আজি এ রাঙ্গা প্রাতে প্রণাম লহ দেবী বিপ্লবী বীরকন্যা প্রীতি লতা!
শৈলেন কুমার দাশ
বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ বীর বিপ্লবী বঙ্গকন্যা, চট্টলার আদুরে দুলালী! আজ ২৪শে সেপ্টেম্বর তাঁর মহান প্রয়াণ দিবসে বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার স্মরণীয়-বরণীয় এক মহান বঙ্গকন্যা; বিপ্লবের রাজকন্যা!
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এক মহান বীরকন্যা, বিপ্লবী ও স্বাধীনতার মহামন্ত্র ধারণকারী এক মহাঅগ্নি স্ফুলিঙ্গসম ভারতবষর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামী। অসম্ভব মেধাবী এই বঙ্গ কন্যা ঢাকার ইডেন কলেজে পড়ার সময় তার সহপাঠীরা বলেছেন, যে মেয়েটি ছিল অতি নরম মনের অধিকারী, একটি পিঁপড়াও যে মারতে পারতো না সেই মেয়েই এক সময় হয়ে উঠেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে এক মহাবিপ্লবী! তাতেই বুঝা যায় দেশের জন্য ভালোবাসা কতটা অনুরণিত ও উদ্বুদ্ধ করেছিল এই মহাবিপ্লবী মাস্টারদা সুর্যসেনের সুযোগ্য শিষ্যাকে! আজ ২৪শে সেপ্টেম্বর দেশের জন্য তোমার মহান আত্মাহুতি দিবস! আজ এই মহান প্রয়াণ দিবসের মহা শুভক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তোমাকে স্মরণ!
হে কন্যা তোমার ও তোমার মহান গুরুদেব বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনের মহাপ্রজ্জলিত নেতৃত্বের শক্তি আর বঙ্গপুত্র নেতাজি সুভাষ বসুর সশস্ত্র সংগ্ৰামের মহান নেতৃত্বের হাত ধরেই আমাদের ভারতবর্ষের স্বাধীনতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রজ্জ্বলিত হয়। তাই উপমহাদেশের মহান স্বাধীনতা তথা সুকৌশলী ব্রিটিশ বেনিয়াদের কুচক্রের কবল থেকে ও কঠোর অন্যায়ের নাগপাশ থেকে একশ নব্বই বছরের ঘৃণ্য শৃঙ্খল মুক্তির একমাত্র শৌর্যদীপ্ত বিপ্লবী তুমি সহ বঙ্গমাতার এই তিন আরাধ্য সন্তান! সেইসাথে অগণিত বিপ্লবী সন্তান স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রভাগ পুরোটাই সাজিয়েছিলেন মহান স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত অসীম সাহসী শ্যামলী সবুজ বঙ্গের পুত্রকন্যারা!
এই মহাবিপ্লবী কন্যা প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ই মে চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। তাঁর পিতা শ্রী জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার হেড ক্লার্ক। বাবা মায়ের অতি আদরের কন্যা ছিলেন প্রীতিলতা! শিক্ষা অনুরাগী মা বাবা মেধাবী কন্যার লেখাপড়ার ব্যাপারে ছিলেন খুবই আগ্ৰহী।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী আন্দোলনের মন্ত্রে উজ্জিবিত এক মহাবিপ্লবী কন্যা ও ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রামে প্রীতিলতাই সমগ্র ভারতবর্ষে প্রথম আত্মোৎসর্গকারী এক মহান বিপ্লবী কন্যা।
প্রীতিলতা চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর তিনি ১৯২৯ সালে ঢাকা ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তি হন এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এর দুই বছর পর প্রীতিলতা কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে ডিস্টিংশনসহ গ্রাজুয়েশন করেন।
ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাকালে প্রীতিলতা বিপ্লবী লীলা নাগের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ বিরোধী দীপালি সংঘের সাথে যুক্ত হন। শ্রীসংঘেরও সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শ্রীসংঘ ছিল ঢাকার একটি বিপ্লবী সংগঠন যার নেতৃত্বে ছিলেন বিপ্লবী অনীল দাস। এই সংগঠনের নারী শাখার নেতৃত্বে ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। এই সংস্থাটি মূলত ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল এবং এটি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার লিগ নামেও পরিচিত ছিল।
কলকাতার বেথুন কলেজের ছাত্রী থাকাকালে কল্যাণী দাসের নেতৃত্বাধীন ছাত্রীসংঘের সদস্য হন প্রীতিলতা। সেই প্রতিকুল পরিবেশে একজন মেয়ে হিসাবে একাধিক বিপ্লবী দলের সদস্য হওয়া কতটা কঠিন ছিল তা অনুমান করাও দুষ্কর! এ থেকেই বুঝা যায় দেশের স্বাধীনতার মন্ত্র কতটা দেদীপ্যমান ছিল প্রীতিলতার অন্তরে।
গ্রাজুয়েশন করার পর তিনি চট্টগ্রামের ইংলিশ মিডিয়াম নন্দনকানন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের (বর্তমানে অপর্ণা চরণ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ) প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। যে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রায়বাহাদুর অপর্ণা চরণ দে। যার একান্ত অনুরোধে প্রীতিলতা স্কুলের এই দায়িত্ব গ্ৰহণ করেন।
১৯৩০ সালে সমগ্র বাংলা জুড়ে কুচক্রী ব্রিটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে অনেক বিপ্লবী দল সংগ্রামরত ছিল। ঐসব দলের সদস্যরা বিশ্বাস করত যে, কেবল সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের গোপন দলিলপত্র প্রদর্শন ও অধ্যায়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল ব্রিটিশ বেনিয়ারা। দেশ মাতৃকার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা আর দৃঢ় চিত্তের অধিকারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সেসব নথিপত্র গোপনে পাঠ করে দেশের স্বাধীনতার বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হন।
প্রীতিলতার এক ভাই মাস্টারদা সুর্যসেনকে তাঁর বিপ্লবী চেতনা সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের সাথে মাস্টারদা সূর্য সেনের দেখা হয় ১৯৩২ সালের মে মাসে। যা পরবর্তীকালে প্রীতিলতার বিপ্লবী জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অস্ত্র লুট, রেললাইন উপড়ে ফেলা, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন বিকল করে দেয়াসহ ব্যাপক আক্রমণ হয়। এ আক্রমণ চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ নামে পরিচিতি পায়। এ আন্দোলন সারাদেশের ছাত্রসমাজকে উদ্দীপ্ত করে। চাঁদপুরে হামলার ঘটনায় বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির আদেশ হয় এবং তিনি আলীপুর জেলে বন্দি হন। প্রীতিলতা রামকৃষ্ণের বোন পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতেন। রামকৃষ্ণের প্রেরণায় প্রীতিলতা বিপ্লবী কাজে আরো বেশি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।
১৯৩১ সালে ৪ আগস্ট রামকৃষ্ণের ফাঁসি হওয়ার পর প্রীতিলতা আরো বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। তখন তিনি এই আন্দোলনকে কিভাবে আরও প্রচন্ড শক্তিশালী করা যায় সেজন্য অস্থির হয়ে পড়েন। এবং মাস্টারদা সুর্যসেনের সাক্ষাত লাভের জন্য উদ্গ্ৰীব হয়ে উঠেন। ওই সময়ের আরেক বিপ্লবীকন্যা কল্পনা দত্তের সঙ্গে পরিচয় হয় প্রীতিলতার। বিপ্লবী কল্পনা দত্তের সহায়তায় ১৯৩২ সালের মে মাসে প্রীতিলতার সাক্ষাত হয় মাস্টারদা সুর্যসেন ও বিপ্লবী নির্মল সেনের সঙ্গে। নির্মল সেনের নিকটে প্রীতিলতা অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন।
১৯৩২ সালের ১৩ জুন সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে বিপ্লবীদের গোপন বৈঠকের সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা তাঁদের ঘিরে ফেললে বিপ্লবীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যা ধলঘাট যুদ্ধ নামে পরিচিতি পায়। মাস্টারদা ও প্রীতিলতা পালাতে সক্ষম হন। আর তখন থেকেই পুলিশের জরুরি গ্রেফতারি তালিকায় প্রীতিলতার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।
প্রাণ দেন নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। পুলিশ সাবিত্রী দেবীর বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। মাস্টারদার নির্দেশে জুলাই মাসে প্রীতিলতা স্কুলের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
প্রীতিলতা সাহসী বিপ্লবী বীরকন্যা কল্পনা দত্ত সহ গোপন আস্তানায় চলে যান।
প্রীতিলতা সূর্যসেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলের প্রথম মহিলা সদস্য ছিলেন। তিনি টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস এবং রিজার্ভ পুলিশ লাইন দখল অভিযানে যুক্ত ছিলেন। তিনি জালালাবাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৩২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ’ এইরূপ অবমাননামূলক কথার জন্য ক্লাবটির দুর্নাম ছিল। ক্লাব আক্রমণ সফল করে পুরুষবেশী প্রীতিলতা সামরিক কায়দায় তাঁর বাহিনীকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই সময়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হলে তাৎক্ষণিকভাবে পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর আত্মদান বিপ্লবীদের সশস্ত্র সংগ্রামকে আরো উজ্জিবিত করে তোলে। যা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনকে হাজার গুণ অগ্রগামী করে তোলে।
ভারতবর্ষের শ্যামল প্রান্তর এই বিপ্লবী বঙ্গকন্যার কাছে চিরঋণী! তাই মহান শ্রদ্ধায় আজ তাঁর মহান আত্মাহুতি দিবসে এই বিপ্লবী কন্যাকে স্মরণ। বঙ্গ তথা ভারতবর্ষের কোণায় কোণায় এই বিপ্লবী কন্যার স্মরণে প্রদীপ শিখা প্রজ্জ্বলিত হোক। তবেই এই মাটি হয়তো প্রায় দু’শ বছরের পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তির ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করতে সক্ষম হবে।
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৫। ক্যালগারি, আলবার্টা
শৈলেন কুমার দাশ
লেখক, কলামিস্ট, কানাডা
