বেইজিং-এর স্মৃতিকথা
কাজী সাব্বির আহমেদ
(পর্ব-৭)
আমাদের ভাষা শিক্ষার কোর্স শুরু হয় ‘ফল’ সেশনে। যেহেতু বছরের এই সময়টায় গাছের পাতারা সব ঝরে পড়ে তাই আমেরিকানরা এই সিজনকে বলে ‘ফল’। আমরা বাংলাদেশে ‘ফল’-কে ব্রিটিশদের মতন ‘অটাম’ বলে থাকি। বাংলায় বলি শরৎকাল। বাংলাদেশের শরৎকালে গ্রীষ্মের ভয়াবহ উত্তাপ কমে গিয়ে গা-জুড়ানো মৃদুমন্দ বাতাস বইতে শুরু করে। সেই সাথে সাদা সুগন্ধী শিউলী ফুলের সমারোহ এবং খাল কিংবা নদীর দু’কূল জুড়ে সাদা কাশফুলের ঝোপ প্রকৃতিকে করে তোলে মোহনীয়। আর পরিস্কার নীল আকাশে থাকে সাদা মেঘের ভেলা। শরৎকালে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে যেমন লাগে সাদা রঙের ছোঁয়া তেমনি বেইজিং-এর চারিদিকে তখন দেখা যায় লাল পাতার আভা। কারণ ঝরে যাওয়ার আগে তখন গাছের সবুজ পাতার রং বদলাতে শুরু হয়। বেইজিং-এর প্রায় তিরিশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ফ্রাগ্রেন্ট হিলস বা শিয়াংশান পাহাড় যেখানে গাছের পাতার এই রং বদলের অপরূপ রূপটি দেখা যায়। সেখানে যাওয়ার উপযুক্ত সময় হচ্ছে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত। বেইজিং ল্যাংগুয়েজ ইনস্টিটিউট থেকে আমাদেরকে একদিন সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রকৃতির এই অপূর্ব রূপ দেখার জন্য আমাদেরকে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হবে। পায়ে হেঁটে উঠার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। তাছাড়া রয়েছে কেবল কারের অপশন। আমরা পায়ে হেঁটেই পাহাড়ে উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমাদেরকে বলা হলো যে পাহাড়ে উঠা সহজ কিন্তু নামা কঠিন। তবে তারুণ্যের মহিমায় পাহাড়ে উঠা কিংবা নামা কোনটাই আমাদেরকে কাবু করতে পারেনি। শিয়াংশান পাহাড়ের গাছগুলির মধ্যে রয়েছে মেইপল ট্রি, স্মোক ট্রি আর গিঙ্কো গাছ। এই সময়ে মেইপলের পাতা গাঢ় লাল ও কমলা রং ধারণ করে। স্মোক ট্রির পাতা হয় গোলাপী লাল আর তাতে থাকে এক ধরনের ধোঁয়াশা ভাব। আর গিঙ্কো গাছের পাতা উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ ধারণ করে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যখন দূর দিগন্তে চোখ রাখা যায় তখন মনে হয় পুরো এলাকাটাই যেন আগুনরঙা লাল আভায় ভরে উঠেছে। সেই লাল আভার মাঝে মাঝে দেখা মেলে হলুদ আর কমলা রঙের মিশ্রণ যা কিনা লাল রঙের একঘেয়েমি দূর করে এই তিন উজ্জ্বল রঙের মাঝে তৈরি করেছে এক অপরূপ সমতা। প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য দেখার মাঝে রয়েছে এক মানসিক পরিপূর্ণতার আমেজ যা কিনা আমাদের স্মৃতিপটে থেকে যায় চির ভাস্বর হয়ে। জীবনের এক পর্যায়ে আমি কানাডার টরন্টো শহরে এসে স্থায়ী হয়েছি। ‘ফল’ সিজনে টরন্টোর প্রকৃতিও সেজে উঠে পাতার রং বদলের অপূর্ব সৌন্দর্যে। প্রতি বছর আমরা সেই রূপের আস্বাদন নিতে বেরিয়ে পড়ি লং ড্রাইভে। রাস্তার দু’পাশ জুড়ে থাকে বিভিন্ন শেডের পাতার সমারোহ। তারপরও আমার স্মৃতিপটে বেইজিং-এর শিয়াংশান পাহাড়ে জীবনের প্রথম দেখা রঙিন পাতার নান্দনিক রূপের স্মৃতি চির অম্লান হয়ে আছে।

আমাদের ভাষা শিক্ষার অগ্রগতির সাথে সাথে আমাদের জীবনও আরো বেশী চাইনিজ সমাজের সাথে মিশে যেতে শুরু করে। তার কারণ হলো আমরা যেমন একদিকে তাদের সাথে কথোপকথনে অংশ গ্রহণ করতে পারি সেই সাথে তাদের কালচারকেও গভীরভাবে অনুধাবন করা শুরু করি। তাদের বডি ল্যাংগুয়েজের সাথেও পরিচিত হতে শুরু করি। এইভাবে ধীরে ধীরে তারা যে কথাটি মুখে অথবা আকারে ইঙ্গিতে প্রকাশ করছে না অর্থাৎ যেটা তাদের চিন্তার পর্যায়ে রয়েছে সেটাও অনুধাবন করা শুরু করি। অর্থাৎ চাইনিজদের থিংকিং প্রসেসটাও আমাদের কাছে আস্তে আস্তে খোলাসা হওয়া শুরু করে। একটা নতুন ভাষা কিভাবে একটা নতুন কালচারকে আমাদের সামনে ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করে দেয় সেটাই আমরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করছিলাম।
আমারা আমাদের নতুন শেখা চাইনিজ শব্দ কিংবা বাক্যের গঠন ইত্যাদি ঝালিয়ে নেয়ার জন্য বেশী বেশী করে ক্যাম্পাসের বাইরের চাইনিজদের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন করা শুরু করি। প্রথম প্রথম ক্যাম্পাসের বাইরে আমাদের গন্তব্য ছিল সীমিত। তার কারণ আমাদের তখনও বেইজিং শহরকে তেমন করে চেনা হয়ে উঠেনি। প্রথম যে গন্তব্য আমাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে সেটা ছিল ‘বেইজিং ইয়ো ই শাংতিয়েন’ বা ‘বেইজিং ফ্রেন্ডশীপ স্টোর’। চীনা সরকার এই রিটেইল স্টোরটি ১৯৬৪ সালে বেইজিং-এর চিয়েনকোয়ামেন এলাকায় তৈরি করে। প্রাথমিকভাবে বেইজিং-এ অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের ডিপ্লোমেট, চীনে কর্মরত বিদেশী এক্সপার্ট এবং ট্যুরিস্টদের জন্য খোলা হয় এই স্টোর যেখানে পাওয়া যেত বিদেশ থেকে আমদানীকৃত পণ্য, লাক্সারী আইটেমস আর ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ সিল্ক ও অন্যান্য স্যুভেনির সামগ্রী। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আমরা যখন বেইজিং যাই তখন এই স্টোরটি একটি সুপারস্টোরে রূপান্তরিত হয়েছে যেখানে গ্রোসারী আইটেমও পাওয়া যেত। সেই সাথে ফরেন স্টুডেন্টদের জন্যেও এই স্টোরের দুয়ার ছিল উন্মুক্ত।
এই স্টোরটি যেহেতু বিদেশীদের জন্য তাই এখানে লোকাল চাইনিজদের প্রবেশের ব্যাপারে ছিল কড়াকড়ি। কোন বিদেশীর সঙ্গী হয়ে ঢোকার ক্ষেত্রে চাইনিজদেরকে এই স্টোরে ঢোকার অনুমতি দেয়া হত। এই স্টোরে ‘রেন মিন পি’ বা চীনের জনগণ যে কারেন্সি ব্যবহার করে তা ছিল অচল। এই স্টোর থেকে কেনাকাটা করলে দাম পরিশোধ করতে হত ‘এফইসি’ বা ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ সার্টিফিকেট’ নামক এক বিশেষ ধরনের কারেন্সিতে। চীনে যখন কোন বিদেশী লেজিটিমেটভাবে ফরেন কারেন্সি চেঞ্জ করে চীনের কারেন্সি নেয় তখন ব্যাংক অথবা যে কোন সরকারি এজেন্সি তাকে ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ সার্টিফিকেট’ নামক সেই বিশেষ চীনা কারেন্সি দেয়। অর্থাৎ বিদেশীরা যখন চীনে কোন কিছু কেনাকাটা করবে তখন সেটার মূল্য চুকাতে হবে সেই বিশেষ কারেন্সিতে। সরকারিভাবে ‘রেন মিন পি’ এবং ‘এফইসি’ এই দুই প্রকার কারেন্সির মুদ্রামান সমান কিন্তু খোলা বাজারে ‘এফইসি’-র মুদ্রামান ‘রেন মিন পি’-এর প্রায় দেড় গুণ। কারণ ‘এফইসি’ দিয়ে স্পেশ্যালাইজড কিছু দোকানে এমন কিছু পণ্য কিনতে পাওয়া যায় যা কিনা বাইরের কোন দোকানে পাওয়া যায় না। তবে আমরা যারা চীন সরকারের বৃত্তিপ্রাপ্ত ফরেন স্টুডেন্ট তারা অবশ্য ‘হোয়াইট কার্ড’ দিয়ে সেই সব পণ্য ‘রেন মিন পি’ দিয়ে কিনতে পারতাম। ফলে অনেক বিদেশী ডিপ্লোমেট বা লোকাল চাইনিজ তাদের ‘এফইসি’-র সাশ্রয়ের জন্য আমাদের শরণাপন্ন হতেন।

