নিভৃতে
রীনা গুলশান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
১৭
অনেকক্ষণ আগে নানী জোর করে বড় এক মগ গরম দুধ খাইয়ে গেছে। দুধের মধ্যে আবার ১ চা চামচ মধু দিয়েছে। নানী বলে এতে শরীরে প্রচুর এনার্জি আসে। ক্লান্তি দুল হয়। ঘুমও ভালো হয়। বিশেষ করে কানাডাতে যাবার পরতো কথাই নাই। প্রতি রাতে শোবার আগে ফোন দেবে, ও নিজে বা নন্না। কিন্তু নানী এক বারের জন্যও ভুলবে না বলতে, দুধটা খেয়ে নে, মধু দিতে ভুলিস না যেন।
এটা নিয়ে সিসিলিয়া প্রথম প্রথম খুউব হাসতো। পরের দিকে অবশ্য কেয়ার করতো না। তার চরিত্রের এটাই প্রধান দিক ছিলো, কিছু কেয়ার না করা। নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকা। আর তার চারপাশে এক ধরনের ‘ ফ্যান্টাসি’ নিয়ে সে বসবাস করতো। জীবনের কোন কিছুই সিরিয়াসলি না নেবার পণ করে জীবনকে অতিবাহিত করছে। আর নাওমী ঠিক তার বিপরীত।
নাওমীর কাছে গেলেই মনে হয় মহাসমুদ্রের পাশে বসে আছে। যেমন গভীর তেমনিই তার বিস্তার। নাওমীর চরিত্রের গভীরতায় ফাবিয়ান বারবার বিভ্রান্ত হয়েছে। আসলে এগুলো ফাবিয়ানের জীবনেরই নষ্ট অতীত। সেই অতীতের কাছে বার বার ও হেরে গেছে। কোন কিছুই গভীরভাবে ভাবতে শিখেনি। বাবা ফ্রাঙ্কের উপর অজানিত ঘেন্নায় এতটাই বিভ্রান্ত ছিল তার বাল্যকাল যে, জীবনের ভালো দিকগুলো তাকে উদ্ভাসিত করলেও বার বার পতিত হয়েছে নিম্নের দিকে। মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফাবি, একি তবে তার নষ্ট জ্বিনের প্রতিক্রিয়া। ফ্রাঙ্ক যেভাবে তার মা সারাকে প্রতারিত করেছে, সেও কি তার থেকে মুক্তি পেয়েছে!
না হলে বাবা যদিও তার মাকে প্রতারিত করেছে কিন্তু তার মা কি তাকে কম ভালোবাসা দিয়েছে? আর নানা আলবার্ট বারটুচি? সে তো শুধু ভালোবাসাই নয়, তার জীবনের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিও ফাবিয়ানের নামেই দিয়ে গেছে। এমনকি তার নিজের মেয়ে সারাকে তেমন কিছুই দিয়ে যায়নি। ব্যাংকের কিছু টাকা তার মায়ের নামে দিয়ে গেছে। আর ২৫ বছর পর্যন্ত তার সম্পত্তি দেখাশুনা করবে তার নন্না আমান্ডা বারটুচি। আর ২৫ বছর বয়সে ফাবিয়ান তার সম্পত্তি নিজেই দেখাশুনা করবে।
যদিও ফাবি কখনো সম্পত্তির দিকে ফিরেও তাকায়নি। সব ‘টনি চাচাই’ দেখাশুনা করে। অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং আন্তরিক এই টনি টাচা। প্রতিটি পাই পয়সা সে তার নানীকে বুঝিয়ে দেয়। নানী অবশ্য এই সব অর্থনৈতিক বিষয়ে ফাবির সাথে আলোচনা করতে গেলে ফাবি উড়িয়ে দ্যায়। তার যখন টাকার দরকার, তখন শুধু নন্নাকে বলে, কত টাকার দরকার?
ফাবিয়ানের আজও ভাবলে খারাপ লাগে যখন যে কাটিনজিরোতে মিউজিকের উপর পড়তে গেলো, তখন সে প্রয়োজনেরও অতিরিক্ত টাকা উড়িয়েছে। নানী কোথা থেকে টাকা যোগাড় করতো, কোন দিন সে ভাবেনি। পড়াশুনার টাকার কথা বলে আসলে প্রচুর ঘুরাঘুরিও করেছে। বন্ধুদের পাল্লায় পড়লে যা হয়। মাও তখন ওকে প্রচুর টাকা দিত। আর ওর বন্ধুরা সবাই মোটামুটি বেশ স্বচ্ছল পরিবারের ছিল। রায়ান তো ছাত্রাবস্থায় ইটালির বিখ্যাত স্পোর্টস কারই কিনে ফেললো। যদিও ওটা সেকেন্ডহ্যান্ড ছিল। অবশ্য নাম মাত্র সেকেন্ডহ্যান্ড। রায়ান গাড়িটা কিনে ওদের সুবিধাই হয়েছিল। প্রচুর ঘোরাঘুরি করেছে ঐ গাড়িতে। রোমেও ঘুরে এসেছিল। তারপর অন্যান্য বিখ্যাত শহর সবই তারা ঘুরে বেড়িয়েছে রায়ানের গাড়িতে করে। ওরা ৪ জন। জেসন, রায়ান, রবার্ট আর ফাবিয়ান। বাকি ৩ জন অবশ্য ভাগে ভাগে তেলের খরচা দিত। রবার্টটা অবশ্য খুবই কৃপণ স্বভাবের ছিল। রবার্ট এক একটি ইউরো এইভাবে খরচা করতো যেন, ১ মিলিয়ন ইউরো খরচা করছে।

হঠাৎ অনেক পুরানো একটা কথা মনে করে ফাবিয়ান নিজে নিজেই হো… হো… করে হেসে উঠলো। ওরা তখন একই এপার্টমেন্টে থাকতো। যেহেতু, সবাই সবার সিক্রেট মোটামুটি জানতো।
রবার্ট তার নিজস্ব ইউরো রাখবার জন্য ছোট্ট একটা স্টিলের দেরাজ কিনেছিল। ওটার মধ্যে সব পয়সা-কড়ি রাখতো। তো একদিন ওরা তিনজন পরিকল্পনা করে দেরাজ (কাটা তার দিয়ে কিভাবে জানি জেসন খুলেছিল) খুলে সব টাকা সরিয়ে আবার বন্ধ করে রেখে ওরা মন দিয়ে পড়াশুনা শুরু করলো। রবার্ট ঐ দিন বেশ রাতে এলো। এসেই যথারীতি ওর ছোট্ট দেরাজ খুললো চাবি দিয়ে। তারপরই বিকট চিৎকার ওদের সবার নাম ধরে। ওরা সবাই নির্বিকারভাবে এলো এবং রায়ান হেড়ে গলায় উল্টো চিৎকার করে বললো-
: কিরে, রাত দুপুরে এসে বিকট স্বরে চিৎকার জুড়েছিস ক্যানো?
: না, মানে- এই দ্যাখ আমার দেরাজে কোন পয়সাই নাই। এখন স্বর একটু নেমে গেল। কারণ এপার্টমেন্ট আবার রায়ানের নামে নেওয়া।
: মানে কি? পয়সা নাই? টাকা তো আছে?
: না, না, দ্যাখ তোরা সবাই একটা পয়সাও নাই। রবার্ট বেচারা প্রায় কান্না কান্না মুখ।
: তো আমাদের এসব বলার মানে কি? আমরা চুরি করেছি?
: না, মানে- তোদের চোর বলবো কেন? কিন্তু সকালে যখন গিয়েছি, তখনও আমার ২৬০ ইউরো ছিল।
: OMG! তার মানে তুই বাসা থেকে বেরোবার আগে রোজ পয়সাকড়ি গুনে যাস?
: হু, মানে- এটা আমার অভ্যাস।
ফাবিয়ান আর অভিনয় করতে পারছিল না। ও হঠাৎ পেট চেপে ধরে হাসা শুরু করলো। এরপর তো রবার্ট-এর কিল ও ফাবিয়ানের পিঠে, আবার জেসন আর রায়ান-এর কিলও ওর পিঠে। কেন ও হেসে ফেললো। ক্যানো ফাবি সব কেলো করে দিলো? আরো একটু জমিয়ে রবার্টকে কান্নাকাটি করাতো? তা নয় ফাবিয়ান সব নষ্ট করে দিল।
আজ আবার অনেক দিন পর সে সব মনে করে ফাবি নিজে নিজেই হা… হা… হো… হো… করে হেসে উঠলো।
ঘরের বাইরে আমান্ডা ফায়িানের খাবার গরম করে টেবিলে লাগাচ্ছিল। খুব বিষন্নভাবে ঘরে এলো, আবার কি হলো? নিশ্চয়ই কারো সাথে ফোনে কথা বলে হাসছে? আমান্ডার চিন্তিত উপরে ওঠা ওঠা ভ্রু অনেকক্ষণ পর স্বস্তির বাতাসে নিচে নেমে এলো। ও জোরে হাঁক দিলো-
: ফাবি, এই সোনা, এবারে একটু খাবি আয়। ফাবি চলে এলো চট করে। এসেই নানীকে জড়িয়ে ১টা চুমো দিলো।
: তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না। বললাম না, রোডিকা আন্টি অনেক কিছু খাইয়ে দিয়েছে।
: হু জানি, সেতো সেই লাঞ্চে- এখন বেশ হজম হয়ে গেছে। এই দ্যাখ গরম গরম চালের গুড়ো দিয়ে, ঘরে তোলা ক্রিম দিয়ে প্যান কেক করেছি। মধু দিয়ে ২/৪ টে খেয়ে দ্যাখ, আর এই এক মগ দুধ।
: ওহ্! নন্না, তুমি আমার ভুড়ি নামিয়ে দেবে। তখন আমাকে দেখে আর কেউ ফিদা হবে না।
: আমান্ডা মুচকি হাসলো, ফাবিয়ান শুধু ওর নাতিই নয়, ওর একমাত্র বন্ধুও।
: থাক বাবা, যথেষ্ট ফিদা করেছো। এবারে সিরিয়াস হও জীবন নিয়ে। জীবনটাকে নিয়ে আর ছেলেখেলা করা যাবে না। এবারে একদম বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে।
: ওকে বস্! এবারে বিয়ে করে একে বারে তোমার একটা সেবাদাসী এনে দিবো।
: উহু! আমার বন্ধু। আমার শেষ বয়সের কথা বলার একটা সঙ্গী এবং আমি তোমার বাচ্চাও দেখতে চাই ফাবি। এটাই আমার জীবনের শেষ চাওয়া তোমার কাছে। আশা করছি তুমি আমাকে বিমুখ করবে না।
: ওহ্! নন্না, তুমি এত সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছো কেন?
: হু হচ্ছি, কারণ দেখলাম তুমি আদপেই হীরা চিনতে পারছো না। এবং বুঝতে পারছো না, জীবনটাকে নিয়ে কোন পথে পরিচালিত করবে? তো, আমি এখন আবার তোমাকে সেই নির্নয়ের দিকে নিয়ে যাবো, যাতে তুমি বার বার ভুল না করো।
: হু! নন্না, আমি মূলতই ভুল করেছি বার বার! বিশেষ করে আমি আমার জীবনের প্রকৃত ভালোবাসাই চিনতে পারিনি।
: সেটা কি আজও চিনেছো?
: মনে হয় নন্না চিনেছি, বড় দেরিতে। তবু মনে হয়…
হঠাৎ ওদের কথা বলার মধ্যে ফাবিয়ানের সেল ফোন বেজে উঠলো। ফাবিয়ান বেশ বিস্মিত হয়েই ফোন তুললো, এ সময় নাওমীর ফোন?
: হ্যালো, কে? আরে তুমি? কি ব্যাপার আজ যে বড় বাসায়? কি বললে? আমার এজেন্ট ফোন করেছিল তোমাকে সকালে? ব্যাটা ম্যাকলিন? ওর কাছে তো আমার নম্বর ছিলই, তাহলে?
: হু ছিল, তবে ম্যাকলিন বললো তোমাকে বহুবার ট্রাই করেছিল পায়নি, না পেয়ে অবশেষে আমাকে করেছে।
: হ্যাঁ বরাবরের মত আমি ম্যাকলিনকেও দ্বিতীয় কণ্ট্রাক্ট নম্বরে, তোমার নম্বর দিয়েছিলাম। কি ব্যাপার নাওমী? ব্যাটা আজ হঠাৎ আমাকে খুঁজছে কেন? এই সাড়ে চার বছরে তো কম ঘুরালো না, আমাকে চরকির মতো…
: হুম, তা ঠিক। তবে জানো তো, দেরিতে পাওয়া ফল বেশি মিষ্টি হয়।
: তাই? হু, তুমি মনে হয় ঠিকই বলছো, দেরিতে আসা কোন বোধোদয়ও মনে হয় স্থায়িত্ব বেশি হয়।
: তাই? জানি না, আমি আর কিছু জানতেও চাই না। আচ্ছা শোন, তুমি এখুনি জন ম্যাকলিনকে ফোন করো। খুবই ইমার্জেন্সি। আমি এখন রাখবো, নন্নাকে আমার শুভ কামনা দিও- বাই।
: বাই- ফাবিয়ান স্মিত স্বরে বললো।
নন্না বললো, কিরে কোন বাজে খবর? নাওমী বেশি কথা বললো না যে?
: না, কোন বাজে খবর নয়। আমাকে আমার এজেন্টের সাথে জলদি কথা বলতে বললো।
: ওহ্! নিশ্চয়ই কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, জলদি টেলিফোন কর।
: হ্যাঁ করছি, বলতে বলতে ফাবিয়ান দ্রুত হাতে জন ম্যাকলিনকে ফোনে ট্রাই করতে থাকে। বার বার এনগেজট টোন। না পেয়ে ম্যাসেজ বক্সে অনেকক্ষণ ধরে ম্যাসেজ দ্যায় ফাবি। তবু ফাবিয়ান বার বার পায়চারী করতে থাকে। ৪ বছর, হ্যাঁ ৪ বছর ৬/৭ মাস ধরে এই জন ম্যাকলিনকে টাকা দিয়ে আসছে শুধুই আশায় আশায়। একদিন জন কোন একটা কানেকশন ঘটিয়ে দেবে। টিভি বা সিনেমায়। কিছুই করতে পারেনি। একবার শুধু একটা মিউজিক ভিডিওতে মিউজিকসহ পরিচালনা করেছিল। ব্যাস এই সুদীর্ঘ ৫ বছরে ঐ একটিই। আর ঐ বোরিং জব নাইট ক্লাবে অন্যের গাওয়া গান নিজের ভোকালে। খুবই বিরক্তিকর! ঐ সব মাতালদের বাহবা পেতে তার একটুও গরজ নাই। কি জানি প্রকৃত সমঝদাররা কবে তার গান শুনতে পারে? তবে মিউজিক ভিডিওটা বাজারে ভালোই চলেছে। তবুও তেমন ক্লিক করছে না। ভাগ্য। এইসব চিন্তার মধ্যেই হঠাৎ বিকট স্বরে ফোনটা বেজে উঠলো-
: হ্যালো জন, কেমন আছো?
: হাই, হাই ফাবিয়ান- বিকট চিৎকার করে উঠল জন ম্যাকলিন। আরে হলো কি ব্যাটার? এত জোরে চিল্লায় ক্যানো?
: আবে ইয়ার, তুমি কোথায়? ফোন দিয়ে দিয়ে হয়রান। তোমার বাসায়ও তো গিয়েছিলাম।
: ক্যানো আমি তো তোমাকে বলেছিলাম যে, আমি ইটালিতে যাচ্ছি।
: হু মনে ছিলো না। যাই হোক, এখন একটা বিরাট খবর আছে। তোমার হৃদয়টাকে হাত দিয়ে ধরে রাখো।
: আরে জলদি বল, আমার ধৈর্য্যরে বাঁধ ভেঙ্গে যাচ্ছে।
: আরে বলছি, বলছি- তোমার আসবার আগে, নাইট ক্লাবে যখন গান গেয়েছিলে তুমি নাকি খুব ইমোশনালী গেয়েছিলে, তোমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। আর তুমি নিজের হৃদয় উজাড় করে গান গাইছিলে, ঐ রাতে তোমার সামনের কোন একটা টেবিলে বসা ছিল কানাডার একজন বিখ্যাত পরিচালক এবং প্রযোজক। খুবই খ্যাতিমান সে এ্যানথোনি এ্যান্ডারসন!
: হ্যাঁ, তাকে কে না জানে। তবে সে যে ঐ দিন ক্লাবে ছিল, আমি দেখিনি। কোন কারণে আমার মনটা খুবই খারাপ ছিল ঐ রাতে জন।
: কারণ সে কোণার দিকের একটা টেবিলে বসে তোমার গান উপভোগ করছিল আলো-আঁধারিতে এবং অবশেষে…
: অবশেষে? ফাবিয়ান চিৎকার করে উঠলো…
: অবশেষে সে তোমার সাথে দেখা করতে চাইছে। শুধু তাই নয়, সে তার পরবর্তী মুভির সঙ্গীত পরিচালনার জন্য তোমার কথাই ভাবছে।
: জন, তুমি কি জান, তুমি কি বলছো? ফাবিয়ান আর কথা বলতে পারছে না। তার কণ্ঠ অসম্ভব উত্তেজনায়, আবেগে বদ্ধ হয়ে গেল।
: হ্যাঁ, হ্যাঁ ফাবিয়ান, আমি জানি আমি কি বলছি? এটা তোমার জীবনের একোদ্বিতম স্বপ্নের বুনট। তোমার জীবনের সব কিছু। আর আমিও তোমার এই কঠিন স্বপ্নের সাথে গত প্রায় ৫ বছর ধরে জড়িয়ে আছি! কিছুই করতে পারছিলাম না। এবং এখনো যেটা হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে, সেটাও তোমার নিজের হাত ধরেই আসছে। আমার যেহেতু ওদের সাথে লিংক ছিল, তাই আমাকে এ্যানথোনি এ্যান্ডারসন স্যার শুধু তোমার সাথে যোগাযোগ করে দিতে বলেছে।
: না, না জন ম্যাকলিন- এভাবে বলো না। তুমি যথেষ্ট চেষ্টা করেছো। আমার ভাগ্য ক্লিক করছিল না। তবে এখন আমি যে ইটালিতে, তুমি তাকে কি বলেছো?
: হ্যাঁ, হ্যাঁ সবই বলেছি। তুমি ৩ সপ্তাহের মধ্যেই যে আসছো, তাও বলেছি। তবে তার থেকে আর ১ দিনও দেরি করবে না।
: পাগল নাকি, আমি পারলে এই রাতেই চলে আসি।
: না, না, তার দরকার নাই-ম্যাকলিন মধুর করে হাসলো। আমি এদিকটা সামলাচ্ছি। ওর সাথে দেখা হবার ডেট, সময় সব ফিক্সডট করছি। এসব নিয়ে ভেবো না। তুমি তোমার হলিডে উপভোগ কর, শুভ রাত্রি।
: শুভ রাত্রি।
ফাবিয়ান অনেকক্ষণ, কতক্ষণ পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলো। যতক্ষণ না নন্না এসে ওকে জড়িয়ে ধরলো। এবারে ফাবিয়ানের হতবিহ্বল ভাব চলে গিয়ে একটা চিৎকার করেই নানীকে জড়িয়ে উঁচু করে তুলে ঘুরপাক খাওয়া শুরু করলো। আর চিৎকার করে বলছিল-
: নন্না আমি পেরেছি, আমি পেরেছি। At last নন্না, I got it, Yes I got it ।
: ওরে ছাড়, ছাড়- আমি পড়ে যাবো।
ফাবিয়ান নন্নাকে বসিয়ে দিল তার রকিং চেয়ারে এবং নন্নার কোলে মুখ গুঁজে সেই ছোটবেলার মত তার কোমর জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো-
: ছি! বাবা এই মহাআনন্দে কি কাঁদতে আছে? সৃষ্টিকর্তা তোর ডাক শুনেছে। মাথা ঠান্ডা কর, আর চট করে ওকে একটা ফোন দে যে, তোর জন্য এত করেছে।
: কে? মা? ফাবিয়ান জিজ্ঞাসা করলো।
আমান্ডা বারটুচি মনে মনে খুবই অবাক হলো, ফাবিয়ানের মুখে ‘মা’ ডাক শুনে। মা’র নাম বললো? সে নিজেকে সামলিয়ে বললো-
: মাকে ফোন দিবি কিনা সেটা তোর ব্যাপার, তবে নাওমীকে একটা ফোন দে। হয়তো মনে মনে অপেক্ষা করে আছে। জন ম্যাকলিন কি বললো তোকে সেটা জানার জন্য।
: হু! ঠিকই বলেছো নন্না, আমার এখুনি ওকে একটা ফোন দেওয়া উচিত।
: ওকে তুই নাওমীকে ফোন দে, আমি বরং রোডিকাদের একটু জানিয়ে দেই।
: আচ্ছা, ওহ্ নন্না শোন- মাকে তুমি বলো না, আমিই ফোন দিবো, বুঝলে?
: ওকে! আমান্ডা অসম্ভব বিস্ময়কে যেন গিলে ফেললো মুখ বন্ধ করে। আজ এসব কি হচ্ছে? একটার পর একটা বিস্ময়। মনে হচ্ছে আনন্দে বা বিস্ময়ে আমান্ডার দম বন্ধ হয়ে যাবে! প্রথমে ডোরিনের বিয়ের কথা শুনলো। এটাতেও আমান্ডা খুবই খুশি হয়েছে। মনে হয়েছে, অনেক দিনের একটা সমাধান না হওয়া সমীকরণের অপূর্ব সমাধান হলো। ফাবিয়ান ডোরিনকে নিয়ে খুবই দোটানায় ছিল, আর গত ৫ বছরে এখানে কি কি হচ্ছিল ডোরিনের জীবনে সেটা আমান্ডাই দেখছিল। তাই সে কোনভাবেই চাচ্ছিল না, ডোরিনকে নিয়ে ফাবিয়ান আর ঐ দৃষ্টিকোণ দিয়ে ভাবুক। তারপর এলো এই দ্বিতীয় এবং তার এদ্দিনের প্রোথিত খুশি। ফাবিয়ান যে তার মিউজিকের ভবিষ্যত নিয়ে খুবই ভাবিত এবং হতাশায় নিমজ্জিত ছিলো, সেটা আমান্ডার থেকে কে আর বেশি জানে? প্রতিদিনের তাদের কেেথাপকথনের ভূভাগই থাকতো এই মিউজিকের উপর। নন্না, কিছুই হচ্ছে না। কোনই দিশা পাচ্ছি না। আমার জীবনে কি কেবলই আমাবশ্যার অন্ধকার? জীবনের কোন খানেই কি একটু আলোর দিশা দেখবো না?- এ রকমই হতো ফাবিয়ানের প্রলাপ। আমান্ডা ফাবিকে বোঝাতে বোঝাতে নিজেও কেমন জানি ভেঙ্গে পড়তো। মনে হতো সত্যিই তো, তার জানের টুকরা, নয়নের মণি ফাবিয়ান জীবনে কখনোই কি একটু শান্তি খুঁজে পাবে না? সৃষ্টিকর্তার কাছে শুধু কাঁদতো আর দু’হাত তুলে প্রার্থনা করতো।
আর ফাবিয়ানের জীবনের প্রথম এবং শেষ জট ছিলো তার মা- সারা। যেদিন থেকে ওদের জীবন থেকে ফ্রাঙ্ক চলে গিয়েছিলো। সারা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। তারপর, সারা এবং ফাবিয়ান দুজন, দুজনকেই প্রচণ্ডভাবে আঁকড়ে ধরেছিল। এরপর খুউব ধীরে ধীরে সারার জীবনে এলো স্টিভেন গ্যালাটি। স্টিভেনের ভালোবাসার জোয়ারে এক সময় সারাও ভেসে গেলো। সারাকে অবশ্য ভেসে যেতে সাহায্য করেছিলো আমান্ডা এবং রোডিকা। তাছাড়া কি-ই বা করার ছিল। অতটুকু বয়সে একাকী জীবন এবং ঐ টুকুন একটা ছেলের দায়িত্ব, এটা কম কথা নয়। সারা হাসতে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিলো। কিন্তু সারার জীবনের সেই নতুন স্বস্তি, ভালোবাসা, ভালোবাসার ঘর কন্যায়- ফাবিয়ান কিছুতেই প্রবেশ করতে পারলো না। জন্মের থেকেই ফাবিয়ান ভীষণ একগুয়ে এবং কিছু কিছু ব্যাপারে মারাত্মক পজেসিভ। সারা চেষ্টার কম করেনি। আমান্ডাও চেষ্টা করতে করতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও সারা তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে আজও। সে তো মা! মায়েরা তো সন্তানের কাছ থেকে কখনোই মুখ ফেরাতে পারে না। কিন্তু ফাবিয়ান যেন মায়ের সাথে সম্পর্ক না রাখারই সংকল্প করেছে।
আজ হঠাৎ এতদিন পর ফাবিয়ান-এর মুখ থেকে ‘মা’ শব্দটি শুনেই আমান্ডা যেন বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে গেল। ভাবছে যেন ভুল শুনেছে! তারপর ফাবিয়ান রীতিমত ব্যাখ্যা করলো, সে নিজেই তার ‘মা’কে সব বলবে।
আমান্ডা আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে, এরপরই যেন কান্না পেল। আজ কতটা বছর ধরে এই দিনটির জন্য সে অপেক্ষা করছিল না? আমান্ডার চোখ দিয়ে সেই অপেক্ষার কান্নাগুলো অবিরাম টুপটাপ ঝরে পড়লো। আজ আমান্ডা সেই কান্না হাত দিয়ে মোছারও চেষ্টা করলো না। অশ্রুগুলোকে ঝরতে দিল।

রীনাগুলশান, টরন্টো
gulshanararina@gmail.com
(লেখক রীনা গুলশান বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স।ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিকে তার কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রম্যরচনা প্রকাশিত হয়েছে।প্রকাশিত হয়েছে কানাডার বিভিন্ন বাংলা পত্রিকাতেও। তিনি‘প্রবাসীকণ্ঠ’ ম্যাগাজিন এর একজন নিয়মিত কলামিস্ট।)
