এক মায়ের আত্মকথা


রাশিদা আউয়াল
(প্রথম পর্ব)
আদি যুগ থেকে আজ অবধি মা বাবার সাথে সন্তানদের বিনে সুঁতায় বাঁধা নাড়ির যে সম্পর্ক, সেটা এখন আর আগের মত নেই। কালের বিবর্তনে সে সম্পর্ক আজ হিসাব-নিকাশ এর পালা বদলে ছিন্ন হতে চলেছে।
আধুনিক যুগে আমাদের সন্তান ও আমরা কেমন আছি?
বর্তমান এই যান্ত্রিক যুগে সব সম্পর্ক গুলোতে যেন, দেনা-পাওনার দায়ে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
আজ কাল প্রায় প্রতিটি ঘরেই দেখা যায়,মা বাবা ও সন্তানদের মাঝে ভালবাসাহীন কেমন একটা মেকি সম্পর্ক।
বাবা মা যত শিক্ষিত জ্ঞানী-ই হোক না কেন, ছেলে মেয়েদের কিছু বলা যায় না, যেমন কোনো ব্যাপারে আদেশ, উপদেশ, কিম্বা কোনো বাধা নিষেধ ওরা শুনতেই চায় না। উল্টো কেমন যেন, বিরক্ত অনিহা প্রকাশ করে। আমাদের বয়সের অভিজ্ঞতাও যেন, ওদের কোনো কাজে আসে না। অথচ এই জন্য এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের কত দুর্ভোগ কত অশান্তি হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছে না।

আজ কাল মা কিছু বলতে গেলে ই ছেলে বলে,
“মা তুমি তো দেখছি বাংলা মুভির ডায়ালগ দিচ্ছ।
আমাকে ইমোশন্যাল-ই ব্লেক মেইল করছ!”

আর মেয়ে বলে,“আহ! আম্মু তুমি কিছু বুঝনা।
এটা হলো এখনকার ট্র্যাডিশন।”

আমাদের মনে করতে হবে এবং বুঝতে হবে যে, আমরা যখন সন্তান ধারন করি তখন থেকে ওরা মাতৃ জঠোর থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়েই যাবে…!! দু:খজনক হলেও এটা সত্যি।
একটু মাথা খাঁটিয়ে ভেবে দেখুন তো!!
গর্ভে থাকতে মায়ের নাড়ি দিয়ে খায়, জন্ম হলে বুকের দুধ থেকে শুরু করে…!!!
তারপর বাবার পালা, নামি দামি স্কুলে পড়ানো, দামি ঘড়ি পোশাক। এরপর পকেট খরচ, বন্ধু বান্ধবীর জন্য পার্টি খরচ।
ছেলে মেয়ের বিয়ের খরচ মেয়ের শ^শুর বাড়ি আসতে যেতে খরচ, মেয়ের শ^শুর বাড়ির দাবী পূরণ।
মেয়ে, জামাইর আবদার, পরে নাতি-নাতীনদেরও আবদার…।
১)ছেলে বড় হলে চাকুরির জন্য ঘুষের টাকার ব্যবস্থা করা।
২)বাবার প্রোভিডেন্ট ফান্ডের টাকা, মায়ের গয়না সব শেষ করে ব্যবসা করে বিত্তবান হয়ে বাবা মাকে দূরে রাখা।
ছেলের আবদার বা ইচ্ছে পূরণে ঘর-বাড়ি বিক্রি করে বিদেশে লেখা পড়া করানো।
সাধ্যের বাইরে খরচ করে ছেলেকে বিয়ে করানো।
নাহলে সমাজে মাথা নিচু হয়ে যাবে। প্রয়োজনে শ^শুর বাড়িতে ছেলেকে তুলে দেয়া। শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধাআশ্রমে নিজেদের জায়গা করে নেয়া।
আর মেয়ে? মেয়ে তো ঘরের লক্ষী। আসলে কি তাই?
নাহ! আসলে মেয়ে হলো বাবা মায়ের সব চেয়ে বড় দূর্বলতা। ছোট থেকে মেয়ের সকল শখ-আহ্লাদ আবদার পূরণ করতে বাবা মা আপ্রাণ চেষ্টা করেন। সেই মেয়ে ই একদিন বড় হয়ে বিলাসিতার নামে টাকা উড়ায়।
ক্ষণিকের ভালবাসায় বাবা মাকে কষ্ট দিয়ে কখনো কারো হাত ধরে চলে যায়। নয়তো গলায় ফাঁস দিয়ে বাবা মাকে জিন্দা দাফনায়।
এইতো গেলো এক যুগের কথা! তখনকার ছেলে মেয়েদের শিক্ষা বৈবাহিক সামাজিক ব্যবস্থা ছিল এক রকম। আসুন একটু ঘুরে দেখি, কেমন বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থাপনা?
ছেলে মেয়েরা এখন বিয়ের বয়স হলে কি বলে ? কি করে?
ছেলে মেয়েদের পাশ করা শেষ হলেই বাবা মা বিয়ের ফরজ কাজটি সেরে ফেলতে চান, সে জন্য বাবা মা তাদের বিয়ের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, অস্থির হয়ে থাকেন। কিন্তু ছেলে মেয়েরা এ ব্যাপারে মোটেই গুরুত্ব দেয় না, এমন কি কর্ণপাত ও করে না। ফলে বাবা মায়ের ভোগান্তি বা আক্ষেপ এর শেষ নেই। কিন্তু ছেলে মেয়েরা? নিজের চিন্তা ধারা মতে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে,ভাবছে না তাদের আগামীর দিন গুলো।
বিয়ের কথা বল্লেই ছেলে বলে,“আগে ভাল একটা চাকুরী পেয়ে নিজের পায়ে দাড়িয়ে নেই”।
তারপর চাহিদার শেষ নেই। বউ সুন্দরী শিক্ষিত নামি দামি শ^শুর বাড়ি হতে হবে। এই করে করে ছেলের বয়স পঁয়ত্রিশ পার। তারপর শুরু হয় মা বাবা অস্থিরতা, কান্নাকাটি। “আহ! মা থামো তো। আমার এখন মার্কেটে অনেক চাহিদা”। তুমি বোঝনা, আমার এখন বাড়ি গাড়ি সব আছে, মেয়েরা তো আমার জন্য পাগল। এই করে বয়স হয়ে যায় চল্লিশের ঘরে,তখন মাথায় টাক, মস্ত বড় ভুড়ি,তখন হায় হায় করে।
আর মেয়ে? “আহ! মা দেখছ না, আমার সাথে ম্যাচ হচ্ছে না? আমাদের একটা স্টাট্যাস আছে না? চিন্তা করো না,সময় হলেই তোমাদের জানাবো।”
মেয়েদের চাহিদারতো আরও শেষ নেই।
দেখতে সু-পুরুষ হতে হবে, হালাল রোজগারে হতে হবে,সরকারি,বে-সরকারি ভাল চাকুরী থাকতে হবে। বাবা মায়ের সাথে থাকতে পারবে না,ভাই বোন কতজন? কোনো গ্রামের, কোন বংশের? আর একটু দেখি, আর একটু দেখি!
এমন করে করে বয়স হয়ে যাচ্ছে সে খবর থাকে না।
বয়স যখন পয়ঁত্রিশ হয়ে যায়,তখন আর ভাল পাত্র কোথায় পায়? তখন করে শুধু হায় হায়।
সৃষ্টিকর্তা বা বিধাতা আমাদের সৃষ্টি করেছেন এমন ভাবে, মানব সন্তান মানেই বয়স এবং সময়ের সাথে সাথে শারীরিক চাহিদা আসবে এটাই স্বাভাবিক। ছেলে মেয়ে কেউ এই চাহিদা এড়াতে পারবে না।
তাই সময়মত বিয়ে না হলে তারা বিভিন্ন আজে বাজে পথ অবলম্বন করে ফলে,সমাজে প্রতিনিয়ত হচ্ছে পাপ অন্যায় অনাচার।
এর চেয়ে ঢের ভাল আছে স্বল্প আয়ের ও কম শিক্ষার লোকেরা। ওদের নেই কোনো হিসাব-নিকাশ, নেই সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। শিক্ষা অ-শিক্ষার ধার ধারে না। রুজি রোজগারের চিন্তাও করে না। ছেলে মেয়ে বড় হলে টাকা পয়সা থাক আর না থাক, সময় সুযোগ বুঝে বিয়ে দিয়ে দেয় বা ওরা নিজেরা বিয়ে করে ফেলে। বিয়ের কিছু দিন পরই শুরু হয় সংসারে টানা-পোড়েন। যৌতুকের চাহিদা,তালাকের বিড়ম্বনা। তবুও তারা তাদের নিজেদের মত চলে,অভাব-অনটনের মাঝেও দু:খ কষ্টে,হাসি আনন্দে কেঁটে যায় ওদের জীবন।
আর মধ্যবিত্তর মানুষেরা আছে মহা ফাঁপরে!! এরা কাউকে না পারে কিছু বলতে, না পারে সাধ্যের মধ্যে চলতে। এদের আবার মান-সন্মান জ্ঞান সব চেয়ে টনটনে, যাকে বলে ‘ইগো প্রবলেম’।
সীমিত আয়ের মধ্যে চলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তবু তাঁরা সমাজ ও লোক লজ্জার ভয়ে নিরুপায়। হয়তো অসুস্থ স্বামী, বেকার ছেলে, বিবাহ যোগ্য মেয়েকে নিয়ে অস্থির চিত্তে,অশ্রু নয়নে বিধাতাকে ডেকে যায়।
এদের ছেলে মেয়ের বিয়ের কথা আর কি বলবো!
এই ধরনের মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাল রেজাল্ট বা যোগ্যতা সমপন্ন ছেলেকে হয়তো কোনো ধনির দুলালির জন্য বাছাই করে, চাকুরী, ফ্লাট, সব কিছু দিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে দেন ঠিকই।
কিন্তু তার বাবা মা? মা বাবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে,তাদের বুক খালি করে,তাঁদের একমাত্র উপার্জনশীল ছেলেকে নিয়ে উচ্চবিত্ত ঝাঁকজমকপূর্ণ মহলে এনে বন্দী করেন, মেকি সম্পর্কের বন্ধনে।
অসহায় বাবা মা তখন সন্তানের ভবিৎষত সুখ স্বপ্নে সব কিছু হাসি মুখে মেনে নেয়।
আর মেয়ে? হ্যাঁ! মেয়ের হয়তো বিয়ে হবে, না জানা কোনো ধনির দুলাল নেশাখোর যুবকের সাথে। যার হয়তো চরিত্র বলতে কিছু নেই। নয়তো স্বামী হিসাবে স্ত্রীর সাথে থাকার তার কোনো যোগ্যতা নেই।
কিন্তু অসহায় বাবা মা বলবেন,“থাক মেয়েটা আমার থাকবে, দুধে ভাতে – সুখে”! তাই কি হয়? কখনো নয়। মারধর, জ্বালা যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে, এক সময় হয়তো যে কোনো ভাবে আত্মহত্যার পথ বেছে নিবে।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এই সমাজের কাছে জিম্মি হয়ে বেঁচে আছে, তাই শত দু:খ কষ্টে, যতো সমস্যাই হোক না কেন, তবু মুখ খুলে না কারো কাছে।
এমনি ভাবে বৃদ্ধ বয়সে বাবা মা তাঁদের সুখ শান্তি বির্সজন দিয়ে, জীবন কাঁটিয়ে দেয়, সুশীল সমাজের পর্দার আড়ালে।
ধনি গরীব যেমনই হোক না কেন, মোটামুটি সবার ঠিকানা একটাই হয় – বৃদ্ধাশ্রম, নয় অবহেলিত নির্বাসিত জীবন যাপন”!!
এখনকার ছেলে মেয়েদের কাছে কখনো কি জাগে না, তাদের আগামী জীবনের বৃদ্ধ বয়সের প্রতিচ্ছবি ??
দু:খজনক হলেও সত্যি, বদলেছে কিছু মানুষ,বদলেছে কিছু মানুষের মন, তাদের চিন্তা ধারা। কিন্তু বদলায়নি এ সমাজ, সমাজের নিয়ম, মন-মানসিকতা।
চাই সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে ধনি গরীব ভেদাভেদ থাকবেনা। থাকবে না বাবা মা সন্তানের মাঝে ব্যবধানের প্রাচীর। সবাই একত্রে মিলে মিশে ভালবাসার পরিপূর্ণতায় সব কিছু ভাগাভাগি করবে।
এমন একদিন আসবে, নতুন দিগন্তে রবির কিরণে সবে ভাসবে। হয়তো আমি আপনি থাকবো না। আগামীর প্রজন্ম বদলে দিবে এ সমাজ ব্যবস্থা, বদলে দিবে এই অ-নিয়ম বিধি নিষেধ।
এ ভাবেই চলছে, চলবে…!! জানি না এর সমাধান কোথায় কি ভাবে কবে হবে??

রাশিদা আউয়াল
ব্র্যাম্পটন, ৯/৩/২০২১