মানুষের পরিচয়
রোজানা নাসরীন
পৃথিবীতে যারা বসবাস করছে তাদের মধ্যে সৃষ্টির বিস্ময়গুলি প্রথম অনুভূত হয় মানুষের কাছে। মানুষ তখন ভেবেছে মানুষের জন্ম ও জীবনচক্রের মধ্যেই রয়ে গেছে বিরাট বিস্ময়। এই বিস্ময়ের কতগুলি বৈশিষ্ট্য ও রহস্য আমাদের সামনেই ঘরাঘুরি করছে। নানা প্রকার বৈচিত্রের মধ্যে প্রধান বিস্ময় মানুষের আকৃতি ও প্রকৃতিগত বৈচিত্র, নারী ও পুরুষ। পৃথিবীর সকল জীবের মধ্যে জোড়া মানেই একজন মেইল আর একজন ফিমেইল, এমন জোড়া না থাকলে কেউই টিকে থাকত না। পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকতে হলে, টিকে থাকতে হলে, এমন জোড়া অসম্ভাবীভাবে প্রয়োজন। একজন না হলে অন্য জনের জন্মই হত না। পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে অন্য জীবের মধ্যকার পার্থক্য তাদের অবয়বে ও মস্তিষ্কের চর্চার। তাই বুদ্ধিমান জাতি হিসেবে আজ পর্যন্ত আমরা জানি মানুষকেই। পুরুষ এবং নারী মিলিতভাবে সৃষ্টি করেছে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং ক্রমাগত মানব ধারা। সমন্বয়, সহযোগিতা সহমর্মিতা যুক্ত হয়ে মানব সভ্যতার সুবিশাল বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু আমারা যখন মানব সভ্যতার ইতিহাস খুঁজতে যাই তখন আমাদের মস্তিষ্কে ও চিন্তায় কাজ করে শুধু পুরুষ কথাটি। যেমন আমাদের পূর্ব পুরুষ, উত্তর পুরুষ কথাটি। ঠিক সেইভাবে আমাদের অধিকৃত বিষয়গুলিও বণ্টন হচ্ছে বংশ পরম্পরায় শুধু পুরুষ থেকে পুরুষের হাতে। সেখানে মানুষ হিসেবে শুধু পুরুষকেই গণ্য করা হয়। আমাদের মস্তিষ্কের ভিতর মানুষ বলতে একটি মাত্র চিত্র উপস্থিত হয়, সে হল পুরুষ। তাই মানুষেরা মনে করে বংশ সৃষ্টি করে পুরুষ, ধারণ করে পুরুষ, তাকে অর্থ দিয়ে, সামাজিকতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে পুরুষ, এবং পুরুষের পরিচয়ে তাই বংশ বিস্তার হয়। আমাদের প্রধান ও প্রথম ধারণা মানবাকৃতি পুরুষের। তাই মহাশূন্যে নক্ষত্রদের মিলিত করে আমরা একটা মানবাকৃতি তৈরি করে নিয়েছি যার নাম দিয়েছি ‘কালপুরুষ।’ কোন ক্ষেত্রে মানুষের কথা আসলেই আমরা ভেবে নেই মানুষ মানে পুরুষ। তাহলে নারী কে? সে কি শুধুই পুতুল বা ক্রীড়ানক এবং নিষ্ক্রিয়? তার কোন ভূমিকা এই মানুষ জন্মে নেই? তারা কি পুরুষের মত এই পৃথিবীর মানুষ নয়? এই প্রশ্নগুচ্ছ যখন মানুষকে বিদ্ধ করেছে যখন থেকে তখনই কেবল নারীকে নিয়ে সংস্কৃতিবান পুরুষের ভাবনার শুরু হয়েছিল, আর তাদের কি করে জীবনের সাথে মিশিয়ে দিতে হয় তা নিয়ে তারা ভাবতে শুরু করেছে। আমাদের সহজ ধারণা পুরুষ কেন এ কথা ভেবেছে? নারী কেন ভাবে নি? আসলে নারী ও পুরুষ সম্মিলিত ভাবে অনেক ভেবেছে, সমাজ বাঁধ সেধেছে এতদিন, কিন্তু মানুষের ভাবনার গতি কেউ থামিয়ে দিতে পারে না বলে ক্রমাগতভাবে এখন এসব নিয়ে ভাবনাটা বেড়ে গেছে। নারীর পাশাপাশি পুরুষও এ নিয়ে ভাবছে। বহু বন্ধুর পথ অতিক্রমের পর এখন নারীও একজন মানুষ সে কথা সকলে স্বীকার করে নিয়েছে মানুষের মহানুভবতার জন্য নয়, বরং পৃথিবীর আদি কাল থেকে মানুষের যাকিছু দৃষ্টিগোচর হয়েছে তাকে নিয়ে ভাবনার সহজাত বোধ থেকে। নারী মানুষের সকল বিষয়ের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। নারীর মানবিক অধিকার বিষয়ক মূল্যবোধ, নারীর মানবিক মূল্য, নারীর সম্পত্তির অধিকার, গার্জিয়ানশিপ, এ জাতীয় বিষয়গুলি যখন পুরুষের মানবিক অধিকারের বিষয়গুলি সাথে মানুষ মিশিয়ে বিবেচনা করেছে, তখন রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বাঙ্গীণ সচেতন দায়িত্ব আনুসারে নারীকেও তারা গ্রহণ করেছে মানুষ হিসাবে। বর্তমান সমাজ-মানস মানুষের অতি সচেতন মানবিক গুনাবলী দ্বারা অনুভব করতে শিখেছে পুরুষ যেমনি মানুষ, নারীও ঠিক তেমনি মানুষ। যদিও শুধু আচরণগত ভাবে কারো কারো মাঝে এখনো রয়ে গিয়েছে সেই আদিমতা। কিন্তু মানুষ যত দিন অতিক্রম করছে সে তার ভুলগুলি বুঝতে পারছে। যদিও এখন মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে- যে যেমন পারছে অন্যকে দমন করার রীতিটা আত্মস্থ করছে। এই দিন আর বেশি সময় টিকে থাকবে না, কারণ অপরাধ করার জন্য যে আর্থিক অভাববোধ প্রয়োজন তা মিটাতে মানুষ সচেষ্ট। একদিন মানুষের মাঝে অভাববোধ থাকবে না, সে জন্য তার অপরাধও কমে যাবে বা শেষ হয়ে যাবে। এটা হচ্ছে মানুষের বদলে যাওয়ার প্রধান লক্ষণ। এতে আশা করা যাচ্ছে আগামীদিনে মানুষ অনেক বেশি মানুষ হয়ে উঠবে।
নারী দিবস প্রতি বছর একবার করে আসে এবং চলে যায়। নারী শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতেই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে কিনা এটা আজ ভাবার বিষয়। পৃথিবীতে কেউ আলাদাভাবে কোন কাজ করার জন্য জন্ম নেয় না। মানুষ জন্মের পর সমাজ তাকে নানা প্রকার শিক্ষা দিয়ে সামাজিক নিয়ম অনুসারে কাজ করিয়ে নেয়। কে কোন কাজ করবে সে বিষয়ে সমাজ-মানসই অগ্রণী ভুমিকা পালন করে, এবং সমাজিক এই নিয়মেই পুরুষ জিতে গিয়েছিল। এবং তারা নিজেদের সুবিধার জন্য প্রথা নামক বৈষম্যের একটা দিক তৈরি করে নিয়েছিল। কারণ তাদের গায়ের বাহ্যিক শক্তি বেশি। তাই তারা কে কোন পরিচয় বহন করবে তাও নির্ধারণ করে দেয়। সে ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা ছিল গৌণ। নারীর প্রথম পরিচয় সে একজন মানুষ, তারপর তার আকৃতি ও প্রকৃতিগত কারণে সে একজন নারী। নারীত্ব যেমন তার পরিচয়ের একটা দিক, ঠিক তেমনি যে সে মানুষ সেটা তার পরিচয়ের অন্য একটি দিক। এই দুই পরিচয় তার সমান্তরাল, কোনটির চেয়ে কোনটি বড় বা ছোট নয়। পুরুষের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনি। এই দুটি দিক এক সঙ্গে বিবেচনা করার প্রসঙ্গে নারী তার সামাজিক, মানবিক, রাষ্ট্রীয় অধিকার ও লিঙ্গের সমতা বিধানের লক্ষ্যে আজকে এসে চেষ্টা করে যাচ্ছে। নারী এবং পুরুষের ভেতরে মানসিক যে দ্বন্দ্ব তা ঘুচানোর প্রচেষ্টা আজ উৎসাহের সাথে চলছে। অনেক মানুষ মনে করে পুরুষ হিসেবে নারীর বেঁচে থাকার উদগ্র বাসনা থেকে সৃষ্টি হয়েছে এই দ্বন্দ্ব। তা কিন্তু নয়। নারী কেন পুরুষ হিসেবে বাঁচতে চায়? এ প্রশ্নটি করা আজ অপরিহার্য। সমাজের পচনকে থামাতে হলে আগে খুঁজে নিতে হয় পচনের কারণটা। ঠিক তেমনি নারীদের জন্ম হয়েছে পুরুষ রচিত সামাজিক নিয়ম গুলির মধ্যে, যেখানে নারী কেবলই লিঙ্গ দোষে অত্যাচারিত। তাই সে পুরুষের স্বাধীনতার মতন চাইবে স্বাধীনতা উপভোগ করতে, এটাই মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার জন্য স্বাভাবিক নিয়ম। বর্তমান বিশ্বে নারীকে নিয়ে যে তুমুল তর্ক বিতর্ক চলছে, তার নেপথ্যের কারণ নারীর মনুষ্যত্বের উপলব্ধি। সভ্যতার গোরা থেকেই নারী এবং পুরুষ মিলিতভাবে মানুষ সৃষ্টির ধারা বহন করে চলেছে। নারী সৃষ্টি করেছে জীবন ধারনের পদ্ধতি মানে জীবনের অন্তরঅঙ্গ, আর পুরুষ সৃষ্টি করেছে মানব সভ্যতার বহিরাঙ্গ। নজরুল ইসলাম যেমন বলেছেন-
“নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে”
নারী ও পুরুষ বেঁচে থাকার জন্য ভাগ করে নিয়ছিল জীবন চলার বিষয়গুলি, কিন্তু পরিশেষে সেটাই কাল হয়ে দেখা দিল। নারীর ভাগে যখন পড়ল গৃহকর্ম, সন্তান প্রতিপালন, খাদ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব এবং পুরুষ গ্রহণ করল খাদ্য সংগ্রহ, সামাজিক সমন্বয়, অর্থ যোগান এ জাতীয় কাজগুলি। পুরুষ তাদের কাজগুলি অনেকটা সহজ করে নিয়েছে। কিন্তু নারীর কাজগুলি ক্লান্তিকর রয়ে গেল, সেখানে কোন সংস্কার করা হয় নি। সেই যুগে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে যে দুঃসহনীয় বাঁধাগুলো ছিল তা মানুষ অতিক্রম করেছে। তারপর অনেক সময় বয়ে গেছে। নারী ক্রমাগত গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে এবং পুরুষের গায়ের বাহ্যিক শক্তি নারীর তুলনায় বেশি থাকার কারণে তারা হয়ে গেছে স্বাধীন মানুষ, আর নারী হয়ে উঠেছে পরভৃত জাতিতে। এভাবে তৈরি হল শাসক শোষিত শ্রেণী। এমন করে সভ্যতার সুচনা লগ্ন থেকে দুই ধরণের মানুষের দুটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তারপর ক্রমান্বয়ে দুজনার মধ্যে তৈরি হয়েছে বৈষম্য, শাসন-শোষণ এবং গায়ের শক্তি অনুসারে একের উপরে অন্য জনের প্রভুত্ব ও প্রবঞ্চনা। এক পর্যায়ে এসে পুরুষ হয়ে গেল প্রভু শ্রেণী এবং নারী হয়ে গেল ভৃত্য শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। শুরু হল প্রভু-ভৃত্যের দ্বন্দ্ব। পুরুষ সৃষ্টি করল সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মানদণ্ড, যেখানে জীবনের সবটুকু অধিকার পুরুষের, এবং জীবনের সবটুকু প্রবঞ্ছনা নারীর ভাগ্যের সাথে মিশে গেল। সমাজকে সংঘবদ্ধ করতে গিয়ে একটি সুশৃঙ্খলিত বিষয়ের প্রয়োজন হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু মানুষকে শোষণের দায়িত্ব কাউকে দেয়া হয় নি। পুরুষেরা সামাজিকভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, এবং দলবদ্ধভাবে সেই নিয়মগুলির যথেচ্ছা গ্রহণ বর্জন করেছে। যেখানে নারীর উপস্থিতি ছিল ক্ষীণ, তার কারণ ছিল নারীর সময়ের অভাব। নারী ব্যস্ত থেকেছে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার, জীবনকে সুখী করার বিষয়গুলি নিয়ে। পুরুষের কঠিন কাজ একবার করলে কিছু সময় বিরতি পাওয়া যেত বিধায় তাদের হাতে ছিল অফুরন্ত সময়। হয়ত তাই এমনটি হয়ে গেছে। নারী পরিবার গঠন করার লক্ষ্যে অসম্ভব কাজ করেছে, কিন্তু নারীর ভাগ্যে জুটেছে প্রবঞ্ছনার শর্ত এবং পুরুষের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার। এই সমস্যার কারণেই সকল নীতিমালার মধ্যে রয়েছে পুরুষের প্রাধান্য ও প্রভুত্ব করার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত।
পুরুষ সবক্ষেত্রে নারীকে তার আদেশ-নিষেধ পালন করতে নির্দেশ দিয়েছে, যার কারণে পুরুষ হয়ে গেল চিরস্থায়িভাবে নারীর প্রভু শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত, তাই স্বামী শব্দটি তাদের অনেক প্রিয়। পুরুষ যখন সমাজে কোন অপরাধ করেছে তখন তা হয়ে উঠেছে সহনীয়, কারণটি ছিল তার গায়ের শক্তি। নারী যখন অপরাধ করেছে তখন তা হয়ে উঠেছে অসম্ভব ব্যাপার। এভাবে বড় বড় অপরাধ একমাত্র পুরুষের হয়ে গেছে, আর নারী অপরাধ থেকে পিছিয়ে গেছে। যদিও সমাজে নারী পুরুষ উভয়ই অপরাধ করছে, তবে পুরুষ করছে বেশি এবং নারী করছে কম। এটা নারীর মহানুভবতার কারণে নয়, তার গায়ের শক্তি কম থাকার কারণে। পুরুষ গায়ের শক্তি প্রয়োগ করে হত্যা করেছে, ধর্ষণ করেছে, ধ্বংস করেছে, কিন্তু তারাই প্রথম লিঙ্গ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নারী জীবনকে পরিচর্যা করেছে, তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সর্বোপরি জন্ম দিয়েছে এবং ভালোবাসা দিয়ে তাকে মানুষ করে তুলেছে, কিন্তু সে হয়ে গেছে দ্বিতীয় লিঙ্গ। একসময় প্রথম লিঙ্গ দ্বিতীয় লিঙ্গের প্রতি নির্দয় আচরণ শুরু করে এবং ক্রমাগত তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সমাজের আচরণগত কারণে পুরুষ-শিশুটি স্বাধীনভাবে বড় হতে থাকে আর নারীশিশু পরাধীনভাবে বেড়ে ওঠে। যেহেতু সমাজ ভাঙ্গা-গড়ার দায়িত্ব পুরুষের উপর বর্তায়, তাই এই নিয়ম শুধু নিয়মই রয়ে গিয়েছে, তাকে পিছে ফেলে আসতে মানুষের বড় বাঁধে, তাই সমাজের গতি এতটা শ্লথ। যদিও অনেক পুরুষ এখন তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এখনো মানব সমাজে বসবাসরত অসংখ্য পুরুষ পুরানো বিশ্বাসকে তাদের একমাত্র বিশ্বাস হিসাবে মানছে, তাই অরাজকতা সমাজে অজও পুরানো দিনের মতনই লালিত হচ্ছে।
আমরা যুগে যুগে অনেক মহামানবের মূর্তি দেখেছি মহামানবীর নয়। মহামানব মানে তারা সকলেই ছিল পুরুষ। সেই সব মহামানবরা সকল সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে পুরুষের পক্ষে। যদি প্রশ্ন করা হয় কেন সেখানে নারী ছিল অনুপস্থিত? এই প্রশ্নটির যথাযথ উত্তর হল, ধর্মীয় চেতনার সূচনায় মানুষ দেখেছে পুরুষই সকল ক্ষমতার অধিকারী। সাধারণ মানুষ ভেবে নিয়েছে মানুষই হল পুরুষ, এবং সেই মত মহামাবনও পুরুষ। নারীরা সেকালে মহামানবী হতে পারত না, যদি কেউ জ্ঞানে গরিমায় পুরুষকে ছাড়িয়ে যেত, তাকে সমাজের পুরুষ শ্রেণী মিলে শাস্তি প্রদান করত। যেমন খ্রীষ্ট ধর্মাবালম্বীরা উইচ হান্টিং করে তাদের পুড়িয়ে মেরে ফেলত। যার কারণে তখন নারী বোকা থাকার ভান করেছে। তাদের মস্তিষ্কের চর্চা থেকে দূরে থেকেছে ও তারা পুরুষের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। এমন করে সকল ধর্ম অনুসারীরা সকল বিষয়ে এরূপ কাণ্ড ঘটাত। যদিও হেরফের ছিল কেবল তাদের বিধানের, কিন্তু নারীদেরকে শোষণের ক্ষেত্রে সকল ধর্ম একই ভূমিকা পালন করেছে। নারীদের বাহ্যিক গায়ের শক্তি পুরুষের তুলনায় কম ছিল বলে তারা নারীকে সকল বিষয় থেকে বাদ দিয়ে নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা করেছে এবং নারী রয়ে গেছে সকল প্রতিযোগিতার বাইরে। গায়ের শক্তিই হয়ে গেছে সকল জ্ঞানের আকর। পুরুষের বাহ্যিক গায়ের শক্তিতেই সে সর্বৈব ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গেছে, এবং পুরুষ তার তুমুল প্রচার করেই কেউ কেউ মহামানব হয়ে গেছে। আমরা একটা কথা জানি প্রচারেই প্রসার। নারীর মধ্যে যদি মহামানবী হওয়ার গুণাবলী কেউ দেখতে পেত, তাহলে মানুষ মনে করত এই গুণাবলী নারীর মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়, না হলে সে কোন নারীই নয়। অর্থাৎ ভাল গুণ শুধু নারীর জন্য রক্ষিত থাকতে হবে। নারীর গায়ে পুরুষের তুলনায় বাহ্যিক শক্তি কম বিধায় নারীকে জগতে টিকে থাকতে হলে তাকে নৈতিকতা বহন করতে হবে, এবং পুরুষ সকল নৈতিক চরিত্র গায়ের জোরে এড়িয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বেশিরভাগ নারী কোন চ্যালেঞ্জ মূলক কাজ গ্রহণ করে নি, যেমন সমরাঙ্গনে যাওয়ার কাজটি, মানে যুদ্ধ করার কাজটি। সেজন্যে নারীকে কোন দেশ জয়ের বিধাতা হতে মোটা দাগে কেউ দেখেনি। মানুষ পরবর্তীতে বুঝে নিয়েছে নারী কোন চ্যালেঞ্জে মূলক কাজ করতে পারে না, কিন্তু তার মহামানবের গুণাবলী থাকা অবশ্য কর্তব্য, কিন্তু সে কোনদিনই মাহামানবী হিসেবে সমাজে পরিচিত হবে না। তাই তার প্রচার প্রসার কোনটিই ঘটে নি। ঘটেছে যা তা হল সে পুরুষের তুলনায় অনেক নিম্নে অবস্থান করে আসছে। তাকে মহামানবী হিসেবে মেনে নিলে সেখানে পুরুষের সম্মান খর্ব হয়। তাই ছিটেফোটা দুএকজন ছাড়া কোন মহা মানবীর প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাই না। পুরুষ মাহামানব হিসাবে সামাজিক তুমুল প্রচার ও গ্রহণযোগ্যতা সকল যুগকে অতিক্রম করেছে। তাই পুরুষ জ্ঞানবিজ্ঞানে এগিয়ে গেছে আর নারী অনেক অনেক পিছিয়ে গেছে, আর নারী শুধু তাদেরকে পেছনে থেকে শক্তি যুগিয়েছে। পুরুষ সকল ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার মূল কারণ ছিল লিঙ্গের বৈষম্য। যখন মানুষের বোধগুলো বিকশিত হচ্ছিল তখনকার বাস্তবতা ছিল অনেক প্রাকৃতিক, যেখানে বাহ্যিক গায়ে জোরকেই অনেক বেশি বিবেচনা করা হত। যেমন পুরুষ ইচ্ছা করলে একটি নারীকে সহজে ধর্ষণ করতে পারত, সে ছিল গায়ের বাহ্যিক শক্তির কারণে নারীর চেয়ে ক্ষমতাবান। পুরুষের গায়ের বাহ্যিক শক্তিই পুরুষকে বানিয়ে দিয়েছে সকল শক্তির আধার। এবং তার গায়ের এই বাহ্যিক জোরই হয়ে উঠেছে সকল ক্ষমতার উৎস। ক্ষমতার এই উৎস থেকেই ক্রমান্বয়ে পুরুষের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সে মানুষ খুন করতে পারে, শরীরের শক্তি দিয়ে নারীকে সহজেই পরাভূত করতে পারে। সকল শাস্তিযোগ্য অপরাধ অবলীলায় করতে পারে, অপেক্ষাকৃত দুর্বল শ্রেণীকে শাসন শোষণ করতে পারে, যার কারণে সে অনেক ক্ষমতাবান হয়েছে। এর মধ্যে যে পুরুষ অন্যকে ভালোবেসেছে ও অনেকটা ন্যায় সঙ্গত কাজ করেছে, সে হয়েছে মহানুভব। এ জাতীয় মানসিকতা থেকে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সে কারো কাছে তার কোন কাজের জন্য জবাবদিহিতা করতে হয়নি, তাই সে নারীর কাছে তার গায়ের শক্তি প্রদর্শন করেছে অনেক বেশি। নারী যখন তার অনৈতিক কাজের জন্য তার দিকে আঙ্গুল তুলেছে তখন সে সমাজে নিজের অবক্ষয়ের একটি চেহারা দেখেছে। যেমন পুরুষের যে কাজটি মাফ হয়েছে নারীর সেই কাজটিই হয়ে গেছে অনেক অনেক বেশি অপরাধের। যে পুরুষের অপরাধ করার ক্ষমতা যত বেশি তাকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। এভাবেই পুরুষ সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছে এবং নারী ক্রমাগত শোষণের ফলে হয়ে গেছে পুরুষের অনুগামী সত্ত্বা। আজো সাধারণ নারীর হাতে থাকে না তাকে নিজেকে পরিচালনা করারও কোন অর্থনৈতিক উপকরণ। যার কারণে সমাজের বৈষম্য একটি চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করেছে, যাকে ভাঙতে প্রস্তুত হয়ে গেছে আজকের সমাজ।
বৈষম্য সৃষ্টি করা মানুষের জন্মগত দোষের মধ্যে একটি। সে যখন আদিম পরিবেশে ছিল তখন এই বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তখন মানুষের কোন বোধের শক্তি ছিল না। ধীরে ধীরে মানুষের বোধগুলো বিকশিত হতে থেকেছে। তখন বাস্তবতা ছিল অনেক প্রাকৃতিক, যেখানে গায়ে জোরকেই অনেক বেশি বিবেচনা করা হত। নারী সন্তানকে নিজের শরীরের মধ্যে বেড়ে উঠতে সহায়তা করেছে, পূর্ণাঙ্গ মানুষ করে তুলতে সে নিজেকে সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে। সেক্ষেত্রে যদি বলা হয় নারীই মানুষের জীবন প্রবাহের কর্ণধার, পুরুষ সে কথা গ্রাহ্যও করবে না। নারী শুধু পুরুষ কর্তৃক বংশ বৃদ্ধির জন্য শুধু ব্যাবহৃত হয়েছে, এবং সমাজ পুরুষকে দিয়েছে বংশ রক্ষার দায়িত্ব। যে নারী কেবল পুরুষ সন্তান জন্ম দিত সেই নারীকে শ্রেষ্ঠ নারী বলা হত। এ দ্বারা প্রমাণিত হয় একমাত্র পুরুষকেই মানুষ বলে স্বীকার করত তখনকার মানুষ, নারীকে মানুষ বলে স্বীকার করত না। মানব জন্মে নারী পুরুষের দুজনার সমান দায়িত্ব রয়েছে, কিন্তু সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে একমাত্র নারীকে তারা তাদের হাতিয়ার বানিয়ে দিয়েছে, এবং তারা সকল দায় থেকে মুক্ত থাকার অভিসন্ধি গ্রহণ করেছে। কোন নারী যদি কেবল নারী শিশু জন্ম দিত তাহলে সে চরম অবহেলার স্বীকার হয়ে যেত সমাজে। কিন্তু বিজ্ঞান মানুষকে জানিয়ে দিয়েছে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের দায় প্রথম পুরুষের তারপর নারীর। সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র নারীকেই ধরা হত জন্মদানের প্রধান চরিত্র, এখানেও রয়েছে আর একটি অবিচার। এমনভাবে সমাজের আনাচে কানাচে শত শত অবিচার রয়ে গেছে, সেগুলোকে আমাদের সংশোধন করা অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে। সমাজকে এই অবিচারের প্রভাব মুক্ত করতে একমাত্র মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। মানুষকে অবহেলা করে মানুষ কিছুই অর্জন করতে পারে না, তাই সমাজে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবারই সমান অধিকার প্রাপ্য। মানুষ যা সহজে চোখে দেখে তাই তার বিশ্বাসের ভিত্তি। মানুষের চোখের অগোচরেও অনেক বিষয় রয়ে গেছে, তা আজ মানুষ বুদ্ধিমত্তার সাথে বিজ্ঞান চর্চা করে কেউ কেউ বুঝে নিয়েছে, কেউ আবার বুঝতে পারছে না। যেদিন সকলের ক্ষুধা দূর হয়ে সকলে এসব নিয়ে ভাবতে বসবে, সেদিন হয়ত এইসব সমস্যাগুলোর সমাধান হবে। তা যত দ্রুত ঘটবে তা মানুষের জন্য কল্যাণ বহন করে আনবে। একদিন মানুষের মধ্যে কোন লিঙ্গ বিভেদ থাকবে না, সেদিন মানুষ সর্বাধিক সুখী হয়ে আত্মপ্রকাশ করবে। দিন বদলের সংকেত ধীরে হলেও তা সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে মানুষের অন্তরের মধ্যে। যে ধ্বনি অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে আমদের মাঝে, সে হয়ত এই নতুনের বার্তা বহন করে আনবে।
রোজানা নাসরীন
টরন্টো
