নিভৃতে

রীনা গুলশান

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

২০

সকাল থেকে নাটালি আর ডেভিড সারার পায়ে পায়ে ঘুরছে। কি যন্ত্রণা-

: মাম্ আমরা তোমার সাথে যাবো, ভাইয়াকে ৫ বছরের মত দেখি না। তুমি ক্যানো এমন করছো?

: কিন্তু আমি একটু আগে যেতে চাচ্ছি। ২ দিন পর তোরা যাবি।

স্টিভেন এরপর মিন মিন করে বললো,

: ওকে, আমরা না হয় ২ দিন মায়ের কাছে থাকবো। তারপর তোমার গ্রীণ সিগন্যাল পেলেই না হয় শ্বশুরালয়ে যাবো।

এবারে সারা হেসে ফেললো। এমন সময় সারার সেল ফোনের রিং টোন বেজে উঠলো। (এটা ৫ বছর আগে ফাবিয়ান সেট করে দিয়েছিল ‘Come September’এর সেই বিখ্যাত মিউজিকটা), এখন আবার কে ফোন করলো। সারার যে কত কাজ। কাপড়-চোপড় গুছাবে, রান্না করবে। কাল সকালের ফ্লাইটে সারার যাবার টিকিট স্টিভেনই বুক করে রেখেছে। এখন আবার স্টিভেন ডেভিড আর নাটালিও সুর ধরেছে যাবার জন্য। সারা বুঝেই পাচ্ছে না যে কি করবে? এদেরকেও বিমুখ করতে কেমন যেন বাধো বাধো লাগছে। আবার ফাবিয়ানের কথা ভেবেও রীতিমত ভয় করছে। কারণ, তার মন-মর্জির তো কোন ঠিক নাই। এই মেঘ, এই বৃষ্টি!

: মাম্, ফোন ধরছো না কেন? নাটালি বললো।

সারা ফোন অন করলো। ওপাশ থেকেই কেউ বললো-

: হ্যালো, শুধু এই একটি শব্দ শুনেই সারার শরীর যেন জমে গেল। মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের করতে পারলো না। ফাবিয়ান তার ফাবি তাকে ফোন করেছে। তার নয়নের মণির তাকে মনে পড়েছে? হায় আল্লাহ, এতো যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। একই সাথে অজস্র আনন্দ-বেদনা সারার হৃদয় মোথিত করে চোখে নেমে এলো বন্যার মত কান্নার ঢল। নাটালি হতভম্ভ হয়ে মায়ের কাণ্ড দেখছে। ডেভিডও অবাক হয়ে গেছে, কার ফোন এলো? মা এমন করছে কেন? শুধু স্টিভেনই বুঝতে পারলো এটা ফাবিয়ানের ফোন। স্টিভেন-এর চোখেও অশ্র“ এলো। একমাত্র সেই-ই জানে, এই ফোন কি ভীষণ কাক্সিক্ষত। সারার জন্য। মনে হয় জন্ম জন্মান্তরের অপেক্ষার পর তাদের ঘরের সমস্ত চৌকাঠ ভরে গ্যালো রাঙা আলোয়। বিবাহিত জীবনের এই সমগ্র সময়টাতে সারা তাকে সমগ্র সুখ দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। করছে। তবু একমাত্র স্টিভেনই জানে কোন কোন সময়ে সারার দেহটা এখানে থাকে, কিন্তু মন তার কোন সুদূরে ফাবিয়ানের আবর্তে ঘুরপাক খায়-

‘সহজ লোকের মত কে চলিতে পারে?

পথে চলে পারে পারাপারে

উপেক্ষা করিতে চাই তারে

মড়ার খুলির মত ধরে

আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মত ঘোরে

তবু সে মাথার চারিপাশ।

সকল লোকের মাঝে ব’সে

আমার নিজের মুদ্রাদোষে

আমি একা হতেছি আলাদা

আমার চোখেই শুধু ধাঁধাঁ

আমার পথেই শুধু বাঁধা।

আলো অন্ধকারে যাই মাথার ভিতর

স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে।

হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়।

আমি তারে পারি না এড়াতে।

সব কাজ তুচ্ছ হয়, পন্ড মনে হয়

সব চিন্তা প্রার্থনার সকল সময়

শূন্য মনে হয়

শূন্য মনে হয়।

(জীবনানন্দ দাশ)

সারার সেই শূন্য হৃদয়ের ভেতরে তখন সত্যিই কোন আর বোধ কাজ করে না। আর স্টিভেনের মনে অপরাধ বোধ কাজ করে। মনে হয় তারই জন্য সারার এত দূরে আসা। তাইতো ফাবির এতো অভিমান। আর সারার এই নিদারুণ হতাশার ক্রন্দন। স্টিভেন তখন ভেবে পায় না, কিভাবে যে সে এই প্রকট সমস্যার সমাধান করবে। যদিও সারা তাকে মোটেও বুঝতে দিতে চায় না। কিন্তু সে যে সারাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। তাই ভালোবাসার মানুষকে বুঝতে হলে মুখের ভাষার খুউব প্রয়োজন হয় না। চোখের ভাষা, হাতের একটু স্পর্শেই বোঝা যায় গোটা অন্তকরণ। হঠাৎ একটা অস্ফুট রোদনে স্টিভেনের চিন্তা সূত্র ছিন্ন হয়-

: ফাবি, আমার ফাবি- তুই… তুই.. কেমন আছিস সোনা। সারা কি বলবে বুঝতে পারে না। এবারে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে।

: ভালো আছি মাম্মাম্ (এটা ফাবির অনেক আদরের ডাক) ফাবিয়ানেরও কণ্ঠ বুজে আসে। মনে হয় এক সাগর রক্তাক্ত যন্ত্রণা পাড়ি দিয়ে এইমাত্র ফাবি তীরের বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে।

ছেলেবেলায় যখনি তার কোন আবদার থাকতো বা টনি আঙ্কেলের সাথে দূরে কোথাও যেতো, বাড়িতে ফিরেই সারার কোমর জড়িয়ে ধরে বলতো, মাম্মাম্ আমি এসেছি। মাম্মাম্ আমার এটা চাই, ওটা চাই। আমি ওখানে বেড়াতে যাবো। ইত্যাকার আবদারে ভরপুর সেই ডাক।

আজ এ্যাদ্দিন পর সেই ছেলেবেলার তীব্র ভালোবাসায় দিনগুলি ফাবির অন্তরেও ঝাঁপিয়ে এলো। ফাবিও কথা বলতে পারছিল না। তবুও সে বললো-

: মাম্, তুমি কবে আসছো? আমিতো ৪/৫ দিন হলো এসেছি।

: হ্যাঁ সোনা, আসছি শিঘ্রি।

: নাটালি, ডেভিড আর পাপাও আসছে তো?

সারা তার কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ছেলেবেলায় তাঁর আর আমান্ডার প্রাণান্ত চেষ্টা সত্ত্বেও কখনো ফাবি, স্টিভেনকে পাপা বলে ডাকেনি। স্টিভেন নিজেও চেষ্টার ক্রটি করেনি। কিন্তু ফাবিয়ান সারা জীবন স্টিভেনের সাথে ভাববাচ্যে কথা বলেছে।

: মাম্মাম্ পাপাকে একটু ফোনটা দাও তো।

সারা চোখ ঈশারায় স্টিভেনকে ডেকে ফোন দিল। স্টিভেন বেচারারও একই হাল। রীতিমত মনের ভেতরে কাঁপাকাঁপি শুরু হয়েছে তার। কারণ বড় হবার পর যখনই তার সাথে কথা বলেছে, তা শুধু প্রতি উত্তরই বলা চলে। আর তাও ভাববাচ্যে। তাই ফাবিয়ানের সামনে স্টিভেন গেলেই নিজেকে তার বরাবরই আসামী মনে হতো। কানাডা যাবার পর দু’বারই বোধ হয় কথা বলেছিল, তাও সে নিজেই ফোন করেছিল। ফাবিয়ান টুকটাক কথা বলার পর জরুরি কাজের কথা বলে ফোন রেখে দিয়েছিল। আর আজ এ সব কি হচ্ছে? বুঝতে পারছে না স্টিভেন। সূর্যটা কোন দিক দিয়ে উঠেছে, কি জানি? তবু কাঁপা হাতেই ফোন ধরে বললো-

: হ্যালো।

: হাই পাপা, কেমন আছো?

