সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে স্বাধীনতার কথা
প্রফেসর ড. কবির হোসেন তালুকদার
ভূমিকা : ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন রক্ত গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে রঞ্জিত করেছিল পলাশীর সবুজ আম্্রকানন ও ভাগীরথী নদীর পানি। এদিন মীরজাফর আলী খান, জগৎ শেঠ, রাজা রাজবল্লভসহ আরো কিছু বিশ^াসঘাতক ইংরেজ বেনিয়াদের সাথে হাত মিলিয়ে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলার স্বাধীনতাকে হরণ করে নেয়। বাংলার শেষ স্বাধীন সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। বাঙ্গালী জাতি ইংরেজদের হাতে দু’ইশত বছরের শৃংখলে আবদ্ধ হয়।
হারানো স্বাধীনতা উদ্ধার করার জন্য মঙ্গঁল পান্ডে, ক্ষুদিরাম, অবিরাম, টিপু সুলতান, তিতুমীর, সূর্যসেনসহ আরো অনেক নাম না জানা স্বাধীনতাকামী মানুষ অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেন দেশমাতৃকার জন্য। বাঙ্গালী জাতিকে পাড়ি দিতে হয়েছে দুইশত বছরের পরাধীনতার গ্লানিকে বুকে নিয়ে।
অগাস্ট, ১৯৪৭ সাল। ভারতবর্ষ দ্বিখন্ডিত হয়। রক্তস্নানের মধ্য দিয়ে জন্ম নিল দুটি রাষ্ট্র। ভারত ও পাকিস্তান। ধর্মভিত্তিক দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান নামের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হল। সেই তত্ত্বের ছিল না কোন ভিত্তি। বিষয়টি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের বুঝতে বেশী সময় লাগেনি। তথাকথিত পাকিস্তান নামের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হল বটে কিন্তু মুক্তি পেল না বাঙ্গালী জাতি।
বাঙ্গালী জাতির উপর নেমে আসলো অন্যায় অবিচার, অত্যাচার, নিপীড়ন ও শোষণ। তার থেকে বাঙ্গালীর হৃদয় ও মনে জন্ম নিল অসন্তোষ, প্রতিবাদ ও আন্দোলন, প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের স্পৃহা ও আকাঙ্খা। পাকিস্তানী শাসকরা বাঙ্গালীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধবংস করার জন্য প্রথমেই আঘাত করলো আমাদের ভাষার উপর।
২১শে মার্চ, ১৯৪৮ সাল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের বয়স সবেমাত্র সাত মাস। সদ্য স্বাধীনতার উদ্দীপনা তখন তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে কম নয়। সে সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভেবেছিলেন যে, বর্তমান উদ্দীপনার জোয়ারের মাঝেই তার ভাষাগত চক্রান্তকে তিনি সফল করে নিতে পারবেন।
জিন্নাহ বললেনÑ উর্দু – উর্দুই হবে শুধু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা। জিন্নাহর ঘোষণার পর পরই সেখানকার উপস্থিত ছাত্র সমাজ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়লো। সেদিন ছাত্র সমাজ জিন্নাহর মুখের উপর তারা শুনিয়ে দিল বাংলা ভাষাকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দিতে হবে। প্রতিবাদের ঝড় ছড়িয়ে পড়লো শহর থেকে গ্রামে গ্রামে।
ভাষা আন্দোলন :
৬ই এপ্রিল, ১৯৫১ সাল। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে উদযাপিত হয়েছিল ‘জাতীয় ভাষা দিবস’। দাবি করা হয়েছিল, বাংলা ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসাবে গণ্য করতে হবে। দাবি আদায়ের জন্য শুরু হয়েছিল আন্দোলন। দিন দিন তার তীব্রতা বাড়তে থাকে। শহর, গ্রাম-গঞ্জে সেই আন্দোলনের অগ্নি স্ফুলিঙ্গের মত ছড়িয়ে যেতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকরা ধরপাকড় শুরু করে। তবু আন্দোলনকে থামাতে পারেনি।
১৯৫২ সাল ফেব্রুয়ারি মাস। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান তখন আন্দোলনের জোয়ারে টলমল এবং উত্তাল।
২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সাল। ঢাকার রাজপথে ছাত্র-জনতার এক বিশাল মিছিল বের হয়। সেই মিছিলের উপর পাকিস্তানি নরপিচাশরা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। মিছিলে শহীদ হয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো অনেকে। তারপর আর আন্দোলনকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। সত্যিকার অর্থে সেদিনই ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপণ করা হয়।’
বাহান্ন সনের নিগ্রহের পরে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সর্বাত্মক অবিচারের চেহারাটা আরো স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে ধরা পড়ে যায় তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের চোখে। ফলে তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি ক্রমেই প্রবল হতে থাকে। বাঙালিরা বুঝতে পারেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার না পাওয়া পর্যন্ত সার্বিক এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না।
মুসলিম লিগের বিপর্যয়ের ইতিহাস :
তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে যারা মুসলিম লীগের কর্তা ব্যক্তি ছিলেন, তাদের অধিকাংশেরই ভূমিকা ছিল বস্তুত তল্পিবাহকের। মুসলিম লীগের লোকেরা যে রাজনীতি করতেন তা শুধুই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর শোষনের পথ পরিস্কার করা ছাড়া তাদের আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নেমেছিলেন বিভিন্ন দল নিয়ে গঠন করা যুক্তফ্রন্ট। প্রাদেশিক পরিষদে ৩০৯টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট পেল ২১৫টি আসন। অর্থাৎ মোট আসন সংখ্যার দুই তৃতীয়াংশের বেশি।
কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হল, এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও যুক্তফ্রন্ট সরকার বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বর্ষীয়ান রাজনীতিক নেতা শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীসভা শপথ গ্রহণ করলো। তারপর দু’মাস পার না হতেই ৩০ মে সেই মন্ত্রীসভাকে বাতিল ঘোষণা করা হল। শেরে-ই-বাংলা ইতিমধ্যে কলকাতায় গিয়ে ঘোষণা দিলেন যে, দুই বাংলার মধ্যে যে মিথ্যার প্রাচীর দাঁড় করে রাখা হয়েছে, তা তুলে নেয়া হবে। উক্ত বক্তব্য শুনে পশ্চিমা শাসকরা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তারা দুই বাংলার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ লেনদেন বন্ধ করে দেয়ার পাঁয়তারা শুরু করলেন। শেরে-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেবের সরকারকে পদচ্যুত করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানে তারা শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু কে না জানে, অশান্তি আর উচ্ছৃঙ্খলার আগুন জ্বালিয়ে ছিলেন স্বয়ং পাকিস্তানি শাসকরা। যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীসভা বাতিল করার অজুহাত সৃষ্টির জন্য পাক শাসকরা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সেদিন নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলে শ্রমিক দিয়ে দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল।
শুধু জনপ্রিয় একটি মন্ত্রীসভাকে বাতিল করেই পশ্চিমা প্রভুরা ক্ষান্ত হননি। তারা ফজলুল হক সাহেবকে গৃহবন্দী করে রাখলেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে পাঠানো হল জেলখানায়।
আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে যে পঙ্গু সরকার গদিতে বসানো হল, তাদের দিক থেকে কার্যকর কোন বাধা আসবার প্রশ্নই ছিল না। অতএব পশ্চিমা প্রভুত্ব ও শোষন ও শাসন আগের মতই অবাধে চলতে লাগলো।
৭ই মে, ১৯৫৪ সালে পাক গণপরিষদে এই মর্মে একটি প্রস্তাব পাশ করতে বাধ্য হয় যে, বাংলা ও উর্দু দুই-ই হবে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা।
১৯৫৪-১৯৫৮, এই কয়েকটি বছরে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থাতেও অস্থির অবস্থা চলতে থাকে।
১৯৫৬ সনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৫৭ সালে তাকে বিদায় নিতে হয়। এলেন ফিরোজ খান নুন। কিন্তু তিনিও বেশি দিন গদিতে থাকতে পারিনি। ৭ অক্টোবর, ১৯৫৮ সন। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জা সংবিধান বাতিল করেন। কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক মন্ত্রীসভাগুলিও পদচ্যুত হয়। গোটা দেশে সামরিক আইন জারি করা হল। ১৯৫৮ সালেই পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা চলে যায় সামরিক জান্তাদের কাছে।
ইস্কান্দার মির্জাকে তাড়িয়ে ক্ষমতার মসনদে বসলেন জেনারেল আইয়ুব খান। শুরু হল আইয়ুবি গণতন্ত্র। যার নাম ছিল মৌলিক গণতন্ত্র। নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র অনিয়ন্ত্রিত ভন্ডামির ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। উপরন্তু দেখা গেল, তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে আইয়ুব ও চিরাচরিত শোষনের নীতিই অনুসরণ করছেন। জেনারেল আইয়ুবশাহী দশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। সামরিক শাসকভক্ত এই দশ বছরকে ‘ডিকেট অব ডেভোলপমেন্ট’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এই সময়টা উন্নতি হয়েছিল কাদের! রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানের? নাকি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের কুখ্যাত সেই বাইশটি পরিবারের। স্বদেশের শিল্প-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা যাদের মুঠোর মধ্যে চলে যায়। কিন্তু তার মূল্য দিতে হয় তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণকে। বাঙালি জনসমাজকে বঞ্চিত করে এবং শোষন করে পশ্চিমা প্রভুরা সম্পদের পাহাড়গড়ে ছিল।
৭ই জুন, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তি সনদ ৬ দফা পেশ করেন।
১৯৬৮ সালে আইয়ুব খান শেখ মুজিবুর রহমানকে জেলখানায় বন্দী করে রাখেন।
তথাকথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ সাজিয়ে বাঙালিদের তিনি ধোঁকা দিতে চেয়েছিলেন। বাংলার জনসাধারণ তার আগেই বুঝতে পেরেছিলেন কে তাদের শত্রু, কে তাদের মিত্র। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ শুরু হয়। তার ফলশ্রুতিতে আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালে ১লা জানুয়ারিতে তার মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহকর্মীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হন।
একদিকে পূর্ব পাকিস্তানে, তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানেও আন্দোলন দিনে দিনে উত্তাল হয়ে উঠতে থাকে। আন্দোলনের দাবি ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। লাঠি আর বন্দুকের ভয় দেখিয়ে আন্দোলনকে আর দাবিয়ে রাখা গেল না। বিক্ষুব্ধ জনতার আন্দোলনের জোয়ারে আইয়ুব শাহীর সরকার ভেসে গেল।
কিন্তু সামরিক শাসনের আর অবসান ঘটলো না। আইয়ুব শাহী চলে গেলেন। এলেন আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। ইয়াহিয়া খান সম্বন্ধে প্রথম প্রথম সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে, তিনি অনিচ্ছুক স্বৈরশাসক, সামরিক শাসনকে জিইয়ে রাখতে চান না। যথাসম্ভব যত তাড়াতাড়ি জনসাধারণের প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চান।
২৫শে মার্চ, ১৯৬৯ সনে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। তার ৮ মাস পর, ২৮শে নভেম্বর, ১৯৬৯ সনে তিনি ঘোষণা করলেন যে, প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল নির্বাচন হবে সত্তর সনের ৫ই অক্টোবর তারিখে। পরে আরো দু’মাস নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়। ৭ই ডিসেম্বর, ১৯৭০ সনে নির্বাচনের তারিখ ধার্য করা হয়।
১৯৭০ সালে সমগ্র বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের পতাকা তলে এসে সমবেত হয়। নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিই পেল আওয়ামী লীগ। জাতীয় পরিষদ, মানে কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি পেল আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের আসন সংখ্যা ছিল মোট ৩১৬টি। প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হল নিরঙ্কুশ।
পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর টনক নড়লো। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তার খবর রাখতেন। কিন্তু তার জয় যে এতটাই চমকপ্রদ হবে, তা নিশ্চয় তাদের হিসেবে ছিল না। তারা বুঝতে পারলেন যে, শুধু পূর্ব পাকিস্তানে নয়Ñ সমস্ত পাকিস্তানেই বাঙালির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে চলছে। অতপর আবার নতুন করে শুরু হল তাদের নগ্ন, বীভৎস্য ষড়যন্ত্রের খেলা।
‘অনিচ্ছুক স্বৈরশাসক’ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মুখোশ নিমেষে খসে পড়ল। মুখোশের আড়ালে থেকে বেরিয়ে এল পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম সামরিক জান্তার আসল চেহারা।

১৯৭১ – ২৫ শে মার্চের আগে নেপথ্যে কাহিনী :
পশ্চিমা শাসকরা চক্রান্তের নীল নকশা তৈরি করে রেখেছিল আগেই। কেবল দিন, ক্ষণ, সময় ও সুযোগ বুঝে তা কাজে লাগানোর অপেক্ষায় ছিল। নির্বাচনে বিজয়ের পর আওয়ামী লীগের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নবনির্বাচিত সদস্যেরা এক সভায় মিলিত হন। এই সভায় পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবিতে অটল থাকার শপথ গ্রহণ করেন তারা। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ঘোষণা করেন, ছয় দফার ভিত্তিতে দেশের শাসনতন্ত্র অবশ্যই রচিত হবে। ঠিক তার তিন দিন পর ৭ই জানুয়ারি, ১৯৭১ সালে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন থেকে ছোরাসহ এক যুবক ধরা হল। পুলিশী জেরায় সে স্বীকার করলো, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য তার উপর নির্দেশ ছিল। কারা এই নির্দেশ দিয়েছিল তা জানা যায়নি। একদিন পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের জীবন রক্ষা পাওয়াতে স্বস্তি প্রকাশ করে বাণী পাঠান ঢাকায়। আর একদিন পর তিনি ঢাকায় এলেন। ১১ই জানুয়ারি থেকে ১৩ই জানুয়ারি, ১৯৭১ সন বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সাথে উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান।
পর দিন ১৪ই জানুয়ারি তারিখে করাচি প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে ঢাকা বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেন, ‘শেখ মজিবর রহমান পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। আরো বলেন, শেখ মুজিবের সরকার শীঘ্রই ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। ইয়াহিয়া বলেন, শেখ মুজিব যখন ক্ষমতা গ্রহণ করবে তখন আমি ক্ষমতায় থাকবো না। দেশের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো আমি তার জন্য উত্তরাধিকার হিসাবে রেখে যাব।
২২শে জানুয়ারি, ১৯৭১ সাল। জনাব জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা করেন, পাকিস্তানে একটি প্রকৃত ফেডারেশন গঠনের প্রশ্নে শেখ মুজিব একমত।
২৭ শে জানুয়ারি, ১৯৭১ সাল, জনাব ভুট্টো এলেন ঢাকায়। উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা। বিমানবন্দরে বললেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতের প্রতি তার শ্রদ্ধা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তারা এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হলেন ৭৫ মিনিটের জন্য।
আলোচনা শেষে ভুট্টো বললেন, এই বৈঠকে তারা খুশী ও সম্মানিত বোধ করছেন।
২৮শে জানুয়ারি, ১৯৭১ সাল। ভুট্টোর হোটেল কক্ষে আবার আলোচনা ৭০ মিনিটের জন্য।
৩০শে জানুয়ারি, ১৯৭১ সাল। এম. এল জাহাজযোগে মুজিব-ভুট্টোর নৌবিহার ৫ ঘণ্টাব্যাপী। সাংবাদিক সম্মেলনে জনাব ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে তার আলোচনা সফল হয়েছে কিনা এ প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বললেন, আমরা দু’নেতাই আলোচনায় সন্তুষ্ট। তবে আলোচনার দ্বার খোলা রইলো।
জনাব ভুট্টো ঢাকা থেকে লাহোর পৌঁছানোর আগেই ৩০শে জানুয়ারি তারিখে সাড়া দেশের মানুষ স্তম্ভিত বিস্ময়ে শুনলো, কাশ্মিরী মুক্তিযোদ্ধা নামধারী দুজন বিমান ছিনতাইকারী ভারতীয় বিমান ‘গাঁটা’ জোর করে লাহোরে নামিয়েছে। শুরু হল, পাকিস্তানে চক্রান্তের রাজনীতির মঞ্চ নাটকের আরেক অঙ্কের অভিনয়। তাদের এই চক্রান্তে প্রধান সহযোগীর ভূমিকা নিলেন জনাব ভুট্টো।
৩রা ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ সাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে ভারতীয় বিমান অপহরণের দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতা হস্তান্তর বিঘ্নিত করার জন্য এটা পাকিস্তানি স্বার্থান্বেষী মহলের একটা বড় চক্রান্ত।
৯ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ সাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে বলেন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন এখনও আহূত না হওয়ায় তিনি সামরিক জান্তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে উদ্বিগ্ন।
১০ই ফেব্রুয়ারিতে জনাব ভুট্টো বললেন, তারো অভিযোগ, সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব করছেন। পর দিনই ভুট্টো আগের দিনের বক্তব্য অস্বীকার করলেন। কতিপয় দেশী ও বিদেশী শক্তি দু’টি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
১৩ই ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন, ৩ মার্চ ঢাকায় প্রথম জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে।
১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জনাব ভুট্টো নাটকীয়ভাবে ঘোষণা করেন, ‘৬ দফার প্রশ্নে কোন আপোষ মীমাংসার সম্ভবনা না থাকায় তার দলের পক্ষে ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করা সম্ভব নয়। তবে ৬ দফায় কোন রদবদল বা আপোষের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলে তারা যে কোন দিন ঢাকা যাবেন। বঙ্গবন্ধু এই বিষয়ে কোন মন্তব্য প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান।
২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ শহীদ দিবসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানালেন, আসুন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগেই আমরা ৬ দফা সম্পর্কে খোলাখুলি ও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করি। কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারি পরে পাকিস্তানের রাজনীতি দ্রুত ও নাটকীয় পট-পরিবর্তন হয়।
২২শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার বেসামরিক মন্ত্রী পরিষদ বাতিল করেন। তারপর বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসকদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেন। একই দিন কাইয়ুম খান ঘোষণা করেন তারাও ভুট্টোর দলের সাথে একমত ও একাত্মতা প্রকাশ করেন। ওই তারিখে কাইয়ুমপন্থী মুসলিম লীগের মত কাউন্সিল মুসলিম লীগও তাদের সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, তারা জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় আসবেন না।
২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে ভুট্টোর গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য ৬টি দলের ৩৩ জন সদস্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
২৮ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে জনাব ভুট্টো দাবি জানালেন, ‘জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিত রাখতে হবে এবং শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য নির্দিষ্ট ১২০ দিনের সময়সীমা বাতিল হলে তিনি অধিবেশনে যোগ দিবেন। তিনি আরো হুমকি দিলেন, পিপলস পার্টির সদস্যদের উপস্থিতি ছাড়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসলে তিনি আন্দোলন শুরু করবেন।
অগ্নিঝরা মার্চ, ১৯৭১
১লা মার্চ, ১৯৭১। ঢাকার আকাশ ঝকঝকে নীল। স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা চলছে। খেলা দেখার মাঝেও চলছে উত্তেজিত রাজনৈতিক আলোচনা। সেদিন ঢাকার প্রভাতী সংবাদে দুটি গুরুত্বপূর্ণ খবর বেরিয়ে ছিল।
এক. বিমানযোগে পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন জাতীয় পরিষদের সদস্য ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। তারা অধিকাংশ ওয়ালি মুজাফফর ন্যাপের।
দুই. ঢাকার শিল্প ও বণিক সমিতির সংবর্ধনা সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, জনাব ভুট্টো তার দলের ৮৩ জন সদস্য নিয়ে ঢাকায় আসতে চান না। আমি যদি বলি, ১৬০ জন সদস্য নিয়ে আমরা পশ্চিম পাকিস্তানে যাব না। তাহলে পরিস্থিতি কি দাঁড়ায়? পরিষদের আলোচনায় বসার আগে কি করে আমরা প্রতিশ্রুতি দিব
যে, ৬ দফা সংশোধন করা হবে। ৬ দফা এখন জনগণের সম্পত্তি। তাদের নির্বাচনী রায়। ব্যক্তিগতভাবে পরিবর্তণ বা পরিবর্ধন করার অধিকার আমার নেই। আসলে তখন ষড়যন্ত্র চলছে যাতে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করতে না হয়। পাকিস্তানের কোন কোন সদস্য ও নেতা শাসনতন্ত্র প্রণয়নে তাদের প্রস্তাব গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হলে তারা অধিবেশনে যোগ দিবেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যে, যদি একজন সদস্যও কোন ন্যায়সঙ্গত প্রস্তাব দেন তা গ্রহণ করা হবে। আমরা আমাদের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে অন্যায় কিছু করবো না।’
দু’দিন পরেই ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন। তাই বাংলাদেশের সকলের মনেই
প্রবল উদ্বেগ, প্রতীক্ষা, আশা ও আকাঙ্খার মিশ্র অনুভূতি। শেষ পর্যন্ত জনাব ভুট্টো তার মত পাল্টাবেন এবং ইয়াহিয়া তার প্রতিশ্রুতি রাখবেন, এটাই বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র আশা ছিল। সোমবার সকাল ১০.০০টার আগেই জানাজানি হয়ে গেল, দুপুর ২টায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বেতার ভাষণ দিবেন। সকলেই অপেক্ষারত। বেলা ১টায় বেতার ঘোষক বললেন, এবার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভাষণ দিবেন। কিন্তু না। ইয়াহিয়ার কণ্ঠ নয়। প্রেসিডেন্টের ঘোষণা পাঠ করলেন অপর একটি কণ্ঠ। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ৩ তারিখে বসবে না। অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। আশা ভঙ্গের বেদনায় প্রথমে সকলেই স্তম্ভিত ও মূক। তারপরই গর্জে উঠল ঢাকা ও অন্যান্য শহর।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য সমর্থন করে জনাব নুরুল আমিন এক বিবৃতিতে বললেন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখা অযৌক্তিক এবং স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকাশের পক্ষে আবার বাধা সৃষ্টির চক্রান্ত। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, এই নুরুল আমিনই আবার পরবর্তীতে জনাব ভুট্টোর প্রধান সহযোগী হলেন।
১লা মার্চ, ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের গভর্নর ভাইস এডমিরাল আহসান পদচ্যুত হলেন এবং সামরিক প্রশাসক লে: জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হল। সামরিক প্রশাসনের ১১০ নং সামরিক আইন নির্দেশে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার ছবি ছাপা ও প্রচার নিষিদ্ধ করা হল।

২রা মার্চ রাত পৌনে আটটায় ঢাকা বেতারে ঘোষণা করা হল, রাত বারটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত ঢাকা শহরে সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হল। পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই আদেশ বলবৎ থাকবে। বাংলাদেশে প্রচন্ড গণবিক্ষোভের খবর পাওয়ার পর জনাব ভুট্টো ৩রা মার্চ, ১৯৭১ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে দেখা করেন। ঐদিনই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এক অনির্ধারিত বেতার ভাষণে আবার ১০ই মার্চ তারিখে এক রাজনৈতিক সভা আহ্বান করেন।
বঙ্গবন্ধু সাথে সাথে এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন এবং ঘোষণা করেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও অন্যান্য স্থানে সেনা বাহিনী যখন ব্যাপকভাবে গণহত্যা চালাচ্ছে, শহীদের তাজা রক্ত এখনও শুকিয়ে যায়নি, তখন এই আমন্ত্রণ এক নির্মম তামাশা।
৬ই মার্চ, ১৯৭১ সাল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এক বেতার ভাষণে ২৫শে মার্চ তারিখে জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করেন। ঐ দিনই লেঃ জেনারেল টিক্কা খানকে বাংলাদেশের গভর্নর নিযুক্ত করেন।
৭ই মার্চ, ১৯৭১ সাল। বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ জনতার সমাবেশে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে তার দলের যোগদানের চারটি পূর্বশর্ত ঘোষণা করেন।
(ক) সামরিক আইন তুলে নিতে হবে।
(খ) সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে।
(গ) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
(ঘ) গণহত্যার উপযুক্ত তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।
রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত ভাষণ সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বেতারে প্রচার করতে না দেয়ায় অন্যান্য সরকারি অফিস-আদালতের কর্মচারীদের মত ঢাকা বেতারের কর্মচারীরাও কাজ বন্ধ করে দেন। পর দিন এই ভাষণ প্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়।
৮ই মার্চ থেকে এক সপ্তাহের জন্য বঙ্গবন্ধু অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের নয়া কর্মসূচী ঘোষণা করেন।
১২ই মার্চ লাহোরে এয়ার মার্শাল আজগর খান এক জনসভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের অদূরদর্শিতার জন্য বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
১৪ই মার্চ বাংলাদেশের বেসামরিক কর্মচারীরা কাজে যোগ দেয়ার সামরিক নির্দেশ অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নেন।
১৫ই মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসন চালু রাখার জন্য ৩৫টি বিধি জারি করেন।
১৬ই মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়ার প্রথম বৈঠক। কালো পতাকা শোভিত মোটরে বঙ্গবন্ধু ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবনে গমন করেন।
১৮ই মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়ার ২য় বৈঠক।
১৯শে মার্চ তারিখে জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে ৯০ মিনিটব্যাপী বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন ঢাকার অদূরে জয়দেবপুরে সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে বহুলোককে হত্যা করেছে।
২০শে মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়ার ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ধরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
২১শে মার্চ আবার মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠক হয়। এই দিন প্রচন্ড গণবিস্ফোরণের মুখে কড়া সামরিক পাহারায় জনাব ভুট্টো ঢাকায় আসেন। জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনার পর তিনি ঘোষণা করেন, সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
২২শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর সাথে বৈঠক শেষ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন, সকল দলের নেতাদের সম্মতিক্রমে এবং আলোচনার স্বার্থে তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আবার স্থগিত রাখছেন।
২৩ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছুটির দিন ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের সর্বত্র স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। জেনারেল ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের সাথে আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের দু’দফা বৈঠক হয়।
২৫ মার্চ, ১৯৭১। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার বার্তাটি লোক মারফত বিভিন্ন বেতার যন্ত্র ও গণ মাধ্যমে প্রচারের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। তারপর পাক হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। সেই রাতেই পাকিস্তানি নরপিচাশরা ঘুমন্ত অবস্থায় নিরাপরাধ, নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে রাইফেল ও মেশিনগানের গুলি চালায়। দীর্ঘ ৯ মাস স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হন। ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত ভূলণ্ঠিত হয়।
আজ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি – জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হাজার বছরে শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ও তার পরিবারবর্গসহ যারা ১৫ই আগষ্ট, ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্যদের হাতে নিহত হন তাদেরকে। এটা ছিল পৃথিবীর নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম হত্যাকান্ড। হত্যাকারিরা শুধু বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার বর্গকে হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি। তারা জাতীয় চার নেতা – জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন আবুল মনসুর ও জনাব কামরুজ্জামান-কে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে জেলখানার ভিতর হত্যা করে। এরপর তারা পর্যায়ক্রমে পরিকল্পিতভাবে সাবেক অর্থমন্ত্রী জনাব এস.এম কিবরিয়া, এম.পি জনাব আহসানউল্লাহ মাস্টারকে হত্যা করে। বি.এন.পি আমলে রমনা বটমূলে ১লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে এবং উদিচী শিল্পী গোষ্ঠির আয়োজিত যশোহর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা নিক্ষেপ করে বহু নিরীহ মানুষের প্রাণ কড়ে নেয়া হয়।
আমি সকল বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন।
বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালী জাতিকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। সোনার বাংলা গড়ার রূপরেখা ও পরিকল্পনা দিয়েছিলেন।
আজ তার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি আজ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
তিনি বাংলাদেশকে স্বল্পন্নোত দেশ থেকে আজ উন্নয়নশীল দেশে পরিনত করেছেন। আজ তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশে^র বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহ আমাদের জননেত্রীকে দীর্ঘজীবী করুন। সুবর্ণ জয়ন্তী সফল হোক। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।
প্রফেসর ড. কবির হোসেন তালুকদার
টরন্টো
