অমানবিক দাস প্রথা বিলুপ্তির ঘোর বিরোধী ছিলেন বেঞ্জামিন ভন

আর তাঁর নামেই নামকরণ করা হয় টরন্টোর নিকটবর্তী সিটি অব ভন এর!


খুরশিদ আলম
সিটি অব ভন। টরন্টোর ডাউনটাউন থেকে এর দূরত্ব ৩০ কিলোমিটারের মত। জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ। এটি টরন্টোর ঠিক উত্তরে ইয়র্কের আঞ্চলিক পৌরসভায় অবস্থিত। ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে কানাডার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শহর ছিল ভন এবং এই সময়ের মধ্যে এর জনসংখ্যা ৮০.২% বৃদ্ধি পেয়েছিল। এটি গ্রেটার টরন্টো এলাকার পঞ্চম বৃহত্তম শহর এবং কানাডার ১৭তম বৃহত্তম শহর।
এই শহরটির নামকরণ করা হয় বেঞ্জামিন ভন (Benjamin Vaughan) নামে এক ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্যের নামে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন শত শত দাসের মালিক। শুধু তাই নয়, তিনি সেই অমানবিক দাস প্রথা বিলুপ্তিরও ঘোর বিরোধী ছিলেন। আর এই ব্যক্তিকেই সম্মান জানানোর জন্য গ্রেটার টরন্টো এলাকার পঞ্চম বৃহত্তম শহরের নামকরণ করা হয় সিটি অব ভন! তার নামে আরও আছে সরকারী মালিকানাধীন পাঠাগার Vaughan Public Library এবং সরকারী মালিকানাধীন উদ্যান Benjamin Vaughan District Park. একটি স্কুলও ছিল শহরটিতে Benjamin Vaughan secondary school নামে।
সেকালে দাস প্রথার ভয়াবহতা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। সবাই কম বেশি জানেন কি রকম অমানবিক ও নৃশংস অত্যাচার করা হতো তাঁদের উপর। তাঁদের ন্যূনতম মানবাধিকার ছিল না। পশুর মতন জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হতো তাঁদেরকে। দাস মালিকদের কাছে তাঁরা ছিলেন গৃহস্থ বাড়ির পশুর মতোই। বেচা কেনা করা যেত তাঁদেরকে। কেবল ন্যূনতম খাদ্যের বিনিময়ে তাঁদেরকে দিয়ে করানো হতো বিভিন্ন ধরণের অমানুষিক সব পরিশ্রমের কাজ।
ভাবতে অবাক লাগে দাসদের রক্তচোষা এরকম একজন ব্যক্তির সম্মানে কানাডার একটি শহরের নামকরণ কি ভাবে করা হলো! তাছাড়া কানাডায় তাঁর কোনো অবদানও নেই। তিনি ছিলেন সেকালের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের আপার ক্লাসের একজন সদস্য এবং পার্লামেন্টের সদস্য। এ কারণে তাঁর নামে নামকরণ করা হয় এখানকার একটি শহরের। নামকরণের কাজটি করেছিলেন আপার কানাডার (বর্তমানে অন্টারিও) প্রথম লেফটেনেন্ট গভর্নর জন গ্রেভস সিমকো। সিমকো লেফটেনেন্ট গভর্নরের দায়িত্বে ছিলেন ১৭৯১ সাল থেকে ১৭৯৬ সাল পর্যন্ত।
বেঞ্জামিন ভন ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তাঁর জন্ম হয়েছিল জ্যামাইকাতে। কারণ তাঁর ব্রিটিশ ও এ্যাংলো-আমেরিকান বাবা মা সেই সময় থাকতেন জ্যামাইকাতে। ভনের বাবা ছিলেন একজন এ্যাংলো-আইরিশ ব্যবসায়ী। সেখানে তাঁদের কৃষি খামারসহ অন্যান্য ব্যবসা ছিল। আর সেখানেই কাজ করানো হতো শত শত কেনা দাসদের দিয়ে। পরবর্তীতে বেঞ্জামিন ভন নিজেই হয়েছিলেন এই দাসদের মালিক।
এই দাস মালিককে বছর কয়েক আগেও অন্টারিও’র সিভিক হলিডে উপলক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক সম্মান জানানো হয়েছিল ভন সিটিতে। প্রতি বছর আগস্ট মাসের প্রথম সোমবার অন্টারিওতে এই সিভিক হলিডে পালন করা হয়। নাগরিক ছুটির দিন এটি। এই দিনটিতে অন্টারিও’র অনেক পৌরসভা তাদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রাসঙ্গিক একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্বীকৃতি জানায়। ২০১৩ সালে ভন সিটি কাউন্সিল এই ছুটির দিনটি বেঞ্জামিন ভনের নামে উৎসর্গ করেছিল।
অথচ এই বেঞ্জামিন ভন মনে করতেন জ্যামাইকায় দাসপ্রথার অবসানের অর্থ হবে সেই দেশে সভ্যতার অবসান। তাঁর অভিমত ছিল দাসপ্রথা আফ্রিকানদের জন্য ভালো।
বেঞ্জামিনের এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় সভ্যতার সংজ্ঞা তাঁর বা তাঁর মত অন্যান্য শ্বেতাঙ্গ শাসক ও শোষকদের কাছে কি ছিল। মানুষকে ঠকানো, তাঁদের সম্পদ কেড়ে নেওয়া, তাঁদের মানবাধিকার হরণ, তাঁদেরকে পন্য হিসাবে ব্যবহার করা, প্রয়োজনে হত্যা করা এই সবই ছিল সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গদের কাছে সভ্যতার সংজ্ঞা। গোটা উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া আর অস্ট্রেলিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গিয়ে অতীতে পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গরা যে নৃশংস বর্বরতা চালিয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষকে হত্যা করেছে সেটা তাঁদের চোখে ছিল সভ্যতা বা সভ্যতার বিস্তার!
আজকের ভন সিটিতে শুধু শ্বেতাঙ্গরাই বাস করেন না। এখানে বাস করেন জ্যামাইকাসহ আফ্রিকার আরো অনেক দেশ থেকে আসা লোকেরা। এরা যখন জানতে পারবেন বা যাঁরা ইতিমধ্যে জেনে গেছেন এই বেঞ্জামিন ভন যাঁর নামে তাঁদের সিটির নামকরণ করা হয়েছে তিনি ছিলেন একজন দাস মালিক তখন তাঁদের প্রতিক্রিয়া কি হবে? ইতিবাচক নয় নিশ্চই। অথচ এই নামটি তাঁদেরকে প্রতিনিয়তই শুনতে হচ্ছে। এবং যতবার শুনছেন ততবারই ইতিহাস তাঁদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বেঞ্জামিন ভন কে ছিলেন। দাস যুগের ক্ষত তাঁদের মনে আজও বিদ্যমান। আর প্রতিদিন অতীতের সেই ক্ষতের মাঝে ভনের নামটি উষ্কে দিচ্ছে নতুন করে জ্বালা-যন্ত্রণা।
বেঞ্জামিনের অপচ্ছায়া থেকে মুক্ত হওয়ার একটি উদ্যোগ অবশ্য ইতিপূর্বে নেওয়া হয়েছিল ভন সিটিতে। সেটি ছিল স্থানীয় একটি সেকেন্ডারী স্কুলের নাম পরিবর্তন। বেঞ্জামিনের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য অতীতে এই স্কুলটির নামকরণ করা হয়েছিল তাঁর নামে। তবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্থানীয় সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের মিটিং এ একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল বেঞ্জামিনের নাম বাদ দেওয়ার জন্য। পরে সেই প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। কিন্তু নতুন নাম কি হবে সেই বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোন সিদ্ধান্ত হয়নি সেই সময়।
নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব উত্থাপনের আগে বেশ কয়েকমাস ধরেই অনেক শিক্ষার্থী এবং কমিউনিটির সদস্যগণ এগিয়ে এসেছিলেন তাঁদের বেদনাদায়ক অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য। দাস প্রথার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এবং এই দাস প্রথাকে বিলুপ্ত না করার পক্ষে সোচ্চার এক ব্যক্তির নামে একটি স্কুলের নামকরণ তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। ইয়র্ক রিজিয়ন ডিস্ট্রিক স্কুল বোর্ডের পরিচালক জুয়ানিতা নাথান ontherecordnews.ca কে বলেন, ‘আমরা জানি পরিবর্তনের কাজটি কঠিন এবং তা অস্বস্তিকরও হতে পারে। কিন্তু এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন যা আমাদের স্কুল সম্প্রদায়কে আরও নিরাপদ করে তুলবে এবং একটি প্রীতিকর পরিবেশ তৈরী করবে।’
এই জুয়ানিতা নাথান এবং আরেক ব্যক্তি ডেভিড শেরম্যান যিনি ইয়র্ক রিজিয়ন ডিস্ট্রিক স্কুল বোর্ডের ট্রাস্টি, তাঁরা উভয়েই বলেন, নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব পেশ করার সিদ্ধান্তকে কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের গোষ্ঠীগুলো সমর্থন করেছে। সমর্থন করেছেন কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের পিতামাতারাও।
উল্লেখ্য যে, স্কুলের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর প্রায় আট মাস লেগে যায় নতুন নামকরণে। গ্লোবাল নিউজ জানায়, ২০২১ সালের মার্চ মাসে ইয়র্ক রিজিয়ন ডিস্ট্রিক স্কুল বোর্ড স্কুলটির নতুন নাম রাখে ‘হোদান নালায়েহে সেকেন্ডারী স্কুল’। হোদান ছিলেন একজন সোমালি-কানাডিয়ান সাংবাদিক। তিনি ভন সিটিতে বাস করতেন পরিবার নিয়ে। কিন্তু ২০১৯ সালে সোমালিয়ার কিসমায়ো বন্দর নগরীর একটি হোটেলে অবস্থানকালে এক জঙ্গী হামলার শিকার হয়ে তিনি মারা যান। নৃশংস ঐ হামলায় তাঁর স্বামীসহ আরও ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। হোদান ছিলেন নারী অধিকারের একজন সোচ্চার প্রবক্তা।
উল্লেখ্য যে, ইতিপূর্বে ইয়র্ক রিজিয়ন স্কুল বোর্ডের শিক্ষা পরিচালক লুইস সিরিস্কোর ট্রাস্টিদের কাছে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন, ‘কোনও সন্দেহ নেই যে ভন শহরে বসবাসকারী এবং ভন সেকেন্ডারী স্কুলে পড়া কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের যারা বেঞ্জামিন ভনের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পেরেছেন বা ভবিষ্যতে যারা জানতে পারবেন এটি তাঁদের মানসিক সুস্থতার অনুভূতিকে প্রভাবিত করবে। তাঁরা এই স্কুলের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতে পারবে না।’
লুইস সিরিস্কোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, ‘বেঞ্জামিন ভনকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ বিরুদ্ধাচারী হিসাবেই দেখা উচিত। তিনি একজন কূটনীতিক বা পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন সে হিসাবে নয়। তাঁর নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে জাতিগত ন্যায়বিচারের প্রতি এবং বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ-বিরোধী বর্ণবাদ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করা হয়েছে এবং একই সাথে দায়িত্ব পালন করা হয়েছে।’
কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে একটি স্কুলের নাম পরিবর্তন করেই কি সেই দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল? বেঞ্জামিন ভনের নামে যে শহরটির নামকরণ করা হয় তার কি হবে? সেটি কি অপরিবর্তনীয়ই থেকে যাবে? যদি তাই হয় তবে তার অর্থ কি এই দাঁড়ায় না যে, ভন সিটির কর্তৃপক্ষ এখনও সেই দাস প্রথাকে মৌন সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন এবং একই সাথে সম্মান ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন সেকালের সব দাস মালিকদেরকে?
Canadian Jewish Congress এর সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং The Canadian Anti Hate Network এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এমিরিটাস বার্নি ফারবার গত ১১ জুন টরন্টো স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন “আপনি যদি একজন দৃশ্যমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বা অশে^তাঙ্গদের কেউ হন তাহলে ‘ভনে স্বাগতম’ সাইনবোর্ডটি দেখে আপনার কেমন লাগবে? কারণ আপনি জানেন যে এই ভন নামটি এমন একজন মানুষের যিনি তাঁর আমলে ছিলেন একজন দাস মালিক। একই সাথে তিনি দাস প্রথা বজায় রাখার জন্যও লড়াই করেছিলেন।”
বার্নি ফারবার স্কুলের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “এটি একটি সাহসী এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ছিল।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ইয়র্ক রিজিয়ন ডিস্ট্রিক স্কুল বোর্ড স্বীকার করেছে যে বেঞ্জামিন ভনকে সম্মান জানানো অব্যাহত রাখা ক্রমবর্ধমান বহুবর্ণের শিক্ষার্থীপূর্ণ স্কুল এবং বহুবর্ণের সম্প্রদায়ের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
বার্নি ফারবার প্রশ্ন রেখে বলেন, “কর্তৃপক্ষ যদি সঙ্গত কারণে একটি স্কুলের নাম পরিবর্তনের কাজটি করতে পারেন তবে তাঁরা সেই একই কারণে কেন পারবেন না সিটির নামটি বদলাতে? একটি শহরের নাম পরিবর্তন অতীতের ভয়াবহতা দূর করবে না সত্যি। তবে এটি আমরা কানাডায় কি ধরনের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করছি সে সম্পর্কে একটি শক্তিশালী সংকেত পাঠাবে।”
উল্লেখ্য যে, ভনের সাবেক মেয়র Maurizio Bevilacqua ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সিটির নাম পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন না। এরকম আরও অনেকেই আছেন যাঁরা ভনের নাম পরিবর্তনের পক্ষে নন। এরকমটা আমরা দেখেছি ডান্ডাস স্ট্রিট এর নাম পরিবর্তনের বেলায়ও। যার নামে ঐ সড়কের নামকরণ করা হয় তিনি ছিলেন একজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ। তাঁর পুরো নাম হ্যানরি ডান্ডাস। একসময় ব্রিটেনের ‘হোম সেক্রেটারি’ ছিলেন। দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা অবস্থায় তিনি দাসদের স্বাধীনতা প্রদানের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। তাঁর এই ভূমিকার কারণে ব্রিটেনে দাস ব্যবসা বন্ধ হতে অতিরিক্ত আরো ১৫ বছর সময় লেগেছিল। তিনি সে সময় দাসদের বিরুদ্ধে হয়ে উঠেছিলেন মহা অত্যাচারী এক ব্যক্তি।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ডান্ডাসের নামে টরন্টোতে রয়েছে একাধিক স্থাপনার নাম। এর মধ্যে আছে ডান্ডাস স্কোয়ার, ডান্ডাস সাবওয়ে স্টেশন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যা ডান্ডাস স্ট্রিট নামে পরিচিত। অথচ এই বিষয়গুলো নিয়ে বহু বছর কেউ কোন প্রতিবাদ করেননি। অন্টারিও’র বর্তমান প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ সরকার বা আগের লিবারেল সরকারও বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। এড়িয়ে গেছে স্থানীয় মিউনিসিপাল সরকারগুলোও। তবে ইতিপূর্বে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর টরন্টো নিবাসী আর্টিস্ট ও অ্যাক্টিভিস্ট অ্যান্ড্রু লোচহেড অনলাইনে একটি আবেদন (পিটিশন) পেশ করেন ডান্ডাস স্ট্রিটের নাম বদল করার জন্য। ২০২০ সালের জুন মাসে পেশ করা ঐ আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৫ হাজারেরও বেশি লোক স্বাক্ষর প্রদান করেন। তখন থেকেই ডান্ডাসের কুকর্মের কথা মিডিয়াতে আসতে থাকে যা এতদিন ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল উপনিবেশবাদীদের ‘ভাবমূর্তি’ পরিচ্ছন্ন রাখার স্বার্থে।
ঐ সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও ডান্ডাসের নাম বাদ দেয়ার জোরালো দাবী উঠে। আর তখন টরন্টো সিটি কর্তৃপক্ষও নড়েচড়ে বসে ডান্ডাসের বিষয়ে। তারপর সিদ্ধান্ত হয় নাম পরিবর্তন করা হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেউ কেউ এ বিষয়ে এখনও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা নাম পরিবর্তনের খরচের বিষয়টি অতিরঞ্জন করে প্রচার করছেন এবং বলে বেড়াচ্ছেন দেশে আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলোতে মনোযোগ দেওয়া দরকার।
এরকমভাবে উপনিবেশবাদীদের ‘ভাবমূর্তি’ পরিচ্ছন্ন রাখার স্বার্থে আমরা হয়তো দেখবো বেঞ্জামিন ভন এর নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব উঠলেও এর বিরোধিতা করার লোকের অভাব হবে না। মনে রাখতে হবে ভন ছিলেন কানাডার ক্ষমতাসীন শ্বেতাঙ্গদের পূর্বপুরুষ। তাঁদের চোখে তাঁর ‘অবমাননা’ হয় এমন কাজ অধিকাশং উত্তরসূরি শ্বেতাঙ্গরা স্বেচ্ছায় করবেন এমনটা আশা করা যায় না। তবে বিরোধিতা আসলেও এ কাজটি করতে হবে। মানবতার স্বার্থেই করতে হবে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুগ যুগ ধরে প্রায় দেবত্বের আসনে বসিয়ে এই বর্ণবাদী, দাস ব্যবসায়ী আর গণহত্যা পরিচালনাকারীদের জন্মদিন- মৃত্যুদিন পালন করা হয়ে আসছে। এদেরকে ‘জাতীয় বীর’ বা ‘মহানায়ক’ হিসাবে ইতিহাসের পাতায় স্থান দেয়া হয়েছে, এদের ‘অবদান’-কে মূর্ত্যমান করার জন্য মূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।
কিন্তু দিন পাল্টেছে। যদিও তা বহুযুগ পরে। লোকজন এখন অনুধাবন করতে পারছেন, এতদিন ধরে তাঁরা যাঁকে অতিমাত্রায় সম্মানের আসনে বসিয়ে রেখেছিলেন তিনি আসলে তার যোগ্য নন। কারণ তাঁরা জোর করে মানুষকে দাস বানিয়েছিলেন, ধর্মান্তরিত করেছিলেন, তাঁদের সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিলেন। কৃষ্ণবর্ণের মানুষদেরকে ঘৃণা করার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন যা আজও বিদ্যমান অনেক দেশ ও সমাজে। তাঁদেরকে শোষণ করেছিলেন, বৈষম্যমূলক আচরণ করেছিলেন। দখলদারিত্বের জন্য গণহত্যার ঘটনাও ঘটিয়েছেন তাঁরা অতীতে।
ম্যাকগিল ইউসিভার্সিটির আর্ট ইতিহাসের অধ্যাপক চার্মাইন নেলশন ইতিপূর্বে বলেন, দাস মালিক ও বর্ণবাদীদের স্মরণে নির্মিত বিভিন্ন ভাস্কর্য বা স্মৃতিস্তম্ভগুলো অর্থহীন, তুচ্ছ জড় পদার্থ নয়। বরং এই ভাস্কর্যগুলো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কৌশলগতভাবে বর্ণবিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য একটি তাবিজ হিসাবে ব্যবহার করছেন।
আজ সময় এসেছে ঐ সব ‘প্রাতঃস্মরণীয়’ পাষণ্ড ব্যক্তিদের আসল চেহারা জনগণের সামনে তুলে ধরার। তাঁদের ভাস্কর্য সরাবার। তাঁদের স্মরণে যে সকল স্থাপনা, স্কুল ও সড়কের নামকরণ করা হয়েছে সেগুলোর নাম বদলাবার। আর এর জন্য গড়ে তুলতে হবে জোর আন্দোলন।


খুরশিদ আলম
সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রবাসী কণ্ঠ