মনের আয়নাতে

সাইদুল হোসেন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

দাদা সতীন্দ্র কুমার দাশ

সতীন্দ্র কুমার দাশ, আমার কলকাতিয়া সিনিয়ার দাদা।  বয়স তিরাশি বছর। অতি সহজসরল, বন্ধু-বৎসল, ধর্মভীরু মানুষ। একটু-আধটু সাহিত্যসেবাও করতেন এক কালে, পত্রপত্রিকায় কবিতা-প্রবন্ধ লিখতেন। গল্প করতে এবং শুনতে ভালবাসেন, তবে বর্তমানে বয়স ও রোগের তাড়ানায় শয্যাশায়ী। দিদি, অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী, অসুখে-বিসুখে ভুগে দাদা এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান দেবমাল্যকে রেখে পরলোকে গমন করেছেন দু’বছর আগে। দাদা এখন ডানাভাঙ্গা পাখি, নিজের যাবার দিন গুনছেন। দেবমাল্যের অথবা ওর স্ত্রী জয়িতার মাধ্যমে দাদার খবরাখবর পাই মাঝেমাঝে। ভগবান তাঁর মঙ্গল করুন। দাদার সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের, এই টরণ্টো শহরেই। অনেক আনন্দময় মুহুর্ত আমাদের কেটেছে গল্পগুজব করে, ভোজন-আপ্যায়নে। দাদার অন্তরে একটি অনুসন্ধিৎসু মন বাস করে, তিনি জানতে চান; ভাবতে, অনুভব করতে ভালবাসেন। মনের কথা অকপটে বলতে দ্বিধা করেন না। তেমনি দু’টি ঘটনার উল্লেখ করছি এখানে।

বেশ কয়েক বছর আগে একদিন দাদা বললেন যে একটা ঘটনা তাঁর মনে বড়ই বিস্ময় ও বিতৃষ্ণার সৃষ্টি করেছে যার ফলে তিনি মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। মনটাকে হালকা করার জন্য আমাকে সেটা জানাচ্ছেন। 

দাদার এক ছোট ভাইয়ের মেয়ে ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরে পড়াশোনা শেষ করে ওখানেই চাকরী করে। ভাই ও তার স্ত্রী দু’জনেই মারা গেছেন। মেয়েটা একাই থাকে ওখানে। বিয়ে-থা করেনি আজো।

মেয়েটির একটি ইংরেজ বয়ফ্রেন্ড আছে, সে বেশ বাংলা বলতে শিখেছে তার বাঙ্গালি গার্লফ্রেন্ডের সাহচর্যে এসে। ভালই বলতে পারে বাংলাটা। সেই ছেলেটি লন্ডন থেকে টরণ্টো শহরে এসেছিল নিজের কোন এক কাজে। তাই সে তার গার্লফ্রেন্ডের কাকাবাবুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিল একদিন। সে এসে তার পরিচয় দিতে গিয়ে বললো : আমার নাম পিটার, আমি লন্ডন থেকে এসেছি। আমি আপনার niece (ভাইয়ের মেয়ে) নির্মলার বয়ফ্রেন্ড। আমি টরণ্টো এসেছি আমার মায়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। আগামীকাল ওয়েডিং, পরদিন আমি লন্ডন ফিরে যাব। দেখা-সাক্ষাৎ শেষে পিটার এক সময়ে বিদায় নিয়ে চলে গেল।

দাদার মনে যে কথাটা তিক্ত আলোড়ন তুলেছে সেটা হলো, ছেলে এসেছে মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে! এ কেমন কথা? দাদা পিটারকে প্রশ্ন করেছিলেন : কি বললে? তোমার মায়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছ?

ইয়েস স্যার, দ্যাট্স্ রাইট। আপনি ঠিকই শুনেছেন। মায়ের বিয়েতে যোগ দিতেই এসেছি আমি, বলল পিটার।

ছেলেটা চলে যাওয়ার পর থেকে তিনি ভেবে চলেছেন – ছি : একি অসভ্যতা? একি কালচার? বিষয়টি কিছুতেই হজম করতে পারছেন না দাদা। এবং সেজন্যেই আমাকে ফোন করেছেন।

দাদাকে দোষ দিতে পারি না। একে তো তিনি একজন ভারতীয়, তদুপরি হিন্দু, এবং তখন বয়স তাঁর আশির কাছাকাছি। তাঁর কাছে এটা একটা  দারুণ কালচারাল শক্ নিঃসন্দেহে। বিষয়টা তাঁর মনে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে বৈকি!

অন্যদিন

দাদা আমাকে ফোনে পেয়ে এই কথাগুলো বলেন : অন্তরে তৃপ্তি ও সুখানুভূতি পেতে হলে দু’টি বিষয়ের চর্চা খুবই প্রয়োজন – এক, সংসারের প্রতি নিরাসক্তি, নির্লিপ্ততা, ও নিষ্কাম মানসিকতা, এবং দুই, নিরলস আধ্যাত্মিক চিন্তা।

যৌবনে দেহে শক্তি, মনে সাহস, সম্মুখে উন্নতির শিখরে আরোহণের প্রবল বাসনা থাকে। ছবি : সংগৃহীত

তাঁর কথা শেষ হলে আমি বললাম : দাদা, জীবনের ৭৮টি বছর অতিক্রম করার পর পরলোকের দ্বারে দঁড়িয়ে আপনি যে সত্যের উপলব্দি করতে পেরেছেন মানুষের যৌবনের প্রারম্ভে এই উপলব্দি মনে জাগে না। দেহে তখন শক্তি, মনে সাহস, সম্মুখে উন্নতির শিখরে আরোহণের এবং জীবনকে উপভোগ করার প্রবল বাসনার তাড়না। আপনার মত নিরাসক্তি ও আধ্যাত্মিক চিন্তা তখন মনের আনাচেকানাচেও ঘেঁষতে পারে না কারণ সেটা যৌবনের ধর্ম নয়। দেহের চাহিদা, মনের চাহিদা, পরিবেশের চাহিদা তখন জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি; সংসারের প্রতি নির্লিপ্ততা তখন একজন তরুণ অথবা যুবকের জন্যে  appropriate-ও নয়। সে তাহলে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে, এগিয়ে যেতে পারবে না।

আপনার বয়সে ভবিষ্যৎ বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই, জীবন সংগ্রাম আপনার জন্যে অতীতের বস্তু। এখন আপনার একমাত্র চিন্তা কখন পরপারের ডাক আসবে আর আপনি সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বিদায় নেবেন এই জগৎ থেকে। আপনার কথা দু’টি আপনার জন্যে অথবা একজন বয়স্ক সংসার-বিরাগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে কিন্তু অন্য সবার ক্ষেত্রে নয়।

চুপ করে আমার কথাগুলো তিনি শুনলেন এবং তারপর বললেন : আপনার বিশ্লেষণ যথার্থ। আপনি ঠিকই বলেছেন, যৌবনের একটা ধর্ম আছে। যৌবনে এই সংসার-বিরাগ এবং অত্যধিক আধ্যাত্মিক চিন্তা মানুষের কর্মক্ষমতার এবং তার চলার পথের বাধা অতিক্রমের জন্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে, সংসার অচল হয়ে পড়বে। যে বয়সের যে ধর্ম সেটা পালনই হয়ত ঈশ^রের ইচ্ছা। তারপর যোগ করলেন :

আমার প্রার্থনা ভগবানের কাছে – হে প্রভু, আমাকে আলো দেখাও। “অন্তর মম বিকশিত কর অন্তরতর হে।” 

সেরিং  সেরিং

প্রতিদিনই সার্জারি ডিপার্টমেন্টে কাজ শুরু করার আগে সেদিন যাদের সার্জারি হবে সেই লিস্টটা একবার ভাল করে পড়ি নামের বৈচিত্র্য দেখার জন্যে। কত দেশের লোক, কতই না তাদের নামের ধরন! তেমনি একদিনের লিস্টে চোখে পড়ল একটা নাম Tsering Tsering . নামটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল যে এমনি ধরনের নাম সাধারণত : তিব্বতের লোকদের হয়ে থাকে। তারপর যথারীতি কাজে লেগে গেলাম।

এমন সময় একজন এসে গুড মর্নিং, হাউ আর ইউ? বলে জানতে চাইল তার স্ত্রীর সার্জারি কখন শেষ হবে এবং কখন সে তাকে দেখতে পাবে। বললাম : তোমার স্ত্রীর লাস্ট নেম্ বল। বলল : Tsering. লিস্টে দেখে সার্জারিতে ফোন করে জানলাম যে ওর সার্জারি হয়ে গেছে, ঘন্টা দেড়েক রিকভারি রুমে থাকতে হবে, তারপর ডে-সার্জারির একটা বেডে ট্রান্সফার করা হবে, এবং সেদিনই তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। সে ভাল আছে, দুশ্চিন্তার কারণ নেই।

সব খবর লোকটিকে দিলাম এবং বললাম যে ডে-সার্জারির বেডগুলো আমার অতি নিকটেই। তুমি পাশের ওয়েটিং রুমে ততক্ষণ অপেক্ষা করতে পার।

লোকটা আমাকে অনেক ধন্যবাদ জানাল এবং জানতে চাইল আমি ইন্ডিয়ান কিনা।

বললাম : না, বাংলাদেশী। শোনামাত্র বিরাট একটা হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল : তুমি কেমন আছ? পরিষ্কার বাংলা!

আশ্চর্য হয়ে বললাম : তোমার স্ত্রীর নাম দেখে তো মনে হয় তোমরা তিব্বতের লোক। কিন্তু তুমি বাংলা শিখলে কি করে? কোথায়?

লোকটা তখন বলল : তোমার অনুমান সত্য, আমরা তিব্বতেরই লোক। আমি বহুদিন ইন্ডিয়ার আসামে ছিলাম, ওখানে অহমীয়া ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষাও চলে। কিছুটা শিখেছিলাম ভাষাটা কিন্তু বহুদিনের চর্চা নেই, তাই ভুলে গেছি। তোমাকে ভালবাসি, আমি ভাল আছি, কি খাবে, এটা ঠিক নয় ইত্যাদি ধরনের কিছু কথা আজো মনে আছে।

তারপর আমার সামনে থেকে একটা কাগজ টেনে নিয়ে কি যেন একটা লিখল, তারপর বলল, এটা আমার অহমীয়া ভাষায়। আমার নাম Lodsa Tsering. আবার একটা কি যেন লিখল, বলল, এটা আমার নাম তিব্বতীয় ভাষায়। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপত্তি আমাদের তিব্বতী ভাষা। ক্যানাডায় আছি আজ ১৬ বছর হয়ে গেল, এক ছেলে, এক মেয়ে, ওরা কলেজে পড়ে।

অবশেষে আমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে পেশেন্ট্স্ ওয়েটিং রুমের দিকে পা বাড়ালো সেরিং। দিয়ে গেল এক নতুন অভিজ্ঞতা।

কিছু নারী চরিত্র

সংস্কৃত ভাষার অতি বিখ্যাত একটি শ্লোক : স্ত্রীয়াশ্চরিত্রতং পুরুষস্য ভাগ্যং দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ ॥ (নারীদের চরিত্র ও পুরুষদের ভাগ্য দেবতাদেরই অজানা, মানুষ কি করে জানবে!)

(এক)

একদিন স্টোরে কাজ করছি তবে কাস্টমারের তেমন ভীড় নেই। এক মহিলা অনেক্ষণ ধরে খোঁজাখুুঁজির পর একটা ডায়রী হাতে নিয়ে কাউন্টারে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন : বহু খুঁজাখুঁজি করলাম কিন্তু মনোমত পছন্দের একটাও ডায়রী পেলাম না। জিনিসটা দরকার, তাই এটাই নিতে হলো। এ যেন অনেকটা মনোমত একজন স্বামী খোঁজার মত ব্যাপার। যতই খোঁজ, পছন্দসই একজনকে কিছুতেই মেলে না, তাই অগত্যা যাকে ভাল বলে মনে হয় তাকেই গ্রহণ করতে হয়।

তাঁর কথা শেষ হলে আমি মন্তব্য করলাম যে আপনার স্বামী নিশ্চই আপনার মনোমত?

জবাবে তিনি বললেন : নট্ রিয়েলি, ঠিক তা নয়। পছন্দ করেই বিয়ে করেছিলাম অবশ্য। সে একজন কম্পিউটার স্পেশালিস্ট। দিনরাত এই একটা নিয়েই পড়ে আছে। আয়-রোজগার মন্দ নয়, আমাকে কোনকিছু নিয়ে বিরক্ত করে না, যা বলি তাই শোনে। ইন্ট্রোভার্ট, বাইরের দিকে কোন দৃষ্টি নেই, কোন এম্বিশন আছে বলেও মনে হয় না। ঘরের কাজে অপটু, দেয়ালে একটা পেরেক ঠুকেও আমাকে সাহায্য করতে পারে না, সবদিক একা আমাকেই সামলাতে হয়। অবশ্য কিছু গুণও আছে – মদ খায় না, সিগারেট খায় না, অন্য মেয়েদের পেছনে দৌড়ায় না। কাজ-সর্বস্ব ঘরমুখো একটা লোক, রুটিন পছন্দ করে, আনএক্সাইটিং। মন্দের ভাল, তবে মন ভরে না। ক্যাণ্ট সে আই অ্যাম হ্যাপী।

থামলেন তিনি। মনে হলো অপরিচিত একজনের কাছে কথাগুলো বলে মনটাকে হাল্কা করলেন মহিলা।

কিন্তু সব শুনে আমার মনে ধারণা হলো যে এই মহিলা এক অদ্ভূত চরিত্র! এর থেকে উত্তম স্বামী তিনি পাবেন কোথায়? শী ইজ্ সিক্, অন্ততঃ আমার তো তাই মনে হলো।

(দুই)

অপর একজনের উচ্ছ্বাসময় বর্ণনা : আমার স্বামীটা অতি উত্তম মানুষ একটা। হাসিখুশি, আন্ডারস্ট্যান্ডিং, কোঅপারেটিভ, লাভিং হাজব্যান্ড। নয় বছরের একটি মেয়ে, তিন বছরের একটি ছেলে ও আমরা স্বামী-স্ত্রী – এই চারজন নিয়ে সুখের সংসার আমাদের। দু’জনেই আমরা কাজ করি। আমাকে বোঝার চেষ্টা করে সে, আমিও আপ্রাণ চেষ্টা করি তার মনোমত স্ত্রী ও সঙ্গিনী হতে। চমৎকার একটা মানুষ সে। আমি তো তেমন সুন্দরী নই, তথাপি সে আমাকে ভালবাসে, আদর করে। বহু মেয়ের দুর্বলতা রয়েছে ওর প্রতি। কিন্তু আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে-কোন মূল্যে ধরে রাখবো তাকে।

মহিলার বর্ণনা শেষ হলো। প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকালাম তাঁর দিকে। বললাম : স্বামীর প্রতি ভালবাসার জ¦লন্ত এক দৃষ্টান্ত আপনি। মে গড ব্লেস ইউ।

উজ্জ্বল মুখে তিনি বললেন : থ্যাঙ্ক ইউ।

(তিন)

তৃতীয় জনের কাহিনী।

আমার দ্বিতীয় স্বামী এবং পূর্বতন স্বামীর ১৭ বছর বয়সের একটি ছেলে নিয়ে আমার সংসার। ছেলেটা দেখতে ওর বাবার মত হয়েছে। আগের স্বামীটা ভাল লোক ছিল না। অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলাম, ঠিক বুঝতে পারিনি। ডিভোর্স নিয়ে নিলাম।

বর্তমান স্বামীটা ভাল। কোন সন্তান হয়নি আজো। কাজের প্রয়োজনে দিনের পর দিন সে শহরের বাইরে কাটায়, ফিরে আসে, আবার ক’দিনের জন্য বের হয়ে যায়। আমার একটা পার্ট টাইম জব্ আছে। ছেলে ওর লেখাপড়া ও জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আমার একজন বয়ফ্রেন্ডও আছে। ভালই আছি।

কথা শেষ করে থামলেন তিনি। জিজ্ঞাসা করলাম : বর্তমান জীবন নিয়ে কোন খেদ আছে কি আপনার মনে?

বললে না, কারণ কোন কমপ্লেনের কারণ খুঁজে বেড়াই না আমি। আই টেক মাই লাইফ ওয়ান ডে অ্যাট এ টাইম।  আমি জানি জীবনে সর্বসুখী হওয়া যায় না কখনো।

হেসে বললাম : থ্যাঙ্ক ইউ র্ফ শেয়ারিং ইউর লাইফ স্টোরি উইথ্ মী।

তিনিও হাসলেন, বললেন : থ্যাঙ্ক ইউ র্ফ ইউর টাইম।

(চার)

বড় একটা শপিং মলে গিয়েছিলাম একটা গুড কোয়ালিটি বাথ সোপ কিনতে। বিভিন্ন ধরনের সাবান দেখানোর ফাঁকে ফাঁকে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গও এসে গেল কিছুটা সেল্স্ লেডির সঙ্গে। বলল, সে একজন ফিলিপিনো কিন্তু তার ফিয়ান্সে একজন শ্রীলঙ্কান। টরণ্টো ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করার সময় তাদের পরিচয়, তারপর প্রেম-ভালবাসা। লিভিং টুগেদার চলছে কয়েক বছর ধরে। জিজ্ঞাসা করলাম : সুখে আছো তো?

বলল : নট্ রিয়েলি, বাট ইট্স্ ওকে। তারপর আবার যোগ করল : দেখ, পূর্ণ সুখ কখনো আশা করা যায় না, কারণ মানুষ যা পায় তা নিয়ে কখনো তৃপ্ত থাকে না; আরো চাই, আরো চাই করে করে সে তার অর্জিত সুখটাকেই হারায়। আমি সেই দলের নই। আমি আমার দুর্বলতা, আমার দোষত্রুটি সমন্ধে সজাগ। আমার মাঝে আমার বয়ফ্রেন্ড সে যা চায় তার সবকিছুই পায় না সেটা আমি জানি। ঠিক তেমনি আমিও কোন কোন বিষয়ে তার উপর বিরক্ত, সেটা সেও জানে। তবে আমরা নিজেদের মাঝে গিভ-এ্যান্ড-টেক-এর ভিত্তিতে একটা কম্প্রোমাইজ করে নিয়েছি, তাই কখনো মারাত্মক রকম ফাটাফাটিটা হয় না। দিন চলে যাচ্ছে।

জিজ্ঞাসা করলাম : বিয়েশাদী নিয়ে ভাবছ না? মাথা নেড়ে বলল : না, বিয়েটা বড়ধরনের একটা কমিটমেন্ট বাকি জীবনের জন্যে, নিজের স্বাধীনতাটুকু হারাতে হয়, সংসার-সন্তান ইত্যাদির বোঝাটা বড় অসহনীয় বলে মনে হয়। ফলে বিয়েশাদীর পাকা বন্ধনে জড়াতে চাই না। আমাদের দু’জনের মনোভাবই প্রায় একরকম, তাই বর্তমান জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট। বড়ধরনের কোন অশান্তি দেখা দিলে নিজের পথ বেছে নিবো। পেনফুল অ্যান্ড এক্সপেন্সিভ ডিভোর্সের লিটিগেশনে জড়াতে হবে না। সন্তানের কাস্টোডির লড়াইও করতে হবে না। কোয়ালিফিকেশন আছে, চাকরী আছে, দেশের আইন আমার স্বাধীনতার পক্ষে। অতএব আমি নিশ্চিত। আই অ্যাম এঞ্জয়িং মাই লাইফ।

(পাঁচ)

মহিলা তার ছেলের জন্যে ব্যাকপ্যাক, পেণ্টিং বক্স, ব্রাশ ইত্যাদি কিনতে এসেছিল। সকাল বেলা, সবে স্টোরের দরজা খুলেছি, কাস্টমার তেমন আসতে শুরু করেনি। জিনিসপত্র হাতে নিয়ে আমার কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে তার ব্যক্তিগত জীবন গল্প জুড়ে বসল সে।

আমার একটা মাত্র সন্তান, ৯ বছরের এক ছেলে। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে বছর তিনেক আগে। বর্তমানে একাই আছি ছেলেকে নিয়ে। ছেলেটাকে আমি খুব ভালবাসি, সে আমার চোখের মণি। কিন্তু সে আমার জন্যে জটিল এক সমস্যারও সৃষ্টি করেছে।

আমি আমার জীবনটাকে, পরিপূর্ণ রূপে উপভোগ করতে চাই একজন পুরুষকে পাশে নিয়ে যে হবে আমার স্বামী, আমার সন্তানের পিতা, যে আমাকে ভালবাসবে, যাকে আমি ভালবাসব। আমার বয়স মাত্র ৩২ বছর, আমি যুবতী, আমি সুন্দরী, আমার উচ্চশিক্ষা রয়েছে, ভাল একটা চাকরিও করি। আমার আগের স্বামীটা ছিল কম শিক্ষিত, ওকে বিয়ে করেছিলাম ওর অর্থ-সম্পদের লোভে কিন্তু সংসারটা টিকল না, বড় নিম্ন রুচি লোকটার। অ্যাডজাস্ট করতে পারলাম না, ডিভোর্স নিয়ে নিলাম। সেটেলমেণ্টে বেশ কিছু পয়সা পেয়েছি ওর কাছ থেকে।

আমার নাম জ্যাকুলিন, আমি ভিয়েতনামীজ। আমাদের সামাজিক প্রথা হলো যথারীতি বিয়ে করে স্বামী-সন্তান নিয়ে জীবন কাটানো; আজ একজন, কাল আরেকজন-এর বিছানায় যাওয়াটা আমার নিজেরও পছন্দ নয়। একজন নারীর জীবনে তার স্বামীর স্থান অতি গুরুত্বপূর্ণ, স্বামীর ভালবাসা স্ত্রীর জীবনকে আনন্দময় করে তোলে। তাই মনোমত একজন পুরুষ খুঁজে বেড়াচ্ছি, পাচ্ছি না তেমন। অন্যদিকে যদিও বা পাই, ছেলেটা বাধা দেয় : না, আমি আরেকটা ড্যাডি চাই না, তুমি আমার ড্যাডির কাছে ফিরে চল। ওর মনেও কষ্ট দিতে চাই না, ওদিকে আমার যৌনবনও দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ভোগ করব কখন? বিরাট সমস্যা। কি করব আমি বলতে পার? আমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল সে।

(ছয়)

১৯৯৩ সন। চাকরী খুঁজতে গিয়ে একদিন এক এমপ্লয়মেণ্ট এজেন্সির দরজায় আরো বহু লোকের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার সামনে এক বৃদ্ধ। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি সামনের দিকে, কিন্তু সেই বিরাট লম্বা লাইন শেষ হওয়ার আগেই আমাদের জানিয়ে দেয়া হলো যে সেদিনের মত লোক নেয়া শেষ, আগামীকাল এসো।

অতএব লাইন ভঙ্গ করে যে যার গন্তব্যে চলে গেল। আমি ও সেই বৃদ্ধ এক বেঞ্চিতে বসে কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম।

সে বলল : আমি ইরানের লোক, সেখানে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সারাজীবন কাজ করেছি। আমার বয়স এখন ৬২ বছর। ভালই ছিলাম। কিন্তু ক্যানাডাবাসী আমার এক মেয়ে বলল এখানে চলে আস মা’কে নিয়ে। স্পন্সরও করল। চলে এলাম সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে। সেটা তিন বছর আগের কথা। অথচ এখন মেয়ে বলে তোমাদের ভার আমি আর বইতে পারবো না, তোমরা তোমাদের আশ্রয় খুঁজে নাও। আপন সন্তানের এই ব্যবহার! তাই কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছি কিন্তু কে কাজ দিবে এই বৃদ্ধকে?

(সাত)

হাসপাতালের কর্মী এক গায়ানীজ মহিলা একদিন আমাকে বলল যে তার স্বামী একজন ইন্ডিয়ান, সে বরাবর হিন্দি মুভি দেখে, সঙ্গে সেও দেখে এবং বলিউডের বহু অভিনেতা অভিনেত্রীকে সে চেনে।

জিজ্ঞাসা করলাম : তোমার স্বামীর সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কেমন? সে তো ভিন্ন কালচারের লোক।

এর জবাবে মহিলা যা বলল তাতে আমি চমৎকৃত হয়ে গেলাম। সে বলল : আমার স্বামী খুবই ভাল মানুষ, আমাকে খুব ভালবাসে, আদর করে, এমন স্বামী পাওয়া ভাগ্যের কথা। তাকে নিয়ে আমি খুব খুশী। আমাদের দু’টি ছেলেমেয়ে ছিল, গড ছেলেটিকে তাঁর কাছে ডেকে নিয়ে গেছেন, ওর তিন বছর বয়সে। সে তাঁর ইচ্ছা। বর্তমানে ন’বছর বয়সের মেয়েটাই আমাদের আদরের ধন। স্কুলে যায়, ভাল ছাত্রী। ঘরবাড়ি মেস্ করে না, আমাদের সাধ্যমত হেল্প করে। আমার স্বামীও সব কাজে আমাকে সহযোগিতা করে। আমার অনেক বোঝা সে নিজে টানে। আমরা হিন্দু, কালচার নিয়ে কোন clash হয় না আমাদের মাঝে।

বিরাশি বছর বয়সে আমার বাবা আমাদের সঙ্গে থাকেন মা মারা যাবার পর থেকেই। এখনো শক্ত-সমর্থ, নিজের সব কাজ নিজে করতে পারেন, বাইরে চলাফেরা করতে পারেন, আমাদের উপর মোটেই কোন বোঝা নন তিনি। আমরা স্বামীস্ত্রী দু’জনেই কাজ করি, গড-এর ব্লেসিং আছে আমাদের উপর, আমরা সুখী। স্বামীর কোলে মাথা রেখে যেন মরতে পারি। (চলবে)

সাইদুল হোসেন। মিসিসাগা