মানসিক রোগ : সময়মত ব্যবস্থা না নিলে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে পরিস্থিতি
খুরশিদ আলম
প্রবাসে আবারো ঘটলো এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনা। বিষণ্নতার শিকার হয়ে নিজ পরিবারের সবাইকে খুন করলেন প্রবাসী দুই বাংলাদেশী তরুণ। তারপর তাঁরা নিজেরাও বেছে নিলেন আত্মহত্যার পথ। ভয়াবহ এই ঘটনায় বিস্ময়াভিভূত ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশী কমিউনিটি।
ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, গত ৫ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অ্যালেন শহরে বসবাসরত এক বাংলাদেশী পরিবারের ৬ সদস্যের মৃতদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। মৃত ব্যক্তিরা হলেন ১৯ বছর বয়সী যমজ ভাই-বোন ফারহান তৌহিদ ও ফারবিন তৌহিদ, বড় ভাই তানভীর তৌহিদ (২১), মা আইরিন ইসলাম (৫৬), বাবা তৌহিদুল ইসলাম (৫৪), তানভীর তৌহিদের নানি আলতাফুন্নেসা (৭৭)। বাবা, মা, বোন ও নানীকে গুলি করে হত্যা করার পর তরুণ দুই ভাই নিজেদের জীবনও বিসর্জন দেন। পুলিশ জানায়, ঐ দুই ভাই সুইসাইড নোট-ও রেখে গেছেন। ঐ নোটে যা লেখা আছে তা থেকে ধারণা করা হচ্ছে বিষণ্ন্নতার শিকার হয়ে তাঁরা এই নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটিয়েছেন। নোটে লেখা আছে পরিবারকে লজ্জা ও কষ্ট থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য দুই ভাই বাবা, মা, বোন ও নানীকে হত্যা করে নিজেরাও আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
স্থানীয় পুলিশ জানায়, হত্যাকান্ডের আগে ফারহান তৌহিদ ইনস্টাগ্রামে একটি দীর্ঘ ‘সুইসাইড নোট’ পোস্ট করেছেন। এতে তিনি লিখেছেন, ‘আমি নিজেকে ও আমার পরিবারকে হত্যা করেছি।’
ফারহান কীভাবে নবম শ্রেণি থেকে মানসিক হতাশার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন সেই কথাও নাকি পোস্টে লেখা আছে। তাঁর বড় ভাইও হতাশার সঙ্গে লড়াই করে আসছিলেন।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে ফারহান লিখেছিলেন, ‘আমার ভাই বলেছেন, আমরা যদি এক বছরে সবকিছু ঠিক করতে না পারি, তবে আমরা নিজেদেরকে এবং সেই সাথে আমাদের পরিবারের সবাইকে হত্যা করব।’
নিজেরা আত্মহত্যা করলে পরিবার লজ্জায় পড়বে। তাই লজ্জা ও কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য অন্যদেরও হত্যা করার কথা সুইসাইড নোটে উল্লেখ রয়েছে বলে পুলিশের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে। সুইসাইড নোটে হত্যার পরিকল্পনার কথাও লেখা আছে।
কিন্তু কেন এই মানসিক হতাশা বা বিষণ্ন্নতা? তাও আবার দুই ভাই কিভাবে একই সাথে বিষণ্ন্নতার শিকার হলেন? এর কোন উত্তর এখনো জানা যায় নি। স্থানীয় এক বাংলাদেশী জানান, পরিবারটিকে তিনি সবসময় হাসিখুশি থাকতে দেখেছেন। আরেক বাংলাদেশী জানান, পরিবারটিকে বাইরে থেকে সুখী বলেই মনে হতো।
উল্লেখ্য যে, ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই কানাডাতেও প্রায় একই ধরণের একটি ঘটনা ঘটেছিল। ঐ দিন মিনহাজ জামান নামের এক তরুণ পরিকল্পনামাফিক ঠান্ডা মাথায় নিজের মা, বাবা, ছোট বোন ও নানীকে একে একে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করেন। ঘটনাটি ঘটেছিল টরন্টোর উত্তরে অবস্থিত মার্কহাম শহরে। তবে টেক্সাসের তানভীর ও ফারহানের মত মিনহাজ আত্মহত্যা করেননি।
অনলাইন পত্রিকা vice.com জানায় মিনহাজ মাঝে মধ্যে অনলাইনে তাঁর খেলার সাথীদের বলতেন তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করবেন। তখন সাথীরা মনে করতেন এটি মিনহাজের এক ধরনের ভুতুড়ে তমসাচ্ছন্ন রসিকতা। মিনহাজ তাঁর অনলাইন বন্ধুদের আরো বলতেন তিনি একজন সাবেক মুসলিম। তিনি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে উপহাস বা বিদ্রুপও করতেন। ঘটনার কয়েক মাস আগেও তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার কথা বলেছেন। এমনকি নিজেকেও হত্যা করার কথা তিনি বলেন তাঁর বন্ধুদেরকে। কিন্তু সবাই মিনহাজের এ ধরনের কথাবার্তাকে বাজে রসিকতা হিসাবেই বিবেচনা করে আসছিলেন। কিন্তু সেটি আসলে রসিকতা ছিল না। একদিন সত্যি সত্যি মিনহাজ তাঁর পরিবারের সবাইকে হত্যা করেন।
মিনহাজ তাঁর অনলাইন বন্ধুদের সঙ্গে যে সকল তথ্য শেয়ার করেছেন তা থেকে জানা যায় তিনি টরন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম বছরেই তিনি লেখাপড়া ছেড়ে দেন। তবে বিষয়টি তিনি তাঁর পরিবারের কাউকে জানাননি। দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকে তিনি বিষণ্নতায়ও ভুগতে থাকেন। ঐ সময় তিনি নাস্তিক হয়ে উঠেন এমন তথ্যও তিনি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করেন। আর সেই সময় থেকেই তিনি পরিকল্পনা করতে থাকেন বাবা মা বোন ও নানীকে খুন করার। মিনহাজ লেখাপড়া ছেড়ে দিলেও বাড়ি থেকে নিয়মিত বের হতেন ইউনিভার্সিটির নাম করে। ঘরে বাবা মা’কে বলতেন ক্লাশ খুব দীর্ঘ সময়ের জন্য হয় না। তাই দুপুর নাগাদই তিনি বাড়ি চলে আসেন।
বাড়ি থেকে বের হয়ে মিনহাজ যেতেন মলে। সেখানে ঘুড়ে বেড়াতেন। একটি কমিউনিটি জিমনেশিয়ামেও যেতেন তিনি। কিন্তু চার বছর পর যখন ইউনিভার্সিটি পর্ব শেষ হওয়ার পথে তখন স্বাভাবিকভাবেই সার্টিফিকেটের বিষয়টি সামনে এসে হাজির হয়েছিল। তখন তিনি বাড়িতে জানান যে জুলাই মাসের ২৮ তারিখে তাঁর গ্রাজুয়েশন ডে। এরপরই মিনহাজ ২৮ তারিখের মধ্যেই তাঁর হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে ফেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। কারণ তা না হলে তাঁর এতদিনের প্রতারণা ফাঁস হয়ে যাবে।
মিনহাজ তাঁর অনলাইন বন্ধুদের আরো জানান, তিনি যদি তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেন তবে তাঁরা আর জানতে পারবেন যে তিনি কতটা অপদার্থ বা অকৃতকার্য ছিলেন। তিনি অনলাইন কথাবার্তায় নিজেকে প্রায়ই ‘সাবহিউম্যান’ বা ‘সম্পূর্ণ মানুষ নয়’ এই বলে আখ্যায়িত করতেন। হত্যাকান্ডের পরে মিনহাজ তাঁর অনলাইন বন্ধুদের জানান, আমি নিজেকে খুন না করে পরিবারের সদস্যদের খুন করেছি, কারণ আমি একজন নাস্তিক। আমি বিশ্বাস করি মৃত্যুর পর পরকালের কোন জীবন নেই। সে কারণে আমি মরতে চাই না এবং মৃত্যুকে ভয় পাই। মিনহাজ তাঁর অনলাইন বন্ধুদের আরো জানান, আমি আমার বাবা, মা, বোন এবং নানীকে খুন করেছি, কারণ আমি চাইতাম না আমার মত একজন ব্যক্তির জন্য তাঁরা কখনো লজ্জা বা গ্লানি অনুভব করুক।

ঠিক এই একই কথা বলে গেছেন টেক্সাসের সেই দুই তরুণ। সুইসাইড নোটে তাঁরাও লিখে গেছেন, পরিবারকে লজ্জা ও কষ্ট থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য বাবা, মা, বোন ও নানীকে হত্যা করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, টেক্সাসের ঐ তরুণদ্বয় কি মিনহাজের ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর মনোবিজ্ঞানীরা দিতে পারবেন। তবে বিষণ্নতা বা মানসিক হতাশা যেটাই বলি না কেন, এর প্রভাব যে সময়ে সময়ে কতটা ভায়াবহ হতে পারে তা এ দুটি ঘটনা থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠে।
বিষণ্নতা একজন মানুষের মধ্যে নানান কারণেই দেখা দিতে পারে। চাকরী না পাওয়া, অর্থাভাব, পারিবারিক সমস্যা, দাম্পত্য সমস্যা, প্রেমে ব্যর্থতা, লেখাপড়ায় অত্যধিক চাপ বা ব্যর্থতা, দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক রোগসহ আরো নানান সমস্যা থেকে বিষণ্নতা বা হতাশা সৃষ্টি হতে পারে মানুষের মধ্যে। এমনকি একজনের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে অন্যজনের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করলেও বিষণ্নতা বা হতাশা দেখা দিতে পারে। ক্ষেত্র বিশেষ তার পরিনতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। কয়েক বছর আগে টরন্টোতে এক বাঙ্গালী তরুণ এরকম পরিস্থিতির শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
‘ইয়থ মেন্টাল হেলথ কানাডা’র তথ্য মতে এ দেশে প্রায় বার লক্ষ শিশু ও তরুণ মানসিক রোগে আক্রান্ত। এবং এর মধ্যে উপযুক্ত চিকিৎসা পাবেন মাত্র ২০% এরও কম শিশু বা তরুণ। আর যে সকল তরুণ-তরুণী বা যুবক-যুবতীর বয়স ২৫ হয়ে যাবে তাদের বেলায় অন্তত প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের মানসিক রোগ দেখা দিবে। অন্যদিকে যেসব শিশুকে শৈশব থেকেই মানসিক রোগের চিকিৎসা নিতে হয় এবং তা অব্যাহত থাকে, পরবর্তীতে যৌবনের দ্বারপ্রান্তে এসে প্রায়শই তাঁরা উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা পান না। আর দেখা গেছে তরুণদের মধ্যে যারা মানসিক রোগে ভুগেন তাঁদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগের ক্ষেত্রেই এই রোগ দেখা দেয় শৈশব বা কৈশোর বয়স থেকেই।
আমরা জানি প্রতিবছর ‘৭ এপ্রিল’ দিনটিকে বিশ^ স্বাস্থ্য দিবস হিসাবে পালন করা হয়। এ বছর বিশ^ স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘building a fairer, healthier world। ২০১৮ সালে সর্বশেষ হালনাগাদ করা ‘Our World in Data’ এর তথ্য অনুযায়ী দেখা যায় বর্তমান বিশে^ প্রায় ৯৭০ মিলিয়ন মানুষের মানসিক সমস্যা বা রোগ রয়েছে। এই মানসিক রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী যে লক্ষণ দেখা যায় তা হলো উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা। প্রায় ২৮৪ মিলিয়ন লোকের মধ্যে এই লক্ষণ রয়েছে। অন্যদিকে ডিপ্রেশন বা হতাশায় আক্রান্তদের সংখ্যা প্রায় ২৬৪ মিলিয়ন। আরো কয়েক ধরণের মানসিক রোগ রয়েছে যেগুলোতে মানুষ আক্রান্ত হন। আর মানসিক রোগে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশী ভোগেন। হিসাবে দেখা গেছে বিশে^ মানসিক রোগে আক্রান্তদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ১১.৯%। আর পুরুষের সংখ্যা ৯.৩%।
বিশে^ করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন কর্তৃক ঘোষিত এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘building a fairer, healthier world’ যে কোন বিবেচনায় অত্যন্ত সময়োপযোগী। কারণ দেখা গেছে করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর কানাডা-সহ বিশে^র সব প্রান্তের মানুষের মধ্যেই উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা এবং হতাশা চরম আকার ধারণ করেছে। মানুষের মধ্যে এলকোহল পানের মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে পারিবারিক সহিংসতা। আন্তর্জাতিক সেবা সংস্থা রেড ক্রস এর জরিপ তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, করোনার কারণে বিশে^র বিভিন্ন দেশের অর্ধেক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যাঁরা আগে থেকেই মানসিক রোগ বা সমস্যায় ভুগছিলেন তাঁদের অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। রেড ক্রস বিশে^র ৭টি দেশের জনগণের উপর এই জরিপ চালায়।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন জানায় করোনা মহামারীর কারণে বিশে^র প্রায় ৯৩% দেশেই মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বা বন্ধ রয়েছে। অথচ মহামারির এই সময়টাতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের কাজটি অত্যন্ত জরুরী একটা বিষয়।
উল্লেখ্য যে, গত বছর সেপ্টেম্বরে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর কানাডায় প্রতি দশজনের একজন আত্মহত্যার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন বলে জানা যায়। বিশেজ্ঞরা বলছেন, স্তম্ভিত করার মত এই অভূতপূর্ব চিত্র বলে দিচ্ছে দীর্ঘ সময়ব্যাপী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কভিড-১৯ এর প্রভাব কতটা গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে। এই তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে কানাডিয়ান মেন্টাল হেলথ এ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক পরিচালিত সর্বশেষ জরিপে। জরিপ কার্যটি পরিচালিত হয় গত বছর ১৪ থেকে ২১ সেপ্টেম্বররের মধ্যে।
কানাডিয়ান মেন্টাল হেলথ এ্যাসোসিয়েশন এই একই বিষয়ে একটি জরিপ চালিয়েছিল গত বছর মে মাসেও। দেখা গেছে, সেই সময়ের তুলনায় সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর কানাডিয়ানদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে ব্যাপকভাবে। বিশেষ করে যারা আদিবাসী, lesbian, gay, bisexual, বা transgender (LGBTQ) এবং আগে থেকেই যাদের বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে তাঁরা বেশী মাত্রায় প্রভাবিত হয়েছেন অন্যদের তুলনায়।
আমরা জানি, কোনো মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে সেটির কারণে তাঁর ব্যক্তিজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর পারিবারিক জীবনও। আর এই মানসিক রোগের কারণে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন, বছরের হিসাবে যা প্রায় আট লাখ। এবং এর মধ্যে বেশির ভাগ আত্মহত্যাই ঘটে বিভিন্ন মানসিক রোগের কারণে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব এটি।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের সেই বাঙ্গালী পরিবারে যে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে গেল তার পিছনেও রয়েছে এই মানসিক রোগের প্রভাব। কিন্তু বাড়িতে দু দুটি ছেলে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগে ভুগছিলেন এ খবরটি কি বাবা মা জানতেন না? কিংবা তাঁরা কি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি বিষয়টি? সাধারণত যে কোন মানসিক রোগেরই কিছু না কিছু লক্ষণ থাকে। আর যখন রোগটির মাত্রা বৃদ্ধি পায় তখন লক্ষণগুলোও আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার বিবিসি নিউজকে বলেন, “যখন কোন ব্যক্তির আচরণ, ব্যবহারে বড় ধরণের পরিবর্তন দেখা যায়, বিশেষ করে তাঁর আবেগীয় প্রকাশের পরিবর্তন আসে এবং সেটা তাঁর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে, সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখনি তার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।”
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, প্রবাসে বাঙ্গালী পরিবারে বা এশিয়ান অন্যান্য পরিবারের কেউ বিশেষ করে পুরুষদের কেউ মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে সেটাকে গোপন রাখা হয় বা গুরুত্ব না দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তাদের ভাবনায় পুরুষের মানসিক রোগ চরম লজ্জাজনক একটি বিষয়। অথবা পৌরুষের অবমাননা হিসাবে বিবেচনা করা হয় এই রোগটিকে।
টেক্সাসের ফারহান তৌহিদ ও তানভীর তৌহিদের মানসিক রোগের পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা বলার জন্য আজ আর কেউ বেঁচে নেই। তবে সেটি যে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। অথচ এরকম একটি ভয়াবহ পরিস্থিতিকে মোটেই গুরুত্ব দেয়া হয়নি যার পরিনতিতে গোটা পরিবারটিই ধ্বংস হয়ে গেল। মর্মান্তিক মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হলো সবাইকে একটু সচেতনতার অভাবে। একই ঘটনা ঘটেছিল টরন্টোর মিনহাজের বেলায়ও। দীর্ঘদিন সে মানসিক রোগে ভুগলেও পরিবারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মিনহাজ নিজে চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হয়েছেন এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। আর মিনহাজের বাবা মা কেউই তাঁর মনোরোগের বিষয়টি কেন টের পাননি সেটাও একটা প্রশ্ন। হতে পারে তাঁরা বিষয়টি বুঝতে পারেননি। অথবা বুঝেও গুরুত্ব দেননি।
উল্লেখ্য যে, মিনহাজের আচরণে অসঙ্গতি ছিল এমন কথা তাঁর মায়ের এক বান্ধবী বলেছিলেন প্রবাসী কণ্ঠের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে। কিন্তু এই অসঙ্গতি মায়ের চোখে কেন ধরা পড়লো না? অথবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের চোখে! একটা ছেলে প্রায় চার বছর লেখাপড়া না করেও ছাত্র হিসাবে বাবা মায়ের কাছে ভান করে গেলেন! পরিবারের কেউ কিছুই বুঝতে পারলেন না? মানসিক রোগের লক্ষণগুলোতো একেবারে না বুঝার মতো কিছু নয়। বাইরের লোকের চোখে হয়তো ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের চোখেতো ধরা পড়ার কথা।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বিবিসিকে বলেন মানসিক রোগের লক্ষণ হতে পারে:
-হঠাৎ হঠাৎ করে বেশি উত্তেজিত হয়ে ওঠা
-অনেকদিন ধরে নিজেকে সবার কাছ থেকে সরিয়ে গুটিয়ে রাখা
-অন্যদের অকারণে সন্দেহ করতে শুরু করা
-সামাজিক সম্পর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া
-অতিরিক্ত শুচিবায়ুগ্রস্থ হয়ে ওঠা
-ঘুম অস্বাভাবিক কম বা বাড়তে পারে
-খাবারে অরুচি তৈরি হওয়া বা রুচি বেড়ে যাওয়া
-বাসার, অফিসের বা পেশাগত কাজের প্রতি অনীহা তৈরি হওয়া বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
ডা. মেখলা সরকারের মতে, এই সমস্যাগুলোর মানেই যে তাঁর মানসিক রোগ হয়েছে, তা নয়। তবে এসব উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা গেলে একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত। তাঁরা সেটা বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারবেন যে, এখানে আসলে কোন ব্যবস্থা নেয়া উচিত কিনা।
টরন্টোর মিনহাজ বা টেক্সাসের ফারহান তৌহিদ ও তানভীর তৌহিদের মধ্যে উপরের লক্ষণগুলোর দু-চারটি নিশ্চই প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেউই বিষয়গুলো লক্ষ্য করেননি। বা লক্ষ্য করলেও গুরুত্ব দেননি অথবা বুঝতে পারেননি।
মিনহাজ পরে তাঁর কৃতকর্মের জন্য আদালতে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি বিশেষভাবে ক্ষমা চাচ্ছি যারা আমার পরিবারকে জানতেন এমন লোকদের কাছে। গত বছর ২৬ অক্টোবর ভার্চুয়াল আদালতে সাজার শুনানিকালে অন্টারিওর পিটারবরোর নিকটবর্তী সেন্ট্রাল ইস্ট কারেকশনাল সেন্টার থেকে তিনি এই ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিনহাজ তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করার কথা স্বীকার করেন। তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার ও একটি সেকেন্ড ডিগ্রি মার্ডার এর অভিযোগ আনা হয়। সরকারী আইনজীবী কে. জে. স্টুয়ার্ড বলেন, মিনহাজ কর্তৃক এগুলো ছিল ভয়াবহ, রাক্ষসী ও নির্মম হত্যাকান্ড।
সত্যিকার অর্থে প্রবাসে ইমিগ্রেন্ট পরিবারের কিছু সংখ্যক তরুণ ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে তা একটি দুর্ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিনহাজের ঘটনার পর কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে প্রচন্ড একটি উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। এবার টেক্সাসের ঘটনার পর আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যেও নিশ্চই একই রকম উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, এই গ্রেটার টরন্টো এলাকাতেই গত প্রায় এক দশকে অর্ধ ডজনেরও বেশী বাংলাদেশী তরুণ তরুণী আত্মহত্যা করেছেন মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে। প্রকৃত হিসাবটি কত তা বলা কঠিন। কারণ, এসব ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাগুলো গোপন রাখা হয়। অন্যদিকে কত সংখ্যক বাংলাদেশী তরুণ-তরুণী মানসিক রোগে ভুগছেন তারও কোন সঠিক
হিসাব পাওয়া সম্ভব নয় ঐ একই কারণে। তবে সার্বিকভাবে কানাডায় কিশোর এবং তরুণদের মধ্যে যে মাত্রায় মানসিক রোগ দেখা যায়, প্রবাসী বাংলাদেশী কিশোর ও তরুণরা তার বাইরে নন। হয়তো তাদের সংখ্যা একটু বেশীও হতে পারে।
‘ইয়থ মেন্টাল হেলথ কানাডা’র তথ্য মতে এ দেশে প্রায় বার লক্ষ শিশু ও তরুণ মানসিক রোগে আক্রান্ত। ২০১৬ সালের এক হিসাবে দেখা যায় ঐ সময় অল্প বয়সের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ১৯% শিশু (১০-১৪ বছর), ২৯% কিশোর (১৫-১৯) ও ২৩% যুবকের (২০-২৪) মৃত্যু হয়েছে আত্মহত্যার কারণে। উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো, বিষণ্নতা বা উদ্বেগ সমস্যায় আক্রান্ত এই বয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ৭৫% রোগী বিশেষ মানসিক চিকিৎসা পরিষেবার বাইরে থাকেন।
‘ইয়থ মেন্টাল হেলথ কানাডা’র তথ্য অনুযায়ী আরো দেখা যায়, দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরে এ দেশে শিশু-কিশোরদের (১৫-২৪) মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। আর এক্ষেত্রে শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে কানাডার স্থান তৃতীয় সর্বোচ্চ।
সুতরাং এরকম একটি দেশে ছেলে-মেয়েদের আচার-আচরণের প্রতি সার্বক্ষণিক বিশেষ নজর রাখা যে কতটা জরুরী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ইমিগ্রেন্ট পরিবারের বাবা-মা’রা সংসারের ব্যয় মিটানোর জন্য সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকেন বাইরের কাজে। তারপরও অধিকাংশের জীবন থেকে দারিদ্রতা দূর হয় না। অনেকে এই পরিস্থিতিতে ফুলটাইম কাজের পাশাপাশি আবার পার্টটাইম কাজও করেন। সেই সাথে আছে ঘরের কাজের ব্যস্ততাও। সব মিলিয়ে সন্তানদের প্রতি সময় দেবার ফুরসত মেলাই ভার তাঁদের জন্য।
অথচ এই সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তাঁদের বিদেশ আসা। আর সেই সন্তানই যদি কোন কারণে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয় তখন তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কি হতে পারে?
তাই প্রবাসে প্রতিটি বাবা-মায়েরই উচিত কষ্ট হলেও সন্তানকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া। তাঁদের সমস্যার কথা শুনা। তাঁদের আচার আচরণে কোন পরিবর্তন হচ্ছে কি না তার উপর গভীর নজর রাখা। প্রয়োজনে মনোরোগ চিকিৎসকের স্বরণাপন্ন হওয়াটা জরুরী। মনে রাখতে হবে, মানসিক রোগের চিকিৎসা সময়মত করাতে না পারলে পরে তা কখনো কখনো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
খুরশিদ আলম
সম্পাদক ও প্রকাশক, প্রবাসী কণ্ঠ
