কানাডায় অভিবাসী হতে পেরে কৃতজ্ঞ অনেক নবাগত অভিবাসী, কিন্তু….
কিন্তু উন্নতির জন্য পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ নেই তাদের
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, আগস্ট ২০, ২০২৫ : সিবিসি নিউজ কর্তৃক পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, কানাডায় নতুন আগতদের ৮০ শতাংশেরও বেশি মনে করেন যে দেশটি সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই তার অভিবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক বেশি লোককে আবাসন দিচ্ছে।
গত নভেম্বর মাসে গবেষণা সংস্থা পোলারা স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইটস সিবিসি’র পক্ষে ঐ জরিপ জরিপি চালাতে গিয়ে ১,৫০৭ জনকে তাদের কানাডায় আসার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল।
জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন নবাগতদের মধ্যে চারজন বিশ্বাস করেন- কানাডিয়ান সরকার “পর্যাপ্ত আবাসন, অবকাঠামো বা পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগের কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই অনেক বেশি অভিবাসী এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে” এ দেশে আসতে দিয়েছে।
২০২২ সালে ইরান থেকে কানাডায় অভিবাসী হওয়া চিকিৎসক শাবনূর আব্দুল লতিফ বলেন, তিনি এই বক্তব্যের সাথে একমত।
“এর পিছনে একেবারেই কোনও চিন্তাভাবনা ছিল না,” বলেন আব্দুল লতিফ, যিনি গত বসন্তে লন্ডন, অন্টারিওর ফ্যানশাওয়ে কলেজ থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসন ব্যবস্থাপনা প্রোগ্রাম থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। শাবনূর একথাও বলেন যে, তিনি ইরানের তুলনায় কানাডায় বেশি নিরাপদ এবং স্বাধীন বোধ করেন।

অন্যদিকে গত নভেম্বরে সম্পন্ন অ্যাসোসিয়েশন ফর কানাডিয়ান স্টাডিজের জন্য লেগার জরিপ অনুসারে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ কানাডিয়ান এই মতামত পোষণ করেন।
২০১৪ সাল থেকে কানাডা অর্ধ কোটিরও বেশি মানুষকে স্বাগত জানিয়েছে
গত দশকে কানাডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সিংহভাগই অভিবাসনের কারণে হয়েছে। উল্লেখ্য যে, কানাডার বর্তমান মোট জনসংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখের সামান্য বেশি। এর মধ্যে অর্ধ কোটির মত লোক যোগ হয়েছে গত এক দশকে যাদের জন্ম দেশটির বাইরে।
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ অভিবাসী কানাডায় আসেন এখানে নাগিরকত্ব গ্রহণ করে স্থায়ীভাবে থাকার আশায়। হিসাবে দেখা গেছে শুধুমাত্র ২০২৪ সালের প্রথম নয় মাসেই কানাডা ৬,৬২,০০০ স্থায়ী এবং অস্থায়ী বাসিন্দাকে স্বাগত জানিয়েছে এদেশটিতে।
অবশ্য সেন্টার ফর ইমিগ্র্যান্ট অ্যান্ড কমিউনিটি সার্ভিসেসের নির্বাহী পরিচালক আলফ্রেড ল্যাম গবেষণা সংস্থা পোলারা স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইটস এর অনুসন্ধানগুলিকে কানাডিয়ানদের কর্মসংস্থান এবং আবাসন কেড়ে নেওয়ার ভুল ধারণাকে উস্কে দেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেন, “আপনি আগামীকালই কানাডায় অভিবাসন বন্ধ করে দিতে পারেন কিন্তু তারপরও আবাসন সংকট থাকবে,” তিনি উল্লেখ করে বলেন যে মহামারী চলাকালীন বাড়ির দাম “আকাশছোঁয়া” হয়েছিল, এমনকি যখন সীমান্ত বেশিরভাগ বন্ধ ছিল।
তার মতে, অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ে হতাশা থাকা সত্ত্বেও, বেশিরভাগ নবাগত কানাডায় সামগ্রিকভাবে সুখী বলে জানিয়েছেন। জরিপের উত্তরদাতাদের ৭৯ শতাংশ বলেছেন যে তারা তাদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে সন্তুষ্ট এবং প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষার সুযোগ এবং কর্মজীবনের ভারসাম্য নিয়ে সন্তুষ্ট।
“এটা অবাক করার মতো কিছু নয় যে আপনি যদি কানাডায় আসেন – বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ থেকে – তাহলে আপনার পরিস্থিতির অসাধারণ উন্নতির ফলে আপনি নিঃসন্দেহে উপকৃত হবেন,” এ কথা বলেন ইমিগ্রেশন আইনজীবী লু জ্যানসেন ডাংজালান, যিনি ফিলিপাইনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ২০১০ সালে নিজেই কানাডায় চলে এসেছিলেন।
নবাগতদের মধ্যে বেকারত্বের হার কানাডার গড় বেকারত্বের তুলনায় দ্বিগুণ
জরিপে অংশগ্রহণকারী কর্মরত নতুনদের মধ্যে দেখা গেছে চৌদ্দ শতাংশ বেকার ছিলেন – যা গত নভেম্বর মাসে জাতীয় গড়ের দ্বিগুণ।
নাবাগতদের বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতা কানাডায় ব্যবহার করতে না পারা এই পরিস্থিতির একটি চালিকাশক্তি বলে মনে হচ্ছে। কারণ এক-চতুর্থাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে তাদের পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা “স্বীকৃত হয়নি” এখানে এবং এক-ষষ্ঠাংশ জানিয়েছেন যে কানাডায় তাদের শিক্ষাগত ডিগ্রি বা যোগ্যতা “চাকরির সন্ধানের বেলায় স্বীকৃত হয়নি”।
এ প্রসঙ্গে আইনজীবী ইমিগ্রেশন আইনজীবী লু জ্যানসেন ডাংজালান তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “আমি যখন কানাডায় আসি এবং চাকরীর জন্য আবেদন করতে থাকি তখন তারা আমার শিক্ষাগত যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেয়নি। ”
সমাজ বিজ্ঞানে ডাংজালানের মাস্টারর্স ডিগ্রি ছিল যা তিনি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর থেকে নিয়েছেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একটি উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষণ সংস্থার মতে বিশ্বের টপ টেন ইউনিভার্সিটির একটি। তিনি বলেন, এটাকে তুলনা করা যেতে পারে যে … আপনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় বা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছেন।
জরিপে দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে নতুন আসা ৪৪ শতাংশ বলেছেন যে তারা হয় বেকার, নয়তো তাদের দক্ষতার ক্ষেত্রের বাইরে কাজ করছেন।
“কানাডায় যারা নতুন এসেছেন তাদের জন্য কোনও প্রশিক্ষণ বা পুনরায় দক্ষতা অর্জন করা ব্যবস্থা নেই।” মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্স ফর চেঞ্জের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ হুসান এ কথা বলেন। তার মতে, “কানাডার বাইরে থেকে অর্জিত কাজের অভিজ্ঞতার প্রতি ব্যাপক অসম্মান, অনাগ্রহ এবং অবমূল্যায়ন রয়েছে দেশটিতে।”
এই বাস্তবতা আব্দুল লতিফের বেলায়ও খুব পরিচিত। লতিফ তেহরানে একজন ডাক্তার ছিলেন কিন্তু কানাডায় আসার পর চিকিৎসা অনুশীলন করতে পারেননি। ফ্যানশাওয়ে কলেজে দুই বছরের স্নাতকোত্তর সার্টিফিকেটের জন্য তিনি ৩৩,০০০ ডলার খরচ করেছিলেন।
তিনি বলেন, “নবাগতদের দক্ষতা এবং কানাডায় তা ব্যবহারের সুযোগের অভাব আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কানাডা একটি উন্নত দেশ হলেও, অভিবাসীদের প্রতিভা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর নীতিগুলি পুরানো এবং অদক্ষ।”
কানাডায় নবাগতদের কর্ম অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘স্বীকৃত নয়’
সেন্টার ফর ইমিগ্র্যান্ট অ্যান্ড কমিউনিটি সার্ভিসেসের নির্বাহী পরিচালক আলফ্রেড ল্যাম বলেন, অনেক নবাগত অভিবাসী তাদের পেশাভিত্তিক কাজে প্রবেশ করার সুযোগ পাচ্ছে না বলে কানাডায় শিল্পোন্নত G7-দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ শিক্ষিত লোক থাকা সত্বেও কম উৎপাদনশীল কর্মী রয়েছে।
সি.ডি. হাও ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত কর্মীদের তুলনায় তিনগুণ বেশি কর্মহীনতায় থাকার সম্ভাবনা বিরজমান।
ল্যাম আরো বলেন, “আমরা ক্রমাগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ ও উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাজে লাগাই কম।”
প্রতি ৫ জন অশ্বেতাঙ্গ নবাগতদের মধ্যে ৩ জন বৈষম্যের শিকার
গবেষণা সংস্থা পোলারা স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইটস এর জরিপে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি থেকে আসা লোকেদের জন্য চাকরি খুঁজে পাওয়া বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং। জরিপে অংশগ্রহণকারী নয়জনের মধ্যে একজন নতুন চাকরির সন্ধানে তাদের জাতিগততার কারণে বৈষম্যের সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
৪৩ বছর বয়সী পলিনা সাইমন ২০২২ সালে ইকুয়েডর থেকে ক্যালগারিতে চলে আসেন। দেশে একজন শিক্ষিকা এবং তথ্যচিত্র নির্মাতা ছিলেন তিনি। কানাডায় আসার পর তিনি একটি স্টোরে কাজ করতেন। সম্প্রতি ক্যালগারি পাবলিক লাইব্রেরিতে চাকরি শুরু করেছেন। চ্যালেঞ্জিং হলেও, তিনি বলেন যে ভাষাগত বাধা মোকাবেলাকারী অন্যান্য সম্প্রদায়ের সদস্যদের তুলনায় তার চাকরি খোঁজা তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল।
তিনি বলেন “আমার চারপাশে অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকানরা আছে যারা পেশাদার – দুর্দান্ত মানুষ – কিন্তু ভাষা নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে তাদেরকে। এটি সম্ভবত তাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠেছে পেশাগত জব মার্কেটে প্রবেশের জন্য।”
মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্স ফর চেঞ্জের নির্বাহী পরিচালক হোসেন বলেন, অভিবাসী কর্মীরা হলেন “last hired, first fired,” এবং কর্মক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।
তাছাড়া, গত পাঁচ বছরে কানাডায় আসা প্রতি চারজন নবাগত ব্যক্তির মধ্যে একজনের পারিবারিক আয় ৩০,০০০ ডলারের নিচে। অস্থায়ী বাসিন্দা এবং ৩০ বছরের কম বয়সী অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
হোসেন আরো বলেন, নবাগতদের মধ্যে বেকারত্বের উচ্চ হার “বর্ণবাদ এবং বৈষম্যের প্রত্যক্ষ ফলাফল যা আমাদের সম্প্রদায়কে অবমূল্যায়ন করার জন্য একসাথে কাজ করে।”
জরিপে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ নবাগত তাদের এথনিক পরিচয়ের কারণে কিছুটা পক্ষপাতের শিকার হওয়ার কথাও জানিয়েছেন। জরিপে আরো যে তথ্য উঠে এসেছে তাতে দেখা গেছে, শ্বেতাঙ্গ নবাগতদের তুলনায় অশ্বতাঙ্গ নবাগতদের বৈষম্যের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ২০ শতাংশ বেশি। কানাডায় দক্ষিণ এশীয়রা সবচেয়ে বেশি (৬৬ শতাংশ) বর্ণবাদের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ইমিগ্রেশন আইনজীবী ডাংজালান,বলেন, কানাডায় অভিবাসী-বিরোধী মনোভাবের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশীয়রা “সহজ বলির পাঁঠা” হয়ে উঠেছে।
