শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি

নজরুল ইসলাম

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

একটা দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আদর্শ সংজ্ঞা হল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা ব্যাপক অসন্তুষ্টি । তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলিতে প্রায়শই রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা যায়। অতীতের ইতিহাস থেকে দেখা গেছে, এই অসন্তুষ্টিকে  কেন্দ্র করে   বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জনসাধারণ রাস্তায় নেমে এসে গণ মিছিল, ভাঙচুর,জ্বালাও পোড়াও  করে: এতে  দেশের কল-কারখানা, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, জিডিপি ( গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট )  হ্রাস পায়,  বিদেশিদের নিকট সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়, এবং  সরকারের পতনের প্রবণতা বাড়ায় । এছাড়াও, একটি সরকারি পরিবর্তনের ঘটনা থেকে পরবর্তী পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অব্যাহত  থাকলে দেশের জনগণ এবং সরকার কাজ করার প্রবণতা হারিয়ে ফেলে ; দেশে অর্থনৈতিক মন্দা  দেখা দেয়।  

রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা যাই হোক না কেন, যদি একটি দেশকে সংঘাত মুক্ত রাখা যায়, শাসনতন্ত্রের  আমূল পরিবর্তন সম্পর্কে চিন্তা করার প্রয়োজন না হয়, তবে জনগণ কাজ, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের দিকে মনোনিবেশ করতে পারে। স্থিতিশীল সরকার  দেশে থাকলে, দেশের জনগণ শান্তিতে থাকে ; শিল্পে, ব্যবসা বাণিজ্যে , শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রগতি এবং  প্রতিযোগিতা একমাত্র শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল  সরকারের পক্ষে সম্ভব।  যেসব দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা  এবং উন্নত জীবনযাত্রার অবস্থা রয়েছে, তাদের স্থিতিশীল দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইউরোপের দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি রয়েছে, তার কারণ ও সব দেশে গণতন্ত্রের চাকা বার বার পাল্টাতে হয় না, জনগণ নিশ্চিন্তে কাজ করে। সরকার জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করে দেশকে  সুনির্দিষ্ট পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। 

জার্মানির অর্থনৈতিক অবস্থার দিকে তাকালে আমরা কি দেখতে পাই ? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের  পর  একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ, কিভাবে পরিশ্রম করে উন্নত বিশ্বের  প্রথম সারির দেশ হিসাবে,  গত ৭৫ বৎসরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।  শুধু কি তাই ? ইউরোপের প্রায় সব কটা দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল; ওদের  সরকার ও জনগণ কঠোর পরিশ্রম করে এগিয়ে নিয়েছে। 

গত কয়েক বৎসরে ২৭টি দেশ মিলে (EU) ইউরোপ ইউনিয়ন ভুক্ত হয়েছে এবং একমাত্র কারেন্সী ইউরো (ইংল্যান্ড কে বাদ দিয়ে) করেছে।  নিজেদের মধ্যে মুক্তবাজার নীতি চালু করেছে,  সবাই মিলে মিশে কাজ করে যেভাবে  এগিয়ে গিয়েছে, তা থেকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে।  

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নীতিগুলির  মধ্যে শ্রমজীবী  মানুষ, পণ্য, পরিষেবা এবং মূলধনের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজ করে;  ন্যায়বিচার ও গৃহ বিষয়ে আইন প্রণয়ন; এবং বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্য ও আঞ্চলিক উন্নয়ন সম্পর্কিত সাধারণ নীতি বজায় রেখে চলেছে ।  ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলির মধ্যে ভ্রমণের জন্য পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ বিলুপ্ত করা হয়েছে।  এই সদস্য দেশগুলি  নিয়ে গঠিত গোষ্ঠী যা অর্থনৈতিক ও আর্থিক ইউনিয়নকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করেছে এবং ইউরো মুদ্রা ব্যবহার করেছে।

সাধারণ পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির মাধ্যমে, ইউনিয়নটি বাহ্যিক সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে একটি ভূমিকা তৈরি করেছে। বাহিরের কোনো দেশ,  ইউনিয়নভুক্ত যে কোনো দেশকে আক্রমণ করলে একযোগে সবাই তার প্রতিরক্ষার জন্য এগিয়ে আসার নীতি নির্ধারণ করেছে; এতে সবার নিরাপত্তা জোরদার  হবে।   

ইউরোপীয় ইউনিয়ন  সারা বিশ্বে স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন পরিচালনা করে এবং জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, জি-৭ এবং জি-২০ তে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্বব্যাপী প্রভাবের কারণে, ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কিছু পণ্ডিতরা একটি উদীয়মান পরাশক্তি হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এটা একটা সাহসী পদক্ষেপ যা নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে নেবে।  

আফ্রিকা এবং এশিয়ার কিছু কিছু দেশের মধ্যে  সব চেয়ে বেশি সমস্যা ; কারণ হিসাবে বলা যায় এ সব দেশগুলিতে শিক্ষার মান নিম্ন, মানুষ গণতন্ত্রের  মূল্য বুঝে না, অর্থনীতি সবচেয়ে অস্থির। এক সময় যা একটি প্রতিশ্রুতিশীল অর্থনীতি বলে মনে করা হয়েছিল তা সম্প্রতি সঙ্কটে পড়েছে; উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে সোমালিয়া,লিবিয়া,সিরিয়া,ইরাক, আফগানিস্তান এবং আরো অনেক ।   

আফ্রিকার দুর্বল অর্থনীতির জন্য বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে: ঐতিহাসিকভাবে,আফ্রিকার অনেক দেশ ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদের কবলে থাকায় নিজেদের ইচ্ছানুসারে  বিশ্বের অনেক অংশের সাথে বাণিজ্য করার সুযোগ পায়নি, তাছাড়া এ সব দেশে বেশিরভাগ মানুষ উপজাতীয় গ্রামীণ সমাজে বাস করত;  ইউরোপীয় উপনিবেশ  শেষ হলেও পরবর্তী শীতল যুদ্ধ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি  হওয়াতে সঠিকভাবে এগোতে পারে নি। তাছাড়া ও এ সব দেশগুলির আর্থিক সংকট,গণতন্ত্র বাস্তবায়ন ,বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাত, নিম্নমানের শিক্ষা অনেকাংশে দায়ী।    

এক সময় আফ্রিকাকে বিশ্বের দরিদ্রতম অধ্যুষিত মহাদেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো । যাইহোক, বিশ্বব্যাংক আশা করে যে বেশিরভাগ আফ্রিকান দেশ ২০২৫ সালের মধ্যে “মধ্যম আয়ের” অবস্থানে পৌঁছাবে ।

কিছু আফ্রিকান রাষ্ট্র  GDP  উচ্চ বৃদ্ধির হার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে তারা স্থিতিশীল, তবে বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল আফ্রিকান রাষ্ট্রেরও উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে।  স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা থাকলে, যে কোনো অনুন্নত দেশ ও বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম।

ভারতে ১৯৪৭ সন থেকেই স্থিতিশীল সরকার রয়েছে।  নেহেরু,ইন্দিরা এবং রাজীব গান্ধী পরিবার দেশটিকে  ৩৫ বৎসর শাসন করেন। গত ৭৫ বৎসরের ইতিহাসে ভারতে  স্থিতিশীল সরকার  দেশ পরিচালনা করছে।  ভারতের লোকসংখ্যা ১.৩০ বিলিয়ন বা তারও  বেশি যা পৃথিবীর লোকসংখ্যার দিক থেকে  প্রথম।  এ দেশে ৮০% লোক হিন্দু ,১৪% মুসলিম এবং ২.৫% খ্রীষ্টান ও বাকি অন্য ধর্মের লোক।  এ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র  রয়েছে; এত বড় দেশ, ভোটাভোটির মাধ্যমে সরকার গঠন করা হয়। এ দেশে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আছে বলে, গত ৭৫ বৎসর গণতান্ত্রিক সরকার  সম্ভব হয়েছে।  

ভারতের সংবিধান ১৯৫০ সালে কার্যকর হয়, যা দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। রাষ্ট্র প্রযুক্তিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, বহুবিধ ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীর কোনওটিকেই অগ্রাধিকার দেয় না। ভারতের গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত এবং কয়েক দশক ধরে জাতীয় ও রাজ্য সংসদের জন্য সঠিক ভাবে নির্বাচন দিতে সক্ষম হয়েছে।      

ভারত বিশ্বের একটি বড় অর্থনীতি, উন্নয়নশীল ও  দ্রুত উদীয়মান দেশ এবং এর  অর্থনীতি গত দুই দশক ধরে খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান হল আইটি(IT) সেক্টর এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। IT তে দক্ষ লোক দেশে এবং বিদেশে কাজ করে দেশকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক উন্নত করেছে।    ভারত  গত কয়েক বৎসরে, কয়েক লক্ষ দক্ষ শ্রমিক  বিদেশে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ওদের অর্থনীতি মন্দা ছিল, গত ২৫ বৎসরে জিডিপি হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দক্ষ শ্রমিক বাজার সৃষ্টি করা :

