করোনার দিনগুলো
এই মহামারি সহজে যাবে না, অনেকদিন ধরে চলবে
জসিম মল্লিক
(চতুর্দশ পর্ব)
এই মহামারি সহজে যাবে না, অনেকদিন ধরে চলবে বলেছে বিশ্বসাস্থ্য সংস্থা। পরিস্থিতি সত্যি ভয়াবহ। সবচেয়ে ক্রান্তিকাল। আগের সংখ্যায়ই তৃতীয় ওয়েভের আশঙ্কা করেছিলাম। সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কোভিডের নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। অন্টারিওতে প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন প্রজেকশন অনুযায়ী আগামী মে মাসে নাগাদ প্রতিদিন বিশ হাজার হতে পারে আক্রান্তের সংখ্যা। চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আইসিউতে জায়গা খালি নাই। ভ্যাকসিন রোল আউট চললেও আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিনের অর্পাযপ্ততা রয়েছে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কানাডায় আক্রান্তের সংখ্যা বারো লাখেরও বেশি, মৃত্যু প্রায় ২৪ হাজার। অন্টারিও প্রভিন্সে আক্রান্ত ৪ লাখের অধিক, মৃত্যু প্রায় ৮ হাজার। সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ১৩ কোটি ৯৬ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ জন এবং মারা গেছে ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৪৬ জন। বিশ্বে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ ১৯ হাজার ৫৬ জন এবং বর্তমানে আক্রান্ত অবস্থায় রয়েছে এক কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার ৭৮৬ জন।
সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থ হওয়ার হার ৯৮ শতাংশ এবং মারা যাওয়ার হার দুই শতাংশ। বিশ্বে বর্তমানে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় রয়েছে এক লাখ ছয় হাজার ৮৭৬ জন এবং বাকিদের অবস্থা স্থিতিশীল। বিশ্বে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সে দেশে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে তিন কোটি ২২ লাখ ২৪ হাজার ১৩৯ জন এবং মারা গেছে পাঁচ লাখ ৭৮ হাজার ৯৯৩ জন । বিশ্বে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পর যথাক্রমে রয়েছে- ভারত, ব্রাজিল, ফ্রান্স, রাশিয়া, ব্রিটেন, তুরস্ক, ইতালি, স্পেন ও জার্মানি। ভারতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা এক কোটি ৪২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৪০ জন এবং মারা গেছে এক লাখ ৭৪ হাজার ৩৩৫ জন। ব্রাজিলে আক্রান্ত হয়েছে এক কোটি ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩ জন এবং মারা গেছে তিন লাখ ৬৫ হাজার ৯৫৪ জন।
চীনের উহান থেকে বিশ্বজুড়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ছড়িয়ে পড়ে মহামারি করোনা ভাইরাস। এক বছরের বেশি সময় ধরে পুরো বিশ্ব তছনছ করে ফেলেছে এই ভাইরাসটি। টিকা প্রয়োগ শুরু হলেও ভাইরাসটির প্রকোপ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, শিগগিরই এই ভাইরাস চলে যাবে, এমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। মাঝখানে প্রকোপ কিছুটা কমলেও আবার পুরোদমে জেঁকে বসার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম গ্রেব্রেসুস বলেছেন, সারাবিশ্বে ৭৮ কোটি ডোজ কভিড টিকা দেওয়া হয়েছে। মহামারিটি কখন শেষ হবে বলা কঠিন। তবে এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আশা করি, কয়েক মাসের মধ্যে আমরা তা পারব। গত জানুয়ারি ফেব্রুয়ারিতে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রমেণের নিম্ন গতি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুহারও।
এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার প্রধান বলেছেন, “এ বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সারা বিশ্বে টানা ৬ সপ্তাহ সংক্রমণের হার কমেছিল। এখন সাত সপ্তাহ ধরে ফের সংক্রমণের উর্ধগতি দেখা যাচ্ছে। গত চার সপ্তাহ ধরে টানা বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। এশিয়া ও মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে সংক্রমণের প্রকোপ বাড়ছে।” টেড্রোস আরো বলেন, মহামারি সহজে যাবে না, অনেকদিন ধরে চলবে। তবে এই পরিস্থিতিতে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে এবং অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।” তবে তিনি সবাইকে এই বলেও আশ্বাস দেন, “মহামারিটি অনেক দিন ধরে চললেও আমাদের অনেক আশা রয়েছে। কারণ, প্রথম দু’মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। এতেই স্পষ্ট যে, এই ভাইরাসকে রোধ করা সম্ভব। আমরা এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি।”
এদিকে ফাইজারের প্রধান নির্বাহী অ্যালবার্ট বোরলা বলেছেন, টিকা নেওয়ার পরে ১২ মাসের মধ্যে তৃতীয় বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হতে পারে। গত ১৫ এপ্রিল সিএনবিসিতে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি। ১ এপ্রিল সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড করা হয়। প্রাথমিক গবেষণা বলছে, মডার্না, ফাইজার ও বায়োএনটেকের টিকার কার্যকারিতা কমপক্ষে ছয় মাস পর্যন্ত থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা ছয় মাসের বেশি সময় পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারলেও করোনার নতুন নতুন ধরনের কারণে নিয়মিত বুস্টার ডোজ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। সিইও বোরলা বলেন, বুস্টার ডোজ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এমন তথ্য জানিয়েছেন। কংগ্রেস কমিটির বৈঠকে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কোভিড-১৯ রেসপন্স টাস্কফোর্সের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডেভিড কেসলার বলেছেন, টিকা নেওয়ার পর রোগ প্রতিরোধক্ষমতার স্থায়িত্ব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, টিকার বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, যাঁরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তাঁদের প্রথমে টিকার এই বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস অব ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ট প্রিভেনশনের পরিচালক রোসে ওয়ালেনস্কি হাউস সাবকমিটিতে বলেন, টিকা নেওয়ার পরও যাঁরা করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়ালেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ৭ কোটি ৭০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজার ৮০০ জন টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে ৩৯৬ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। ৭৪ জন মারা গেছেন। ওয়ালেনস্কি আরও বলেছেন, টিকা নেওয়ার পর অনেকের প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী না হওয়ায় এ ধরনের সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে করোনার আরও বেশি সংক্রামক ধরনে অনেকে সংক্রমিত হয়েছেন। ফাইজার ও বায়োএনটেক বলেছে, করোনা প্রতিরোধে তাদের টিকা ৯১ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর। ট্রায়ালের তথ্যের ভিত্তিতে ফাইজার ও বায়োএনটেক জানিয়েছে, ১২ হাজারের বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এটি কমপক্ষে ছয় মাস তাঁদের সুরক্ষা দেবে।
বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে শঙ্কা দিন দিন গভীর হচ্ছে। গত বছরের ৮ মার্চে আক্রান্ত ও ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর খবরের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে করোনায় ১০ হাজার ৮১ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মহামারি করোনা। এই মৃত্যুর মিছিলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সেনা সদস্য, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী ও সাংবাদিক রয়েছেন। দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩৯ জন চিকিৎসক ও ৩৪ জন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৯১০ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর ১ হাজার ৯৯৮ নার্স এবং ৩ হাজার ২৯৫ স্বাস্থ্যকর্মীও আক্রান্ত হয়েছেন এই সময়ের মধ্যে।
গত বছরের ১৫ এপ্রিল করোনায় দেশে প্রথম একজন চিকিৎসক মারা যান। তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দীন আহমদ (৪৭)। তার মৃত্যুর খবর চিকিৎসক সমাজসহ সব শ্রেণিপেশা ও সাধারণ মানুষের হৃদয় নাড়া দেয়, নেমে আসে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয় এই ‘মানবিক ও গরিবের ডাক্তার’ খ্যাত এই চিকিৎসকের মৃত্যুতে। এরপর থেকে করোনায় চিকিৎসকদের মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। বিএমএর তথ্য বলছে, গত বছরের জুন মাসে মোট ৪৫ জন চিকিৎসক করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন। ওই মাসের ৪ তারিখ সবচেয়ে বেশি চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। ওই দিন পাঁচজন চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করেছিলেন। যা ছিল সর্বোচ্চসংখ্যক চিকিৎসকের এক দিনে মৃত্যু। এদিকে সাংবাদিকদের ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপ আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের অধিকার’-এর তথ্য অনুযায়ী, করোনায় দেশে এ পর্যন্ত ৩৪ জন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন।
ব্রাজিলের করোনার ধরন আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে করোনা সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য জানা গেছে। বলা হচ্ছে, ব্রাজিলে পাওয়া করোনাভাইরাসের ধরনটি ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এটি আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের মানাউস শহরের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (ফিওক্রুজ) সম্প্রতি এ গবেষণা চালিয়েছে। দেশটিতে পাওয়া করোনার ধরনটির নাম হলো ‘পি১’। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ব্রাজিলে ইদানীংকালে করোনার সংক্রমণের হারে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। দেখা গেছে যে পি১ ধরনটি ক্রমাগত পরিবর্তিত (মিউটেশন) হচ্ছে। এর ফলে ভাইরাসটি আরও ভয়ানক হওয়ার আশঙ্কা আছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিবর্তনের কারণে করোনার ওই ধরনটি টিকাপ্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে। গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক ফেলিপে নাভেচা বলেন, ‘আমরা মনে করছি, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভাইরাসটি অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছে।’ তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় পাওয়া করোনার ধরনটির মতোই মিউটেশন লক্ষ করা যাচ্ছে পি১ ধরনটিতে। দক্ষিণ আফ্রিকায় পাওয়া করোনাভাইরাসের ধরনটির ক্ষেত্রে বেশ কিছু টিকা কম কার্যকর বলে আলোচনা আছে। ফেলিপে নাভেচা বলেছেন, টিকার কার্যকারিতা কমে যায় কি না, সে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, ভাইরাসটির ‘পি১’ নামের ধরনটি খুব দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।
এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ভাইরাসের ‘পি১’ ধরনটি প্রকৃত ধরনটির তুলনায় আড়াই গুণ বেশি ছোঁয়াচে। অর্থাৎ ব্রাজিলে পাওয়া করোনার ধরনটি দ্রুত ছড়াতে সক্ষম এবং একই সঙ্গে অ্যান্টিবডির বিরুদ্ধে এর সহনশীলতাও বেশি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বর্তমানে টালমাটাল ব্রাজিল। দেশটিতে করোনাভাইরাসে মোট মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে। করোনায় বেশি মৃত্যুর দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরই আছে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ। ব্রাজিলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সবচেয়ে ভীতিকর দিক হচ্ছে, এখন অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। আবার এ বয়সীদের শারীরিক অবস্থা নাজুক হয়ে যাচ্ছে। গত মার্চ মাসের উপাত্ত বলছে, আইসিইউতে থাকা রোগীদের মধ্যে অর্ধেক ৪০ বা এর কম বয়সী।
নাথিং টু ডিক্লেয়ার
অনেকদিন কোনো স্বপ্ন দেখি না। স্বপ্ন দেখা যেনো ভুলেই যাচ্ছি! স্বপ্ন না থাকলে বাঁচব কিভাবে! আমারতো স্বপ্ন ছাড়া কিছু নাই। প্রকৃত স্বপ্নবাজ যদি কেউ থাকে সেটা হচ্ছি আমি। আমি স্বপ্ন দেখি কারণ স্বপ্ন দেখতে পয়সা লাগে না, কারো অনুমতি লাগে না,কেউ জানতেও পারে না। আমি একলা একলা স্বপ্ন দেখি। শিশুকাল থেকেই আমি স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছি। আমার যখন কিছুই ছিল না তখন স্বপ্ন আমার সঙ্গী ছিল। স্বপ্ন আমাকে উদ্দীপ্ত রাখত, স্বপ্ন আমাকে প্রেরনা জোগাত, স্বপ্ন আমাকে বাঁচতে শেখাত। কিন্তু কোভিড আসায় স্বপ্নগুলো কেমন লন্ড ভন্ড হয়ে গেছে। ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরও কি আমি স্বপ্ন দেখি না! দেখি। স্বপ্ন দেখি একদিন পৃথিবী আবার আগের মতো হবে। আবার তুমুল আড্ডা হবে, বেড়ানো হবে, পরস্পরের মুখ দেখতে পাব, বুকের স্পন্দন শুনতে পাব, গায়ের ঘ্রাণ পাব, ভ্যালেন্টাইন পালন করব, বৈশাখ হবে, একুশের শীতের রাতে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাব।
এক বছর ধরে মাস্ক পরছি। বাইরে গেলে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি না, নিঃশ্বাস আটকে যায়, চশমার গ্লাস ঘোলা হয়ে যায়, কমিউনিকেশন হয় না যথাযথ। মানুষে মানুষে দুই মিটার দূরত্ব। অচেনা মানুষের কাছে যেতে ভয় লাগে। মুখোশের আড়ালে চেনা মানুষও অচেনা লাগে। প্রতিদিন ঘুম ভেঙ্গে কোভিড চেক করি। পৃথিবীতে কত মানুষ আক্রান্ত হলো, কত মানুষ মারা গেলো সেসব দেখি। কানাডা আর বাংলাদেশের সর্বশেষ আপডেট দেখি। কখনো আশা জেগে উঠে কখনো হাতাশা গ্রাস করে। এরই মধ্যে কত আপনজন হারিয়েছি। অনেক চেনা মানুষকে আর দেখবো না। কানাডায় এখন চরম উইন্টার। চারিদিকে বরফের স্তুপ। কোথাও যাওয়া নাই। বন্দী জীবন। তাই হতাশা ঘিরে আছে। এই সময়টা আমি দেশে থাকি। কিন্তু এবার কোনো পরিকল্পনা করতে পারছিনা। এখানে ভ্যাকসিন কবে পাব জানিনা। সে তুলনায় বাংলাদেশে অনেক এগিয়ে আছে।
কিন্তু স্বপ্ন জাগরুক আছে। হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারঙ্গম আমি। বেশি পরিকল্পনা করে আমি কিছু করতে পারি না। লাভ ক্ষতির চিন্তা করি না। মন যা সায় দেয় তাই করি। সেজন্য যে কেনো ক্ষতি মেনে নিতে দ্বিধা করব না। তখন কোনো যুক্তি কাজ করে না। পূর্বাপর পরণতি না ভেবেই অনেক কিছু করি আমি। এজন্য আমি জীবনে অনেক মূল্য দিয়েছি। সেজন্য আমার কোনো অনুতাপ হয় না। স্বপ্নই আমাকে উদ্দীপ্ত করে। স্বপ্ন দেখি কবে আবার পীয়ারসন এয়ারপোর্ট থেকে প্লেনটা আমাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে উড়াল দেবে। সাড়ে বারো হাজার কিলোমটিার উড়ে ক্লান্ত এয়ারবাসটা যখনই আগুনের ফুলকি ছুটিয়ে হুস করে ঢাকার মাটিতে ল্যান্ড করবে তখন আমার চোখ অজান্তেই ভিজে উঠবে। ইমিগ্রেশনের বেড়াজাল পার হয়ে বাইরে বের হয়ে প্রথমেই বুক ভরে নিঃশ্বাস নেব। একবছরে ঢাকা কতটুকু বদলেছে সে সব পরখ করে দেখব। ঢাকার রাস্তার ধূলিকনার সাথে কথা বলব। প্রিয় শহর ঢাকা। আমার দেশ। গাড়ির পিছনের সীটে বসে আমার চোখে জল গড়াবে।
গত এক বছরে কতকিইতো করতে চেয়েছিলাম। কত পরিকল্পনা ছিল, স্বপ্ন ছিল। কত জায়গায় যেতে চেয়েছিলাম। অটোয়া, ক্যালগেরি, নিউইয়র্ক, আটলান্টা, টেক্সাস, লসএঞ্জেলেস, লন্ডন, প্যারিস, কোলকাতা। তালিকা ছোট নয়। কিছুই হয় নাই। এয়ারপোর্ট জায়গাটা আমার বড় পছন্দ বা যে কোনো স্টেশন। স্টেশন মানেই জায়গা বদল। ছুটে চলা। চলতে চলতে একদিন এমন এক পারলৌকিক স্টেশনে নামব যেখান থেকে আর ফিরব না। সেখানে কেনো প্লাটফর্ম থাকবে না, কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করবে না। কেউ ফেরে না সেই অচেনা স্টেশন থেকে। ছোটবেলায় প্লেন দেখলেই আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। গুম গুম শব্দ করে একটা ছোট্ট জিনিস উড়ে যাচ্ছে। ভাবতাম পাখির মতো জিনিসটা কেথায় যায়! কোথা থেকে এসেছে! বড় বিস্ময় জাগত মনে।
মাকে একদিন বললাম, মা, আমি প্লেনে চড়ে একদিন অনেকদূরে চলে যাব।
মা বলতেন, কোথায় যাবি!
তাত জানিনা, দূরে কেথাও চলে যাব।
মা বলতেন, তোর আবার মাথায় ঘুঘু ডাকছে।
এই বলে মায়ের চোখ ছল ছল করে উঠত। হ্যাঁ আমার মাথায় প্রায় প্রায় ঘুঘু ডাকে। পারাপারের ললিতের মতো মাথায় আকাশ ঢুকে পড়ে আমার।
প্রতিবার ঢাকায় পৌঁছেই বরিশাল যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠতাম। সেই তরুণ বয়সে বরিশাল ছেড়েছি। আমাকে ছাড়া মায়ের জীবনটা শূন্য হয়ে গিয়েছিল। কারণ আমি ছিলাম সবার ছোট সন্তান। বাবা ছিল না বলে মা আগলে রাখত সারাক্ষন। সেই আমি হুট করে বরিশাল ছেড়ে ঢাকায় আসলাম। স্বপ্ন লেখক হবো। কোনো মানে হয় না! ওসব না করলেই ভাল ছিল। মায়ের পাশে থাকতে পারতাম। প্রতিদিন ফেলে আসা স্বপ্ন দেখি। ঢাকা থেকে স্টীমারে চড়ে খুব ভোরে বরিশাল পৌঁছে যাই। স্টীমার রকেটটি ভোঁ দিয়ে যখন বরিশাল ঘাটে থামতো তখনও রয়ে যেতো অন্ধকার। ঘাট থেকে মাত্র পনেরো মিনিটের রিকশা পথ আমাদের বাড়ি। মনে হয় পথ আর ফুরোয় না। তখনও আকাশভরা তারা, আর পূবদিকে আকাশের রঙ ময়ূরের গলার মতো রঙিন। সামান্য ঠান্ডা অনুভূতি হয় ভোরের সকালে। সেই হিম ধুয়ে দেয় বাতাসকে। বাতাস বড় শীতল, বড় উদার মনে হয় তখন।
বাড়িতে গেলে যে ক’টা দিন থাকতাম, মা কেবল গল্প করতো। নদী, নৌকা আর গাছগাছালির গল্প। মায়ের হাতে জাদু ছিল। মাটি কথা বলতো মায়ের সঙ্গে। যা কিছু মা রোপন করত তাই লকলকিয়ে উঠতো। মাছ, ধান আর পিঠে-পায়েসের গল্প করত মা। একঘেঁয়ে, তবু কান পেতে শুনতাম আমি। ছোটবেলায় যখন বছরে দু-তিন মাস মায়ের সঙ্গে ঢাপরকাঠি মামা বাড়িতে থাকতাম, তখন নদী, নৌকো, মাছ আর ধান আমার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। সেসব গল্প করত মা। মায়ের গলায় জল-মাটির নোনা আর সোঁদা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে যায়। তবু সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে সেই পিঁপড়ার কামড়, শেষ রাত্রির আবছায়ায় ঘুম ও স্তব্ধতার মধ্যে এক অলৌকিক নিরুদ্দেশ যাত্রা। যেখানে মা চলে গেছেন। একটা অজানা এয়ারপোর্ট, চেক ইন, ইমিগ্রেশন, কাষ্টমস, বোর্ডিং পাস, বোর্ডিং ব্রীজ, ফাসিংবেল্ট এন্ড নাথিং টু ডিক্লায়ার!
মায়ের হাতের রান্না ছিল অনন্য
খাবার নিয়ে আমার বিভিন্ন রকম বায়নাক্কা আছে। এটা খেতে চাই না ওটা খেতে চাই না এর রকম ব্যাপার। অনেকে আছে যা পায় তাই হাপুস হুপুস খেয়ে ফেলে। খেতে কেমন লাগল, মসলা ঠিক হয়েছে কিনা, ঝাল ঠিক আছে কিনা, তেলের পরিমাণ সঠিক ছিল কিনা, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল নাকি ভেজিটেবল অয়েল এসব নিয়ে ভাবে না। দুনিয়াতে তারাই সুখী যারা সব খেতে পারে। মানুষতো খাওয়ার জন্য পৃথিবীতে আসেনি, বাঁচার জন্য খেতে হয় তাই মানুষ খায়। খাওয়া নিয়ে পেরেসানি আমার আগে ছিল না। আজকাল অনেক খুঁত ধরি আমি। নিজে কিছু করতে পারি না কিন্তু খুঁত ধরতে পারি।
মনে আছে তখন মাত্র বিয়ে করেছি। সংসার শুরু হয়েছে। জেসমিন রাঁধতে চেষ্টা করছে। কঠিন চেষ্টা। দুটো ঘটনা বলি। রান্নার গল্প। তখনও সংসার গুছিয়ে উঠতে পারিনি। আর্থিক টাানাপোড়েন দূর হয়নি। আমার জন্য তা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু জেসমিনের জন্য ছিল কঠিন পরীক্ষা। আমার সাথে সংসার করার পরীক্ষা। আমি হল জীবন ছেড়ে সংসার জীবনে প্রমোশন পেয়েছি। হল জীবনে আমি অনেক কষ্ট করেছি খাওয়া নিয়ে। তাই খাওয়া নিয়ে কোনো অভিযোগ নাই। কোনোকিছু গায়ে মাখি না। কিন্তু জেসমিন বাবা মায়ের নিশ্চিন্ত আশ্রয় থেকে এসেছে মাত্র।
আমরা থাকি বনানীতে। ছায়া ঘেরা সুন্দর একটা বাসা। প্রায় ফ্রীতে থাকি বলতে গেলে। চারিদিকে গাছ গাছালি। অনেক ফল, ফুল। পাখিরা কিচির মিচির করে দিনভর। সেটা ১৯৯০ সাল। আমাদের এই বাসায় এখনকার অনেক বিখ্যাত সাংবাদিক বন্ধুরা এসেছেন তখন। মঈনুল আহসান সাবের, খায়রুল আনোয়ার মুকুল, কাজী জাওয়াদ, রেজোয়ানুল হক রাজা, আকবর হায়দার কিরন, আবদাল আহমেদ, ইরাজ আহমেদ, মাহফুজুর রহমান, আরিফ রহমান শিবলী, মিনার মাহমুদ, আসিফ নজরুল, মোস্তাক হোসেন, লিটন, লিটু সহ আরো অনেকে এসেছেন।
যাইহোক। আমি বাজার করে নিয়ে আসলাম। টিবি গেট বাজার থেকে চিংরি মাছ আর টিএন্ডটি এলাকা থেকে কলমি শাক কিনলাম। সস্তার জিনিস। জেসমিন রান্না করল। বেশ ঘ্রাণ ছুটছে। খেতে বসেছি। জেসমিন অধীর আগ্রহ নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন হয়েছে! আমি মুখে খাবার নিয়ে দু’আঙ্গুল তুলে বললাম অসাধারণ! সেদিন অবশ্য জেসমিন তরকারিতে লবন দিতে ভুলে গিয়েছিল, তাও খারাপ লাগেনি! তারপর প্রথম পোলাও রান্না। পোলাও রান্নার মনে হয় কিছু কায়দা কানুন আছে। প্রথম দিন পোলাও একেবারে ভর্তা হয়ে গিয়েছিল! সেই ভর্তা পোলাও খেয়ে নিয়েছি মজা করে। চিবুতে হয়নি। এখন জেসমিন একসাথে তিরিশ জনের রান্না করতে পারে, ষোল পদের আইটেম।
মানুষের অনেক অভ্যাসই বদলে যায়। কোনো একটা জায়গায় স্থির থাকে না। পরিবেশ, অবস্থান মানুষকে বদলে দেয়। পরিস্থিতির কারনেও মানুষ বদলায়। খাওয়া নিয়ে বায়নাক্কা আমার আগে ছিল না। টেবিল ভরা খাবার দেখতে আমার ভাল লাগে। কিন্তু সব খাবার আমি খেতে পারি না। অরিত্রি বলেছে, বাবা অনেক খাবার অপচয় করে। কানাডিয়ান প্রতি হাউজহোল্ড পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি খাবার অপচয় করে। যেদিন থেকে খাওয়া নিয়ে রেষ্ট্রিকশন আরোপ শুরু হলো সেইদিন থেকে ঝামেলার শুরু।
মেপে মেপে খাওয়া, ক্যালরি মেপে খাওয়ার কথা আমরা জানতাম না। পেটভরে খেতে পারলেই খুশী ছিলাম। হল জীবনেতো অনেকদিন না খেয়েও রাতে ঘুমিয়ে থেকেছি। কারো বাসায় গেলে হাভাতের মতো হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মনে মনে ভাবতাম কম পরবেনাতো আমার! পেট না ভরলেও চাইতে লজ্জা পেতাম। আধাপেটে খাওয়া শেষ করেছি। পেট ভরেছে কিনা বুঝতাম না। এখনও আমার এমন হয়। এখনও একটু রাত জাগলেই খিদা পেয়ে যায়। মা বলতেন আমার নাকি চোখের খিদা। জেসমিনও তাই বলে।
মামা বাড়ির দিনগুলোর কথা
মনে আছে। অজ গ্রাম। অভাব অনটন। কেরোসিন সেভ করার জন্য সন্ধ্যা নামলেই কুপি নিবিয়ে শুয়ে পড়তে হতো। শীতের রাতে ধানের মাচানে ঘুমাতাম। ওম ওম গরম থাকত সিদ্ধ ধান। চাষের জমি থেকে গ্রাম দেশে সামান্য আয় রোজাগারে সংসার চলে। এক পয়সা দুই পয়সার হিসাব প্রতিনিয়ত। কলস কাঠির হাট থেকে মেঝ মামা লেবেন্চুশ কিনে দিত বা মুড়ির মোয়া। পুকুর সেচ দিয়ে মাছ মারা হতো, সেই মাছ দিয়ে চলে যেতো ছয় মাস। একেবারে ফর্মালিন মুক্ত তাজা মাছ। শীতের সকালে ভাত খেতাম পেটপুরে। শোল, কৈ, শিং, মাগুর, গজার এসব জিয়ল মাছের তরকারি জমে থাকত ঠান্ডায়।
বড় মামি আমার জন্য একটা সুন্দর কাঠেরপিঁড়ি আর একটা কাসার থালা রেখেছিলেন। যখনই যেতাম ও দুটো আমার হতো। আমি পাত পেড়ে খেতে বসতাম। খেতের তরকারি আর পকুর বা ডোবার মাছ। তখনকার দিনে খাবার গরম করার বিলাসিতা ছিল না। ম্যাচের একটা কাঠি খরচ করত হিসাব করে। সেইসব খাবারে স্বাদ এখনও মনের মধ্যে গেঁথে আছে। আর বাড়িতে মা যা রাঁধতেন তাই ছিল অমৃত সমান। মা সিদ্দীকা কবির পড়তে জানতেন না বা ইউটিউবও ছিল না। তবু মা অনন্য ছিলেন।
জসিম মল্লিক
টরন্টো
