বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারের দায়ে কানাডায় ২ জন বাঙালি রেস্তোরাঁ মালিক দোষী সাব্যস্ত

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক,  আগস্ট ৮, ২০২৬ : কানাডার সাসকাচোয়ান প্রভিন্সের দুই ব্যক্তি তাদের রেস্তোরাঁয় কর্মরত এক বাংলাদেশি নারীকে শোষণ করার দায়ে মানব পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। খবর সিবিসি নিউজের।

সাসকাচোয়ানের প্রাদেশিক আদালতে বিচারক মিগেল মার্টিনেজ রায় ঘোষণার পর গতকাল শুক্রবার ৪৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ মাসুম ও ৫৫ বছর বয়সী সোহেল হায়দারকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

বিচারক মার্টিনেজ বলেন, “অভিযুক্ত দুজনই নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য মহিলাটির অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছে।”

মাসুম এবং সোহেল দুজনেই ঐ মহিলার নিয়োগকর্তা হিসেবে তাদের ক্ষমতার  অপব্যবহার করেছে এবং তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেছিল। তাছাড়া মহিলার ভয় ছিল হয়তো তাকে কানাডা ছেড়ে চলে যেতে হতে পারে। আর এই ভয়কে কাজে লাগিয়েছিল মাসুম ও সোহেল। মূলত, তারা মহিলার কাজের অনুমতিপত্র আটকে রাখা বা বাতিল করে দেওয়া, কিংবা কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার হুমকি দিয়ে এটি করেছিল।

গত জুন মাসে সাচকাচুনের প্রাদেশিক আদালতের সামনে পার্কিংয়ের টাকা দিচ্ছেন সোহেল হায়দার (বামে) ও মোহাম্মদ মাসুম। গতকাল শুক্রবার, মানব পাচারের দায়ে তারা দুজনই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। (ছবি : হানা স্প্রে/সিবিসি)

বিচারক মার্টিনেজ বলেন, মাসুম আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে মহিলাটির পাসপোর্ট নিয়ে নেয় এবং “যতক্ষণ না সে তার সাথে যৌনমিলনে রাজি হয়” ততক্ষণ সেই পাসপোর্ট তার কাছে আটকে রাখে।

মাসুমের বিরুদ্ধে আরও তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়েছিল। মার্টিনেজ তাকে সবকটিতেই দোষী সাব্যস্ত করেন। উল্লেখ্য যে, তার মতে মাসুম ওই নারীকে বিভিন্ন সময়ে আটবার যৌন নিপীড়ন করেছিল।

আদালতের জারি করা প্রকাশনা নিষেধাজ্ঞার কারণে মহিলাটির পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না।

মার্টিনেজ বলেছেন, ওই মহিলা ২০২২ সালের আগস্টে আপাতদৃষ্টিতে স্বল্পকালীন ছুটির জন্য বাংলাদেশ থেকে টরন্টোতে এসেছিলেন, কিন্তু তার ‘আসল উদ্দেশ্য’ ছিল কানাডায় থেকে যাওয়ার একটি উপায় খুঁজে বের করা।

মহিলা এক পর্যায়ে জানতে পারেন যে, অস্থায়ী বিদেশী কর্মী হিসেবে চাকরি পেলে তিনি তার থাকার মেয়াদ বাড়াতে পারবেন এবং অবশেষে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে সাসকাচুয়ানে আসেন সোহেল হায়দারের পরিচালিত একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করার জন্য।

কিন্তু সোহেলের কাছে তখন ঐ মহিলাকে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি অনুমোদন ছিল না। তারপরও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং বলা হয় যে, তার শ্রমের বিনিময়ে সোহেল তাকে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন এবং প্রতি মাসে ১,০০০ ডলার পারিশ্রমিক দেবেন।

মার্টিনেজ বলেছেন, মহিলা সপ্তাহে ছয় দিন দীর্ঘ সময় কাজ করতেন রেস্তোরাঁয়, কিন্তু সোহেল তাকে কখনো পারিশ্রমিক দেননি।

প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্টের সদস্যের উদ্বিগ্নতা ‍ও সহযোগিতা

উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালের শরৎকালে সোহেলের রেস্তোরাঁটিতে ওই মহিলার সঙ্গে স্থানীয় প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্টের সদস্য ডাগ স্টিলের তিনবার দেখা হয় খাবার পরিবেশন করার সময়। মার্টিনেজ বলেন, “পার্লামেন্ট সদস্য ডাগ স্টিল তখন ওই মহিলাটির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।” সম্ভবত তিনি তখন কোন কারণে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন মহিলাটি বিপদের মধ্যে আছে।

এর মধ্যে ২০২২ সালের নভেম্বরে, সোহেল মহিলাটিকে তার এক বন্ধু মাসুমের পরিচালিত টিসডেলের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করার জন্য পাঠান। সেখানেও চুক্তি ছিল যে, মাসুম তাকে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে এবং প্রতি মাসে ১,০০০ ডলার বেতন দেবে।

মার্টিনেজ বলেন, তখন থেকে ২০২৩ সালের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঐ মহিলা সপ্তাহে ছয় দিন ১২ ঘণ্টার শিফটে কাজ করতেন এবং প্রতিদিন দুপুরের খাবারের জন্য আধা ঘণ্টা বিরতি পেতেন। মহিলাটির একমাত্র ছুটির দিনে মাসুম সাধারণত তাকে রেস্তোরাঁর সরঞ্জাম কেনার জন্য তার সাথে বাজারে যেতে বাধ্য করতেন।

এদিকে প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্টের সদস্য ডাগ স্টিল মহিলাটিকে নিয়ে তখনও উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং তিনি তার এই উদ্বেগের কথা তৎকালীন টিসডেল এলাকার পার্লামেন্টের সদস্য হিউ নারলিনকে জানান। মার্টিনেজ বলেন, নারলিন তখন টিসডেলে অবস্থিত মাসুমের সেই রেস্তোরাঁয় যান এবং সেই সময় মহিলাটি যখন তাকে খাবার পরিবেশন করতে আসেন তখন তিনি একজন সমাজকর্মীর সাথে যোগাযোগের তথ্য সম্বলিত একটুকরো কাগজ ও তার নিজের বিজনেস কার্ডটি মহিলাটির হাতে তুলে দেন গোপনে।

মহিলাটি পরে ঐ সমাজকর্মীর সঙ্গে কথা বললেন। তার কথা শুনে ঐ সমাজকর্মীও তখন তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

অবশেষে মহিলাটি তার কাজের অনুমতিপত্র পেয়েছিলেন, কিন্তু সেটি ছিল একটি ‘ক্লোজড ওয়ার্ক পারমিট’, যার ফলে তাকে মাসুমের রেস্তোরাঁর বদলে স্থানীয়  এলরোজের শহরের একটি নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁয় কাজ করতে হতো।

মার্টিনেজ বলেন, তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর ঐ সমাজকর্মী ও প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্টের সদস্য ডাগ স্টিল মিলে সেই মহিলাকে তার পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে আনার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। সেই পরিকল্পনা পরে তারা তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করেন।

সোহেল ও মাসুমকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে

রায় দেওয়ার সময় বিচারক মার্টিনেজ বলেন, তিনি প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্টের সদস্য ডাগ স্টিল ও সমাজকর্মীর সাক্ষ্যকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেছেন। তিনি ভুক্তভোগী মহিলাটিকেও ‘বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য’ বলেও মনে করেছেন।

তবে সোহেল ও মাসুম আত্মপক্ষ সমর্থনে আদালতে সাক্ষ্য দেন এবং ওই নারী কখনো তাদের রেস্তোরাঁয় কাজ করেননি বলে দাবী করেন। আর মাসুম যৌন নিপীড়নের অভিযোগও অস্বীকার করেন।

মার্টিনেজ বলেছেন, সোহেলের সাক্ষ্য তার কাছে “অবিশ্বাস্য, কখনও কখনও  অস্পষ্ট এমনকি মাঝে মাঝে এড়িয়ে যাওয়ার মতো মনে হয়েছে।” তিনি আরো বলেন, “মাসুমকে আমি বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্য মনে করিনি।”

উল্লেখ্য যে, কানাডায় মানব পাচারের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন চার বছরের কারাদণ্ড।

বিচারক মার্টিনেজ সোহেল আর মাসুমকে হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাদের সাজা ঘোষণার শুনানির তারিখ নির্ধারণের জন্য তারা আগামী সপ্তাহে আদালতে ফিরে আসবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *