টরেটক্কা টরন্টো

চীন-কানাডা কূটনৈতিক সম্পর্ক -২১

কাজী সাব্বির আহমেদ

প্রায় সাড়ে তিন মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সাউথ চায়না সী বা দক্ষিণ চীন সাগর প্রশান্ত মহাসাগরের এক গুরুত্বপূর্ণ বলয়ে অবস্থিত যার বিস্তৃতি মালাক্কা স্ট্রেইট বা প্রণালী থেকে তাইওয়ান প্রণালী পর্যন্ত। ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মালেয়শিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও ভিয়েতনাম ছুঁয়ে আছে এই সাউথ চায়না সী। ফলে এই সমুদ্রের প্রাপ্য মালিকানার দাবীদার তারাও। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে চীন এই সমুদ্রের প্রায় সবটাই তাদের মালিকানাভুক্ত বলে দাবী করে আসছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সাউথ চায়না সীর প্রায় শতকরা নব্বুই ভাগ অঞ্চলকে ‘নাইন ড্যাশড লাইন’ দ্বারা চিহ্নিত করে সেটার মালিকানা দাবী করে আসছে চীন। কালের পরিক্রমায় চীন সেই দাবী থেকে মোটেও সরে আসেনি বরং বরাবরই কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে তাদের দাবীর ন্যায্যতা প্রতিপাদন করে আসছে। কিন্তু চীনের আঞ্চলিক প্রভাব ক্ষুণ্ন করতে ফিলিপাইন এবং তাইওয়ানের সাথে সামরিক চুক্তির কারণে আমেরিকা এই সাগরে ইতিমধ্যেই রণসজ্জা সাজিয়ে ফেলেছে। চীন মূলত তিনটি কারণে এই সাগরের নিরঙ্কুশ আধিপত্য করায়ত্ত করতে চায়। প্রথমত, এই সাগর হচ্ছে চীনের জন্য নিরাপত্তার চাবিকাঠি। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা দেশগুলির আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য চীনের বর্ম বা ‘ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স’ হচ্ছে এই সাগর। অর্থাৎ এই সাগর চীনের জন্য একটি ‘নিরাপত্তা বলয়’ হিসেবে কাজ করবে। ফলে এই সাগরের আধিপত্য রক্ষার কোন বিকল্প নেই চীনের। দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত সাবমেরিনের কৌশলগত টহলের জন্য এই সাগরে আধিপত্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই টহলদার সাবমেরিনগুলি মার্কিন রণতরী কিংবা সাবমেরিনকে এই অঞ্চলে প্রবেশে বাধা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীনের পারমাণবিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। তৃতীয়ত, চীনের নৌ পরিবহনের জন্য এই সমুদ্রপথ প্রয়োজন। বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্তত এক তৃতীয়াংশ দক্ষিণ চীন সাগরে পরিচালিত হয়। বলা হয়,এর তলদেশে বিশাল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে। এটি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মাছ ধরার জায়গা হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বেশ কয়েক দশক ধরে এই দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে উত্তেজনা থাকলেও বর্তমান কালে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। কেননা ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ক্ষমতায় আসার পর চীনের সামরিক শক্তির প্রভূত উত্থান ঘটে এবং তার প্রত্যক্ষ প্রয়োগ ঘটে দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, পারমাণবিক বোমাসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজ ও কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। স্পষ্টত তা ছিল এই সাগরে চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সামরিক হস্তক্ষেপ। ফলে এই সাগরের অন্যান্য দাবীদার দেশগুলি বিশেষ করে ফিলিপাইন তার নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কিত হয়ে পড়ে। কারণ ১৯৯৯ সালে ফিলিপাইন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ব্যবহৃত সিরা মাদ্রে নামক একটি জরাজীর্ণ যুদ্ধজাহাজকে বিতর্কিত স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের সেকেন্ড থমাস শোল-এ স্থাপন করে এই অঞ্চলে তার দাবীকে পোক্ত করে। কিন্তু চীন এবার আগ্রাসী মূর্তি ধারণ করে ফিলিপাইনের সিরা মাদ্রে যুদ্ধজাহাজে অবস্থানরত অফিসারদের জন্য পাঠানো খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রবাহী জাহাজগুলির গতিপথ রোধ করা শুরু করে। একই সাথে সেকেন্ড থমাস শোল থেকে ‘সিরা মাদ্রে’ যুদ্ধজাহাজকে সরিয়ে নিতে ফিলিপাইনকে চাপ দেয়। উপায়ান্তর না দেখে ফিলিপাইন ‘পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিটেশন অ্যাট দি হেগ’-এ চীনের বিরুদ্ধে নালিশ করে। ২০১৬ সালে হেগের আদালত ফিলিপাইনের পক্ষে রায় দিয়ে বলে যে, চীন যে ‘নাইন ড্যাশ লাইন’-এর ঐতিহাসিক সীমানার দাবী করে তার কোন আইনি ভিত্তি নেই। কিন্তু চীনের ফরেন মিনিস্ট্রি হেগের দেয়া এই রুলিংকে ‘নাথিং মোর দ্যান অ্যা পিস অব ওয়েস্ট পেপার’ বলে উল্লেখ করে। অর্থাৎ যুদ্ধংদেহী চীন আন্তর্জাতিক আইনের রায়কে সরাসরি বুড়ো আঙুল দেখায়। কম্যুনিস্ট পার্টির আশির্বাদপুষ্ট ‘গ্লোবাল টাইমস’ নামক একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা তার সম্পাদকীয়তে লেখে যে, ‘এই রুলিংকে অবলম্বন করে যদি আমেরিকা কিংবা জাপান বেইজিং-এর উপর সামরিক বা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তবে চীনের জনগণ চাইবে সরকার যেন তার ‘টিট-ফর-ট্যাট’ জবাব দেয়’। অর্থাৎ চীন জানিয়ে দেয় যে তারা দক্ষিণ চীন সাগরের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য দরকার হলে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে হলেও বিশ্বের যে কোন শক্তিকে রুখে দিতে প্রস্তুত।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং প্রথমবারের মতন রাষ্ট্রীয় সফরে আমেরিকা যান। সেই সময় হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এক জয়েন্ট নিউজ কনফারেন্সে শি চিনপিং আমেরিকার তখনকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে চীন সাউথ চায়না সী-র স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জে কোন প্রকার সামরিক তৎপরতা চালাবে না। কিন্তু এটাও উল্লেখ করেন যে সাউথ চায়না সী-র এই অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে চীনের অংশ তবে চীন ডায়ালগের মাধ্যমে এর অংশীদারিত্ব বিষয়ক বিতর্কের নিরসনে বিশ্বাসী। কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে চীন স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি ফিলিপাইনের কোন জাহাজকে পেলেই তাকে মিলিটারি গ্রেড লেসার কিংবা ওয়াটার ক্যানন দিয়ে তার গতিপথ রোধ করেছে। এই এলাকায় আমেরিকা কিংবা কানাডার টহলদার বিমানের গতিপথ রোধ করতেও চীন পিছপা হয়নি। ফলে আমেরিকা চীনকে তার ওয়াদা ভঙ্গের জন্য দোষারোপ করেছে। এমন কি ২০১৬ সালে বারাক ওবামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার শেষ চীন সফরে গিয়ে শি চিনপিংকে অকপটভাবে অনুরোধ করেছেন সাউথ চায়না সী-র বিতর্কের বিষয়ে হেগের দেয়া রুলিং মেনে চলার জন্য। কিন্তু চীন সেটাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে। চীনের এই ওয়াদা ভঙ্গের ব্যাপারে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল অবধি চীনের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে থাকা আমেরিকার প্রাক্তন ডিপ্লোমেট স্টাপ্লেটন রয় বলেন, ২০১৫ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বরের দেয়া বক্তব্যে শি চিনপিং আসলে জোর দিয়েছিলেন ২০০২ সালের করা ‘ডিক্লারেশন অব কনডাক্টস অব পার্টিস ইন সাউথ চায়না সী’ চুক্তিটির বাস্তবায়নের উপর। উল্লেখ্য যে এই চুক্তিটি নবায়ন করা হয়েছিল ২০১১ সালের ২০শে জুলাই তারিখে যেখানে চীন এবং দশটি আসিয়ানভুক্ত দেশ স্বাক্ষর করে। দশ দফার এই চুক্তির প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে যে সবাইকে ১৯৮২ সালে চার্টার অব ইউনাইটেট নেশনস হিসেবে প্রবর্তিত ‘ইউএন কনভেনশন অন দি ল’ অব দি সী’ এবং সেই সাথে অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইন যেমন ১৯৫৪ সালে সাইনো-ইন্ডিয়ান এগ্রিমেন্ট হিসেবে প্রবর্তিত ‘ফাইভ প্রিন্সিপালস অব পিসফুল কো-এক্সিসটেনস’ মেনে চলতে হবে। এই চুক্তিতে জোর দেয়া হয় যে চলমান বিতর্কিত বিষয়গুলির নিষ্পত্তি করতে হবে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে। স্টাপ্লেটন রয় উল্লেখ করেন যে, ২০১৫ সালে শি চিনপিং-এর দেয়া প্রতিশ্রুতি ছিল আলোচনার ভিত্তিতে দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য ওবামা প্রশাসনের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু আমেরিকা আলোচনার পথ না মাড়িয়ে বরং দক্ষিণ চীন সাগরে তার সহযোগী অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং ইউকে দ্বারা গঠিত ‘ফাইভ আইজ’ ক্লাবের মাধ্যমে নেভাল প্যাট্রলকে আরও জোরদার করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চীন তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আমেরিকা কিংবা তার সহযোগী দেশের সেই সব আগ্রাসী প্যাট্রলকে প্রতিহত করতে বাধ্য হয়েছে সামরিক তৎপরতার মাধ্যমে। চীনের এই রিঅ্যাক্টিভ সামরিক তৎপরতার জন্য কোনক্রমেই তাকে ওয়াদা ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত করা যায় না। কিশোর মাহবুবানি, সিঙ্গাপুরের অবসরপ্রাপ্ত ক্যারিয়ার ডিপ্লোমেট, ২০২০ সালে প্রকাশিত তার ‘হ্যাজ চায়না ওন? দ্য চাইনিজ চ্যালেঞ্জ টু অ্যামেরিকান প্রাইমেসি’ বইতে এই যুক্তিই দেখিয়েছেন।

কানাডিয়ান আর্মি মর্ডানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি (গভর্মেন্ট অব কানাডা ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত)

দক্ষিণ চীন সাগরে ‘ফাইভ আইজ’ জোটের পশ্চিমা পরাশক্তিদের নাক গলানোর প্রতিক্রিয়ায় অতীতের চেয়ে অধিকতর স্পর্শকাতর চীন শুধুমাত্র সামরিক তৎপরতার মাধ্যমে তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সচেষ্ট না থেকে রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমেও ভীতি প্রদর্শন করতে পিছপা হচ্ছে না। রয়টার্স পরিবেশিত খবর থেকে জানা যায় যে, ২০২৩ সালের ১৩ই ডিসেম্বর তারিখে অটোয়াস্থ চাইনিজ দূতাবাসের মুখপাত্র কানাডাকে তিরস্কার করে বলেন যে, সাউথ চায়না সী হচ্ছে একে ঘিরে থাকা দেশগুলির জন্য একটি ‘কমন হোম’, কোনক্রমেই সেটা কানাডা, আমেরিকা কিংবা অন্য কোন দেশের ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের ‘হান্টিং গ্রাউন্ড’ নয়। তিনি কানাডাকে অভিযুক্ত করে আরও বলেন যে, বহিরাগত দেশ হিসেবে কানাডা ফিলিপাইনের অবৈধ কর্মকান্ডে সহযোগিতা করে ইউএন চার্টারের পরিপন্থী পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং সেই সাথে এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। ইতিপূর্বে চীন সাউথ চায়না সী-তে কানাডার একটি মেরিটাইম প্যাট্রল প্লেনের গতিরোধ করে এবং একটি মিলিটারি হেলিকপ্টারের ঠিক সামনে ফ্লেয়ার ছুঁড়ে মারে। কানাডা চীনা বিমানবাহিনীর এই দুটি বিপদজনক ম্যানুভারের প্রতিবাদ জানালে চীন উল্টো কানাডাকে অভিযুক্ত করে চীনের সীমানায় অবৈধ প্রবেশের জন্য। অর্থাৎ ইদানীং কালে সাউথ চায়না সী নিয়ে চীন ও কানাডা বেশ কয়েকবারই বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছে। দুই দেশের মধ্যে এই বিতণ্ডা কোন দিকে মোড় নেয় সেটা বুঝতে হলে আমাদেরকে প্রথমে দেখতে হবে কানাডা কি আসলেই চীনের মতন এক শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে এককভাবে যুদ্ধ করার সামর্থ্য রাখে কি? ‘গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার’ নামক একটি সংস্থা যারা ২০০৬ সাল থেকে বছর ভিত্তিক পৃথিবীর ১৪৫টি দেশের ‘ফায়ার পাওয়ার’-এর একটি র‌্যাংকিং করে থাকে। তাদের করা ২০২৩ সালের এই র‌্যাংকিং-এ চীনের অবস্থান তৃতীয় আর কানাডার অবস্থান ২৭তম। অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক পরিসংখ্যান ডাটাবেইজ সার্ভিস সংস্থা ‘নেইশন মাস্টার’-এর তথ্যানুযায়ী আমরা যদি কানাডা এবং চীন এই দুই দেশের সামরিক শক্তির খুঁটিনাটি হিসেবের দিকে তাকাই তবে দেখতে পাব যে, কানাডার যেখানে প্রায় ১০০টি ফাইটার প্লেন রয়েছে সেখানে চীনের আছে দেড় হাজার -অর্থাৎ পনেরো গুণ বেশী। তেমনি সৈনিকের সংখ্যা আটচল্লিশ গুণ, ট্যাংকের সংখ্যা আটত্রিশ গুণ, যুদ্ধ জাহাজের সংখ্যা তিন গুণ, সাবমেরিনের সংখ্যা চল্লিশ গুণ বেশী। চীনের সামরিক বাজেটও কানাডার চেয়ে আট গুণ বেশী। এছাড়াও চীনের একটি এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার রণতরী এবং তিনটি নিউক্লিয়ার সাবমেরিন রয়েছে, অপরদিকে কানাডার এগুলোর কিছুই নেই। অনেকটা ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার’-এর দশা। আমেরিকার সিকিউরিটি পলিসি এক্সপার্ট এলব্রিজ কলবি কানাডা থেকে প্রকাশিত ‘ন্যাশনাল পোস্ট’ পত্রিকার ২০২২ সালের ২৫শে অগাস্ট সংখ্যায় তার লিখিত একটি উপসম্পাদকীয়তে কানাডার সামরিক শক্তি সম্পর্কে এই কথাটিই বলেছেন। তিনি জোর দিয়েছেন কানাডার সামরিক বাজেট বৃদ্ধির উপর তা না হলে কানাডার পরিণতি হবে নিধিরাম সর্দারের মতন। চীন অথবা রাশিয়ার সাথে কানাডাকে যুদ্ধ করতে হবে না সেই ভরসাতে কামানে গোলা ভরা লাগবে না, সেটা যদি কানাডার সামরিক পলিসি হয় তবে সেটা হবে একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ। অতএব দেখা যাচ্ছে যে কানাডার সরকার তার সামরিক শক্তির উন্নয়নে কি পদক্ষেপ নিচ্ছে সেটাও আমাদেরকে আমলে নিতে হবে চীনের সাথে কানাডার কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন খাতে প্রবাহিত হবে সেটা অনুধাবন করার জন্য।

২০২৩ সালের ১৯শে ডিসেম্বর তারিখে কানাডিয়ান মিলিটারি ম্যাগাজিন ‘স্পিরিট-দি-করপস’-এর অনলাইন পোর্টালে স্কট টাইলর তার ‘অন টার্গেটঃ কানাডিয়ান আর্মড ফোর্সেস বাই নাম্বারস’ আর্টিকেলে উল্লেখ করেছেন যে, কানাডিয়ান আর্মড ফোর্সেস, রয়্যাল কানাডিয়ান নেভী এবং রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্স এই তিনটি বাহিনীর কোনটিই বর্তমানে ভালো অবস্থাতে নেই। এই আর্টিকেলে আরও বলা হয়েছে যে, ইউক্রেইন যুদ্ধের জন্য জরুরী ভিত্তিতে কানাডিয়ান আর্মির অত্যাবশ্যকীয় কিছু ইকুপমেন্ট পাঠানো হয়েছে যা এখন রিপ্লেস করতে খরচ হবে ২২০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বর্তমান মিলিটারি বাজেট থেকে এই টাকাটা খরচ করতে হবে যেটার কোন পরিকল্পনা ছিল না। কানাডার মিলিটারিকে আধুনিকায়ন করার জন্য ২০২১ সালে সরকার ‘কানাডিয়ান আর্মি মর্ডানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি’ নামক একটি পরিকল্পনা হাতে নেয়। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে কানাডিয়ান আর্মিকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কমান্ড, কন্ট্রোল, কম্যুনিকেশনস, কম্পিউটারস, ইন্টেলিজেন্স, সার্ভেলিয়েন্স এবং রেকননাইসসান্স এই সাতটি এরিয়াতে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় রয়্যাল কানাডিয়ান নেভী ৬০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১২টি সাবমেরিন এবং রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ারফোর্স আড়াই বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১১টি আধুনিক ড্রোন কেনার জন্য সুপারিশ করেছে সরকারের কাছে। এছাড়াও পুরাতন যুদ্ধ জাহাজ গুলিকে প্রতিস্থাপন করার জন্য ১৫টি নতুন যুদ্ধ জাহাজ তৈরির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে যেখানে আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে তিনশত ছয় বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও ন্যাটোর সদস্য হিসেবে কানাডা তার বার্ষিক জিডিপির দুই পারসেন্ট মিলিটারি খাতে ব্যয় করার জন্য প্রতিশ্রুতবদ্ধ। কিন্তু বিগত বছরগুলিতে কানাডা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। ফলে অদূর ভবিষ্যতে সামরিক প্রতিরক্ষা খাতের বাজেটে একটি বড় ধরণের বৃদ্ধি আসন্ন। সেটা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতখানি প্রভাব ফেলবে সেটা আগেভাগে বলা মুশকিল। চীনের সাথে কানাডার বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বজায় রাখাটা কানাডার জন্য যতখানি জরুরী সেটা কিন্তু চীনের জন্য নয়। কারণ চীন তার মোট রফতানির মাত্র এক পারসেন্ট কানাডাতে করে থাকে সেখানে কানাডা করে চার পার্সেন্ট। কোন কারণে যদি এই সম্পর্কের অবনতি হয় তবে তা হবে কানাডার অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর এবং সামরিক বাজেট বৃদ্ধির অন্তরায়।

২০২৩ সালের ১০ই মার্চ তারিখে কানাডার একটি নন-প্রফিট অর্গানাইজেশন ‘অ্যাংগাস রিড’ চীনের প্রতি কানাডার জনগণের মনোভাব নিয়ে একটি সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায় যে শতকরা চল্লিশজন কানাডিয়ান মনে করেন যে সরকারের উচিৎ হবে চীনকে কানাডার জন্য একটি ‘থ্রেট’ বা হুমকি হিসেবে দেখা। অপরদিকে চীনকে কানাডার শত্রু হিসেবে দেখছেন শতকরা বাইশজন। শুধুমাত্র শতকরা বারোজন মনে করেন চীন কানাডার বন্ধু। অথচ ২০১৭ সালের অনুরূপ সমীক্ষাতে দেখা গেছে যে শতকরা ছত্রিশজন কানাডিয়ান মনে করতেন চীন কানাডার বন্ধুপ্রতিম দেশ। ষাট দশকের শেষভাগে কোল্ড ওয়ারের প্রতিপক্ষ চীনের সাথে কানাডা যখন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে রাজী হয় তখন চেয়ারম্যান মাও প্রিমিয়ার ট্রৌ এনলাই-কে বলেছিলেন যে, “উই নাউ হ্যাভ অ্যা ফ্রেন্ড ইন আমেরিকা’স ব্যাকইয়ার্ড”। কালের বিবর্তনে সেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রায় তলানীতে এসে পৌঁছেছে আজ। এমনই কথা বলেছেন কানাডিয়ান চীনা বিশেষজ্ঞ বার্নি ফলিক ২০২২ সালে প্রকাশিত তার ‘কানাডা এন্ড চায়না – অ্যা ফিফটি-ইয়ার জার্নি’ বইতে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে চীনের সাথে কানাডার কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কে প্রথম টানাপোড়েন ঘটে ১৯৮৯ সালের থিয়েনআনমেন ম্যাসাকারের ঘটনার মধ্য দিয়ে। ‘হিউম্যান রাইটস’ ছিল এই টানাপোড়েনের প্রধান কারণ। কিন্তু ১৯৯৪ সালে কানাডার তদানীন্তন প্রধানমান্ত্রী জঁ ক্রেটিয়েন ‘টিম কানাডা’ প্রজেক্টের মাধ্যমে চীনের সাথের বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়ন সাধনের মিশন হাতে নেন। সেই সময়ে কানাডা চীনের ‘হিউম্যান রাইটস’ নিয়ে তেমন কোন উচ্চবাচ্য করেনি যদিও চীন প্রস্তুত ছিল এই প্রসঙ্গে কানাডার সাথে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য। কিন্তু বর্তমানে চীন তার সুর পাল্টিয়ে ফেলেছে। হিউম্যান রাইটস প্রসঙ্গে চীন এখন উল্টো কানাডাকে স্মরণ করিয়ে দেয় ফার্স্ট নেশনের প্রতি তাদের আচরণের কথা। কানাডার সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের আসল অবনতি ঘটে যখন ২০১৮ সালের পহেলা ডিসেম্বরে চীনের বিখ্যাত টেলিকম কোম্পানী হুয়াওয়েই-এর সিএফও মেং ওয়ানট্রৌ-কে ভ্যানকুভার এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেফতার করে কানাডা। কারণ মেং ওয়ানট্রৌ-এর বিরুদ্ধে আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস-এর গ্রেফতারী পরোয়ানা ছিল। কানাডার এই কাজে ক্ষুব্ধ হয়ে চীন কানাডাকে প্রথমে অভিযুক্ত করে আমেরিকার ‘রানিং ডগ’ হিসেবে এবং পরবর্তীতে মাইকেল কভরিগ এবং মাইকেল স্পাভর নামক দুই কানাডিয়ানকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার করে। শুরু হয় চীন ও কানাডার মধ্যে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব।  (চলবে)

কাজী সাব্বির আহমেদ

কলাম লেখক । টরন্টো