আমাদের কাছে ‘বেইজিং ফ্রেন্ডশীপ স্টোর’-এর মূল আকর্ষণ ছিল এর লাগোয়া একটি কফিশপ। আমরা বাংলাদেশে বিকেল বেলাতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে রেস্টুরেন্টে বসে চা সহযোগে আড্ডা দিতে অভ্যস্থ। এই কফিশপটি আমাদের সেই অভ্যাসকে উস্কে দিয়েছিল এই বিদেশ বিভূঁইয়ে। তবে এই কফিশপের পরিবেশ আমাদের দেশের রেস্টুরেন্টের মতন গমগমে নয়। আলোআঁধারি পরিবেশে নিরিবিলিতে বসে কফি খাওয়ার জন্য এই কফিশপ। কফির সাথে অনেক ধরনের স্ন্যাক্সের সমাহার রয়েছে এখানে। এখানে আমি অনেককেই দেখেছি এক কাপ কফি নিয়ে অনেক সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে লেখালেখি করতে। অনেকের ধোঁয়ায়িত কফির কাপ ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সেই দিকে নেই কোন খেয়াল কারণ সে আপন মনে পড়ে যাচ্ছে কোন এক পেপারব্যাক উপন্যাস। আমাদের জন্য এই নিরিবিলি পরিবেশ ছিল কিছুটা অস্বস্তিদায়ক কারণ আমরা সেখানে দলবেঁধে গিয়ে বড় একটা টেবিলে বসে হৈহুল্লোড় করে আড্ডা দিতেই বেশী পছন্দ করতাম। তবে কথায় বলে, যস্মিন দেশে যদাচার – ফলে ধীরে ধীরে আমরাও সেই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলাম।
ল্যাংগুয়েজ ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাস থেকে বেইজিং-এর ডিপ্লোমেটিক এরিয়া চিয়েনকোয়ামেন যেতে হলে আমাদেরকে প্রথমে ৩৩১ কিংবা ৩৭৫ নম্বর বাসে চেপে যেতে হত শিট্রিমেন নামক বাস স্টেশনে। সেখান থেকে সাবওয়ে বা তিথিয়ে-তে চড়ে যেতে হত চিয়েনকোয়ামেন স্টেশনে। সাবওয়ে থেকে বের হয়ে কিছুদূর হাঁটলেই তবে পৌঁছানো যেত বেইজিং ফেন্ডশীপ স্টোরে। ফ্রেন্ডশীপ স্টোর ছাড়িয়ে আরেকটু হাঁটলে দেখা মিলত চিয়েনকোয়ামেনের বিখ্যাত সিল্ক মার্কেটের। এই মার্কেটের আসলে কোন সাইনবোর্ড কিংবা ফরমাল কোন নাম ছিল না। চিয়েনকোয়ামেন এলাকার শিউশুয়েইচিয়ে নামক এক গলির দুইপাশে ছিল সারি সারি ছোট ছোট দোকান। আর সেই দোকানগুলিতে পাওয়া যেত নানা ধরনের সিল্কের কাপড়-চোপড়, স্যুভেনিরসহ অন্যান্য এক্সোটিক আইটেম যেগুলো বেইজিং-এর অন্য কোথাও দেখা যেত না। মূলত বিদেশীরা ছিল এই দোকানগুলির কাস্টমার এবং তারাই এই মার্কেটের নাম দিয়েছিল সিল্ক মার্কেট। এই সব দোকানগুলিতে চলত চূড়ান্ত রকমের দর কষাকষি। অনেকটা আমাদের দেশের গুলিস্তান মার্কেটের মতন। এখানে বেচাকেনা হত ‘রেন মিন পি’ কারেন্সিতে। সেটার কারণেও বিদেশীরা এই দোকানগুলিতে ভিড় জমাত। এছাড়াও তারা তাদের ডলার কিংবা এফইসি ব্যাংকের থেকে প্রায় দেড় বা দ্বিগুণ রেটে এখানে ভাঙ্গিয়ে নিতে পারত। তবে যে সব চাইনিজেরা ডলার ভাঙ্গানোর ব্যবসা করত তাদের কোন দোকান ছিল না। তারা ছিল ভাসমান। তারা অনেক সময় তাদের কাস্টমারদেরকে হাতের কারসাজিতে টাকা কম দিত। তাই ডলার ভাঙ্গানোর সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হত। তারপরও এই মার্কেটের জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। চীন সরকারের বৃত্তির সাথে আমাদেরকে শীতের কাপড় কেনার জন্য এককালীন আশি রেন মিন পি দেয়া হয়। আমি আমার প্রথম উইন্টার জ্যাকেটটি এই মার্কেট থেকেই কিনেছিলাম। এছাড়াও শস্তায় বেশ কয়েকটা সিল্কের প্রিন্টেড শার্টও কেনা হয়েছিল এই মার্কেট থেকে। এই মার্কেটের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল যে এখানকার দোকানগুলি ছিল ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত। ব্যক্তি মালিকানায় ব্যবসার এই উদ্যোগ সেই সময়ে কম্যুনিস্ট চীনের জন্য একদম একটি নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার ছিল যেটা কিনা প্যারামাউন্ট লীডার দেং শিয়াওপিং প্রবর্তন করেন। সেই সময়ে দেং শিয়াওপিং-এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা হাঁটি হাঁটি পা পা করে অগ্রসর হতে শুরু করে। কালের বিবর্তনে এবং চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির সঠিক নেতৃত্বের কারণে চীন আজকে বিশ্বের একটি অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তির দেশে পরিণত হয়েছে। আর গলির ধারের সারি সারি ছোট ছোট দোকানের সেই সিল্ক মার্কেটটি আজ পরিণত হয়েছে একটি মাল্টি স্টোরিড প্লাজাতে। চীনের এই অর্থনৈতিক শক্তির উত্থানের শুরুটা আমাদের চোখের সামনে ঘটেছিল।
আমরা ১৯৮৭ সালে যখন বেইজিং-এ যাই চীন সেই সময়ে সবে মাত্র ‘কালচারাল রেভ্যুলেশন’-এর করাল থাবা থেকে বেরিয়ে এসেছে। চীনের প্রিমিয়ার পদে তখন রয়েছেন লি পেং, যিনি কিনা মাও সেতুং-এর আমলের প্রিমিয়ার চৌ এনলাই-এর পালক পুত্র। কিন্তু মূল ক্ষমতা রয়েছে প্যারামাউন্ট লিডার দেং শিয়াওপিং-এর হাতে। দেং শিয়াওপিং ইতিমধ্যে চেয়ারম্যান মাও-এর বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক দর্শন ঝেড়ে ফেলে দিয়ে কম্যুনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের ভিতর আমূল পরিবর্তন এনেছেন। কম্যুনিস্ট চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় হচ্ছে ‘কালচারাল রেভ্যুলেশন’ যা কিনা চীনের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। ১৯৪৯ সালে কম্যুনিস্ট চায়নার গোড়া পত্তনের পরপরই চেয়ারম্যান মাও সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেন যার মধ্যে ‘দ্য গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ ছিল অন্যতম। কিন্তু উপযুক্ত দূরদর্শিতার অভাবে এই প্রকল্পের ভরাডুবি হয় এবং স্মরণকালের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয় সারা চীন জুড়ে। এই দুর্ভিক্ষে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে পঞ্চাশ থেকে ষাট মিলিয়ন লোকের মৃত্যু ঘটে। ‘দ্য গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’-এর ব্যর্থতাকে অন্যের ঘাড়ে চাপানোর উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান মাও তখন কম্যুনিস্ট পার্টির ভেতর একদলকে ‘প্রতিবিপ্লবী’ বলে অভিহিত করলেন এবং তাদেরকে নির্মূল করার জন্য নতুন এক ফর্মূলা দিলেন। সমাজ থেকে ‘পুরাতন আইডিয়া’, ‘পুরাতন কালচার’, ‘পুরাতন প্রথা’ এবং ‘পুরাতন অভ্যাস’ – এই ‘চার পুরাতন’-কে দূর করার এই ফর্মূলাই ১৯৬৬ সালে ‘কালচারাল রেভ্যুলেশন’-এর সূচনা করে। শুরু থেকেই অবশ্য ‘কালচারাল রেভ্যুলেশন’-এর কন্ট্রোল চেয়ারম্যান মাও-এর চতুর্থ স্ত্রী চিয়াং ছিং তার তিন সহযোগীর সহযোগিতায় নিজ কব্জায় রাখেন। চিয়াং ছিং এবং তার তিন সহযোগীর এই সমন্বয় ইতিহাসে কুখ্যাত ‘গ্যাং অব ফোর’ বা ‘চার কুচক্রী’ নামে অভিহিত। এই সময় অবশ্য কম্যুনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা লিউ শাওচি এবং দেং শিয়াওপিং কালচারাল রেভ্যুলেশনের বিরোধিতা করেন। মাও-এর আলট্রা লেফটিস্ট পলিসির বিপরীতে কনভেনশনাল ইকোনমিক পলিসি নেয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করার কারণে তারা দুইজনই চেয়ারম্যান মাও-এর কোপানলে পড়েন। ফলে চেয়ারম্যান মাও-এর জীবদ্দশায় তাদেরকে দলের মধ্যে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৩ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রিমিয়ার চৌ এনলাই দেং শিয়াওপিং-কে চীনের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর জন্য বেইজিং-এ ফিরিয়ে আনেন। একই সাথে তিনি চেয়ারম্যান মাও-কে কনভিন্স করতে সমর্থ হন যে দেং শিয়াওপিং তার (চৌ এনলাই) মৃত্যুর পর প্রিমিয়ারের পদে বসার যোগ্যতা রাখেন। ফলে চেয়ারম্যান মাও দেং শিয়াওপিং-কে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারীতে কম্যুনিস্ট পার্টির অন্যতম ভাইস প্রিমিয়ার পদে নিয়োগ দেন। কিন্তু দেং শিয়াওপিং-এর এই উত্থান গ্যাং অব ফোর-এর সদস্যরা ভালো চোখে দেখেনি। ফলে দেং শিয়াওপিং-এর অবস্থান আবারও নড়বড়ে হয়ে পড়ে। কিন্তু ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে মাও সেতুং-এর মৃত্যু এবং সেই সাথে অক্টোবরে গ্যং অব ফোর-এর পতনের পর দেং শিয়াওপিং দলের ভেতর তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের কঠোর হাতে মোকাবিলা করা শুরু করেন এবং কালচারাল রেভ্যুলেশনের ভুলগুলি নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করার জন্য দলের সবাইকে উৎসাহিত করেন। একটি জাতির সর্বাঙ্গীন উন্নতির মূল চাবিকাঠি যে শিক্ষা সেটা সেই সময় দেং শিয়াও পিং খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই চেয়ারম্যান মাও-এর মৃত্যুর পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৭৭ সালে ইউনিভার্সিটিগুলোতে স্বাভাবিক শিক্ষাক্রম পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারণে চীন অর্থনৈতিকভাবে এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে যে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়েছিল সেটাকে পুষিয়ে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এটাই ছিল প্রথম পদক্ষেপ। শিক্ষার মাধ্যমে একটি জাতি যে উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম, আজকের চীন সেটাই প্রমাণ করে দেখিয়েছে।
বামপন্থী বিশেষ কোন নীতিকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোটাই যে বেশী গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোঝাতে দেং শিয়াওপিং তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন -‘বিড়াল সাদা না কালো সেটা দেখার বিষয় নয়, সে ইঁদুর ধরতে সক্ষম কিনা সেটাই বিবেচ্য’। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে চেয়ারম্যান মাও-এর নির্বাচিত উত্তরসূরি হুয়া কোয়াফেং-কে সরিয়ে তিনি দলের নেতৃত্বে চলে আসেন। দলের নেতৃত্বে এসেই দেং শিয়াও পিং তার বিখ্যাত ‘কায় গ খায় ফাং’ নীতির ঘোষণা দেন। চাইনিজ ভাষার চারটি শব্দ সম্বলিত এই নীতির সরল বাংলা অর্থ হচ্ছে, ‘খোলা-দুয়ার নীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন তথা উন্নয়ন’। উল্লেখ্য যে এই সময় অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে চীনের শতকরা নব্বুই জন লোকের দৈনিক আয় ছিল দুই মার্কিন ডলারেরও কম। প্রথম রিফর্ম শুরু হয় কৃষি ক্ষেত্রে। কালচারাল রেভ্যুলেশনের সময় গ্রামে গ্রামে যে কম্যুনাল খামার গড়ে উঠেছিল সেগুলিকে ব্যক্তি মালিকানার আওতায় আনা শুরু হয়। গ্রাম ভিত্তিক কৃষি খামারের সংস্কারের পর নজর দেয়া হয় শহরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতির। তারই ধারাবাহিকতায় বেশ কিছু কোস্টাল সিটিতে গড়ে তোলা হয় স্পেশ্যাল ইকোনমিক জোন যাদের মধ্যে গোটা হাইনান প্রভিন্স এবং শেনট্রেন, ট্রুহাই, শানথৌ, শিয়ামেন ইত্যাদি শহরগুলি উল্লেখযোগ্য। এইভাবে সমাজতান্ত্রিক বলয় থেকে চীনের সমাজ ধীরে ধীরে মার্কেট ইকোনমির দিকে যাত্রা শুরু করে এবং অচিরেই তার সুফল পেতে শুরু করে। ১৯৯০ সালে আমি ব্যক্তিগতভাবে হাইনান দ্বীপ এবং ম্যাকাউ-এর নিকটবর্তী ফুচিয়েন প্রভিন্সের শিয়ামেন শহর ভ্রমণ করেছিলাম। চীনের অন্যান্য শহরের চেয়ে সেখানকার জীবনযাত্রার মান যে অনেকখানিই উন্নত সেটা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছিল।
দেং শিয়াওপিং-এর নেতৃত্বে চীন যখন হাঁটি হাঁটি পা পা করে একটি পাকাপোক্ত অর্থনৈতিক বুনিয়াদের সূচনা করে ঠিক সেই সময়ে রাশিয়া তথা সমগ্র ইস্ট ইউরোপের অর্থনীতিতে ভাঙ্গন শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৮৮ সালে যখন তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি তেরো ডলারে নেমে আসে তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতির মূল ভিত্তিই ছিল তেল রফতানির উপর নির্ভরশীল। রুবেলের দাম যখন পাল্লা দিয়ে নিম্নমুখী তখন সোভিয়েত জনগণ উপায়ান্তর না দেখে অর্থ উপার্জনের জন্য নিজেরাই নানা রকম বুদ্ধি বের করা শুরু করে। তারই ফলশ্রুতিতে তারা মস্কো থেকে দলে দলে লাগেজ-ট্যুরিস্ট হিসেবে ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলে চড়ে বেইজিং-এ এসে উপস্থিত হয়। বেইজিং থেকে সস্তায় বড় বড় ব্যাগ ভরে বিভিন্ন ধরনের সিল্কের কাপড় এবং পোর্সেলিনের তৈজসপত্র কিনে তারা ফিরে যেত রাশিয়ায়। তবে বেইজিং থেকে মালামাল কেনার সময় তারা সবচেয়ে বেশী ভিড় জমাত চিয়েনকোয়ামেনের সেই সিল্ক মার্কেটে। আর আমরা তাদেরকে কাছ থেকে দেখার সাথে সাথে সাক্ষী হয়ে রইলাম একটি পরাশক্তির পতনের পদরেখার। (চলবে)
(লেখক পরিচিতি : কাজী সাব্বির আহমেদ বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বাংলাদেশে কলেজ ম্যাগাজিনে নিয়মিত কবিতা এবং সায়েন্স ফিকশন লিখতেন। চীনে অবস্থানকালে প্রবাসী জীবন নিয়ে বিচিত্রার ‘প্রবাস থেকে’ কলামে লিখতেন।)
