কানাডায় সহিংসতায় নারী ও বালিকাদের হত্যা ২০১৯ সালের চেয়ে বেড়েছে ২৪%

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক : দেশে নারীহত্যা বাড়ছে। নতুন এক রিপোর্টে জানা গেছে, গত বছর সহিংসতায় প্রায় ২০০ নারী ও বালিকার মৃত্যু হয়েছে।

কানাডার ফেমিসাইড অবজারভেটরি ফর জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি (CFOJA) সম্প্রতি নতুন সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কানাডায় লিঙ্গ/জেন্ডার ইস্যুর সাথে সম্পর্কিত যেসব নারী ও বালিকা হত্যার শিকার  (ফেমিসাইড) হয়েছে সে বিষয়টি পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণসহ তুলে ধরা হয়েছে। খবর কেরিসা উইলসন -নাউটরন্টো.কম।

ফেমিসাইড বলতে সেক্স অথবা জেন্ডারের কারণে অর্থাৎ শুধুই নারী হবার কারণে যেসব হত্যা ঘটে সেগুলিকে বোঝানো হয়। ফেমিসাইডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর হাতে ফেমিসাইড, এর পরেই আছে পারিবারিক ফেমিসাইড এবং সবশেষে সেইসব ফেমিসাইড যেগুলি ঘটে ঘনিষ্ঠতার বাইরের কারো হাতে যেমন, নিহত ও হত্যাকারী পরস্পরের বন্ধু, পরিচিত অথবা অচেনা ব্যক্তি ছিল এমন।

নিখোঁজ এবং খুন হওয়া আদিবাসী মহিলাদের জীবনকে সম্মান জানিয়ে একটি বার্ষিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন একদল নারী। ছবি: জেনিফার গাউথিয়ার/রয়টার্স

এই রিপোর্ট প্রকাশের একটি লক্ষ হলো আইন এবং/অথবা কানাডার দণ্ডবিধিতে  ফেমিসাইড বা নারীহত্যার নামটি যুক্ত করা।

২০২২ সালে কানাডায় ১৮৪ জন নারী ও বালিকা হত্যার শিকার হয় এবং আরও ১৩টি মৃত্যুর ঘটনা সন্দেহজনক হিসাবে চিহ্নিত হয়। এসব মৃত্যুর বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে। 

রিপোর্টে বলা হয়, “প্রকৃতপক্ষে, নারী ও বালিকাদের হত্যার জন্য পুরুষদের অভিযুক্ত করা হয়েছে এমন ঘটনা কোভিড মহামারীপূর্ব ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২২ সালে বেড়েছে ২৭ শতাংশ। আর আমরা এই গণনার কাজ এখনও চালিয়ে যাচ্ছি।”

রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কানাডাজুড়ে সামগ্রিকভাবে অন্তত ৮৫০ জন নারী ও বালিকা নিহত হয়। এছাড়াও শুধু গত পাঁচ বছরেই ফেমিসাইডের কারণে ৮৬৮ টি শিশু তাদের মাকে হারিয়েছে।

সিএফওজেএ-র প্রতিষ্ঠাতা ও গুয়েলফ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মিরনা ডাউসন U of G News কে বলেন, “একজন নারীর মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পাবার কথা।” “তবে নিহতের রেখে যাওয়া স্বজনের ওপর তার মৃত্যুর যে প্রভাব পড়ে ফেমিসাইড বলতে তারই স্বীকৃতি বলে বুঝতে হবে। এ ধরণের মৃত্যু বছরের পর বছর ধরে সমাজে এবং এই ক্ষতি থেকে বেঁচে উঠতে সচেষ্ট ব্যক্তি, বিশেষ করে শিশুদের জীবনের পরিণতির ওপর প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।”

দেখা গেছে, ২০২২ সালে নিহতের সংখ্যা ২০২১ ও ২০২০ উভয় বছরের তুলনায় বেশি, যেখানে যথাক্রমে নিহত হন ১৭৩ জন এবং ১৬০জন।

অবশ্য, মহামারির আগে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা সামান্য কম ছিল। ২০১৯ সালে ১৩৭টি মৃত্যুর বিপরীতে ২০১৮ সালে মৃত্যু ঘটে ১৮৪টি।

গত বছর ডিসেম্বরে মিসিসাগায় গুলিতে নিহত হন পবনপ্রীত কৌর। এই হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী ধরম সিং (বাঁয়ে) নামের এক ব্যক্তিকে খুঁজছে পুলিশ। ছবি : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

গত বছর কানাডায় প্রতি মাসে গড়ে ১৫ জন নারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে নিহত হন সবচেয়ে বেশি ২২ জন এবং সবচেয়ে কম এপ্রিলে মোট সাত জন।

সবচেয়ে বেশি নারী ও বালিকার নিহত হন অন্টারিওতে (৩৬%)। এর পরই ছিল ব্রিটিশ  কলাম্বিয়া (১৪%) এবং সবচেয়ে কম নুনাভুতে (০.৫%)।

রিপোর্টে বলা হয়, ২০২২ সালে পুরুষের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল এমন সহিংসতার ঘটনায় নিহত নারী ও বালিকার সংখ্যা ছিল ১৫০জন। তার মানে প্রতি মাসে ১৩ জন করে নারী ও বালিকা নিহত হয়েছেন।

প্রতি এক লাখ নারীর জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে হিসাব করলে নারীহত্যার সর্বোচ্চ হার ছিল যথাক্রমে নুনাভুতে (৫.০৬), সাসকাচুন (২.৫৩) এবং ম্যানিটোবায় (১.৯৯)। অন্যদিকে সর্বনিম্ন হার ছিল নিউফাউন্ডল্যান্ড ও ল্যাব্রাডরে (০.৩৮) নোভা স্কশিয়া (০.৩৯) এবং কুইবেকে (০.৪৪)।

নিহতদের বৃহত্তম অংশই ছিল অন্টারিওর যেখানে নিহত হন ৩৯ শতাংশ নারী ও বালিকা। এর পর ছিল ছিল বি.সি, কুইবেক ও আলবার্টা। এই তিনটি প্রদেশেই নিহতের হার ১৩ শতাংশ।

এদিকে, ৫৮ শতাংশ নারী ও বালিকা নিহত হন নগর এলাকায়, যেখানে ২৫ শতাংশ নিহত হন পল্লী এলাকায় এবং ১৭ শতাংশ ছোট টাউনে।

গত বছর ২৫ থেকে ৩৪ বছর এবং ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীদের নিহত হবার হার ছিল সর্বোচ্চ, ২৩ শতাংশ। হত্যার শিকার নারীদের গড় বয়স ছিল ৪২ বছর।

অভিযুক্ত পুরুষদের বয়স সম্পর্কিত তথ্যে দেখা যায়, ১৩৩ টি হত্যাকাণ্ডের যেগুলিতে বয়স জানা গেছে, তাতে তাদের বয়স ছিল ১৫ থেকে ৮২ বছরের মধ্যে, গড়ে ৩৭ বছর।

৮৬ টি ঘটনায় নিহতের জাতিগত পরিচয় জানা যায়। তাতে দেখা যায়, প্রায় সমানুপাতিক হারে নিহত হয়েছেন শে^তাঙ্গ (৩৪%), অশে^তাঙ্গ (৩৪%) এবং আদিবাসী (৩৩%) নারী।

নিহত নারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এমন অভিযুক্তের হাতে নিহত হন যার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হিসাবে সম্পর্ক চলছিল অথবা আগে এ ধরণের সম্পর্ক ছিল। এর পর রয়েছে পরিবারের অন্য কোনও সদস্যের হাতে হত্যার ঘটনা।

ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর হাতে হত্যার শিকার ৫২ নারীর মধ্যে ৪২ জনের সম্পর্কের অবস্থা জানা যায়। নিহত নারীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ তাদের খুনের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির বর্তমান অথবা প্রাক্তন বৈধ জীবনসঙ্গী ছিলেন। অন্যদিকে ২৪ শতাংশ ছিলেন বর্তমান অথবা প্রাক্তন কমন-ল পার্টনার এবং আরও ২৪ শতাংশ ছিলেন বর্তমান অথবা প্রাক্তন ডেটিং পার্টনার।

হত্যার শিকার নারীদের ৪৮ শতাংশের ক্ষেত্রে হত্যার পদ্ধতি জানা গেছে। ৫১ শতাংশ ছুরিকাঘাতে, ৩২ শতাংশ গুলিতে এবং ৭ শতাংশ প্রহারে নিহত হন।

সিএফওজেএ নরহত্যার বিষয়ে আরও সমন্বিত তথ্য রেকর্ড করার আহবান জানায় যাতে লৈঙ্গিক/জেন্ডার ইস্যুর সাথে সংশ্লিষ্ট হত্যা বা ফেমিসাইড সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

রিপোর্টে বলা হয়, “অংশত এর কারণ হলো, ঐতিহাসিকভাবেই তথ্য সংগ্রহের উপাদানগুলি প্রণয়ন করা হয় পুরুষের হাতে পুরুষের হত্যার বিষয়টি মাথায় রেখে। তার ওপর, এগুলোর মূল লক্ষ প্রতিরোধমূলক ফলাফলের চেয়ে বরং সরকারগুলোর প্রশাসনিক প্রয়োজনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি এমন এক পরিস্থিতি যা অবশ্যই পাল্টাতে হবে।”

সিএফওজেএ যুক্তি তুলে ধরে যে, দেশের আইন এবং সরকারি সংস্থাগুলির উচিৎ অধিকতর প্রামাণ্য গবেষণার ও উপাত্ত পাওয়ার ব্যবস্থা করা। আর তারা এটি করতে পারে এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক জ্ঞান রাখে এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে শিখে এবং যারা নারী হত্যা রোধের ব্যাপারে ভূমিকা রাখে এবং নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতা বিষয়ে সোচ্চার তাদের কাছে উপাত্ত সহজপ্রাপ্য করার মাধ্যমে।