দ, প -এর দাপট

দ এর দাপট

দাশু দত্ত দর্শনার বাসিন্দা। দেশসেবা, দানদক্ষিণা, দরিদ্রের প্রতি দয়া তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। দৈনিক দুই কিলোমিটার হাঁটা দারুন গ্রীষ্মেও অব্যাহত রাখেন। দেহ তাঁর দেবদারু বৃক্ষের মত ঋজু। দক্ষিণ হস্তের ক্রিয়াতেও তিনি খুব দক্ষ। দেবতা-তুল্য চরিত্রবান। দেশপ্রেমী। দলমত নির্বিশেষে সবার সম্মানিত ব্যক্তি। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নাই’ এই মতাদর্শের দৃঢ় সমর্থক তিনি। দই-দুধ তাঁর প্রিয় খাদ্য। দীর্ঘ কাল দাড়ি, সুন্দর সাদা দাঁতের সারি, দ্রুত চলন, দরাজ গলা, দিল-দরিয়া স্বভাব ইত্যাদি কারণে দত্তবাবু একজন দর্শনীয় ব্যক্তি। তিনি দাবা খেলায় খুবই পারদর্শী। রাজনৈতিক বা স্বার্থকেন্দ্রিক দলাদলি তাঁর অপছন্দ। দেবভাষায় অর্থাৎ সংস্কৃত ভাষায় তাঁর দখল গভীর। কেনাকাটার বেলায় তিনি দরাদরি পছন্দ করেন না। দক্ষিণ-দুয়ার বাড়ীতে বাস করেন। তবে তাঁর স্ত্রীটি বড় দজ্জাল মেয়েমানুষ, অতি দুর্মুখ, স্বল্প অপরাধে গুরু দন্ডদাত্রী। দু’জনে এক অসুখী দম্পতি। তিনি একটি দোয়েল পাখী পোষেন, দর্প করে দাবি করেন এটা দেবতার দান, তাই সে তার ঘরের লক্ষ্মী। দিনদিন দত্তগিন্নীর দাপট ও দেমাক বাড়ছে, ফলে দত্ত মশায়ের জীবনে দহন এবং দুঃখও বাড়ছে স্ত্রীর দাবড়ানি খেয়ে খেয়ে। এই রোগের কোন দাওয়াই দত্তমশায়ের জানা নেই, তাই তিনি দারুণ দুর্বিপাকে পড়েছেন। এই দিকদারি আর কাহাঁতক সহ্য করা যায়?

দত্তবাবুর বাড়ীর দারোয়ান এক দীর্ঘদেহী লোক, নাম তার দীনবন্ধু দাস। দস্যুর মত স্বভাব তার। তার ডান পায়ে একটা দগ্দগে ঘা, তাই সে আরও বদমেজাজী। তাকে দেখামাত্র দুষ্টলোকের বুক দুরদুর করে কাঁপতে থাকে। আগে চর-দখলদারির কাজে সে দাঙ্গাবাজি করে বেড়াত। অন্যরকম দুর্নামও তার রয়েছে।

দত্তমশাই দু’বছর আগে একবার দিনাজপুরের দেবহাটা গ্রামে গিয়েছিলেন এক দাওয়াতে। সেদিন ছিল দেওয়ালি উৎসব। সেখানে এক প্রাচীন দেবালয় হিন্দুদের এক বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থল। দেবী দুর্গার পাথরের মূর্তি দারুণ আকর্ষণীয় বস্তু, যদিও বা খানিকটা দুর্দশাগ্রস্ত। সঙ্গে একটি দৈত্যের মূর্তিও আছে। পুরোহিত সেখানে উপস্থিত ভক্তদের সামনে দেবতার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। দেহাতি লোকদের খুব ভীড় জমে সে মন্দিরে।

দেশীয় দ্রব্যাদি ও খাদ্যের খুবই ভক্ত দত্তবাবু। দেশবিদেশ ভ্রমণও তিনি ভালোবাসেন। দার্জিলিং, দিল্লী, দক্ষিণ ভারত, দুবাই, দোহা ইত্যাদি দুনিয়ার বহু দেশ ও শহর তিনি ঘুরেছেন। দম-দেওয়া পুতুলের মত অক্লান্তভাবে তিনি দেশ ভ্রমণ করে থাকেন। ধন-দৌলত তাঁর প্রচুর, তাই চিত্ত ভাবনাহীন।

দাম্ভিক লোককে পরিহার এবং দয়ালু লোককে আমন্ত্রণ করেন তিনি। এলাকার দারোগা সাহেব দত্তবাবুকে পছন্দ করেন। কেউ দায়ে ঠেকলে তিনি তাকে সাধ্যমত দান করেন। তাঁর বাড়ীর সামনে একটা বড় দীঘি, তাতে তিনি দিব্যি সাঁতার কাটেন। দুদ্ধবতী দু’টি গাভী পালন করেন তিনি, এবং অকাতরে দুধ বিলান পড়শীদের মাঝে। দোনলা একটি বন্দুক নিয়ে তিনি দূরে জঙ্গলে ডোরাকাটা বাঘ শিকারেও যান। গ্রামের দবির দেওয়ান তাঁর শিকারের সঙ্গী।

তাঁর একমাত্র দুহিতা দেবযানীকে নিকটেই দশমঙ্গল গ্রামে এক দাপটওয়ালা জমিদার পরিবারে বিয়ে দিয়েছেন। দেবযানীর শ্বশুর দরকষাকষি করে বাবার কাছে থেকে নগদ দু’লক্ষ টাকা যৌতুক বাবদ আদায় করে ছেড়েছেন। ওর স্বামী দেবদুলাল আবার দারুতে দারুণ আসক্ত। ওদের বিয়ে হয় দোল পূর্ণিমার রাতে; দ্বিরাগমনের পর দুলাল ওকে দ্বাদশ দিবসের জন্যে দ্বারভাঙ্গা শহরে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল। ওদের শয়নকক্ষে ঘৃতদীপ জ্বলে, বিদ্যুৎ-বাতি নয়। দোদুল্যমান হৃদয় নিয়ে সে স্বামীর ঘর করছে, যদিও দোহারা চেহারার দুলালকে সে দৈনন্দিন জীবনে ক্রমেই দেহ ও মন সমর্পণ করে চলেছে।

পুত্র-মুখ দেখতে পারেননি, এটা দত্তবাবুর জীবনে এক বড় দুঃখ। সদাই দুশ্চিন্তা- এই অগাধ সম্পদ তাঁর মৃত্যুর পর কে ভোগ করবে, বংশের প্রদীপ নিভে যাবে, দশভুতে লুটে খাবে সব। দুশমনি করার লোক তো দুর্লভ নয় এ সমাজে। এই দুর্ভাবনা কখনো কখনো দুর্বহ হয়ে উঠে, দত্তবাবু তখন নিজেকে বড় দুর্বল, বড় অসহায় বলে অনুভব করেন।

শিকারে গিয়ে একদিন এক দাঁতাল শূকরের রোষদৃষ্টিতে পড়েন দত্তবাবু। দোষ অবশ্য তাঁরই। অতি নিকট থেকে গুলি করতে এগিয়ে গেলেন কিন্তু যথা সময়ে বন্দুক থেকে গুলি বের না হওয়াতেই বিপদ ঘটল। দৈবক্রমে বেঁচে গেলেন সে দফা। গাভীর দুধ দোহন করতেও সখ হয় তাঁর কখনো কখনো। একদিন তো গাভীর লাথি খেয়ে দুধের পাত্রসহ দড়াম করে মাটিতে পড়ে গেলেন।

সৌখিন মানুষ দাশু দত্ত। ফলের বাগান করেছেন বাড়ীতে। দেলদুয়ারের জমিদার বাড়ী থেকে দিলখোশ আমের কলম করে এনে সেই বাগানে লাগিয়েছেন। এই দুই পরিবারে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও দহরম-মহরম। দুধসাগর আমও ফলে সেই বাগানে।

তিনি দূরদর্শী লোক। দেনা-পাওনার বিষয়ে খুবই সতর্ক দৃষ্টি রাখেন, নাহলে ভবিষ্যতে দৈন্যদশায় পড়তে হবে একথা তিনি সর্বদা মনে রাখেন।

তাঁর ছোটভাই দিনু দত্তের ছিল দোকানদারী ব্যবসা, কিন্তু দেনার দায়ে এখন মাথার চুল পর্যন্ত মহাজনের কাছে বাঁধা তাঁর, বড়ই দুঃসময় যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে ছোটমেয়ে দিতিকে দোজবরে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন দু’মাস আগে। বড় দত্তবাবু খবর পেয়ে বাধা দিয়েছেন এবং দিতির বিয়ের সব দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

আমরা দাশু দত্তের দীর্ঘায়ু কামনা করি।

বাংলা অক্ষর প-এর পাঁচালী

(ইংরেজী সাহিত্যে বহু শতাব্দী ধরে পরিচিত ও প্রচলিত Nonsense Rhymes. বিখ্যাত কবিদের রচিত। অপর নাম Nonsense Poetry, Nonsense Poems, or Nonsense Verse.

Nonsense poetry does not always make any sense. Those are written only for fun. মনটাকে হালকা করাই উদ্দেশ্য। Google search করলে বহু তথ্য পাওয়া যাবে।

সেই সূত্র ধরেই রচিত আমার এই প্রবন্ধ। উদ্দেশ্য : বাংলা ভাষাভিত্তিক ক্ষণিকের জন্য বিনোদন বা fun মাত্র, কোন message দেয়ার জন্য নয়। তবে কেউ যদি স্মরণীয় কিছু খুঁজে পান, তবে সেটা আমার সৌভাগ্য।) 

বাংলা বর্ণমালার পাঁচটি বর্ণ : প-ফ-ব-ভ-ম। শুরুতেই আছে প। প-এর বহুবিধ ব্যবহার ও প্রয়োগ নিয়ে কিছু পল্কা আলাপচারিতা।

আসুন তাহলে শুরু করা যাক।

প্রারম্ভেই বলি, “চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা!”

পাঁচ-পঞ্চ-পর্ব-পেঁচা-প্যাঁচ-প্যাঁচাল-পাঁচালী,

পরিচয়-প্রেম-প্রণয়-পরিণয়-পরিণাম-প্রণয়ী।

প না হলে যেমন লেখা যায় না প্রসিদ্ধ,

ঠিক তেমনি লেখা যায় না অপ্রসিদ্ধ-ও।

প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক, এখানেও সেই প।

প্রতিযোগিতা সম্ভব নয় কিছু প্রতিযোগী উপস্থিত না থাকলে।

নিবাসে থাকলে তবেই যাওয়া যায় প্রবাসে।

প্রসাদ পেতে হলে যেতে হবে পূজার মন্দিরে,

আর রাজদর্শন পেতে হলে যেতে হবে তাঁর প্রাসাদে।

রাজতন্ত্রের চেয়ে অধিকতর কাম্য প্রজাতন্ত্র।

প্রমাণ, প্রমাণিত লিখতে গেলে চাই প,

প্রচারে এবং অপপ্রচারেও প অপরিহার্য।

প্রবীণ-প্রাচীন-প্রাচীর-প্রলয়-প্রধান-প্রকান্ড-প্রকট-প্রাণী,

এরাও প-এর অনুগামী।

প্রতিরোধ-প্রতিশোধ-পাঞ্জা-পান্তা-পান্থ-প্রান্থ,

পান্না-পাক্কা-প্রাচ্য-প্রতীচ্য-পুরুষ-পৌরুষ-পাষন্ড :

সর্বত্রই উপস্থিত প।

পদযাত্রা করতে গেলে যেমন লাগে দু’টি পা,

পরিশ্রম ছাড়া তেমনি পাগলামীও সারে না।

পথিকের ভরসা যেমন তার যুগল পা,

প্রার্থীর ভরসা তেমনি দাতার প্রসন্নতা।

প্রচার-প্রসার-প্রকার-প্রাকার-প্রণাম-প্রণামী,

প্রসন্ন-প্রফুল্ল-প্রগতি-প্রগতিশীল-প্রগতিশালী।

পরমা সুন্দরী পরম বন্ধু হলে প্রাণে বিরাজে প্রশান্তি।

যুক্তির ধারাটা প্রায়শঃই বদলে দেয় প্রযুক্তি।

প্রায় থেকে প্রায়শঃ যেমন ক্রম থেকে ক্রমশঃ,

প্রতিশ্র“তি-প্রতিদান-প্রবৃত্তি-প্রবৃদ্ধি-পরস্ব-পরশ্ব।

সুপ্রতিষ্ঠিত ও অপ্রতিষ্ঠিতের মাঝে থাকে গুণ ও মানের ব্যবধান।

প্রিয়জন হলো আমাদের পরিবার-পরিজন,

সমাজে পদপিষ্ঠ হয় তারা যারা “হরিজন।”

পুরাতন স্থান পায় প্রাচীনের দলে,

পশুপাখিরা বাস করে পাহাড়ে-পর্বতে।

প্রবলেরা প্রায়শঃই দুর্বলের উপর তাদের প্রভাব খাটায়।

প্রণত না হলে অসন্তুষ্ট হন ব্রাক্ষ্মণ বটে,

অতীতে পন্ডিত মশায়ের পিটুনীও প্রাপ্য হতো

পাঠশালায় পড়া না পারিলে।

প্রখর রোদে প্রচুর পরিশ্রম করে

কৃষক শুকায় তাদের ভেজা পাট,

প্রকৃত মূল্য না পেলে হতাশায় দেয় কপালে হাত।

প্রজন্ম-প্রজাতি-প্রজাপতি-প্রশান্তি-প্রবেশ,

পিঠ-পিঠা-পাঠ্য-প্রাপ্য-প্রবল-প্রবাল-প্রাণেশ।

প্রাচুর্য-পারা-পারাবত-পারাবার-পরশ-পারদ,

পার্শ্ব-পোষ্য-পার্থিব-পাগল-পোশাক-পরিচ্ছদ।

পাজামা-পাঞ্জাবী-পাদুকা-পাগড়ি, নারীদের পোশাক ঘাগরি।

প্রসারিত-প্রচারিত-প্রশমিত-প্রভাবিত-প্রবাহিত-প্রজ্জ্বলিত,

প্রত্যুষ-প্রথম-প্রতুল-প্রমত্ত-প্রতীক-পতিত-পালিত।

পাঁক-পাক-পাকা-পাখা-পাশা-পাড়া-পালা-পাজী,

পিরিত-পীরিতি-পুতুল-পুতলি-পুকুর-পাশরি।

পথ-পথিক-পাথেয়-প্রদর্শন-প্রশমণ-প্রচলন-প্রহসন,

পীত-প্রীত-প্রেত-প্রীতি-পূনঃ-প্রিয়-পিষ্টক-পৃথক-প্রহরণ।

পানশুপারি-পানশালা-পাশাপাশি-পরগাছা-পরমায়ু।

পৈতৃক-পুরাকাল-পুরনারী-পুরাতন-পুরাপুরি-প্রাণবায়ু।

প্রতারিত-প্রতিদিন-প্রতিশোধ-প্রতিরোধ-প্রতিদান,

প্রদান-প্রগাঢ়-প্রসার-প্রদাহ-প্রবাহ-প্রদেশ-প্রবেশ-প্রস্থান।

পেশা-পেষা-পোষা-প্রগতি-প্রসূতি-প্রকৃতি-প্রভৃতি,

পুলক-পূরব-পূনশ্চঃ-পুস্তক-পুস্তিকা-প্রতীকী।

পাপ-পাপী-পাপাশয়-প্রস্তুত-পরাজিত-প্রস্ফুটিত।

পরিমাণ-পরিধান-প্রশাসন-প্রলয়-প্রশ্রয়-প্রজনন-প্রসাধন,

প্রয়োগ-প্রহার-প্রহর-প্রবল-প্রলম্বিত-পরমত-প্রশিক্ষণ,

প্রাণবান-পরাধীন-পরাশক্তি-পরকাল-পরস্পর-পরম্পরা-পরধন।

প্রাদুর্ভাব-প্রাদেশিক-প্রাণহরা-প্রাণেশ্বর-পিতা-পিতামহ-পীতাম্বর,

প্রশ্নবোধক-প্রশ্নাতীত-প্রয়োজন-প্রযোজন-প্রদক্ষিণ-পীনোন্নত-পয়োধর ॥

সাইদুল হোসেন

মিসিসাগা, ক্যানাডা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *