সংকটময় অবস্থায় কানাডার হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, মার্চ ১৪, ২০২৬ : সারাদেশের রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে শয্যা পাওয়ার জন্য স্ট্রেচারে অথবা গুদাম কক্ষে দিনের পর দিন সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। আসনের তুলনায় রোগী বেশি হওয়ায় স্ট্রেচারে অথবা গুদামঘরে অস্থায়ী বিছানায় দুই চার দিন এমনটি ছয়দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনেককে। কেউ কেউ মারাও যাচ্ছেন ওখানেই।

না, এটি কোন ভৌতিক সিনেমা বা হরর মুভির দৃশ্য নয়। এগুলো কানাডার হাসপাতালসমূহের জরুরি বিভাগগুলোতে ঘটে চলা এক বাস্তব দৃশ্য। সিবিসি নিউজে এমনই এক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে গত ১৩ মার্চ প্রকাশিত তাদের এক প্রতিবেদনে।

কানাডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (সিএমএ)-এর সভাপতি ড. মার্গো বার্নেল বর্তমান পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে সিবিসি নিউজকে বলেছেন “আমার মনে হয় আমরা চূড়ান্ত সংকটের কাছাকাছি চলে এসেছি।”

হাসপাতালগুলোর জরুরী বিভাগ চূড়ান্ত সংকটের কাছাকাছি চলে এসেছে। ছবি: প্রবাসী কণ্ঠ

নিউ ব্রান্সউইক-এর একজন মেডিক্যাল ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বার্নেল বলেন, জরুরি বিভাগগুলোর জন্য সমস্যা হলো, তাদের দরজায় কারা আসছে তা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অন্যদিকে জরুরি বিভাগগুলোতে শুধু রোগীর সংখ্যাই বাড়ছে না, বরং যে রোগীরা আসছেন তাদের শারীরিক অবস্থাও আরও জটিল।

বার্নেল ব্যাখ্যা করে বলেন, “এর মানে হলো ডাক্তারের সাথে দেখা করতে আসা রোগী এবং তাদেরকে যদি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বিছানা পেতে হয় তাহলে উভয় ক্ষেত্রেই অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত, এতে রোগীসেবা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

গত সপ্তাহে পাওয়া এক তথ্যে দেখা গেছে উইনিপেগে কিছু রোগীকে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য ২০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে। অন্যদিকে অটোয়ার এক শিশু হাসপাতালে জরুরি নয় এমন রোগীদের জন্য আনুমানিক অপেক্ষার সময় ছিল ১৫ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট। প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডের সামারসাইডে জরুরি নয় এমন রোগীদের জন্য আনুমানিক অপেক্ষার সময় ছিল ১০ ঘণ্টারও বেশি।

এদিকে, ‘অন্টারিও হেলথ’ কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, গত জানুয়ারি মাসে যেসব রোগী জরুরি বিভাগে এসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তারা ওয়ার্ডে বিছানা পাওয়ার আগে জরুরি বিভাগে গড়ে ২০.৩ ঘণ্টা সময় কাটিয়েছেন। অন্যদিকে কুইবেক প্রভিন্সে হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোতে স্ট্রেচারে শুয়ে বা বসে থাকার গড় সময় ছিল ১৮ ঘণ্টা।

আলবার্টার চিকিৎসকেরা জরুরি বিভাগগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন এবং এই পরিস্থিতিকে ‘সংকটপূর্ণ অবস্থা’ বলে অভিহিত করেছেন।

‘সংকটজনক পরিস্থিতি’

গত ৩ মার্চ, কিংস্টন হেলথ সায়েন্সেস সেন্টার ফেসবুকে একটি বার্তা পোস্ট করে। ঐ বার্তাটিতে রোগীদের সতর্ক করে বলা হয়, “আগামী সপ্তাহগুলোতে আপনারা যে সেবা পাবেন তা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।” এরপর ব্যাখ্যা করা হয় যে, কিংস্টন হেলথ সায়েন্সেস সেন্টার এইমাত্র তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী ভর্তি হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।

পোস্টটিতে দীর্ঘ অপেক্ষার সময় সম্পর্কে সতর্ক করা হয় এবং উল্লেখ করা হয় যে কিছু রোগীকে “একটি অপ্রচলিত স্থানের বিছানায় স্থান দেওয়া হতে পারে।” অর্থাৎ হাসপাতালের গুদাম ঘরে বা করিডোরে।

সম্প্রতি, নিউফাউন্ডল্যান্ড ও ল্যাব্রাডরের কর্নার ব্রুকের একজন রোগী বর্ণনা করেছেন যে তিনি একটি জানালাবিহীন ঘরে অতিরিক্ত স্ট্রেচারে ছয় দিন কাটিয়েছেন, আর অন্য একজন বর্ণনা করেছেন “করিডোরের একটি ছোট কোণে, যেখানে তোয়ালে ও কম্বল রাখা হয়,” সেখানে একটি স্ট্রেচারে তিন দিন কাটানোর কথা।

জানুয়ারিতে, ক্যালগারির রোগীরা জরুরি বিভাগে ডাক্তার দেখানোর জন্য অপেক্ষা করার সময় তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন। এদের মধ্যে একজন মহিলাও ছিলেন, যিনি প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণের জন্য ডাক্তার দেখানোর অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলেন। ঐ সময় তার শরীরের নিচে রক্ত ​​জমা হচ্ছিল। এটি একটি লাইফ থ্রেটেনিং অবস্থা।

অটোয়ার একজন জরুরি চিকিৎসক এবং কানাডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ ইমার্জেন্সি ফিজিশিয়ানস-এর জনসংযোগ কমিটির ভাইস চেয়ার ড. মাইকেল হারম্যান সিবিসি নিউজকে বলেন। “সারা দেশে আপনারা যে ঘটনাগুলো দেখছেন, তা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সেই চরম ভাঙনের মুহূর্তটিকেই প্রতিফলিত করে, যা আমার মতে আমরা দুর্ভাগ্যবশত এই মুহূর্তে প্রকাশ পেতে দেখছি,”

সিস্টেমের উপর চলমান চাপ 

গত বছর প্রকাশিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি)-র একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালে কানাডায় প্রতি ১,০০০ জনে গড়ে ২.৫টি হাসপাতালের শয্যা ছিল। এটি ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর গড় ৪.২টি শয্যার তুলনায় অনেক কম। এর অর্থ হলো, সেই বছর পরিমাপকৃত ৩৫টি দেশের মধ্যে কানাডার অবস্থান ছিল ২৮তম। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে প্রতি ১,০০০ জনের জন্য ১২টি শয্যা ছিল।

হারম্যান বলেন, প্রতিটি জরুরি বিভাগই উন্নতমানের সেবা প্রদানের চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যবস্থাগত সীমাবদ্ধতার কারণে তারা প্রায়শই সেটি করতে পারে না।