কানাডায় বহুসংস্কৃতিবাদ ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে
গবেষণা বলছে-দেশটির পরিচয়কে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করছে বহুসংস্কৃতিবাদ
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, জুলাই ৫, ২০২৬ : সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কানাডাবাসী মনে করেন যে, বহুসংস্কৃতিবাদ দেশের পরিচয় গঠনে ইতিবাচক অবদান রেখেছে। খবর সিবিসি নিউজের।
গত জুন মাসের ৩০ তারিখে প্রকাশিত ‘কানাডিয়ান ডাইভারসিটি স্টাডি ২০২৬’শিরোনামের গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করে টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ‘এনভায়রনিক্স ইনস্টিটিউট’ এবং ‘গ্লোবাল মাইগ্রেশন ইনস্টিটিউট’।

ইতিবাচক অবদান রেখেছে। ছবি: কানাডা.সিএ
৪৯ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি গত ৪ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিলের মধ্যে অনলাইন জরিপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেন ৬,৮১৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক কানাডিয়ান।
সিবিসি জানায়, অভিবাসন বিষয়ে পরিবর্তিত মনোভাবের মধ্যেই এই ফলাফল এসেছে, যা কোভিড-১৯ মহামারীর সময় এবং তার পরবর্তী বছরগুলোতে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কানাডার রাজনীতিতে একটি বিভেদ সৃষ্টিকারী বিষয় হয়ে উঠেছিল। প্রকৃতপক্ষে, ডাইভার্সিটি বা বহুসংস্কৃতিবাদ বিষয়ক এই সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী কানাডিয়ানদের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ অভিবাসন সম্পর্কে পুরোপুরি ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু যারা এই বিষয়টি নিয়ে বেশি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, তাদের মধ্যেও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিশ্বাস করেন যে, কানাডার উপর একটি ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে বহুসংস্কৃতিবাদের।
অভিবাসন নিয়ে সাম্প্রতিক তীব্র প্রতিক্রিয়া
গত বছর কানাডার জনসংখ্যা ০.২ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায়, কনফেডারেশন গঠনের পর সেই প্রথমবার দেশটিতে লোকসংখ্যায় হ্রাস দেখা গিয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে জনসংখ্যা আবারও ০.১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
জাস্টিন ট্রুডোর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন, মহামারীর পরে শ্রম ঘাটতির কারণে ফেডারেল সরকার অভিবাসন ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সরকার ‘অস্থায়ী বাসিন্দাদের’ উপর বিধিনিষেধও শিথিল করে, যার ফলে আন্তর্জাতিক ছাত্র এবং অস্থায়ী বিদেশী কর্মীদের সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে, টানা তিন বছর ধরে জনসংখ্যা বছরে প্রায় দশ লক্ষ করে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এই আকস্মিক বৃদ্ধি দেশের আবাসন বাজারের পাশাপাশি অবকাঠামোকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও এই পরিস্থিতির সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছিল এবং যুব বেকারত্ব ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। ২০২৫ সালের শেষের দিকে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল যে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কানাডিয়ান নতুন অভিবাসীর সংখ্যা কমানোর পক্ষে ছিলেন।
তীব্র সমালোচনার মুখে তখন ট্রুডো পরবর্তীতে দেশে অস্থায়ী ও স্থায়ী উভয় ধরনের বাসিন্দাদের আগমন কমানোর জন্য নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছিলেন। পরে মার্ক কার্নি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে দেন।
উল্লেখ্য যে, বহুসংস্কৃতিবাদ বিষয়ক সমীক্ষাটি এই ফলাফলগুলোকে সমর্থন করে, যেখানে প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন উত্তরদাতা বলেছেন যে, তাদের মতে অভিবাসনের হার অনেক বেশি এবং কানাডার অভিবাসীদের প্রতি পুরোপুরি স্বাগত জানানো উচিত নয়।
তা সত্ত্বেও, একটি বড় অংশ—৬০ শতাংশ—বলেছেন যে কানাডার উচিত তাদের পুরোপুরি স্বাগত জানানো। এই মনোভাবের সঙ্গে একমত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের হার ছিল বেশি, ৭৩ শতাংশ, যেখানে দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬৫ শতাংশ এবং অ-অভিবাসীদের ক্ষেত্রে ৫১ শতাংশ।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ
সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, অভিবাসী বাছাই করার সময় কানাডার উচিত তাদের উৎস দেশের চেয়ে যোগ্যতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া। পঁয়ষট্টি শতাংশের মতে, অভিবাসীরা কোথা থেকে এসেছেন সেটার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে তাদের শিক্ষা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ।
দীর্ঘদিন ধরেই এই উদ্বেগ রয়েছে যে, কানাডার ক্রমহ্রাসমান জন্মহার ও মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সামাল দেওয়ার জন্য নীতিনির্ধারকরা কেবল আরও বেশি মানুষ নিয়ে আসার দিকেই মনোনিবেশ করেছেন।
কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন যে, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে শুধু আরও অভিবাসীকে প্রবেশের অনুমতি দিলেই চলবে না, আমাদের আরও বেশি কিছু করতে হবে।
২০২৪ সালের C.D. Howe Institute publication এর একটি প্রকাশনা অনুসারে, কানাডার তুলনামূলকভাবে দুর্বল মূলধনী বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে দেশটি বর্ধিত অভিবাসনকে নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে সক্ষম নয়।
ওই সমীক্ষা অনুসারে, অভিবাসন নীতির একমাত্র লক্ষ্য যদি হয় শ্রমশক্তি বৃদ্ধি করা, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে গড় জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারবে না। এতে বলা হয়েছে, লক্ষ্য হওয়া উচিত সমগ্র জনগোষ্ঠীর মানব পুঁজি বা দক্ষতার স্তর বৃদ্ধি করা।
নাগরিকদের পরিচয়ের জন্য কানাডা এখনও গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বহুসংস্কৃতিবাদ সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের এক বিরাট অংশ, অর্থাৎ ৮৭ শতাংশ, তাদের আত্মপরিচয়ের বোধের জন্য কানাডাকে খুব বা কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন।
গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, চলমান সমাজ সমীক্ষাগুলো বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশের অবস্থা সম্পর্কে রাজনীতিবিদ ও নাগরিকদের অবহিত করতে সাহায্য করতে পারে।
