থাকে না হাতে
ছুঁয়ে থাকা যায় না কিছুই
আকাঙ্খায় ডেকে এনে শুধু
তারে অতিতে হারানো
যেইখানে শুরু তার
শেষ তার সেখানে।”
আজকের ভোরটা বেশ ধোঁয়াশায় ভরা। শীতের সকাল গুলো সাধারণত এমন-ই হয়। আর লন্ডনের আকাশতো এই হাসি, এই কান্না। বিনা নোটিশেই কান্না গুলো পথে চলতে থাকা, পথিকদেরকে ভিজিয়ে দেবে নিমিষেই। আজকের ভোরে দেখলাম দারুন কুয়াশাচ্ছন্ন। মাজেদা আপার বাসা থেকে ৫ মিনিটের হাটা দূরত্বে সাবওয়ে। আমার জন্য ঐ ৫ মিনিট ১৫ মিনিট লেগে যায়। তবে টিকিট কাটাই আছে অর্থাৎ ওয়েস্টার কার্ড এ যথেষ্ট পরিমানে পাউন্ড ভরা আছে। এক মাসের মত চললেও ফুরাবে না। আবার লন্ডনের কোথাও ঘুরতে গেলে এটা ব্যবহার করতে পারবো বেশ কিছুটা সময়। আস্তে আস্তে হাটছিলাম। মাথার মধ্যে তখন অনবরত রুদ্র গোস্বামীর কবিতা ঘুরছিল।
স্টেশনে যেয়েই দেখলাম, খাপছাড়া ভাবে বেশ কিছু মানুষ টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছে, ঘুম ঘুম মুখাবয়বে। আমাদের এই ঝামেলা নাই। অতএব আমরা কার্ড ‘সোয়াপ’ করে জলদি করে এলিভেটরের কাছে চলে এলাম। কারণ এত ছোট এলিভেটর, দেখলেই আশ্চর্য লাগে, যে এত বড় স্টেশনের এরকম পিচ্চি এলিভেটর। আবার ঘটর ঘটর শব্দও হয়। এমনিতেই আমার এলিভেটরে ভীতি প্রবল। যাইহোক, নীচে নেমে এখন চোট টান টান করে ডিসপ্লে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। লন্ডনে এই আবার একটা ঝামেলা আমার মনে হলো। যদি একটু অন্যমনস্ক থাকেন তো, দেখা গেল, নর্থ বাউন্ডের যাত্রী সাউথ বাউন্ডে চলে যাবে। আমাদের কানাডায় আবার একেবারে সব আলাদা আলাদা। আপনি ইচ্ছা করলেও, হারানোর কোন সুযোগ নাই। যাই হোক বেশ অনন্দ এবং অসাধারণ এক বিচিত্র অনুভূতির দোলাচলে ভাসতে ভাসতে অবশেষে সেন্ট পেনক্রাস রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছালাম। বেশ খানিকটা হেটে আমাদের কাউন্টারে এলাম। একটা ছেলে এসে আমাদের সব টিকিট বুঝিয়ে দিয়ে গেল। আমরা তারপর টিকিটের নির্দেশ অনুযায়ী ট্রেনের কাছে এসে দাঁড়ালাম। একটি পরই ট্রেন চলে এলো। আমরা আমাদের নির্দেশিত কামারায় এসে বসলাম। ৭টায় ট্রেন ছাড়বে। ঠিক সময় মতই ট্রেন ছেড়ে দিল। জীবনে প্রতিটি ট্রেন জার্নির শুরুতেই আমার ভেতরে একটি অদ্ভূত চেতনা কাজ করে। “আমি চলে যাচ্ছি। দূরে। বহুদূরে। যেখানে পরিচিত কোন মানুষ আমাকে আর ছুঁতে পারবে না। আজও তার থেকে ব্যত্যয় হলো না। কি জানি এই জন্যই কি না জানিনা, ট্রেনের জার্নিটা খুব ছোট বেলা থেকেই অসম্ভব প্রিয়।

ছোট ভাই মিঠুর সাথে বেলজিয়াম সেন্টারে। ছবি : লেখক


যাই হোক, ট্রেনে উঠার আগে অবশ্য একই রকম নিয়মাবলীর মধ্য দিয়েই আসতে হয়েছিল। পরপর ২টি বিশাল কক্ষ অতিক্রম করতে হয়েছে। এবং দড়ি দিয়ে দিয়ে যে জিগজাগ লাইন করা, সেটা এত বিশাল লম্বা যে আমার এই ব্যথা পা নিয়ে, খুবই অসুবিধা হয়েছে। আমি এসব জায়গাতে হুইল চেয়ার নিতে পারতাম, কিন্তু নেইনি। এবং ইউরোপের মানুষজন এত ভালো যে, অনেক সময়ই আমাকে তারা বলেছে, “তুমি দড়ির মাঝখান দিয়ে একদম সামনে চলে যাও।” আমার খুব হাসি পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এটা এক ধরণের চিটিং। যদিও আমার হাসবেন্ড ২টা সুটকেস এবং কাধ ব্যাগ নিয়ে ঠিকই লাইন মোতাবেকই আসছিল। সত্যি, একদম বেচারা। আমাকেও হাতের বাহু ধরে হাটতে হয়। কারণ, এখন আমার দু’পায়ে ঠিক মত ব্যালেন্স আসেনি। মাঝে মাঝেই মনে হয়, শরীর টাল খেয়ে একদিকে হেলে যায়। যেহেতু দু’পায়েরই ‘ফিমার বোন’, তাও উপরিভাগে ‘ক্লিন ব্রোক’, তাই এখনো অব্দি শরীরে শতভাগ ব্যালেন্স আসেনি। কিন্তু কেউ আমাকে করুনা করুক এটা আমি আদৌ সহ্য করতে পারি না। তাই ওরা যখন বলছিল, তখনও আমি দ্বিধান্বিত ভাবে ভাবছিলাম, এটা করবো কি করবো না? তারপর একজন মহিলা সিকিউরিটি যখন খাঁটি ব্রিটিশ টোনে বললো, তুমি আমার হাত ধরে আসো। এবং সে আমাকে মাঝখান দিয়ে সর্টকাট নিয়ে গেল। আমি সিকিউরিটি চেকিং এর কাছে গিয়ে একটি চেয়ারে বসে হাসফাস করছি, তবু এবং তারপর একটি ট্রেতে জ্যাকেট, হাতের ঘড়ি, ব্রেসলেট ইত্যাদি খুলে রাখতে আরম্ভ করি। শুধু পেনডেন্টে (উহ! কেন যে ওটা পরে গিয়েছিলাম, বারবার খুলতে পরতে মনে হচ্ছিল ছুড়ে ফেলে দেই) একটা ডায়মন্ডের লকেট এবং হাতের ডায়মন্ড রিং-টা, ভ্যানিটি ব্যাগে রেখে দিলাম। কারণ, প্যারিসে যাবার সময় ওটা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই পূর্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবারে ভালো কিছু করলাম। আমরা জীবনে প্রতিটি পদে পদে শিক্ষাপ্রাপ্ত হই। এবং আরো একটা শিক্ষা নিলাম যে, এবারে যখন কোন ব্যাপক ভ্রমণে যাবো তখন জামা কাপড় ছাড়া কিছুই নিবো না। ঘড়িও না। এমনকি অনামিকায় আংটিও না। এখন এরা যদি আমাকে অবিবাহিত মনে করে, করুক না। ক্ষতি কি? আমারতো সুহানা, কিয়ান, ম্যাহেক এবং কিয়ারা’র মতো চারটে গ্র্যান্ডকিডস রয়েছেই।
যাইহোক, সাতখন্ড রামায়ন পড়ে অবশেষে যখন ইউরোস্টার ট্রেনে উঠলাম তখন আমি রীতিমত ক্লান্ত, পিপাশার্ত। মজার ব্যাপার এবং বিরক্তির ব্যাপার ১ বস্তা (ব্যাগ) ভরে এরা খাবার এ্যালাও করলও ছোট এক বোতল পানি এ্যালাও করবে না। কেন রে বাপু? পানি তো একেবারে ক্রিস্ট্রাল ক্লীন, এ পাশ ওপাশ সব দেখা যায়। তবু পানিতেই যত আপত্তি। যাইহোক আমার এমনিতেই এখন ১৫/২০ মিনিট পরপর এক ঢোক করে পানি পান করা লাগে। অতএব, আমার স্বামী সুটকেস জায়গামত ভাল করে রেখে, আমাকেও ঠিক মত বসিয়ে ক্যাফেটরিয়াতে যেয়ে ১ বোতল পানি ২ ইউরো দিয়ে কিনে আনলো। ২ ইউরো! মাই গড! মানে আমাদের প্রায় ৫ ডলার কানাডিয়ান। মেজাজটা খুবই খারাপ হলো। অথচ কফি, এক কাপ ১ ইউরো ৫০ সেন্ট। কি আশ্চার্য এসব দেশ? প্লেনেও দেখেছি পানি চাইলে ফ্লাইট ক্রুদের মুখ হাড়ি হয়ে যায়, কিন্তু জুস চাইলে হাসি হাসি মুখে সার্ভ করে।
অবশেষে ইউরোস্টারের ক্যাপ্টেন দীর্ঘ একটা বক্তৃতা দিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল। আর আমার একই সাথে দুটো প্রতিক্রিয়া ঝাপিয়ে পড়লো হৃদয়ের অন্তস্থলে। ওহ! অবশেষে সুধীর্ঘ ৩৩/৩৫ বছর পর আমি বেনজীর আলম মিঠুকে দেখবো। এবং বেলজিয়াম। বিশেষ করে আমার স্বপ্নের ‘ব্রুজেস’ দেখতে চলেছি। মিঠুকে অবশ্য কেউ, এসব নামে চেনে না। ইউরোপে সে খুবই ফেমাস ‘আলম’ নামে। সে একজন অতি সম্মানিত ক্রিয়েটিভ সেফ। অত্যন্ত অভিজাত এলাকায় তার নিজের দুইটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। যেখানে বুকিং দিয়ে মানুষ খেতে যায়। এবং প্রতিমাসের শেষ সপ্তাহে ১টি করে নিউ মেনু থাকে। যেটা সম্পূর্ণ তার নিজস্ব। এবং তার স্পেনে একটা বিশাল রিসোর্ট কাম রেস্টুরেন্ট আছে। প্যারিসে তার নিজস্ব ‘ক্রুজ’ আছে। পৃথিবীর নানান দেশে সে খাদ্য, পুষ্টি, মেনু ক্রিয়েশন নিয়ে বক্তৃতা দেয়। টিভিতে তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। আর আমার হাসি পাচ্ছিল, আমার ছোট খালার এই ছেলেটি আমার থেকে ৪/৫ বছরের ছোট; তখন সদ্য কমার্সে গ্রাজুয়েট করেছে এবং তার বিজনেসম্যান বাবা, তাকে জোরপূর্বক নিজ ব্যবসাতে বসানোর জন্য বারবার ব্যর্থ চেষ্টা করেই যাচ্ছে। কিন্তু ছেলের একই কথা, সে একজন নামকরা সেফ হতে চায়। খালু তখন চেম্বার অব কামার্সের প্রেসিডেন্ট। খালুর চোখে একজন নামকরা সেফ এর অর্থ হলো, বিয়ে বাড়িতে যে সব বাবুর্চি আমরা দেখতে পাই তারা। অতএব খালু মহা হৈ চৈ করে ছেলেকে নালায়েক, গাধা উপাধিতে ভূষিত করে, তার নব নির্মিত স্টিল ফ্যাক্টরীতে পাঠাতো শুরু করলো। ছেলে ভদ্রলোকের মত বেশ কিছুকাল সেখানে যাতায়ত করলো। এদিকে তলে তলে ‘এ্যাডামেন্ট গোয়িং টুবি এ সেফ’। বেলজিয়ামে যাবার সব ঠিক ঠাক করে স্টিল ফ্যাক্টরী দেখিয়ে ব্যাংক থেকে প্রচুর টাকা লোন করে একদম চম্পট। এদিকে খালুর মাথায় চরম বাড়ি। আর ওদিকে আলম সাহেব আজও চম্পট। কালও ভাগোয়াট। তার কোন খবরও নাই। খালু তখন মাসছয়েক পর টাকার শোক ভুলে, ছেলের শোকে মুহ্যমান হলো। সম্ভবত বছর দু’য়েক পর তার মাকে (আমার খালাম্মাকে) ফোন করে বলেছিল যে, সে বেলজিয়ামে আছে। কিন্তু কউকে ঠিকানা বলেনি। কাউকে, এমনকি আমাকেও না। আমি তার ‘বোন-কাম-বন্ধু’ বেশী। ছোটবেলা থেকে আমি, পারভীন, নাজমু আর
মিঠু একসাথে খেলাধূলা করে বড় হয়েছি। তবুও আমাকেও বিশ^াস করেনি। তবে পরে শুনেছি। সে প্রায় ৮ বছর ধরে ফ্রেন্স ভাষা এবং সেফ ও কুকিং এর উপর পড়াশুনা করেছে। সে এই ৩৫ বছরেও কুকিং এর উপর পড়া থামিয়ে দেয়নি।
রান্না যে একটা সত্যিকারের শিল্প, আমি মিঠুকে দেখে প্রথম হৃদয়ঙ্গম করেছিলাম। আমি তার রান্নাঘরে গিয়েছিলাম, যেদিন সে ‘স্পেশাল মেনু ডে’ তে রান্না করে। সেদিন কোন এসিস্টেন্টকে দায়িত্ব দেয় না। দেখলাম সে রীতিমত নেচেনেচে, হেসেহেসে রান্না করছে।
মিঠুকে দেখেই প্রথম বুঝলাম, ‘পাওয়ার অব প্যাশন’ এর তাৎপর্য।
সেই হারিয়ে যাওয়া ভাইটিকে দেখতে চলেছি। আমার আদরের ছোট ভাইটি। ঈশ, কতদিন পর দেখবো? ৩৫ বছর পর! বিয়ে করেছে ফরাসী এক কন্যাকে। ২টি সন্তানের জনক। আমিওতো বুড়ো হয়েছি। হয়নি? কি জানি, আমাকে দেখে মিঠু কি ভাববে?
“আমি কোন আগুন্তুক নই। এই
খর রৌদ্র জলজ বাতাস মেঘ ক্লান্ত বিকেলের
পাখিরা আমাকে চেনে
তারা জানে আমি কে? অনাত্মীয় নই?!”- (আহসান হাবীব।)
আমাকে ‘কৃষ্ণকলি’পা বলতো। আজ এতটা বছর পর কি জানি, কেমন দেখবে আমাকে? বাতাস কেটে কেটে ইউরো স্টার ট্রেন ছুটে চলেছে অজানা দেশের অতি চেনা ভালবাসার মানুষটির কাছে। আমার অনেক আদরের ছোট ভাইটির কাছে। আমার একমাত্র ‘ভাই-বন্ধুর’ কাছে। যার কাছে অবলিলায় আমি সব বলতে পারি এক নিমিষেই। (চলবে)
রীনা গুলশান। টরন্টো।
gulshanararina@gmail.com