দক্ষ শ্রম: এর জন্য শ্রমিকদের নির্দিষ্ট প্রতিভা থাকতে হবে যা  শিল্পে বা অফিসে  ব্যবহৃত হয়; ইঞ্জিনিয়ার, ওয়েল্ডার, ইলেক্ট্রিশিয়ান, কম্পিউটার এবং আরও  অনেক   ধরণের  কাজ যাদের বিশেষ চাহিদা পূরণের জন্য অত্যন্ত বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়।

অদক্ষ শ্রম:   এমন কর্মীদের বোঝায় যাদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতার অভাব রয়েছে। এই কাজগুলি দক্ষ শ্রম কাজের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এ কাজ করতে কোনও  স্কুল, কলেজ বা প্রযুক্তিগত বিশেষ ধরণের বিদ্যার  দরকার পড়ে না।

সব সময় উন্নত দেশগুলিতে দক্ষ শ্রমিক খুঁজে বেড়ায় ; ইউরোপ,আমেরিকা,অস্ট্রেলিয়া, বা কানাডার মতো উন্নত দেশগুলিতে দক্ষ শ্রমিকের অভাব এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এই শ্রমিক খুঁজে নিজেদের দেশে কর্মসংস্থান বা স্থায়ী ইমিগ্রেশন দিয়ে রেখে দেয়।    যাদের কাজের দক্ষতা থাকে, তাদের জন্য কাজ খুঁজে পাওয়া বা ইমিগ্রেশন নেয়া কঠিন কিছু না।

অনুন্নত দেশের দক্ষ শ্রমিকদের অনেকেই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় হতাশ হয়ে উন্নত দেশে সুযোগ –সুবিধার লোভে পাড়ি জমায় । এমন ও দেখা গিয়েছে, সরকারি/ আধা –সরকারি বা বেসরকারি কর্মচারীদের  উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইউরোপ/আমেরিকায় পাঠানো হয়েছে,   সরকারের পয়সায় পড়াশুনা শেষ করে দেশে আর ফেরত যায় নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে, অনুন্নত দেশে দক্ষ শ্রমিক কোথায় পাবে ?  

মূল কথা, একটা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর দেশের অর্থনীতি , বিদেশী বিনিয়োগ এবং জনগণের আস্থা থাকলে আপনাতেই দেশ উন্নতির দিকে ধাবিত হয়।  দেশ ও সরকার জনগণের আর্থিক ও নিরাপদ জীবন ব্যবস্থার   অঙ্গীকার দিলে জনগণ দেশেই নির্বিঘ্নে বিনিয়োগ করতে বাধ্য।  যে সব দেশে  সরকার জনগণের আর্থিক ও জীবনের নিরাপত্তা  দিতে ব্যর্থ হয়, শিক্ষিত, বিত্তবান  লোক বসে না থেকে বাহিরে চলে যায় ।

আমাদের দেশে স্বল্পকালীন  শীত, ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারী পর্যন্ত;  শীতের মৌসুমে সাইবেরিয়া ও অন্যান্য দেশের পাখি এসে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে থাকে।  মানুষের স্বভাব ও অনেকটা পাখির মতোই।  কানাডা, ইউরোপ,  আমেরিকায় বা যেখানে নিজে ও ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালো থাকবে, দেশের অর্থ এনে  বিনিয়োগ করে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং বাস্তবে ও তাই হচ্ছে।   এই কানাডা এবং আমেরিকাকে রেফিউজি (উদ্বাস্তু)  দেশ বলা হয়; এ সব দেশে সারা বিশ্বের শিক্ষিত এবং অর্থ -সম্পদশালিরা এসে ভিড় জমিয়েছে, যার দরুন এ সব দেশে আজকাল বাড়িঘরের দাম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।  

 কানাডাকে বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল অর্থনীতিগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।  কানাডা একটি সংসদীয় গণতন্ত্র এবং  সাংবিধানিক রাজতান্ত্রিক দেশ। 

কানাডা বেশ কয়েকটি দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে  করেছে । মুক্ত বাজার(Free trade) নীতি অবলম্বন করে, আমদানি ও রপ্তানি অর্থনীতিতে অবদান রাখছে; যদিও কানাডা অনেক দেশের সাথে ব্যবসা করে, তবে ৮০%  বাণিজ্য অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

নজরুল ইসলাম

টরন্টো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *