টরন্টোতে এস.এস.সি ১৯৯৮ ব্যাচের পিকনিক অনুষ্ঠিত
ডা. পুলক : ছোটবেলার পিকনিকের স্মৃতি মনে আছে সবার? শীতে বছরের শেষে কিংবা নতুন বছরের শুরুর সময়টাতে সব ছোটরা মিলে ২০ টাকা কিংবা পন্চাশ টাকা চাঁদা তুলে বাজার করে আনা হতো। আর প্রতি বাসা থেকে তোলা হতো চাল, ডাল, ডিম, আলু, পেঁয়াজের মতো উপকরণ। এরপর সবাই মিলে কোনো মাঠে গিয়ে আনাড়ি হাতে যে যার মতো পারে হইহই করে রান্না করা। হঠাৎ বড়দের মতো দায়িত্ব পেয়ে হুমকিধামকি দিয়ে কাজ করানোটাও ছিলো বিরাট গর্বের। নিজেকেও কেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো! পিকনিক নিয়ে এমন অনেক আনন্দের স্মৃতি জড়িয়ে আছে আমাদের প্রায় সবার ছোটবেলায়। বড়বেলায় এসে সেই আনন্দ হয়তো কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে সময় আর ব্যস্ততার ভারে, তবে এখনো হারিয়ে যায়নি।
তবে কানাডায় এসে শীতের দিনে নয় বরং গরমকালে তথা সামার এলে পিকনিকের আয়োজন করতে চায় মন। করতে যেহেতু হবে, তাই জায়গা খোঁজাটা দরকার। বহু খুঁজে শেডসহ একটা জায়গা পাওয়া গেলো, নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ । ঝামেলা একটাই , দিনটি লং উইকেন্ডে পরেছে। কিম্তু কিছু করবার নাই। বন্ধুত্বের টান যেহেতু আছে তাই সবাই আসবে সেটাই প্রত্যাশা ।

সময় পেরিয়েছে সাতাশটি বছর। ঠিক ধরেছেন , সাতাশ বছর আগে আমরা সবাই এস.এস.সি (S.S.C) পাশ করেছি ১৯৯৮ সালে । কিন্তু হৃদয়ের বন্ধন কখনোই পুরোনো হয় না, বিশেষ করে যখন সেই বন্ধনের শিকড় শৈশব, যৌবন আর স্বপ্নের দিনে গাঁথা থাকে। পিকনিক নামক মিলনমেলায় ছিল এমনই এক অন্তরঙ্গ, হৃদয়ছোঁয়া অভিজ্ঞতা—যেখানে স্মৃতি, ভালোবাসা আর আশা ভেসে বেড়িয়েছে আবেগের ঢেউয়ে।
আমাদের পিকনিক এর দিনটা বেছে নেওয়া অবিশ্বাসভাবে মিলে গেছে আমাদের এস.এস.সি তে রেজাল্ট দেওয়া দিনের সাথে । রেজাল্ট নিয়ে শংকা থাকলেও পিকনিক নিয়ে কোনো শংকা ছিলো না । প্রায় শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে পিকনিককে দিয়েছে নতুন এক মাত্রা । সবাই যার যার মতো উপভোগ করেছে । সাতাশ বছর আগে পাশ করা সব বন্ধুদের মনের বয়স সেই আট্টানব্বই সালেই আটকে আছে , তা কথায় কথায় এমনেই বোঝা গিয়েছে।
পিকনিকের আগে এর পিছনের কিছু গল্প বলাটা দরকার । কয়েকবার করে আমাদের মিটিং হয়েছে । বসা হয়েছে রেস্তোরাতে বা বাসায়। কথা হয়েছে বারংবার সবার সাথে । জাহান স্পট খুঁজতে আর বুকিং দিতে সময় দিয়েছে। জাহান আর রানা মিলে সাউন্ড সিস্টেম অর্ডার করেছে । রানা আর সুরুচি ওদের বাসা ছেড়ে দিয়েছে পিকনিকের ডেকোরেশন গোছানোর জন্য । তানজির আর নীতি কয়েকবার করে ওশোয়া থেকে এসেছে আমাদের ডেকোরেশনে সাহায্য করতে । রিনি সবার সাথে যোগাযোগ করে যাকে যাকে পারে পিকনিকে এনেছে । তন্দ্রা আমাদের হিট আইটেম ” বাস ও শিক্ষাবোর্ড” আইডিয়া দিয়েছে আর বানিয়েছে। বাসটা পেয়েছি DU ফোরামের হিরু ভাই থেকে , তাকে কৃতজ্ঞতা । নীতি আর বাকি আমরা ওকে সাহায্য করেছি । তন্ময় ফোন করে করে সবার সাথে কথা বলে পিকনিকে এনেছে । পুলক আর রুমা শহরের বাইরে ছিলো, তাই শেষদিকে এসে যতটুকু পারে সাহায্য করেছে সবদিকে। মার্জিয়াও অনেককে ফোন দিয়েছে আর ডেকোরেশনে সাহায্য করেছে ।

তারপর এলো মাহেন্দ্রক্ষণ , অগাষ্ট এর দু তারিখ । সিটন পার্ক এর চার নম্বর স্পট পিকনিকের জন্য নির্ধারিত । দুপুর বারোটা থেকে সবার আসবার কথা । তাই সাড়ে এগারোটার মধ্যে তন্দ্রা , ঈশিতা, রুমা , পুলক, বখতিয়ার ভাই , জাহান আর আরজু চলে আসলো গাড়ি বোঝাই পিকনিকের জিনিষপত্র নিয়ে । তন্দ্রাকে নিয়ে এসেছে প্রীতি, ওর কথা আলাদা করে বলতেই হয় । বন্ধুত্বের টানে সাড়ে পাঁচশ কি.মি গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছে ছেলেসহ। গত টিউলিপ ফেস্টিভালে আমাদের পাগলাদের সাথে আড্ডা মেরে মজা পেয়ে গেছে তাই এইবারও চলে এসেছে । ব্যানার টাঙ্গানো হলো আর পিকনিকের রসদ নামানো হলো । এরমধ্যে চলে এলো রানা আর সুরুচি , ওদের গাড়িতেও রাখা জিনিষ এলো মাঠে । রিনি নিয়ে এলো ট্রলি যা দিয়ে ভারি ভারি সাউন্ডবক্স আনা হলো স্পটে । তন্ময় আসলো আন্টিকে নিয়ে , ওর হিমু পান্জাবি আলাদা করে নজর করেছে সবার । মার্জিয়া এসে দায়িত্ব নিলো উপস্হাপনার,ওর সাবলীলতায় সবাই মুগ্ধ।

ধন্যবাদ হাসিবকে কারণ ও ওর বাচ্চাদের নিয়ে এসেছে ওর বউ অসুস্হ থাকবার পরেও । তারপরই এলো মাসুদ , লুতফর আর তারিতা । ওরা বেজায় খুশি পিকনিকে এসে, ছবি তোলায় নেমে গেলো এসেই । সায়মা ফোন দিলো বাচ্চাদের খেলা শুরু হয়েছে কিনা তা জানতে, একটু পরে চলে এলো । রায়হান জানালো ওর গাড়ি নষ্ট তাই বিপুল বিক্রমে বাসে রওনা হয়েছে বউ আর বাচ্চাসহ । প্রীতি আর ঈশিতা কফি আর টিম বিটস নিয়ে এলো সাথে আমাদের পিকনিকে আনা সমুচা আর জিলাপি দিয়ে সকলে হালকা পেটপুজো করে নিলো। সেই সময় আমাদের সব অনুষ্ঠানের স্পন্সর বড়ভাই মহি ভাই ও শারমিন এলো তাদের পরিবারসহ । সাথে র্যাফেল ড্র এর প্রথম পুরস্কার টিভি। টিভি নিয়ে আমাদের ফটোসেশন চললো অনেকক্ষণ। আস্তে আস্তে পিকনিকে জনাসমগম বাড়ছে । মাশিয়াত ও রিমি ভাবি এলো দু মেয়েসহ। এরপর এলো তুহিন আর সাইদা এলো দু বাচ্চাসহ । শান্ত আর তার পরিবার ফোল্ডিং চেয়ার নিয়ে হাজির । দু বন্ধু মনোয়ার আর কামরুল হাজির প্রায় একই সময়ে। আফসানা এলো তার মা আর পরিবার নিয়ে । উম্মে রুমান পরিবার নিয়ে এলো আর আমাদের জন্য আনলো ঠান্ডা পানীয়। দিদার আর জেসমিন দু মেয়েকে নিয়ে চলে এলো । টরন্টোর “ওয়ান অফ দ্যা হ্যাপিনিং পারসন” হিশাম চিশতি এলো, সাথে সাথে সেলফি তোলা শুরু চারিদিক থেকে । রাজিব দু শিফটে এলো, একবার বউ বাচ্চা নামাতে আর পরের বার শ্যালিকা,শ্বশুর শাশুড়ি নামাতে । অমি আর নীপা এসেছে সুদুর অটোয়া থেকে আমাদের সাথে পিকনিকে একটা আনন্দময় দিন কাটাবে বলে । সুমন এলো দুপুরের খাবারের শেষে আর আরিফা আর নাশিদ এলো প্রায় পাঁচটার দিকে ।

আমরা এখানে সবাই ব্যস্ত, তবে সেই ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের চাকরি এবং পরিবার মেইনটেইন করে সবাইকে একসাথে করার জন্য যে চেষ্টা করছে সকল এডমিন ও মডারেটররা এবং সকল বন্ধুরা সেই ঘোষণায় যে অভুতপূর্ব সাড়া সবসময় দিয়েছে সেটা সত্যিই প্রশংসনীয়।মহি ভাইকে ধন্যবাদ আমাদের লটারির প্রথম পুরস্কার স্পন্সর করবার জন্য । হিরু ভাইকে ধন্যবাদ আমাদের অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ বাস ফটো স্ট্যান্ডটা শেয়ার করবার জন্য । সকল দুলাভাই আর ভাবিদের ধন্যবাদ আমাদের এই পিকনিকে এসে আনন্দময় করবার জন্য। বাচ্চারা নেচে,গেয়ে আর গল্প করে সময় ভালোই পার করেছে।
এর মধ্যে দুপুরের খাবার হাজির আর প্রায় শ’খানিক গেস্টের আয়োজন তথাপি সবকিছু ভালোভাবেই চলেছে। খাবারের স্বাদও ভালো ছিল। সবাই বেশ প্রশংসা করেছে । সবাই লাইন ধরে দাঁড়িয়ে নিয়েছে আর ভলান্টিয়াররা সবাইকে খাবার তুলে তুলে পরিবেশন করেছে । পোলাও, কাবাব, রোষ্ট, ভুনা মাংস , বুটের ডাল, সবজি আর সালাদে এক পরিপূর্ণ আহার । খাবারের পর ছিলো ফিরনি, সেকি স্বাদ ।
দুপুরের খাবারের পর শুরু হলো স্মৃতিচারণ পর্ব । মহি ভাই সবাইকে ধন্যবাদ দিলেন আর এই আয়োজনে তাকে ডাকবার জন্য । হিশাম জানালো তার ভালোলাগার কথা এত্তোগুলো বন্ধুদের দেখে । মাসুদ আর লুতফর ধন্যবাদ জানালো আয়োজকদের আর আগত বন্ধুদের । মার্জিয়া তার স্কুলের বান্ধবি রুমান ডেকে নিয়ে স্মরণ করলো ওদের স্কুলজীবন । এই পর্ব শেষে শুরু হলো বিভিন্ন বয়সী বাচ্চাদের খেলা । চার থেকে সাত বছর বয়সীদের চকলেট দৌড়, আট থেকে বারো বয়সীদের মার্বেল দৌড় আর তেরো থেকে বাকিদের টারগেট প্র্যাকটিস । বাচ্চারা এতো আনন্দ পেয়েছে অংশ নিয়ে আর ভলান্টিয়ার ঈশিতা, প্রীতি, রিনি তন্দ্রা, সুরুচি আর রুমা রীতিমত ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছিলো বাচ্চাদের নিয়ে । পুরুষদের পেনাল্টি শুটআউট ছিলো রোমাঞ্চকর, এক্কেবারে থ্রিলার মুভি । মেয়েদের ফ্রেন্ডশিপ গেমে দর্শকরাও সমানতালে মজা পেয়েছে ।

পিকনিকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিলো দুটো, এক হলো বাচ্চাদের যেমন খুশি তেমন সাজো আর কাপল সাজসজ্জা গেমস। এত্তো মজা হয়েছে যে, সেটা নিয়ে লেখলে দুটো আলাদা গল্প হবে । আরেকটা বিষয়, এখানে তেমন কেউই কাউকে আগে থেকে চিনতো না গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া । কিন্তু সবার সাথে আন্তরিক আলাপ করে মনে হয়নি যে অচেনা। খুবই ভালো লেগেছে সবার কথা শুনে আর পরিচয় হয়ে। আরো একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় যে, সবাই ব্যস্ত ছিলো একে অপরের স্কুল বা কলেজের নাম বা গল্প নিয়ে কিংবা পুরানো স্মৃতি রোমন্থন ইত্যাদি নিয়ে। দুই দুলাভাই মাইক নিয়ে এই আন্তরিকতা নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছে । জাহানের সৌজন্যে রেজিস্ট্রেশন করা সবাই পেলো একটি করে আকর্ষনীয় পোলো টি-শার্ট ।
সব মিলিয়ে দিনটি আমাদের অনেক ভালো কেটেছে। অনেকে তো বলেছে দিনটা এতো তাড়াতাড়ি শেষ হলো কেন । বিকেলে রুমা আর মামুন দুলাভাই এর বদৌলতে পেয়ে গেলাম চা, তরমুজ আর ঝালমুড়ি। ডিউটি শেষ করে তানজির তরমুজ আর চানাচুর নিয়ে এসেছিলো। পিকনিকে এলো সুমন ভাবিকে কাজে ড্রপ করে । আফজাল এলো আর এসেই ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে গেলো। সবশেষে এলো আরিফা, নাশিদ আর দুলাভাই। দুপুরের খাবার ছিলো ,তাই পরিতৃপ্তি নিয়ে আহার সাড়লো বাকি সবাই । অগাষ্ট মাসে যাদের জন্মদিন তাদের নিয়ে বিশাল কেক কাটা হলো মহাসমারোহে ।
বাকি রইলো মহা আকর্ষণীয় র্যাফেল ড্র এর । এর আগে আমরা মাইলষ্টোন স্কুল এর মর্মান্তিক ঘটনার জন্য আমরা এক মিনিট নীরবতা পালন করি । আবার ধন্যবাদ এডমিন আর মডারেটরকে যারা দ্বিতীয় থেকে সপ্তম পুরস্কার স্পন্সর করেছে । পুরস্কার লোভনীয় ছিলো, রিনি ,প্রীতি আর সুচী’র পরিশ্রমে টিকিট সোল্ড আউট ছিলো । সবাইকে তাক লাগিয়ে প্রথম পুরস্কার ৫০ ইন্চি টিভি পেয়ে গেলো লুতফর । সবাই মিলে পুরস্কার তুলে দেওয়া হলো । এভাবেই শেষ হলো একটা অসাধারণ দিনের । আস্তে আস্তে সবাই বিদায় নিতে থাকলো আগত সকলে । সকলকে ধন্যবাদ দিয়ে আয়োজকরা অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানে। আয়োজকরা যখন সব গুছগাছ শেষ করে বাসায় ফিরছে তখন প্রবল উত্তাপ দেওয়া সুর্য্যিমামাও অস্ত যাচ্ছে পশ্চিমাকাশে ।

এটা ছিল শুধু একটি পিকনিক নয়, বরং সময়কে থামিয়ে রেখে পুরোনো বন্ধুত্বের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অপূর্ব উপলক্ষ। অচেনা দেশে, চেনা মুখগুলোর মাঝে আবার যেন ১৯৯৮ সালের সেই তারুণ্য ফিরে পেলাম। স্মৃতি, হাসি আর হৃদয়ের টান—সবকিছু মিলে গড়া এক নিখুঁত দিন, যা মনে থাকবে আজীবন।❤️❤️❤️
ধন্যবাদ বন্ধু পুলক, এত সুন্দর করে আমাদের স্মৃতিকে লেখায় ধরে রাখার জন্য। মনে হলো আবার পিকনিকে ফিরে গেলাম!❤️❤️❤️