অচিন পাখি

শুভ্রা শিউলী সাহা

পাড়ার এক ছোকড়া একখানা প্রেমপত্র দিয়েছিল – পড়ে দেখি তার ৮ লাইন চিঠির প্রায় সবকটি লাইনই রবি ঠাকুর, নজরুল বা অন্য কারোর লেখা থেকে ধার করা। বললাম বাপু দুলাইন বাংলা লিখতে পারো না আবার নকল করা প্রেমের চিঠি। আমার অংকের টিউটর একদিন আমার অংক বইয়ের মধ্যে একখানা চিঠি রেখে গিয়েছিল – মাকে দেখাতেই পরদিন থেকে বেচারার টিউশানিটা চলে গেল। কলেজের এক সহপাঠী আমার একখানা ছবি একে আমায় দিয়েছিল, রেগে সে ছবি ছিড়ে ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম, বলেছিলাম নৌকা বানিয়ে জলে ভাসিয়ে দাও। এখন ভাবি এসব অন্যায় কেন করেছিলাম? কি দরকার ছিল ওর শিল্পকর্মটা নষ্ট করার কিংবা কারো রুটিরুজি নষ্ট করার। সময়ের সাথে সাথে জীবনবোধ, ভাবনাগুলো কত বদলে যায়। এক জীবনের জন্য কত আয়োজন আমাদের। মৃত্যু সংখ্যা গননার ধারাপাত, কার দরজায় কখন যে কড়া নাড়ে সে ভয়ে আমরা এখন আতংকিত। আমরা কেউ জানিনা এ অনিশ্চিতের অবসান কবে হবে।

আমি কিন্তু বেশ আছি – I belong to the classification of people known as wives- গর্ব করে সবসময় বলি, I am a wife and I am a mother. কিন্তু আমার পাশের মানুষটি বলে, “তোমাকে বিয়ে করে কি যে ভুল করেছি”। এই কথা গত ৩০ বছর ধরে শুনছি। ছেলেরা বিয়ে করে আর মেয়েদের বিয়ে হয় তাই হয়তো তার এ অনুতাপ । একটু অত্যাচার তো করিই বটে, তবে বেশী না। গাছে গাছে কখনো এমন ঝগড়া করে না। পেঁপে বাগানে দেখেছি মেয়ে গাছ, পুরুষ গাছ পাশাপাশি দাড়িয়ে থাকে কোন অভিযোগ না করেই। শুধু গাছ কেন? ঈশ হাঁস, গাং চিল, কাক সব পাখিদের দেখি দল বেঁধে চলতে। ওরা তো কোন ফ্যমিলি ডে, ভি ডে পালন করে না।

বিয়ের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করতো কেমন চলছে তোর marriage life? আমি বলতাম দারুন, তোরাও বিয়ে করে ফেল। বেশ empower মনে হয়, অন্যের কাছ থেকে strength ধার করা য়ায়। শুধু মাত্র আমার কথা নয়, Diane Ackerman তার লেখা The Brain on Love এ বলেছে- Loving relationship alter the brain most significantly. আরও বলেছেন যখন দুটো মানুষ Couple হয় – the brain extends idea- a happy marriage relieves stress, make one feel safe, this relationship change the brain. আবার এও বলেছেন- Love is the best school, but the tuition is high and the homework can be painful.

খুবই সত্যি কথা – “There is only one happiness in life: to love and be loved.”

রাতের বেলা মাঝে মধ্যেই messenger এ ফোন বেজে ওঠে, দূর দুরন্তের বিভিন্ন দেশের প্রান্ত থেকে সকলেই খোঁজ খবর নেয়, যারা হয়তো খুব একটা ফোন করেনি কখনো। সীমু ভালো আছিস তো? কাছের বন্ধুরা যেমন, সোমা, পপি, শ্রাবনী দি, ছন্দা দি, কবিতা দি, শিলা দি সবাই ফোন করে কুশল জানতে চায়। এক বন্ধু লিখেছে, বালাই ষাট। সকলেই শতবর্ষী হোক। হয়তো বিপর্যয় আরো আসবে পৃথিবীতে কালো প্রদীপ জালিয়ে। তবুও মানুষ জয় করবে, আবার ব্যথা ডুবে যাবে জীবনের গানে। এরই মাঝে আমরা খুঁজে যাবো জীবনের মানে। পারস্পরিক ক্ষমাই শুধু পড়ে আছে অচল সাঁকো হয়ে, আমাদের মাঝে। বুদ্ধ বলেছিলেন “মানুষ মরে গেলে তবুও মানব রয়ে যায়”। হয়তোবা সব শেষ হয়ে যাবে, তবুও আমাদের ভালবাসাটুকু শুধু রয়ে যাবে।

মন্দ না এখন শুধু দিনের ভাবনাতেই জীবন সীমিত। কারণ পরদিন সকাল আমার জন্য কি হবে তা কে জানে? পাখি কখন খাঁচা ছেড়ে পালাবে কে জানে? চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি – সত্যিই তো নিজেকেই চিনলাম না।

লেখক পরিচিতি : পেশাগত জীবনে শুভ্রা শিউলী সাহা একজন কৃষি অর্থনীতিবিদ, সংস্কৃতি কর্মী। টরন্টোর বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে দীর্ঘ দিন ধরেই জড়িত। জেন্ডার ও উন্নয়ন বিষয়ক গবেষনায় সম্পৃক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন জাতিসংঘের কর্মকান্ডে। তিনি প্রকৃতি প্রেমিক এবং কবিতা পড়তে ভালবাসেন। প্রবন্ধ, গল্প লেখা তার শখ