কানাডার কিছু অঞ্চলের স্কুলে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার তিনগুণ বেড়েছে

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫ : এরকম একটি দৃশ্য কানাডার স্কুলগুলোতে খুব বিরল নয় যেখানে দেখা যায়- স্কুল প্রাঙ্গণে নির্মমভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে একটি শিশু। উদ্বেগ এবং মনোযোগ-ঘাটতি/অতি সক্রিয়তা ব্যাধি(ADHD)-তে আক্রান্ত একজন শিক্ষার্থী যে কিনা ভিড়, কোলাহলপূর্ণ ক্লাসরুমে যেতে হিমশিম খাচ্ছে। অথবা একজন হতাশ কিশোর চুপচাপ ক্লাশের এক কোনে বসে আছে যার একটি বিব্রতকর ছবি সম্প্রতি তার শ্রেণী কক্ষের সবার সাথে স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে শেয়ার করা হয়েছে।

কিছু শিক্ষার্থদের জন্য এই ধরনের অভিজ্ঞতা খুবই সাধারণ। এবং এই ধরণের পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে স্কুলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠে। গতমাসে প্রকাশিত সিবিসি নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

এটাকে বলা হয় স্কুল এড়িয়ে চলা, এমনকি কখনও কখনও ‘স্কুল ফোবিয়া’-ও  বলা হয়। আর এটা তখনই ঘটে যখন শিশুরা স্কুলে নিরাপদ বোধ করে না। তখন বাড়িতে থাকাটা আত্মরক্ষার একটি কৌশল হয়ে ওঠে শিশুদের জন্য।

স্কুলে অনুপস্থিতির কারণ হিসাবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে তা হলো  অসুস্থতা। ছবি : ইউটিউব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কুলে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার বৃদ্ধির একটি কারণ এটি।  সিবিসির একটি তদন্তে দেখা গেছে, এই পরিস্থিতি কানাডার সব স্থানেই ঘটছে।

অনুপস্থিতির কারণ হিসাবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে তা হলো  অসুস্থতা। পাঁচ বছর আগের তুলনায় এই পরিস্থিতি প্রতিটি এলাকায় বেড়েছে। কিছু জায়গায় এটি তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মনোবিজ্ঞানী ডেভিড স্মিথ বলেন, “প্রতিদিন শত শত বা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বেলায়ই এমন হয় যারা উত্পীড়নের শিকার হওয়ার কারণে স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। স্মিথ ইতিপূর্বে বুলিং নিয়েও গবেষণা করেছেন।

আর নতুন সমস্যা হলো, বুলিং এখন শুধু স্কুল প্রাঙ্গণেই নয়, সোশ্যাল মিডিয়া এবং গ্রুপ চ্যাটের মাধ্যমে বাচ্চারা বাড়িতে বসেও এর শিকার হতে পারে। এবং হচ্ছেও। আর এর সঠিক সংখ্যা পরিমাপ করা কঠিন।

সিবিসি নিউজ বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির কারণ সম্পর্কে জানার জন্য কানাডার ৪৬টি স্কুল ডিস্ট্রিক্টের সাথে যোগাযোগ করেছিল যেখানে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে তথ্য পেয়েছে মাত্র ২৬টি ডিস্ট্রিক্ট থেকে।

দেখা গেছে, স্কুলে সাধারণভাবে অনুপস্থিতির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় ছুটির দিন, ডাক্তার বা অন্য কোন পেশাদারের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট, স্কুল ভ্রমণ, তুষারপাতের দিন, পারিবারিক অনুষ্ঠান যেমন শেষকৃত্য এবং প্রায়শই অসুস্থতা।

প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ১৫টি স্কুল ডিস্ট্রিকের মধ্যে ১১টিতে পাঁচ বছরে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দুটি স্কুল ডিস্ট্রিকের মধ্যে একটি বয়সগ্রুপের মধ্যে অনুপস্থিতির হার বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্য একটি বয়সগ্রুপের মধ্যে হ্রাস পেয়েছে।

অন্যদিকে অকারণে অনুপস্থিতির ঘটনাও ঘটে সাধারণভাবে যা প্রভিন্স বা স্কুল ডিস্ট্রিক কর্তৃক অনুমোদিত নয় অথবা এমন অনুপস্থিতি যার কোনও ব্যাখ্যা নেই। ১৫টি স্কুল ডিস্ট্রিকের মধ্যে ১০টিতে এই সংখ্যা পাঁচ বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আবার ক্রনিক অনুপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে কোন কোন শিক্ষার্থীর বেলায়। তারা সাধারণত স্কুল বছরের ১০ শতাংশেরও বেশি সময়, অথবা মাসে প্রায় দুই দিন অনুপস্থিত থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে যে এটি জীবনের পরবর্তী সময়ে নেতিবাচক ফলাফলের পূর্বাভাস দেয়।

স্কুলে যাওয়ার বিষয়ে বাচ্চাদের নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করা

কিছু বাবা-মা যারা বাড়ি থেকে কাজ করতে পারেন না তাদের হয়তো বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

তবে আলবার্টায় বসবাসকারী তিন সন্তানের একজন মা কোর্টনি ম্যাকলিন সিবিসিকে বলেন, শিক্ষকরা সাধারণত চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। তিনি আরো বলেন, ” সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের বেলায় আপনি এমন ভান করতে পারবেন না যে কিছুই হচ্ছে না।”

ম্যাকলিনের তিন সন্তানেরই উদ্বেগ এবং মনোযোগ-ঘাটতি/অতি সক্রিয়তা ব্যাধি(ADHD) আছে। তার বড় ১২ বছর বয়সী সন্তান এভলিনেরও উদ্বেগ আছে।

তিনি মনে করেন, সমস্যায় আক্রান্ত সন্তানদের উপকার হবে যদি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণগুলি সনাক্ত করার জন্য আরো বেশি সংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি চান  স্কুলগুলো যেন পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে এবং জানতে চেষ্টা করে যে তাদের সন্তানের জন্য কোন বিষয়গুলো কঠিন অথবা কোন বিষয়গুলো সহজ। 

তবে বাস্তবতা হলো স্কুলে কর্মীর একটু অভাব আছে এবং সাধারণত মাঠে একজন ব্যক্তি সবার উপর নজর রাখেন।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড স্মিথের মতে, “এ বিষয়ে ভালো গবেষণা হয়েছে, এবং এটি বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে, যা দেখিয়েছে যে যখন স্কুল এবং স্কুলের মাঠে প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধান বৃদ্ধি করা হয়, তখন বুলিং হারের উপর অর্থপূর্ণ প্রভাব পড়ে।”

তিনি আরো বলেন, “তবে এটা নিশ্চিত যে এরকম পদক্ষেপ সব কিছু থেকে মুক্তি দিতে পারবে না। কিন্তু এটি একটি উল্লেখযোগ্য পজিটিভ প্রভাব ফেলতে পারে।”

স্মিথের গবেষণায় আরেকটি বিষয় পরীক্ষা করা হয়েছে। সেটি হলো, স্কুলে শিক্ষকদের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক শিশুর নিরাপত্তা বোধ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। শিশুরা তখন মনে করে স্কুলে এমন একজন আছে যার উপর সে নির্ভর করতে পারে। এমন কেউ আছে যার কাছে সে যেতে পারে যদি তার দিনটি খারাপ যায়। এরকম পরিস্থিতিতে হ্রাস পাবে তার ‘স্কুল ফোবিয়া’ এবং কমবে স্কুলে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতাও ।