নিভৃতে
রীনা গুলশান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
১৫
আজকের আকাশটা খুব পরিস্কার। বেশ রোদেলা দুপুর। ঝকঝকে চারপাশ। ফাবিয়ান নাওমীর কথিত পোশাকটাই পরলো। তারপর কেমন যেন খুব দ্বিধান্বিত মন নিয়ে ডোরিনদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। ওখানে যেয়ে দেখলো রোডিকা আন্টি বেশ রান্না নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর আঙ্কেল কেভিন একটা খুরপি হাতে বাগানের তদারকিতে ব্যস্ত। ডোরিনকে আশেপাশে দেখা গেল না।
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ফাবিয়ান আঙ্কেল, আন্টিকে হ্যালো বলতেই দুজনেই ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরলো। আসলে রোডিকা আর কেভিন এক প্রকার ওকে পুত্র সমানই মনে করে। ওদেরও অনেক স্বপ্ন ছিল ফাবিয়ানকে নিয়ে। যে ফাবিয়ান ওদের হাতের উপর হয়েছে। স্বপ্ন ছিল একদিন ফাবিয়ান তাদের জামাই হবে। এখনও পর্যন্ত রোডিকার সাথে সারার সপ্তাহে অন্তত দুইবার কথা হয়। এবং সেসব কথার ৮০ ভাগই প্রায় ডোরিন আর ফাবিয়ানের সম্পর্কিত। যদিও এখন প্রায় সবই ওলটপালট হয়ে গেছে। তবুও হঠাৎ করে গত রাতে ফাবিয়ানকে দেখে নির্বাপিত আশা আবার জেগে উঠেছে।
: এসো বাবা এসো, একেবারে ঘরেই চলে আসো- রোডিকা ফাবিয়ানের হাত ধরে একেবারে ফামিলি রুমে নিয়ে বসলো। তারপর ‘ডোরিন’ ‘ডোরি দ্যাখ কে এসেছে’- বলেই হাকডাক শুরু করলো। কেভিন আঙ্গেলও ফাবিয়ানের পাশে বসেই বউকে বললো-
: বুঝলে ফাবির সেই প্রিয় তরমুজের স্মুতি নিয়ে আসো।
: আঙ্কেল, আপনার এখনও মনে আছে?
: কি বলিস, মনে থাকবে না? ছোটবেলায় তোর আর ডোরিনের যন্ত্রণায় ওটা বানানোর উপায় ছিল নাকি? নিজেদের ভাগেরটাতো খেতিসই আবার আমাদের ভাগেরটাও চুরি করে খেয়ে ফেলতিস।
: হা… হা… মাই গড! আপনিতো দেখি সবই মনে করে রেখেছেন।
কথা বলতে বলতেই রোডিকা ফাবিয়ানকে সল্টেড কাজু বাদাম এনে দিল। নিজেই বাড়িতে ভেজেছে তেল ছাড়া। এটাও ফাবির খুউব প্রিয়। একটু পরই ওকে ক্রিম দিয়ে ফেনায়িত কফি এনে দিল। আঙ্কেল কেভিন আবার টিপ্পনি কাটলো-
: হু! ছেলেকে পেয়ে আর আমার কথা মনে নাই!

: শুনলি ফাবি, ৩ কাপও বেশি নয়। আর হবে না। একেবারে লাঞ্চের পর। তোর পছন্দের খাবার সব বানিয়েছি আজ।
: তাই নাকি? কি বানিয়েছো আজ?
: আমি বাপু তোমার নন্নার মত তো রাঁধতে তো পারবো না, ফিস বেক করেছি, বিফ বল দিয়ে পাস্তা করেছি। আর তোর প্রিয় ল্যাম্ব এর স্যুপ করেছি। সাথে গারলিক ব্রেডও বানিয়েছি।
: ঙগএ! আন্টি আমার তো জিভে জল এসে গেছে।
হঠাৎ করেই কেভিন ‘ডোরিন’ ডোরিন বেবী বলে চিৎকার করে ডাকাডাকি শুরু করলো-
: এই মেয়েটার যে কি হয়েছে না, ছুটির দিন হলেই হলো, আর ঘুম ভাঙবেই না। বেলা প্রায় ১২টা, ওঠরে মেয়ে।
একটু পরই ডোরিন এলো কালো রঙের একটা হট প্যান্ট পরা, উপরে হালকা বেগুনি রঙের হাতকাটা ১টি টপস পরা। সেই কোমর পর্যন্ত ঢেউ খেলানো চুল, এখন সেটা বয়কাট দেওয়া। বাপের কাছে এসে আদুরী বেড়ালের মতন বসে বাবার গলা জড়িয়ে আদর করলো। তারপর যেন ফাবিয়ানকে দেখলো। খুবই ফরমাল কায়দায় বললো-
: ওহ্! ফাবিয়ন, তুমি? আচ্ছা কেমন আছো? অনেক দিন পর দেখা হলো বল! আমরা তো মনে করলাম তুমি বুঝি ইটালিকে ভুলেই গিয়েছো।
: কি যে বল, নিজের দেশ- দেশের মাটি; একি ভোলা যায়। কাগজপত্রের সমস্যা ছিল। এখন সব ঠিকঠাক হওয়াতে চলে এলাম।
: খুব ভাল করেছো, একদম পারফেক্ট সময়েই এসেছো।
: মানে, ঠিক বুঝলাম না। ফাবিয়ান খুউব অস্বস্তি নিয়ে বললো। ঠিক বুঝতে পারছে না ডোরিন আসলে কি বলতে চাইছে।
ডোরিন খুউব উৎফুল্ল মেজাজে হঠাৎ উল্লসিত চিৎকার করলো-
: মাম্… মাম্… জানো গত রাতে ম্যাথিউস আমাকে সরাসরি বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছে! এই দ্যাখো, বলেই তার রুবি হীরক খচিত বাম হাতের অনামিকা বাড়িয়ে ধরলো। ডোরিনের অনাকিমায় রুবী, হীরকের দ্যুতি ওর চোখ দিয়ে বের হচ্ছিল। অসাধারণ একটা আনন্দে উদ্ভাসিত অবয়ব।
ফাবিয়ানের হঠাৎ করেই অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। মনে হলো বুকের ভেতরে বসে থাকা অনেক ভারী একটা পাথর যেন গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে গেল। অদ্ভুত একটা আনন্দের অনুভূতিতে তার সমস্ত স্বত্ত্বা ছেয়ে গেল। শুধু পকেটের মধ্যে নাওমীর কিনে দেওয়া পান্না আর হীরা বসানো আংটিটির অস্তিত্বে দারুণ অস্বস্তি হচ্ছিল। নিজেকে কেমন যেন চোর চোর লাগছিল। রোডিকা আন্টির বাসায় আসবার মুহূর্তে নন্না আংটিটি দিয়ে বলেছিল, যদি দরকার হয়। বুঝলি ফাবি, তোর পকেটে করে নিয়ে যা। হঠাৎ করে মনে হলো, কিছুটা সময় যেন পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে রইলো। রোডিকা আর কেভিনও কোন কথা বলছে না। তারা খুব ভালো লাগায় নাকি খুব কষ্টে কেমন যেন স্তব্ধ নিশ্চুপতায় ঝিম মেরে রইলো। হঠাৎ করে সমস্ত নির্জনতাকে উপেক্ষা করে ফাবিয়ানের উল্লসিত চিৎকার ধ্বনি পরিবেশটাকে হালকা করে দিল-
: ঙগএ! অভিনন্দন। অনেক অনেক অভিনন্দন। বাপরে আমার ছোট্টবেলার খেলার সাথিটা যে এত্ত বড় হয়ে গেছে, ভাবতেই পারিনি! সত্যি বলছি ডোরিন, আমার খুশিতে নাচতে ইচ্ছা করছে!
: ওকে, বিয়ের দিনেই নাচটা কি রকম করো সেটা দেখিয়ে দিও সবাইকে। ডোরিনও উদ্ভাসিত কন্ঠে বললো। তারপর ডোরিন এই প্রথম তার কানাডার জীবনযাপন সম্পর্কে নানান প্রশ্ন করতে শুরু করলো! ফাবিয়ানও খুব ক্যাজুয়ালী জবাব দিয়ে যেতে লাগলো।
এরপর ফাবিয়ান এক এক করে ওদের গিফট দিল। রোডিকা এবং কেভিন তাদের গিফট পেয়ে খুবই খুশি হলো। ডোরিনের জন্য ফাবিয়ান নিজেও অনেক কিছু কিনেছিল। আবার নাওমীও কয়েকটা উপহার দিয়েছিল। ডোরিন খুব উদ্ভাসিত হলো। বিশেষ করে ‘ল্যান্ড কম’-এর কসমেটিক্স-এর সেটটা দেখে খুবই খুশি হলো।
: ফাবি- তুমি এত দামী উপহার এনেছো, কি দরকার ছিল বলতো! তারপর আবার এত দামী দামী ব্রান্ডেড জামা-প্যান্ট এনেছো!
: তোমার জন্য না আনলে কার জন্য আনবো? বলত? তুমি আমার ছোট বেলার একমাত্র বন্ধু।
: খুউব ভালোই হয়েছে। আমার বিয়েতে তোমার দেওয়া কসমেটিক্সই ঁংব করবো।
: আগে জানলে তো ম্যাথিউ-এর জন্য বিয়ের স্যুটটা আমিই আনতাম।
: অনেক ধন্যবাদ! ফাবি, তুমি এই কথা বললে বলে। তবে, ওটার দরকার নাই। আমার বিয়ের গাউন আর ম্যাথিউ-এর স্যুট- ওর বোন নিকোল নিজেই আনবে প্যারিস থেকে। দরকার হলে আমি এখান থেকে ফিটিং করে নিবো।
এরপর ওরা দুজন কথা বলতে বলতে ওদের ছোট বেলার সেই লেকের পাড়ে চলে গেল। সেই লেকের পাড়ে ফাবিয়ান কত মাছ ধরেছে। আর ডোরিন দুষ্টুমি করে ঢিল ছুড়ে মাছ তাড়িয়েছে। ফাবিয়ান বারবার স্মৃতি তাড়িত হয়ে যাচ্ছিল। ছোট ছোট এমন সব স্মৃতি ওর হৃদয়ে ফিরে ফিরে আসছিল যা কিনা এখন খুবই বাহুল্য। তবু আজ কেন জানি সেগুলোই প্রচন্ড মূল্যবান হয়ে ফিরে আসছিল। তার হঠাৎ করে অসম্ভব আবেগের তাড়িত হয়ে গলার কাছে একটা কান্নার কষ্ট দলা পাকাচ্ছিল। তবু হৃদয়ের অন্য স্বত্ত্বা ভাবছিল অন্য কথা। তার কোন অনুভূতিই ডোরিনের সামনে প্রকাশ করা উচিত হবে না। হয়তো অনেক কষ্টের পর ডোরিন তার জীবনে আবার ভালো লাগা, ভালোবাসা পেয়েছে। ফাবিয়ান তা কোনভাবেই নষ্ট করে দিতে পারে না। ফাবিয়ানের এটাই বার বার মনে হচ্ছিল। একটা সময় পরে জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন মনে হয়, এবার সেই কাক্সিক্ষত সময়টা এসেছে। যখন সেই পুরনো সময় থেকে নিজেদেরকে বের করে নতুন সময়ের দিকে এগিয়ে নিতে হয়। তবু তার ভেতরে একটা কেন জানি দ্বৈত্য স্বত্ত্বা কাজ করছিল। এক সময়ে খুব ভালো লাগছিল ডোরিন তার কাক্সিক্ষত ফল পেয়েছে।
এতক্ষণ ধরে ম্যাথিউ সম্পর্কে যা সব গল্প শুনলো তাতে করে এটুকু বোঝা যায়, মানুষ হিসাবে ম্যাথিউ সত্যিই খুব ভালো মানুষ। এবং বড় হৃদয়ের। তদুপরি ধনী। নিজের সাথে কেন জানি একটা তুলনা চলে এলো। সেতো আজও কোন কিছুই করতে পারলো না। মিউজিকের উপর মাস্টার ডিগ্রিটা ছাড়া তার কিইবা আছে? আজ পর্যন্ত মিউজিকের কোন ব্রেকই পেল না। নিজের একটা বাড়ি, গাড়ি কিছুই নাই। কোন মতে দিন গুজরান করে চলেছে। জীবনে যে ব্রেকের স্বপ্নে এতোটা দিন পার করেছে। স্বপ্নে দেখেছে যে, মিউজিকে সে একটা দিকপাল হয়েছে। নাহ্! কোন স্বপ্নের পাখিরাই তার জীবনে ধরা দেয়নি। এসে এসেও আসে না! তা না হলে ভালো করে দুনিয়া দেখবার আগেই বাবাকে কেন দেখলো না? সেই যে তার বাবা ফ্রাঙ্ক ফ্রাঞ্জিপেনে জার্মান চলে গেল, আর একটি বারও পিছু ফিরে চাইলো না। কেন এমন করলো বাবা? হয়তো সারার প্রতি তার ভালোবাসা শেষ হয়ে গিয়েছিল অথবা কখনোই ভালোবাসা ছিলই না। কিন্তু ফাবিয়ান তো তারই আত্মজ! তারই ঔরশজাত প্রথম সন্তান। একটিবারও কি তার ফাবিয়ানকে দেখতে ইচ্ছা করে না? আর মা! এটা সত্যি মায়ের প্রতিও তার এক ধরনের ক্রোধ, অভিমান কাজ করতো। কারণ, মা-ই তার সব কিছু ছিল! মা, নন্না আর নানা- এরাইতো সব ছিল। তার সমস্ত দুনিয়া। মাও তাকে কিভাবে ছাড়তে পারলো! এতকাল ধরে তার মায়ের প্রতি এরকমই মনোভাব পোষণ করতো। তবে এবারই কেন জানি না এখানে আসার পর থেকে মায়ের জন্য এক ধরনের সেই ছেলেবেলার অনুভূতিগুলো গ্রাস করছে! যেদিন প্রথম ভ্যালেলংগাতে এলো, আর দেখলো তার নন্না কি অসম্ভব একাকিত্ব নিয়ে ইজি চেয়ারে ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ করে নন্নাকে তার মা সারার মত লেগেছিল। আর তখুনি তার মনে হয়েছিল, তাইতো তার মাওতো এরকমই নন্নার মত একাকী হয়ে যেত। আর সারাতো তখন অপরূপ সুন্দরী ফুটফুটে একটি বালিকা মাত্র। সেই বয়সেই তার মায়ের অসম্ভব আবেগ ও ভালোবাসার ফসল সে। অন্যভাবে বলা যায় তার ভালোবাসার ভুলের ফসল। তবুও ঐ বয়সেও সারাকে একটি বাচ্চার বোঝা দিয়ে যখন ফ্রাঙ্ক পালিয়েই গেল এক রকম, তবুও একটি দিনের জন্যও সারা তাকে বোঝা মনে করেনি অথবা ফাবিয়ানকে নিজের ভুলের ফসল মনে করে অবজ্ঞাও করেনি। বরং দু’হাতে, হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা আর আবেগ দিয়ে ফাবিয়ানকে বুকে আঁকড়ে রেখেছিলো। কত দিন ফাবিয়ান গভীর রাতে চোখ মেলে দেখেছে, তার মা ঘরের কোণের জানালার উপর মাথা রেখে চুপিচুপি কাঁদছে। তবু কখনো ফাবিয়ানের সামনে তার বাবাকে ধিক্কার পর্যন্ত দেয়নি। বরং একটু বড় হবার পর ফাবিয়ান যখন অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। তার অনেক বন্ধু-বান্ধব হয়েছে, ডোরিন, জেসন, রায়ান ইত্যাদি; ওদেরকে দেখেছে সুস্থ পারিবারিক অবস্থানে। তখন মাকে সে বাবাকে নিয়ে প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছে। বেশি প্রশ্ন করলে মা তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে আকুল কান্নায় ভেঙ্গে পড়তো। তখন নন্না তাকে নিয়ে যেত। এবং অন্য প্রসঙ্গে তাকে ব্যস্ত করে রাখতো। তারপর ক্রমশই একটু একটু করে তার বাবার কৃতকর্মের কথা সে জানতে পেরেছে। সারার বিয়ের পর যখন ফাবিয়ান খুব ভেঙ্গে পড়েছিল, তখন রোডিকা আন্টিই তার বাবার সব কীর্তিগুলো ডিটেলস-এ বলেছিল। তবুও মা তাকে কখনো বাবার সম্পর্কে কোন খারাপ কথা বলেনি। শুধু পাথর মুখ করে বলতো-
: সবই আমার কপালরে ফাবি! না হলে এই রকম হবে কেন?
ফাবিয়ান রেগে ফোস ফোস করে বলতো-
: কপাল না ছাই! দেখবে আমি একদিন বড় হয়ে ঠিকই বাবাকে খুঁজে বের করবো। তারপর একটা ছুরি দিয়ে তাকে খুন করবো।
: ছি! বাবা, ওসব বলতে নেই! আমি কি তোমাকে এই শিক্ষা দিচ্ছি।
শুধু একবার মাকে খুব তীব্র ভাবান্তরে দেখেছিল। তার দ্বিতীয় বিয়ের আগের রাতে হঠাৎ করে ফাবিয়ানের মধ্য রাতে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল, কেমন যেন একটা গোঙানির মত শব্দে। তখন ফাবিয়ান দেখেছিল মা মেঝের উপর বসে হাতে একটা কিছু নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল আর কথা বলছিল। সম্ভবত ওটা বাবার ছবি ছিল।
: কেন, কেন তুমি এমন করলে? কেন এমন করলে? আমার ভালোবাসায় কিসের কম ছিল? যে একবারও পেছন ফিরে চাইলে না? আমাকে কোন যন্ত্রণার সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেলে? আমি কেন নির্দ্বিধায় তোমার মত সামনে এগিয়ে যেতে পারছি না? স্টিভেন যে আমাকে পাগলের মত ভালোবাসে, তবু কেন আমি তাকে তোমার মত করে ভালোবাসতে পারছি না? কেন আমর সোনার পাখি ফাবির জন্য কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে? আমি আমার ফাবিকে কিভাবে একা রেখে চলে যাবো? বল, বল ফ্রাঙ্ক, কেন তুমি আমার সাথে এমন করলে? আরও অনেক কিছু মা বলেছিল কিন্তু ফাবিয়ানের তখন বয়সও কম। ঐ কম বয়সে ঐ সব কথা বোঝার মত সমঝদারী তার হয়নি। তখন ঐ ছোট্ট ফাবিয়ানের ছোট্ট হৃদয়টাতে ছিল এক বুক ভরা ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা। সারাক্ষণ মায়ের উপর রাগে আর চাপা যন্ত্রণায় সাপের মত ফোঁস ফোঁস করছে। সবাই মিলে তাকে কত বুঝিয়েছে। মা তাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে চলছিলো। কিন্তু ফাবি কারো কোনো কথাই মানছিল না! তার কেবলই মনে হচ্ছিলো তার বাবা তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে সেই কোন কালে। একবারও পেছন ফিরে চাইল না। এখন মাও তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মাও আর ফিরে আসবে না। হায় ঈশ্বর! সেই দিনগুলি কি বিভৎস, কি বিভিষিকাময় ছিল। কেউ তাকে বুঝাতে পারছিলো না। সেও কাউকে বুঝতে পারছিল না। নাকি বুঝতে চাইছিলো না। একটি অবুঝ ছোট্ট হৃদয় কেবলই মা হারানোর ভয়ে, বেদনায় মুহ্যমান হয়েছিল। আর সেই ভয়, বেদনা শোক ফাবিয়ানকে এই সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে তাড়িত করেছে।
১৬
আজ অকস্মাৎ এই তার আবাল্যের বন্ধু ডোরিনের অতি আনন্দের প্রগলভতায় তার ভেতরে সুক্ষ্ম ঈর্ষা গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন করছে। আর এই বেদনাই মা হারানোর সেই বেদনার কাছে পৌঁছে দিল। কি বিস্ময়কর। তবে কি আসলেই ফাবিয়ান কখনই বড় হয়নি? শুধু শরীরের, বয়সই বেড়েছে! মনটা সেই বয়সেই স্থির হয়েছিল! তা না হলে আজ এই পরিণত শরীরে, মননে ডোরিনের কাছে এসে মায়ের কথা এভাবে মনে পড়ছে কেন? আজ তবে কেন মনে হচ্ছে সে আসলে মায়ের সাথে খুব, খুউব বাজে আচরণ করেছে। সারাটি জীবন সে তার মা’কে ভুল বিচার করে কঠিন সাজা দিয়ে গেছে! একটি বার নিজের থেকে ফোন করেনি, এমনকি মা সুইডেন থেকে ফোন করলে ঠিক মত কথাও বলতে চায়নি। এমনও হয়েছে কোন কোন সময় ফোন কেটে দিয়েছে। অথচ সে ভাল করেই জানে মাই-ই তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত খরচা দিয়েছে। যদিও আমান্ডা তাকে বুঝিয়েছে, সেই-ই তাকে টাকা দিচ্ছে! আর যখন সে কানাডা এলো, তার বেশ ভালো অংকের টাকার দরকার পড়েছিল। আমান্ডা তাকে বলেছিলো, আমাকে কিছুটা সময় দে, আমি জমি বিক্রি করে টাকা দিয়ে দিবো। আর তার যাবার সময় তার পাসপোর্ট বানানো, টিকিট এমনকি নগদ পাঁচ হাজার ডলার, যাবার আগে আগে এক স্যুটকেট ভরা শীতের পোশাক সবই সে জানতো নন্না দিয়েছে। আসলে সবই তার মা-ই দিয়েছে। কারণ এবারই এসে সে জানতে পেরেছিল টনি চাচার কাছে (কথা প্রসঙ্গে তাকে বলেছে), তাদের আসলে কোন জমি বিক্রিই হয়নি! ফাবি মনে মনে খুউব অবাক হয়েছিল। কিন্তু নানীকে জিজ্ঞাসা করতে সংকোচ হয়েছিল। হয়তো নানী কষ্ট পাবে। টনি চাচাই তখন বলেছিল, তোমার কানাডা যাবার সময় জমি বিক্রির কথা হয়েছিলো, কিন্তু পরে সারা মা সব টাকা পাঠালো তাই জমি বিক্রি করা লাগেনি।
: এ্যাই ফাবি, তখন থেকে কি অত ভাবছিস? ডোরিনের অকস্মাৎ তার পীঠের উপর একটা ধাক্কা এবং তার চিৎকারে বাস্তবে ফিরে আসে। মনে হলো ফাবিয়ান যেন কোন সুদূর অতীত থেকে ফিরে এলো। ফিরে এলো হাঁটি হাঁটি পা পা, নীল চোখের, ঝাকড়া চুলের ফাবিয়ান; সারার আদরের নয়নের মণি ফাবি। এক সাগর অভিমান সাঁতরে যেন ফাবি অকস্মাৎ মায়ের স্নেহের মোহনায় ফিরে এলো।
হঠাৎ করে ফাবিয়ানের সব কিছু খুউব ভালো লাগলো। এই ঝকঝকে সকাল। টলটলে চিরচেনা লেকের পানি। সারি সারি জলপাইয়ের বৃক্ষের সারি। সব কিছুতেই খুউব ভালো লাগায় ভরে গেল। হঠাৎ করে সেই ছেলেবেলার মত, তার মুখের সামনে দুটো করোতল গোল করে মুখের উপর ধরে চিৎকার করলো-
: ডোরিন, ডোরি- তুই কোথায়?
ডোরিন মনে মনে খুব অবাক হলেও সেও তার করোতল গোল করে মুখের উপর ধরে চিৎকার করলো-
: আমি নেই, হারিয়ে গেছি।
: কোথায়?
: লেকের ভেতরের জলপরীটা আমাকে ধরে নিয়ে বন্দী করে রেখেছে।
তারপর দুইজন ছেলেবেলার মত চিৎকার করে হেসে গড়াগড়ি দিল লেকের পাড়ের ঘন সবুজ ঘাসে! হাসতেই থাকলো দুজনেই যতক্ষণ না দুজনই দুজনকে জড়িয়ে ধরে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললো।
আর তখনই দুজনই এক সাথে অনুভব করলো গত ৬/৭ বছরে তাদের মনের ভেতরে যে মেঘ জমেছিল, তা এই হাসি এবং কান্নার সাথে সব বৃষ্টির মত ঝরে গেল। ওরা আবার সেই ছেলেবেলার মত লেকের পাড় ধরে ছুটোছুটি করলো। আর দুজনই অনুভব করলো তাদের আজন্মের চিরচেনা সেই বন্ধুত্বের একাত্মতা। ওরা আসলে বন্ধুই। অনেক অনেক বন্ধু। বন্ধুর চেয়েও হয়তো ওরা ভাইবোনের মত। দুজন দুজনের অনেক সুহৃদ। কিন্তু ওরা কখনো প্রেমিক-প্রেমিকা হতে পারেনি।
এই হঠাৎ বোধনে, ওদের হৃদয়ের ভেতর থেকে এক ধরনের অসম্ভব ভালো লাগার আনন্দ উৎসারিত হলো। সেই ভালো লাগায় ওরা আচ্ছন্ন হয়ে রইলো।
তারপর এক সময় ওরা তাই ছেলেবেলার মত হাত ধরাধরি করে ঘরে ফিরলো। রোডিকা আর কেভিনের তো ওদের সেই ছেলেবেলার মত ফেরা দেখে যেন বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছিল না। রোডিকা দৌড়ে দৌড়ে টেবিলে খাবার লাগালো। ওরা সেই আগের মত কাড়াকাড়ি করে খেল! যতটা খেলো তার থেকেও বেশি মজা করলো। তারপর এক সময় ফাবিয়ান গভীর স্বরে বললো-
: ডোরিন, আমিতো আরো প্রায় তিন সপ্তাহের মত থাকবো এবং এবারে নন্নাকে নিয়েই যাবো ভাবছি সাথে করে। তো, এর মধ্যে যদি তোর বিয়ের ডেট দিতে পারিস, তো আমিও তোর বিয়েটা দেখে যেতে পারি।
ডোরিনের হঠাৎ চোখ ভরে কান্না এলো। অনেকক্ষণ কথাই বলতে পারলো না। তারপর ফিস ফিস করে বললো, আমি আজই ম্যাথিউ-এর সাথে কথা বলবো। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো যেন তুই থাকতেই সব হয়ে যায়!
ফাবিয়ান ডোরিনের হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে মধুর হাস্যে বললো, জানিস ডোরি, এর থেকে ভালো আর কি হতে পারে? যেমন করে বাবা-মা অনেক আদরের কন্যাকে খুউব আনন্দে এবং দুঃখে আর একজন ছেলের হাতে তুলে দেয়। তুলে দেবার সময় তাদের দু’রকম প্রতিক্রিয়া হয়। আমার মেয়ে চলে যাবে, আবার একই সময় মনে হবে আমার মেয়ে খুব খুউব সুখে থাকবে। আমারও সেই রকম মনে হবে। যখন তোকে ম্যাথিউর হাতে তুলে দিব। আমার আজীবনের দেখা অবাল্যের সখী ডোরিন চলে যাবে। কিন্তু আমি জানবো, আমার ডোরিন খুউব সুখে থাকবে। ভালো থাকবে।
ডোরিন অনেক ভালোবাসায় ফাবিয়ানকে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধের উপর মুখ লুকিয়ে বললো, ‘জানিস ফাবি, ম্যাথিউ সত্যিই আমাকে খুউব ভালোবাসে। তুই কোন চিন্তাই করিস না।’
দিনের আলো একটু একটু করে চলে গেলো রাতের দিকে। ফাবিয়ান উঠলো, যেতে হবে। নন্না অপেক্ষা করে আছে তার ফাবির জন্য। রোডিকা আন্টি এবং কেভিন আঙ্কেলের কাছে বিদায় নিলো। তারা বার বার বললো,
: তাহলে ঐ কথাই রইলো- ডোরিন ডেট ফিক্সডট করেই তোকে জানাবে। বাকি সব তোর দায়িত্ব।
: হ্যাঁ আন্টি, আপনি কোন চিন্তাই করবেন না। ফাবিয়ান দেখলো ডোরিনের সমস্ত অবয়ব যেন ঝলমল করছে খুশির আলোয়। ফাবিয়ানের বুকের মধ্যে অজানা একটা অনুভূতি। কি জানি কিসের? আনন্দ নাকি বেদনার? নাকি গভীর স্বস্তির! বুকের মধ্যে এক ধরনের অপরাধ বোধ, রাগ, ভালো লাগা, গভীর ভালোবাসা এবং বুঝতে না পারার একটা কাঁটা ওকে গত ৪/৫ বছরে বুকের মধ্যে অবিরত খুঁচিয়েছে।
ফাবিয়ান ডোরিনদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। ভেতরের পথ দিয়ে গেলে ২ মিনিটের পথ। কিন্তু ফাবি মেইন রাস্তায় নেমে এলো। রাস্তায় এরই মধ্যে আলো-আঁধারের খেলা। বেশ সুনশান। এটাই চাচ্ছিল ফাবি। ওর একটু একাকী নিজের জন্য সময় দরকার ছিল। ওর কি ডোরিনের জন্য কোন কষ্ট হচ্ছে? না, ফাবিয়ান হাত দিয়ে কপাল থেকে চুল উপরের দিকে উঠিয়ে দিল। হঠাৎ করে প্যান্টের পকেটের মধ্যে ডায়মন্ড আর এ্যামারান্ডের আংটিটির অস্তিত্ব¡ অনুভব করলো। পকেটে হাত দিয়ে ছোট্ট কালো রঙের ‘ চবড়ঢ়ষব’ং’-এর বক্সটা বের করলো। খুব সুন্দর আংটিটা! ওাভেল আকারের পান্না চারপাশে ডায়মন্ড। দারুন। ৩ থেকে ৪ হাজার ডলার হবেই। পাগলী আস্ত পাগলী, ফাবিয়ান নিজের মনেই ফিসফিস করে বললো এবং মনে মনেই হেসে ফেললো। বাক্সটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে দিল। এরপর একটা গভীর স্বস্তির অনুভূতি ফাবিয়ান নিজের মনেই অনুভব করলো। তারপর ওর প্রিয় গানের কলি গুন গুন করে গাইতে গাইতে সামনে এগিয়ে চললো।
ঙপবধহং ধঢ়ধৎঃ ফধু ধভঃবৎ ফধু
অহফ ও ংষড়ষিু মড় রহংধহব
…….
ওভ ও ংবব ুড়ঁ হবীঃ ঃড় হবাবৎ
ঐড়ি পধহ বি ংধু ভড়ৎবাবৎ
জরপযধৎফ গধৎী-র এই গানটি তার মায়ের খুব প্রিয় ছিল। কখন জানি মায়ের ভালো লাগা ফাবির বুকের মধ্যে বাসা বেধেছে। ওহ্! মা, মাগো আমি খুব খারাপ, খুউব খারাপ; তোমাকে কত কষ্ট দিয়েছি। অকস্মাৎ ফাবি চোখে হাত চেপে ধরলো। হু হু করে কেঁদে ফেললো। ইস্, মাকে খুউব কষ্ট দিয়েছে। নাহ্ কাল সকালেই মাকে ফোন করবো। মাকে ইটালি আসতে বলবো। মা তার ফোন পেয়ে কি করবে? রাগ হবে? দুঃখ পাবে? নাকি ফোনই ধরবে না? ওতো ডিজার্ভই করে এর থেকেও খারাপ ব্যবহারের। না, তার মা কখনো এই রকম করবে না। ফাবিয়ান যতই খারাপ ব্যবহার করুক না কেন। কানাডাতে মা কতবার ফোন করেছে, ইস্ ফাবি কি রকম বাজে ব্যবহার করেছে! ওর বুকের মধ্যে নিজের প্রতি একটা ক্রোধ এবং লজ্জা একই সাথে অনুভব করলো।
একটু ঘুরাঘুরি করে রাত ৮টার দিকেই বাসায় চলে এলো। নানী আবার বেশি রাত জাগতে পারে না। তবু গত রাতে তো প্রায় অর্ধেক রাত নন্না জেগে জেগে তার সাথে গল্প করেছে। বাসায় ঢুকতেই দেখলো, নন্না রাস্তার দিকেই তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফাবিকে দূর থেকে দেখেই একটা স্বস্তির শাস ফেললো। কি জানি, কি হলো ঐ বাড়িতে। কি হলো? না, আমান্ডা দ্রুত মন ঠিক করে ফেললো, সে কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। যদি ফাবি নিজের থেকে কিছু না বলে।
ফাবিয়ান বাড়ির বারান্দায় পা দিয়েই নানীকে জড়িয়ে ধরলো গভীর ভালোবাসায়। তারপর বললো, নন্না কিচ্ছু খাবো না। রোডিকা আন্টি অনেক কিছু খাইয়ে দিয়েছে।
: দুধ তো খাবি? এক গ্লাস গরম দুধ শুধু খা সোনা।
: আচছা এখন না, ঘন্টা খানেক পরে দিও। আমি এখন একটু গোসল করবো। তারপর ঘুম পারবো। খুউব ক্লান্ত লাগছে। সকালে একটু কাজ আছে, মাকে ফোন করবো (মনে মনে বললো)।
: আচ্ছা যা, বাথরুমে তোর রাতের পোশাক রাখা আছে।
: নন্না, এই তোমার দোষ। তুমি আমাকে আবার খোঁড়া করে দেবে, আমাকে কিচ্ছু করতে দাও না।
: যা, যা, ডেপোমি করিস না। (চলবে)
রীনা গুলশান, টরন্টো
gulshanararina@gmail.com
(লেখক রীনা গুলশান বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স। ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিকে তার কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে কানাডার বিভিন্ন বাংলা পত্রিকাতেও। তিনি ‘প্রবাসী কণ্ঠ’ ম্যাগাজিন এর একজন নিয়মিত কলামিস্ট।)