: ভা… ভা…লো আছি (পাপা? স্টিভেন ঠিক শুনেছে তো? নাকি ভুল শুনছে? আজ সৃষ্টিকর্তা এ কোন খেলায় মেতেছে)। … এতটা বছর ধরে এই পাপা ডাকটা শুনার জন্য স্টিভেনের যে কি প্রাণান্তকর চেষ্টা ছিল, আর আজ কিনা এতটা বছর পর ডাকটা শুনেও সে হাসতে পারছে না। তার চোখ ভরে গ্যালো নোনা জলে। সবাই দেখে ফেলবে তাই কান্নাগুলো গিলে কোন মতে বললো-

: কেমন আছো বাবা?

: ভালো আছি পাপা (ফাবিয়ানের আজ প্রথম বারের মত পাপা ডাক। তাই ডাকতে এত ভালো লাগছে যে, সে নিজেও জানে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডেকে ফেলছে বোধহয়। তবুও মন ভরছে না। মনে মনে সারা জীবন ডেকেছে স্টিভেনকে পাপা, কিন্তু অভিমানে সামনাসামনি কখনোই ডাকতে পারেনি। তাই বোধহয়। কি এক অপার্থিব আনন্দে ফাবির কণ্ঠের কাছে তির তির করছে। এই একটি ডাক সে যে কোন দিন ডাকতে পারেনি। নিজের বাবাতো কথা বলার আগেই তাকে ছেড়ে জনমের মত চলে গ্যালো। জীবনে একটি বারের জন্যও পিছু ফিরে চাইলো না। আর মায়ের উপর তাই এত বেশি পজেসিভ হয়ে পড়েছিল যে একটি বারও মায়ের কথা, মায়ের জীবনের কথা ভাবেনি। নাওমীই তাকে কতবার বলেছে, মায়ের জীবনটা একবার ভাবো। তোমার বাবার প্রতারণার কথা একবার ভাবো। ভাবো যে ঐ অতটুকুন একটা মেয়ে কি করতো, যদি আবার বিয়ে না করতো? তাও সে ৫টি বছর অপেক্ষা করেছে। ভাবো একবার। আর তোমার নন্নার কথা ভাবো। কোন মা কি সহ্য করতে পারে যে তার মেয়ে এই রকম অসুখি একাকি জীবনযাপন করে? ভাবো তো আজ তোমার মায়ের একটি সংসার হয়েছে। যে সংসারের প্রত্যাশিত প্রতিটি মেয়ের চোখের স্বপ্ন হয়ে থাকে। হৃদয়ের মাঝখানে। তারপরও তোমার মা তোমাকে একাকি ফেলে চলে যায়নি। তোমাকে বার বার নিতে চেয়েছে। তুমিই যাওনি। অভিমানে যাওনি। নন্নার কথা ভেবে যাওনি। তোমার পাপাও তোমাকে ভালোবাসতো কিন্তু তুমিই তাকে নিষ্ঠুর আঘাতে বারবার ফিরিয়েছো। অতীতের সেইসব কথা ভেবে ফাবির আজ লজ্জাই করছিলো। তাইতো হড়বড় করে কথা বলছিল-

: পাপা, তোমরা সব কবে আসছো। আমিতো ৪/৫ দিনের মতো এসেছি।

: হ্যাঁ বাবা, আমরা খুউব শিঘ্রি আসছি। (কাল সকালেই যাবে এটা বললো না, কারণ নাটালি আর ডেভিড মানা করছিল ঈশারাতে। তারা তাদের ভাইয়াকে সারপ্রাইজ দিবে)।

: ঠিক আছে, আসবার আগে বলবে- আমি তোমাদের এয়ারপোর্টে পিকআপ করতে যাবো। আর আসবার পথে জেনেলিয়া দাদীকেও নিয়ে আসবো। তাহলে সবাই মিলে বেশ হৈ চৈ হবে।

: জেনিলিয়া দাদী? স্টিভেন যেন পাথর হয়ে গ্যালো! বলে কি? ছেলেটার আজ হলো কি?

: হ্যাঁ পাপা, তা না হলে তোমার আবার পিছুটান থাকবে। এই কয়দিন দাদীও আমাদের সাথেই থাকবে।

: ওকে সোনা, ওকে বাবা, নাটালি আর ডেভিডের সাথে একটু কথা বল। আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।

: হ্যাঁ পাপা, অবশ্যই ওদের সাথেও কথা বলবো। আসবার পর তোমার আর আর মাম্মাম্-এর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।

: কি সারপ্রাইজ ফাবি?

: উহু, এখন বললে তো আর সারপ্রাইজ থাকবে না।

: ওকে, ওকে, এই ওদের সাথে কথা বল।

এরপর তিন ভাই বোনের স্পিকারের ফোনালাপ শুনতে থাকলো সারা আর স্টিভেন। যতটা শুনছিল তারা, তার থেকে অনেক বেশি কাঁদছিল। আর সে কান্না ছিল আনন্দের কান্না। আজ স্টিভেন সারার থেকেও অনেক বেশি ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছিল। সারাও বার বার স্টিভেনকে দেখছিল। সে নিজেও এতটা বছরে স্টিভেনকে এতটা ইমোশনাল হতে দেখেনি। তার মুখটা বর্ষার শেষ হয়ে যাওয়া আকাশের মত স্বচ্ছ ও আলোকিত লাগছিল।

কিন্তু একমাত্র স্টিভেনই জানে আজ সে ক্যানো এতট আবেগে ভাসমান। সে সারাকে পাগলের মত ভালোবাসে। কিন্তু সে জানে না, সারা তাকে কতটা ভালোবাসে? হয়তো সারাও তাকে সত্যিই ভালোবাসে। কিন্তু তার সমগ্র আত্মা পড়ে থাকে ফাবিয়ানের চারপাশে। মুখে কিছুই বলে না সে। কিন্তু মুখে বলতেই বা হবে কেন? সত্যিকারের ভালোবাসায় মুখে বলতে হয় না। তার চোখের দৃষ্টিই অনেক কিছু বলে দেয়। আর তাই স্টিভেন সর্বদাই মনে করেছে সারার এই অপরিমেয় দুঃখের ভার তার উপরেও অনেকটাই বর্তায়। সে যদি সুইডেনে না আসতো তাহলে হয়তোবা মা-ছেলের ভেতরে এতটা অভিমানের পলি জমতো না। আস্তে আস্তে হয়তোবা এ্যাদ্দিনে অভিমানের দেয়াল ভেঙ্গে যেত।

তাই তো আজ স্টিভেন নিজেকে অনেকটাই বিজয়ী মনে করছে। মনে হচ্ছে এতদিনে তার বিবাহিত জীবন কানায় কানায় পূর্ণ হতে চলেছে। সারার মুখ দেখতে স্টিভেনের এত ভালো লাগছে। এমনিতেই সারা অসম্ভব সুন্দরী। এমনকি এখনো মনে হয় না, সারার তিনটে এত বড় বড় বাচ্চা!

: তাহলে চলো আমরা সব গুছিয়ে নেই। হঠাৎ সারা আনন্দিত কণ্ঠে বলে উঠলো।

এতোক্ষণে ওদেরও ফোনালাপ শেষ হয়েছে।

: ইয়াহু মাম্, আমরাও তাহলে যাচ্ছি। দেখলে তুমিতো নিতেই চাচ্ছিলে না। ডেভিড চিৎকার করে আনন্দিত কণ্ঠে বললো-

: ওকে বাছারা যাও, যার যার কাপড় গুছিয়ে নাও। সারাও উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললো।

হঠাৎ দেখে নাটালি খিল খিল করে হাসছে। সাথে স্টিভেনও। একটু পর ডেভিডও সেই হাসিতে যোগ দিল। সারা খুউব বোকা বোকা মুখ করে চেয়ে আছে-

: এই কি হলোরে তোদের? এত হাসির কি হলো, কি তোরা কি যেতে চাচ্ছিস না?

: মাম্ আমরা কি জন্য হাসছি, তুমি শুনলে তুমিও হাসবে।

: কি ব্যাপার?

: মাম্ ভাইয়া যেদিন থেকে আমাদের ফোনে বলেছিল, সে ইটালি আসছে। আমরা তো সেদিন থেকেই রেডি হচ্ছি, একটু একটু করে। আমাদের সব গুছানো শেষ।

: কি, তাহলে যে বড় সকালে তোরা আমার অনুমতি চাইছিলি ইটালি যাবার জন্য? তার মানেটা কি?

: ওহ্ মাম্, পাপা না হি… হি… একদম পুরানা এ্যাক্টর। হি… হি… হা… হা…

: তবেরে, তোদের সব কয়টাকে আজ এমন হাল করবো।

সব কয়টা ছুটে পালালো। একটু পর আবার হাসতে হাসতে একটা ডার্ক চকলেট রঙের বড় স্যুটকেস নিয়ে এলো তিনজন এক সাথে। তারপর স্যুটকেস খুলে সারাকে দেখালো, তারা কি সব শপিং করেছে ফাবির জন্য। মাই গড, জুতাই ২ জোড়া, সার্ট, প্যান্ট, ২টা জ্যাকেট (তাও ব্রান্ডেড), টাই। তারপর একদম নিচু থেকে নাটালি বের করলো একটা ফ্রেম। সারা অবাক হয়ে দেখলো, একটা চৌকা কালো কাঠের বর্ডার দেওয়া ফ্রেম তাতে একটা ছবি। ওমা, সারারতো মনেই ছিলো না, তখন ফাবিয়ান জাস্ট মিউজিকের উপর গ্রাজুয়েট করেছে। এক সামারে তারা গিয়েছিলো ইটালি। ছবিটা ডোরিন তুলেছিলো স্টিভেনের ক্যামেরা দিয়ে। বেশ কয়েকটি পোজে তুলেছিল। এই ছবিটা এত সুন্দর। মাঝখানে ২টা চেয়ারে সারা আর স্টিভেন বসা, পেছনে ফাবিয়ান আর ডেভিড দাঁড়ানো। আর নিচে উঁবু হয়ে নাটালি বসা। সবারই দাঁত বের করে হাসি। ফাবিয়ান আবার ডেভিডের কাঁধ ধরে আছে। এই সময়ের একটা অন্য রকমের পোজের ছবি বিশাল ফ্রেমে ওদের লিভিং রুমের দেয়ালে আছে। এবং তাদের যত ফ্রেন্ড আসে এবং জিজ্ঞাসা করে ফাবিয়ানের কথা সবার আগে স্টিভেন বলে উঠবে, ‘আমার বড় ছেলে’। আর মজার ব্যাপার, প্রতিবারই সারার হৃদয়ের ভেতরে এক অসম্ভব ভালো লাগায় স্টিভেনের জন্য দ্রবীভূত হয়।

আজও ছবিটা দেখে সারার চোখ ভিজে উঠলো। এবং নাটালি বললো-

: মাম্, এটাও পাপার আইডিয়া। আর ভাইয়ার জন্য প্রতিটি গিফট পাপাই কিনেছে। তবে আমাদের নিয়ে, তোমাকে লুকিয়ে।

এবারে সারাও হাসলো।

: ওকে, আবারো একটা দারুন সারপ্রাইজ আছে। আমিও তোমাদের বলছি না, বলেই সারাও এবার বাচ্চাদের মত দুলে দুলে হাসলো।

স্টিভেন অবাক হয়ে সারার এই মধুর হাসি দেখছিল। কি যে মিষ্টি লাগছিল ঐ মুহূর্তে সারাকে। তার সারাকে অসম্ভব আদর করতে ইচ্ছা করছিল। ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে নিজেকে সম্বরণ করলো।

: মাম্, এটা খুবই খারাপ। না, না, আমরা দেখতে চাই এখুনি।

: ইয়েস মাম্, আমি এক্ষুনি দেখতে চাই। নাটালি নাকি সুরে বললো।

: আমি ওদের সাথে সম্পূর্ণ একমত- স্টিভেনও জিদ্দি কণ্ঠে বললো।

সারাও ওদেরকে অনেকক্ষণ নাচালো। বললো, না একেবারে ইটালি যেয়ে দেখাবে। অবশেষে যেন হার স্বীকার করলো। আসলে মনে মনে দেখাতেই চাইছিল। অনেক সময় অনেক আনন্দও লুকিয়ে রাখা খুবই কষ্টকর হয়। তাই অনেক দিন ধরে হৃদয়ের ভেতরে এই অপার্থিব আনন্দ বয়ে বেড়াচ্ছিল একাকি সে। তাই মহানন্দে তার ক্লজেট থেকে একটি লাল রঙের অতি সুদৃশ্য বক্স নিয়ে এলো। বক্সটা এনে স্টিভেনের হাতে দিল। স্টিভেন বেশ বোকা বোকা মুখ করে ছোট্ট লাল রঙের সুদৃশ্য বক্সটা খুললো। তারপর তার চোখ দুটো চমকে উঠলো হাসিতে। একটি আংটি। অসম্ভব সুন্দর একটি ওভেল সেপ শ্যাপায়ার, তাকে ঘিরে আছে হিরের দ্যুতি চারপাশ দিয়ে। নাটালি বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে মুখটা কিঞ্চিত ফাঁক করে চেয়ে রইলো। তারপর নিজের অগোচরেই বলে ফেললো-

: Wow মাম্, Its amazing মাম্।

: হ্যাঁ মাম্, সত্যিই সুন্দর- ডেভিডও বললো। কিন্তু কার জন্য? ভাইয়ারতো কোন মেয়েই এখনো ঠিক নাই। ডোরিনও তো ছুটে গ্যালো।

: ডোরিন কখনই ফাবির ছিল না। কেউ যদি সত্যিই কাউকে ভালোবাসে, সেতো চলে যেতে পারে না। এ আংটি আমি অন্য কারো জন্য কিনেছি। সারা খুব আনন্দিত মুখে বললো।

: আমি জানি তুমি কার জন্য কিনেছো? তবে আংটিটা সত্যি আমার খুউব পছন্দ হয়েছে। স্টিভেন স্মিত মুখে বললো। এখন বাচাধনের মনটা স্থির হলেই বাঁচা যায়!

: হু। ঠিকই বলেছো। আমি নিজেও খুউব চিন্তায় আছি- বলেই বাচ্চাদের হাক দিলো, যাও সবাই ঘুমাতে যাও। কাল আমাদের ৭টার সময় ফ্লাইট।

সবাই ঘুমাতে চলে গ্যালো। সারা ঘরবাড়ি গুছাতে, মুছতে শুরু করলো। কাজের আর শেষ নাই। সারা ভেবেছিল একা যাবে, তাই বেশ কয়েক ভাগে রান্না করে রেখেছিল। এখন সেগুলো বক্সে ঢুকিয়ে ডিপ ফ্রিজে রেখে দিল। কিচেন খুউব ভালো করে মুছে রাখলো। মনের আনন্দে কাজ করতে করতে বহু দিন পর সারা এমনকি গুন গুন করে গানও গাইলো।

মনে হচ্ছে হৃদয়ের ভেতরে সুখের অনেকগুলি বলাকা ডানা মেলেছে। সারার মনে পড়ে না, এতটা তৃপ্তির ভার তার হৃদয়ে কখনোই কি ভর করেছিল? বরং সব আনন্দের মাঝেই তার গোটা জীবনে একটা কাঁটার খোঁচা রয়েই গিয়েছিলো। সেটা অবশ্য স্টিভেনও বুঝতে পেরেছে। আজ প্রথম সারার আনন্দে কোন বিবমিষা নাই।

রীনা গুলশান

রীনা গুলশানটরন্টো
gulshanararina@gmail.com
(
লেখক রীনা গুলশান বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স। ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিকসাপ্তাহিক এবং মাসিকে তার কবিতাছোটগল্পপ্রবন্ধরম্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে কানাডার বিভিন্ন বাংলা পত্রিকাতেও। তিনি ‘প্রবাসী কণ্ঠ’ ম্যাগাজিন এর একজন নিয়মিত কলামিস্ট।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *