স্মৃতির মিছিল

সাইদুল হোসেন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

বহু কথা-ই বলেছি ইতিপূর্বে কিন্তু বহু কথা-ই বলা হয়নি। ঘটনাবহুল সুদীর্ঘ জীবন আমার। কিছু না-বলা কথার স্মৃতিচারণ করছি এখানে একে একে।

(এক)

Remember who is the boss. OK?

মার্চ ২৫, ২০২৫

আজ আমার জন্মবার্ষিকী। ৯২ বছর পূর্ণ হলো। ৯৩-তে পা রাখলাম। দীর্ঘ জীবন শুধু নয়, সুদীর্ঘ জীবন লাভ করেছি আমি। অথচ আমার বাবা মারা গেলেন ১৯৫৫ সনে, বয়স হয়েছিল তাঁর মাত্র ৪৭ বছর। গলায় ক্যানসারের আক্রমণে অকাল মৃত্যু। আমার বয়স এখন তার দ্বিগুণ।

আমার জন্ম এমন এক গ্রামে (১৯৩৩ সন) যেখানে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়ার উপযুক্ত একটা তখনকার দিনের Middle High School ছিল। ঐ এলাকার একমাত্র উচ্চ  শিক্ষার স্কুল যদিও সেটা ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ার High School ছিল না। বহু দূরের গ্রাম থেকে ছেলেরা সেই স্কুলে পড়তে আসতো- শুকনার দিনে পায়ে হেঁটে, বর্ষাকালে নিজেরাই নৌকা বেয়ে। হিন্দু-মুসলিম দুই-ই, সবাই ছিল কৃষকের সন্তান। দেখতে বেশ বড়সড়। বেশী বয়সী। ওদের মাবাবা ওদের পড়তে পাঠাতো স্কুলের পাঠ শেষ করে শিক্ষিতদের দলে নাম লিখিয়ে তাদের ছেলেরা গ্রামের/সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসাবে সমাদৃত হওয়ার আকাংখা নিয়ে।

অপর উদ্দেশ্য ছিল বিয়ের সময় শিক্ষিত পাত্র হিসাবে পাত্রীপক্ষ থেকে অধিক পরিমাণ যৌতুক আদায় করা। স্পষ্ট মনে পড়ে যে ১৯৪৫-এ যখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি (বয়স আমার মাত্র ১২ বছর) তখন আমাদের সহপাঠী আমাদেরই গ্রামের ছেলে আবুল হাসেম (আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়) বিয়ে করে আমাদের ক্লাসে হৈচৈ বাঁধিয়ে দিয়েছিল। বিয়ের পর মেহেন্দিমাখা হাত নিয়ে সলজ্জমুখে একদিন ক্লাসে এসেছিল সে। বিয়ের কারণ হিসাবে বলল যে তার দাদাদাদী নাতি বৌয়ের মুখ দেখতে চান। তাদের পছন্দেরই কনে। তাই এই বিয়ে। এই ছিল ওর শেষ ক্লাসে আসা, অতঃপর আবুল হাশেম আর স্কুলমুখো হয়নি।

গ্রামের স্কুলের পড়া শেষ করে ১৯৪৬ সনে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া শহরে গিয়ে সেখানে এক হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। সেখানেও দেখলাম একই দৃশ্য, আমার চেয়ে অধিক বয়সের ছেলেরা ছিল আমার সহপাঠী।

কেন জানি না আজ সকালে এই প্রশ্নটা মনে জেগে উঠলো ঃ অতীতের আমার সেই সব স্কুল সহপাঠীদের মাঝে কেউ আজো বেঁচে আছে কি কোথাও? কিন্তু কে জবাব দেবে?

তবে না থাকলেই আমি খুশী হবো। খুশী হবো এই জন্য যে ওরা আমার মত অতিবার্ধক্যের নিত্য যাতনা থেকে মুক্তি পেয়েছে।

এবার দৃশ্যান্তরে যাই।

বর্তমানে আমরা স্বামীস্ত্রী সরকারী যে সিনিয়র সিটিজেনস রেসিডেন্স্ বিল্ডিংয়ে বাস করি সেখানে প্রচুর পরিমাণ রেসিডেন্ট আছে যাদের বয়স ৯০-১০০ বছর। এরা সবাই হোয়াইট ক্যানাডিয়ান্স, সবাই walker -এর উপর নির্ভরশীল।

বছর দু’য়েক আগে এক গরমের দিনের বিকালে আমরা কয়েকজন বিল্ডিংয়ের সামনে বড় একটা বকুল ফুল গাছের তলায় নিজেদের walker -এ বসে গল্প করছিলাম। এক পর্যায়ে আমার সামনে তার walker -এর সীটে বসা আইরিন অতি জীর্ণ-শীর্ণ হাড্ডি-চর্মসার এক হোয়াইট মহিলা রেসিডেন্ট আমাকে প্রশ্ন করলো :

“How old are you, Sayed?”

বললাম, “90 years.”

জবাবে বললো, Only 90? I’m 96, six years your senior. Remember who is the boss. OK?”

হেসে বললাম, “Sure”

আইরিন ছিল খুবই হাসিখুশী মেজাজের মহিলা। বার্ধক্যজনিত কোন কষ্ট নিয়ে কোনদিন কোন অভিযোগ করতে শুনিনি ওকে। আমরা একই ফ্লোরে পাশাপাশি বাস করতাম। এলিভেটরে অথবা নীচে লবীতে দেখা হলেই প্রশ্ন করতো, “How are you, Sayed”? আমার স্ত্রীও আইরিনকে খুব পছন্দ করতো। দু’মাস আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হসপিটালে গেল, আর জীবিত ফিরে এলো না। ওর বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর। ওর এপার্টমেন্টের সামনে দিয়েই আমাদের এলিভেটরে যেতে, বাসায় ফিরতে  হতো। সে আজ নেই, কিন্তু ওর এপার্টমেন্টের সামনে পৌঁছলেই কানে বাজে Remember who is the boss. OK?

(দুই)

তিন ঘড়ির গল্প

১)           ছোট বড় তিনটা ঘড়ি আছে আমাদের ঘরে। সবচেয়ে ছোটটা আমার দীর্ঘদিনের সংগী। লাল রং টেবিল ক্লক। সেটাকে কিনেছিলাম সেই ১৯৯৪ সনের জানুয়ারী মাসে এলার্ম ক্লক হিসাবে। মূল্য ৪ ডলার মাত্র। তখন আমি নাইট শিফটে কাজ করতাম (রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত)। কাজের শেষে দেড় ঘন্টা বাস জার্নি করে (পথে একবার বাস বদলাতে হতো।) বাসায় ফিরে কাপড়চোপড় ছেড়ে গোসল সেরে ব্রেকফাস্ট করে নিজের রুমে এসে দিতাম লম্বা ঘুম। তখন আমি টরন্টো সিটির ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সন্নিকটে ২৬ তলা একটা বিল্ডিংয়ের ২৬ তলায় আরো দু’জনসহ একটা মেসে বসবাস করতাম। সে আমাকে সময়মত বেজে উঠে জাগিয়ে দিতো। তারপর আমি কাজে চলে যেতাম। আজকাল সেটাকে আর এলার্ম ক্লক হিসাবে ব্যবহার করি না, বাথরুমে রেখে দিয়েছি সময় দেখার জন্য।

STAIGER. QUARTZ technology-তে তৈরী ঘড়ি

এতক্ষণ ধরে এত কথা বললাম এই জন্য যে সেই ছোট্ট ঘড়িটা (ব্যাটারির সাহায্যে চলে) দীর্ঘ ৩২ বছর পরও সঠিক সময় দেখিয়ে চলেছে। অবাক কান্ড বটে!

দ্বিতীয় ঘড়িটাও একটা টেবিল ক্লক। রং সাদা। আগেরটার চেয়ে বেশ একটু বড়। এই ঘড়িটার বৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে চারটি :

ঘড়িটা খুব ভারী কারণ এটা একটা ভারী crystal case এর ভেতরে আবদ্ধ,  plastic case নয়।

এটা সোভিয়েট আমলের ওয়েস্ট জার্মেনীতে তৈরী। সেটার ডায়ালটাতে লেখা রয়েছে West Germany. নাম STAIGER. QUARTZ technology-তে তৈরী। সোভিয়েট আমলের জার্মেনীতে অবসান ঘটেছে ১৯৯১ সনে Berlin Wall ভেংগে  East Germany (Soviet Russia) এবং West Germany (USA) এই দু’টির unification এর ফলে। ঘড়িটা স্পষ্টতঃই  ১৯৯১ সনের আগের কোন এক সনে তৈরী। কিন্তু সেটার বয়স হিসাব করা যাচ্ছে না।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটা হচ্ছে এই যে এটা একটা atomic clock, ব্যাটারীচালিত বা বিদ্যুৎচালিত নয়। তাই এটাতে কখনো নূতন ব্যাটারী লাগাতে হয় না অথবা কোন electric outlet -এ plug-inI করতে হয় না। সে আপনমনে চলছে নিজের সময় দেখিয়ে যা আমাদের ক্যানাডার Eastern Time -এর চেয়ে এক ঘন্টা পেছনে। সময়টাকে re-set করার কোন পথ খোলা নেই। বহু বছরের সংগী আমাদের এই ঘড়িটা।

চতুর্থ বৈশিষ্ট্যটা হচ্ছে এই যে atomic clock হওয়ার কারণে ওটাকে ভেংগে না ফেলা পর্যন্ত সে কোনদিন slow অথবা fast হবে না, অথবা থেমেও যাবে না। মানুষের বুদ্ধি কতটা প্রখর ও সৃজনশীল হতে পারে আমাদের এই ঘড়িটা তারই একটা জ্বলন্ত প্রমাণ।

তৃতীয় ঘড়িটা হচ্ছে একটা বড় Wall clock , তিনটা AA battery’র সাহায্যে চলে সে। কিনেছিলাম ৬০ ডলার খরচ করে ১৯৯৭ সনে- আজ থেকে ২৮ বছর আগে। ঘড়িটার dial/face -এ ১২টি পাখির ছবি আছে ১২টি ঘন্টার দাগের উপর। তবে বৈশিষ্ট্যটা হচ্ছে এই যে প্রতিটি ঘন্টায় ছবিতে দেখানো পাখিটার ডাক স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়। এই দীর্ঘ ২৮ বছর পরও পাখির ডাকের কোন তারতম্য ঘটেনি। আমরা মুগ্ধ!

(তিন)

POKEMON Cards, chicken sandwich, money

আমার এক নিকটাত্মীয় টরন্টো থেকে ওর ওয়াইফ ও জমজ দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে (বয়স ১৪ বছর) লাঞ্চ করতে এসেছিল কিছুদিন আগে। ওরা স্বামীস্ত্রী দু’জনেই খুব নামাজী-মুসল্লী। স্ত্রী মহিলা খুব হিজাবী তবে নিকাবী নয়। ছেলেমেয়ে দু’টিকেও নামাজ শিক্ষা দিয়েছে।

সেদিন ছিল শুক্রবার। ওরা আসার পথে কোন এক মসজিদে জুমার সালাত আদায় করে এসেছে। ক্যানাডাতে জন্ম বাচ্চাদের, ওদের ভাষা ইংলিশ।

লাঞ্চের শেষে আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, “When you prayed your Salat, what did you ask for from Allah?”

জবাবে সে জানালো, “I asked Allah to give me POKEMON Cards, Popeye’s chicken sandwich and some money.”

(চার)

জুতা বদল

একদিন টরন্টো থেকে দুই পরিবার লাঞ্চে এসেছিলেন আমাদের বাসায়। একে অন্যের অপরিচিত। আমি তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। লাঞ্চের পর একজন বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

অন্যজনের সংগে আরো বেশ কিছুক্ষণ গল্প করার পর তিনিও বিদায় চাইলেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো জুতা নিয়ে। আগের ভদ্রলোক এই অতিথির জুতা পরে চলে গেছেন!

সংগেসংগে ফোন করে সেই ভদ্রলোককে জুতা বদলের কথাটা জানালাম। তিনি বললেন, “সেই জুতাগুলো আমার পায়ে খুব ফিট হওয়াতে আমি নির্ভাবনায় সেগুলো আমারই মনে করে পায়ে দিয়ে চলে এলাম, কোন অসুবিধা হচ্ছে না। হা-হা-হা-হা!”

বললাম, কিন্তু এতে তো সমস্যাটার সমাধান হচ্ছে না। জুতা জোড়া বদলানো প্রয়োজন।

শুনে তিনি বললেন, “আমি খুব দুঃখিত এই সমস্যাটা সৃষ্টি করার জন্য। যাহোক আমি বাসাতেই আছি, এই আমার ঠিকানা। অপর পক্ষকে বলুন আমার বাসায় এসে জুতা জোড়া বদলে নিতে।”

কি আর করা? দ্বিতীয় অতিথি তাই টরন্টোতে ঐ বাসায় গিয়ে জুতা বদল করে তারপর নিজের বাসায় ফিরে গেলেন। বহু সময় ব্যয়, পরিশ্রম ও অসুবিধা ভোগ করতে হলো দ্বিতীয় জনকে। (চলবে)

সাইদুল হোসেন
মিসিসাগা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *