ফেলে আসা দিনগুলি মোর
[আমার অতীতের কিছু স্মৃতি]
সাইদুল হোসেন
সুদীর্ঘ জীবন পেয়েছি আমি। সুখে-দুঃখে, আনন্দে-বেদনায় কেটেছে জীবনটা আমার। সুযোগ পেয়েছি বহু কিছু দেখার, বহু কিছু শোনার। তিক্ত-মধুর সব অভিজ্ঞতায় পূর্ণ আমার জীবন। আমি সফল না বিফল ব্যক্তি সেই বিচারে যাচ্ছি না, আমি আমাকে সীমাবদ্ধ রাখবো আমার অভিজ্ঞতার চার দেয়ালের মাঝে একজন সচেতন ভুক্তভোগী এবং দর্শকের ভূমিকাতে। আসুন তাহলে শুরু করা যাক।
বর্তমানে আমি একজন ক্যানাডিয়ান সিটিজেন। এসেছিলাম এদেশে একজন ভিজিটর হিসাবে temporary visitor’s visa নিয়ে দুই ছেলের স্পনসরশীপে। ৩৪ বছর আগে, ১৯৯১ সনে। আছি, থাকবো, এদেশের মাটিতেই আমার কবর হবে, ক্যানাডাই আমার দেশ। ১৯৯৩ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে একবার বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। অতঃপর আর যাইনি কারণ সেখানে কোন পিছুটান নেই। স্ত্রী ও আমাদের দুই সন্তান আমরা সবাই ক্যানাডিয়ান সিটিজেন্স। কোন সম্পদও নেই সেখানে।
বয়স ৯২ বছর। জন্ম আমার সুদূর অতীতের বৃটিশ ইন্ডিয়ার তৎকালীন বেংগল প্রোভিন্সে ১৯৩৩ সনের মার্চ মাসে এক গ্রামে, নিকটবর্তী সাবডিভিশাল টাউন ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া থেকে প্রায় ২০ মাইল উত্তরে। তবে সেই গ্রামের কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল :
সেই অঞ্চলের জমিদাররা বাস করতেন আমাদের গ্রামে। সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত লোকালয় ছিল সেই গ্রাম। বৃটিশ ইন্ডিয়ার বেংগল প্রোভিন্সের সর্বপ্রথম মুসলিম ব্যারিষ্টার আবদুর রসুল সেই গ্রামেরই জমিদার পরিবারের সুযোগ্য সন্তান ছিলেন। তিনি তৎকালীন ক্যালকাটা (বর্তমানের কলিকাতা) শহরে আইনের (ল’) প্র্যাকটিস করতেন। তিনি লন্ডনের Middle Temple School (Oxford University) থেকে ১৮৯৮ সনে ব্যারিষ্টারি পাস করে Bar-at-Law degree অর্জন করেছিলেন। (মৃত্যু ১৯১৭ সনের ৩১ জুলাই। সেদিন তার বয়স হয়ছেলি ৪৩ বছর মাত্র। বড়ই র্মমান্তকি তার এই মৃত্যু । একমাত্র কান্যা নাজমার বিবাহ তারিখ ধার্য ছিল তিনদিন পর ৩রা আগস্ট শুক্রবার। তার মেয়ের বিয়ে দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য তার হয়নি। নাজমার বয়স ছিল তখন মাত্র ১৮ বছর।
১) তাঁর ছোট ভাই ছিলেন তৎকালীন একজন সরকারী সাব-রেজিষ্ট্রার। তাঁর নাম ছিল খাদেম রসুল।
২) সে গ্রামে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত ছেলেদের পড়ানোর উপযুক্ত একটা Middle English School ছিল যেখানে দূর-দূরান্তের বহু গ্রাম থেকে ছেলেরা বিদ্যালাভ করতে আসতো- গ্রীষ্মকালে পায়ে হেঁটে আর বর্ষায় নৌকায় চড়ে।

৩) একটা পোষ্ট অফিস ছিল; সেই এলাকার অতিগুরুত্বপূর্ণ সরকারী অফিস। এক পয়সা দিয়ে একটা পোষ্টকার্ড কিনে চিঠি লেখা যেতো। অশিক্ষিত লোকেরা একটা খালি পোষ্টকার্ড হাতে নিয়ে স্কুলের ছাত্রদের কাছে চিঠি লেখাতে আসতো। চিঠি লিখে দিলে খুব খুশী হতো ওরা। চিঠি লেখার একটা বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করি এখানে :
প্রতিটি চিঠি লেখা শেষ হলে এই বাক্যটি লেখা বাধ্যতামূলক ছিল – “শ্রেণীমত ছালাম ও দোয়া পৌঁছাইতে ভুলিবা না।”
এই কথাগুলো চিঠির প্রেরককে পড়ে শুনাতে হতো।
চিঠির উত্তর পাওয়াটা খুব জরুরী মনে করলে প্রেরক দু’পয়সা খরচ করে জোড়া লাগানো দু’টি পোষ্টকার্ড কিনতো, সেটাতে তার নাম ঠিকানা লিখে দিতো হতো। সেই জোড়ালাগানো পোষ্টকার্ডটার নাম ছিল “রিপ্লাইকার্ড।”
এনভেলাপের প্রচলনও ছিল কিন্তু সেটা কিনতে হলে খরচ করতে হতো এক আনা বা চার পয়সা। অনেক খরচ!
বিদেশ থেকে সেখানে চাকরিরত কেউ ১০ বা ১৫ টাকা গ্রামের কারো নামে মানি অর্ডার করলে সেটা পোষ্টম্যানের বাচনিক গ্রামে একটা আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াতো। সে যুগে একটিমাত্র টাকার ক্রয় ক্ষমতা (purchasing power) ছিল অবিশ্বাস্য রকম বেশী। দরিদ্র আত্মীয়স্বজন সেই ব্যক্তির কাছে ১টা অথবা ২টা টাকা ধার নেয়ার জন্য ছুটে যেতো।
৪) জনগণকে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং অষুধ দেয়ার জন্য ছিল একটা দাতব্য চিকিৎসালয় (charitable dispensary). একজন ডাক্তার ও দু’জন compounder সেখানে সপ্তাহে ছ’দিন উপস্থিত থাকতেন।
৫) তৎকালীন ইউনিয়ন বোর্ড ছিল সেই গ্রামে। সেটার চেয়ারম্যান এবং মেম্বাররা গ্রামের রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য বিষয়ে সরকারের উর্ধতন বিভাগগুলোর সংগে যোগাযোগ রেখে নানা ধরনের উন্নতির ব্যবস্থা করতো। নিকটবর্তী রেল স্টেশন ছিল ইটাখোলা, আখাউড়া-সিলেট লাইনে- দূরত্ব ছিল ৫-৬ মাইল। বর্তমানে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া থেকে গাড়ি চালিয়ে আমাদের গ্রামে যাওয়া-আসা করা যায় বলে শুনেছি।
৬) বড় একটা হাট বসতো প্রতি রবিবারে যেখানে দূরদূরান্তের গ্রামবাসীরা তাদের উৎপাদিত কৃষি এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি এনে বিক্রি করতো। মহা কোলাহলময় ছিল সেই সাপ্তাহিক হাটের দিনটা। আমরা অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করতাম সেই দিনটার জন্য।
৭) ২০ মাইল দূরবর্তী মহকুমা শহর ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াতে যাওয়া-আসা করার জন্য গ্রাম থেকে তিন মাইল দূরে তিতাস নদীর হরিণবেড় নদীবন্দর থেকে গ্রীষ্মে নৌকায় এবং বর্ষায় লঞ্চে চড়ে যাতায়াত করতো সেই অঞ্চলের জনগণ। সেই সব নৌকার নাম ছিল “গহনার নৌকা” বর্ষাকালে আমাদের গ্রামেও আসতো। ভাড়া ছিল যুগোপযোগী মূল্যের। গ্রামের ঘাটে গহনা নৌকার আগমণ টের পাওয়া যেতে ওদের বাজানো ঢাকের আওয়াজ শুনে।
৮) তিন মাইল দূরে হরিণবেড় থেকে নদী থেকে কেটে আনা একটা খাল এবং একটা সড়ক আমাদের গ্রামের সংগে যুক্ত ছিলো, এবং আরো পাঁচ মাইল উত্তরে তিতাস নদী-বন্দর ফান্দাউক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বর্ষাকালে সেই খালে লঞ্চ যাত্রী ও মালামাল বহন করতো ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত।
৯) গ্রামের জনগণ মুসলিম ও হিন্দু এই দুই ধর্মাবলম্বী ছিল তবে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল অধিক। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ে শিক্ষিতের হার ছিল বেশী। গ্রামে ধর্মীয় সম্প্রীতি বর্তমান ছিল। বিনা বাধায় আমরা মুসলিম জনগণ হিন্দুদের বছরব্যাপী নানা পূজা-পার্বণে দর্শক হিসাবে উপস্থিত থাকতে পারতাম, ওদের অনুষ্ঠানগুলোর আনন্দ উপভোগ করতাম। শীতকালে স্থানীয় বাজারের খোলা জায়গায় stage বেঁধে নবাব সিরাজুদ্দৌলা, মেবার পতন, শাহজাহান ইত্যাদি নাটকাভিনয় করতেন গ্রামের শিক্ষিত হিন্দু-মুসলিম যুবকেরা। বর্ষাকালে বেদেরা আসতো নৌকাভর্তি করে, পাড়ায়পাড়ায় সাপের খেলা দেখাতো। প্রতি বছর চৈত্র মাসে মেলা জমতো গ্রামে। গরু দৌড়ের প্রতিযোগিতা হতো হেমন্তে ফসল কাটার পর সেই ফসলকাটা মাঠে।
বর্ষাকালে নদীতে বিলের উন্মুক্ত পানিতে মহাউৎসাহে নৌকা দৌড় (নৌকা বাইচ) হতো শতশত গ্রাম্য দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য।
আমার জীবন (১৯৫৩ জুলাই পর্যন্ত)
১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত ১২টি বছর গ্রামেই কাটিয়েছি, গ্রামের স্কুল থেকে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছি। গ্রামের মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেব হুজুরের কাছে আরবী কায়দা পড়া শিখেছি, অযু করা, নামাজ পড়া শিখেছি। আমাদের গ্রামের বহু অতীতের তৈরী মসজিদটি ছিল ঐ অঞ্চলের একমাত্র পাকা দালানের মসজিদ যেখানে জুমার ও ঈদের দিনে প্রচুর মুসল্লীর সমাগম হতো। স্কুলে পড়াকালীন তৎকালীন প্রচলিত প্রথা অনুসারে বেতের বাড়ি খেয়েছি প্রচুর। এবং সেই সময়তেই ১৯৩৯-১৯৪৫ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খবর শুনেছি। আমাদের গ্রামের আকাশে বৃটিশ ও জাপানী এরোপ্লেইনের মাঝে মেশিনগান ছুড়ে আকাশ-যুদ্ধ দেখেছি।
গ্রামের স্কুলের পাঠ শেষ করে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া শহরে গিয়ে সেখানে আমার ফুফুর বাড়িতে থেকে হাইস্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করেছি। ১৯৪৭ সনের ১৪ই আগষ্ট বৃটিশ ইন্ডিয়াকে দু’ভাগ করে মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান সৃষ্টির সাক্ষী আমি। আমার বয়স তখন ১৪ বছর। বেংগল প্রোভিন্সকে দু’ভাগ করে পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা হলাম আমরা।
লড়কে লেংগে পাকিস্তান
১৯৪০-এ অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের কনফারেনসে ইন্ডিয়ার মুসলিমদের জন্য আলাদা একটা স্বাধীন রাষ্ট্র- পাকিস্তান- প্রতিষ্ঠার দাবী জানানো হয় তৎকালীন বৃটিশ শাসকদের প্রতি। সেই দাবী ক্রমাগত জোরদার হতে থাকে। ইন্ডিয়ান পোলিটিকসে তখন হিন্দু মেজরিটি কংগ্রেস পার্টিই ছিল শক্তিশালী। মহাত্মা গান্ধী, পন্ডিত জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল এঁরা নেতৃত্ব দিতেন। ছিলেন মওলানা আবুল কালাম আজাদ-ও।
অন্যদিকে মুসলিমদের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এলেন ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। দিল্লি-লাহোর-ক্যালকাটা ছিল রাজনৈতিক আন্দোলনের hot spots. ভাষা ব্যবহৃত হতো সচরাচর হিন্দি ও উর্দু। ইংলিশ তো ছিলোই।
আমরা সব দূর-দূরান্তে হিন্দি-উর্দু কথাগুলোই শুনতাম। যথা :- লড়কে লেংগে পাকিস্তান। হিন্দুস্থান হ্যায় হামারি ওয়াতান। মুসলিমরা ছিল দুর্বল- শিক্ষায়, ধনেমানে, অভিজ্ঞতায়। অর্থবল, অস্ত্রবল কোনটাই ছিলো না তাদের।
তাই হিন্দুরা ব্যাঙ্গঁ করে বলতো : আজাদী হাসিল করোগে কেয়সে? (স্বাধীন পাকিস্তান কিসের জোরে অর্জন করবে তোমরা?) আবার জবাবও ওরাই দিতো – হাথমে বিড়ি, মু’মে পান, লড়কে লেংগে পাকিস্তান? (অর্থাৎ হাতের বিড়ি এবং মুখ ভর্তি পান এই অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তান জিতে নেবে তোমরা?)
সেই যুগে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াতে তিনটা হাই স্কুল ছিলো। অন্নদা হাই স্কুল (ছাত্র ও শিক্ষক শতকরা প্রায় ৯৫ জন হিন্দু), এডোয়ার্ড হাই স্কুল (২৫-৩০% মুসলিম ছাত্র) এবং জর্জ হাই স্কুল (ছাত্ররা ৭০-৮০% মুসলিম, শিক্ষকগণ প্রায় ৮০-৮৫% হিন্দু) পরবর্তীতে নাম বদলে কলেজিয়েট হাই স্কুল করা হয়। আমি কলেজিয়েট হাই স্কুল থেকেই ১৯৫০ সনে ম্যাট্রিকুলেশন একজাম পাস করি দ্বিতীয় বিভাগে। অংকে আমি খুবই কাঁচা ছিলাম।
অন্নদা হাই স্কুলের আরো একটা বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে মেধাবী হিন্দু ছাত্ররা ওখানে পড়াশোনা করতো এবং ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ম্যাট্রিক ফাইনালে Merit List -এ প্রথম ২০ জনের মাঝে অন্ততঃ ৫ জন হলেও star marks পেয়ে scholarship পেতো। ৮০% এবং তদুর্ধ নাম্বার পেলে star marks বলা হতো। সম্মানের চোখে দেখতো জনগণ সেই সব ছাত্রদের।
১৯৪৮ সনে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি সেই কলেজ থেকে আই.কম. পাস করি ১৯৫৩ সনে। সেই বছর ঢাকা ইউনিভার্সিটির আই.কম. পরীক্ষার ফাইনালে উত্তীর্ণ ছাত্রদের প্রথম stand করা ১০ জনের মাঝে 10th position পায় আমাদের কলেজের ছাত্র আমার সহপাঠি মাখন মাঝি। অতি দরিদ্র পিতা-মাতার সন্তান। আমার position ছিল 13th.
আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল আলী আজহার সাহেবের আনন্দ তখন দেখে কে?
ক্ষণিকের জন্য রাজনীতি চর্চা
রাজনীতি আমাকে কোনদিনই আকর্ষণ করতে পারেনি, তথাপি ১৯৫২’র বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারিনি। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার রাস্তায় নেমে মিছিলে যোগ দিয়ে কিছু গরমগরম বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম। পড়েগেলাম পুলিশের কুনজরে। তারা আমাদের কলেজের প্রিন্সিপালের কাছে রিপোর্ট করে দিলো।
ইংরেজীতে আমি বরাবরই হাই মার্কস পেতাম। ইংরেজীটা পড়াতেন প্রিন্সিপাল সাহেব নিজে। তাই আমি তাঁর একজন স্নেহের পাত্র ছিলাম। পুলিশের রিপোর্ট পাওয়ার পর তিনি আমাকে তাঁর রুমে ডেকে নিয়ে সব খুলে বললেন। অবশেষে নির্দেশ দিলেন, “রাস্তঘাটে বক্তৃতা দিয়ে তোমার নেতা বনার দরকার নেই; আমি চাই না তুমি জেলে যাও। তুমি কিছুদিনের জন্য ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া শহর ছেড়ে দূরে কোথাও কোন গ্রামে গিয়ে গা ঢাকা দাও। কোন প্রকার রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়াবে না। পরিস্থিতি শান্ত হোক। ক্লাসে ফিরে এসো। তোমার অনুপস্থিতির (absence – এর) বিষয়টা আমি সামলে নেবো। তুমি পালাও, দেরী করো না।”
প্রিন্সিপাল সাহেবকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শহর থেকে কেটে পড়লাম। তিন মাস বাইরে কাটিয়ে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াতে ফিরে আসলাম। কলেজে গিয়ে প্রিন্সিপাল সাহেবের সংগে দেখা করলাম।
তিনি বললেন, “নিয়মিত ক্লাস করতে থাকো, এবং মিছিল-সমাবেশ থেকে দূরে থাকো। গুডলাক!”
প্রিন্সিপাল সাহেবের কাছে আমি কৃতজ্ঞ তাঁর সময়োচিত সাবধানবাণীর জন্য। আল্লাহ তাঁর আত্মার মংগল করুন।
সিনেমা প্রীতির দিনগুলি
সেই সময়ে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া শহরে দু’টি সিনেমা হল চালু ছিলো- রূপশ্রী এবং চিত্রালয়। বাংলা-হিন্দি-ইংরেজী মুভি সপ্তাহের প্রতি শুক্রবারে রিলিজ হতো। টিকেটের হার ছিলো :- ফোর্থ ক্লাস, তিন আনা; থার্ড ক্লাস, পাঁচ আনা; সেকেন্ড ক্লাস, আট আনা, এবং ফাস্ট ক্লাস ১ টাকা। (১৬ আনাতে ১ টাকা হতো।) হিন্দি ও ইংরেজী মুভির দারুণ ভক্ত বনে গেলাম বিশেষতঃ ফাইটিং পিকচারের। আর্থিক অনটন সত্বেও বহু কষ্টে তিন আনা পয়সা জোগাড় করতে পারলেই ফোর্থ ক্লাসের একটা টিকেট কিনে সিনেমা হলে ঢুকে পড়তাম।
হিন্দি সিনেমা সব আসতো ইন্ডিয়ার বোম্বে থেকে। (বর্তমান নাম Bollywood! ) এই হিন্দি সিনেমা দেখতে দেখতে এবং হিন্দি গান ও ডায়ালগ শুনতে শুনতে ক্রমে নিজের বিশেষ কোন চেষ্টা ছাড়াই হিন্দি ভাষাটা আয়ত্বে এসে গেল। আর উর্দু তো সেই একই ভাষা, শুধু লেখার বেলা আরবী-ফার্সী অক্ষরে লিখতে হয়।
ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া শহরে ইলেকট্রিক সাপ্লাই আসে ১৯৫০ সনে; এর আগে সিনেমা হলগুলো Dynamo’র সাহায্যে চলতো।
তৎকালীন ডাক্তার ও উকিলদের কথা
১৯৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া শহরে ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজ থেকে এম.বি. ডিগ্রিধারী ডাক্তার ছিলেন মাত্র দু’জন : ডঃ নন্দলাল চক্রবর্তী এবং ডঃ আবদুর রহীম। আমার চাচা ছিলেন ডঃ নন্দলালের একজন কম্পাউন্ডার।
১৯৪৬ সনে আমার এক ফুফাতো ভাইয়ের পেটের ভেতরে ফোঁড়ার চিকিৎসার জন্য ডা: নন্দলাল ও ডা: আবদুর রহীমের প্রেসক্রিপশন অনুসারে সদ্য আবিষ্কৃত Penicillin injection ক্যালকাটা থেকে special messenger পাঠিয়ে এনে push করা হয়। আমার ভাই ক্রমে আরোগ্য হয়ে উঠে। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া শহরে Penicillin injection -এর প্রয়োগ এই প্রথম।
ওরা ছিলেন graduate doctors, title ছিলো M.B. (Bachelor of Medicine).ওদের visit ছিলো ৪ টাকা (4 rupees per call). ওদের পরিচয় ছিল M.B. ডাক্তার।
কম বিদ্যার ডাক্তারদের বলা হতো L.M.F ডাক্তার অর্থাৎ Licentiate of the Medical Faculty. তাদের visit/fee ছিল ২ টাকা।
এই ২ টাকা ফি দিয়ে ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্যও বহু লোকের ছিল না। তারা অসুখে ভুগে কষ্ট পেতো অথবা স্থানীয় কবিরাজ বা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হতো সস্তা চিকিৎসার জন্য। সেই সময়ে শহরে এবং গ্রামে বহু লোক কবিরাজী এবং হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করতো। তাদের ফি নগদে না দিয়ে ক্ষেতের লাউ-কুমড়া, সদ্যধরা মাছ অথবা মুরগীর ডিম দিয়েও পরিশোধ করা যেতো।
আমার মনে পড়ে যে ১৯৫৫-১৯৬০ সনের কোন এক সময়ে (তবে আমার ভুলও হতে পারে) এক সরকারী সিদ্ধান্ত অনুসারে ঢাকা মেডিকেল কলেজে M.B বদলে M.B.B.S. (Bachelor of Medicine and Bachelor of Surgery) course চালু করা হয়। অতঃপর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে একটা short course করিয়ে সব L.M.F. ডাক্তারকে MBBS designation দেয়া হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত ক্রমেক্রমে পূর্ব পাকিস্তানে বাস্তবায়নও করা হয়। ১৯৬৪ সনে ঢাকার ই-পি-আই-ডি-সি হেড অফিসে এবং মিল-ফ্যাকটোরিতে কর্মরত সব LMF ডাক্তার এই প্রথায় MBBS ডাক্তার হয়ে যান। আমি জানি কারণ আমি সে সময়ে ই-পি-আই-ডি-সি’র হেড অফিসে অডিট অফিসার পদে কর্মরত ছিলাম।
উকালতি পেশাতেও পরিবর্তন আনা হয়। উকিল ফার্সী শব্দ যার ইংলিশ প্রতিশব্দ হলো Pleader (A lawyer who pleads for justice for his clients). ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করে Law Department এর নির্ধারিত পরীক্ষায় পাস করে BL (Bachelor of Law) degree অর্জন করতে হতো। বর্তমানে নাম বদলে সেটাকে করা হয়েছে LLB (Bachelor of Laws).
Law Department -এর নিম্নমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের title দেয়া হতো মোক্তার (Muktear) তাই কেউ করতো উচ্চ আদালতে উকালতি আর কেউ করতো নিম্ন আদালতে মোক্তারী। অতি পরিচিত উকিল-মোক্তার। বর্তমানে মোক্তার সার্টিফিকেট আর কাউকে দেয়া হয় না।
আমার ঢাকার জীবন (১৯৫৩ আগষ্ট থেকে)
আই.কম. পাস করার পর বি.কম. পড়া এবং একই সংগে চাকরি খোঁজার উদ্দেশ্যে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া ছেড়ে ঢাকা চলে গেলাম। আমার এক চাচা ছিলেন ঢাকার আলীয়া মাদ্রাসার ভাইস পিন্সিপাল। তিনি থাকতেন জিন্দাবাহার লেইনে সরকারের রিকুইজিশন করা বিরাট একটা বাড়িতে মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষকদের পরিচালিত এক মেসে। একটা খালি রুমে আমার থাকার ব্যবস্থা হলো, খাওয়া খরচের ভার চাচা গ্রহণ করলেন।
বি.কম.-এ ভর্তি হলাম সদর ঘাটের জগন্নাথ কলেজের নাইট শিফটে। রাতে কলেজে যাই, দিনের বেলা এখানেওখানে কাজ খুঁজি, দৈনিক পত্রিকাতে চাকরি খালি বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত পাঠাই। ১৯৫৪ সনে কপাল খুলে গেল, ইস্ট বেংগল সরকারের ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে এক কেরানীর কাজ পেয়ে গেলাম। মাসিক বেতন ১০৫ টাকা, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ৬ টাকা।
সস্তাগন্ডার দিন ছিল। মাসে ১০৫ টাকা তো অনেক টাকা। চাচার মেস ছেড়ে জগন্নাথ কলেজ পরিচালিত একটা স্টুডেন্টস্ হোস্টেলে গিয়ে উঠলাম কাজী আলাউদ্দীন রোডে। কিছু ছাত্র জুটে গেল সেই হোস্টেলে, নিয়মিত প্রাইভেট পড়াতে লাগলাম ওদের। মাথাপিছু মাসিক ২০ টাকা। মাসের শেষে অনেক টাকা হাতে আসতো। মন খুলে টাকা পাঠাতাম গ্রামের বাড়িতে, বাবা-মা দারুণ খুশী।
দিন কাটতে লাগলো। ততদিনে ঢাকার গুলিস্তান সিনেমা হল হয়েছে, গুলিস্তান নামে একটা মজাদার খাবারের রেস্টুরান্টও খুলেছে সেই বিল্ডিংয়ে। মনের আনন্দে চাকরি করি, খাইদাই আর গুলিস্তান হলে হিন্দি-উর্দু-বাংলা-ইংরেজী সিনেমা দেখি।
১৯৫৫ সনের আগষ্ট মাসে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে বি.কম. পাস করি। কিন্তু ঘটলো হরিষে বিষাদ। গলায় ক্যানসার হয়ে বাবা মারা গেলেন ১৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫। পেছনে রেখে গেলেন মাকে, সংগে ছোট দু’টি ভাই এবং দু’টি বোন। আমি পরিবারের প্রথম সন্তান। অতএব সব দায়িত্ব পড়লো আমার ঘাড়ে। চোখে দেখি অন্ধকার। কিন্তু আল্লাহ সাহায্য করলেন।
তৎকালীন পাকিস্তান ইন্ডাসট্রিয়েল ডেভেলাপমেন্ট কর্পোরেশন (পি.আই.ডি.সি) কর্তৃক আহুত এক কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় সফল হলে ওরা আমাকে ওদের রংপুর শুগার মিল্সে একাউন্টস ডিপার্টমেন্টে একটা চাকরিতে নিয়োগপত্র পাঠায়। বেতন ও ভাতা মিলে মাসিক আয় ৩১০ টাকা- ইস্ট পাকিস্তান সরকারের মাসিক বেতনের প্রায় তিন গুন। আমাকে আর পায় কে? আমি তো মহাখুশী যদিও খোঁজখবর নিয়ে জানলাম যে আমার কর্মস্থল হবে বগুড়া যাওয়ার পথে মহিমাগঞ্জ রেল স্টেশন (রংপুর) থেকে ১৫ মাইল অভ্যন্তরে এক পাড়াগাঁয়ে যেখানের বাসিন্দাদের অর্ধেকের বেশীই সাঁওতাল। সেখানে পি.আই.ডি.সি’র একটা Sugarcane Cultivation Farm আছে, বহু লোক কাজ করে। অতিরিক্ত সুবিধা হবে আমি ফ্রি ফ্যামিলী কোয়ার্টাস পাবো সেখানে।
সুতরাং সাহসে বুক বেঁধে আল্লাহর নাম ভরসা করে ১৯৫৬’র জুন মাসের ১৪ তারিখ রাতে রংপুর গামী ট্রেইনে চড়ে বসলাম ঢাকা স্টেশানে। সারাটি রাত ট্রেইনে কাটিয়ে পরদিন বাহাদুরাবাদ ঘাট- ফুলছড়ি ঘাট ফেরী পার হয়ে আবার ট্রেইনে চড়ে মহিমাগঞ্জ স্টেশানে নেমে রংপুর শুগার মিলসের অফিসে বৃষ্টিতে ভিজে ম্যানেজারের অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলাম। আমার দুরবস্থা দেখে উর্দুভাষী ম্যানেজার খুব সহানুভূতি জানালেন। বললেন, Youngman, this is life. Life is a struggle. Remember it.” আমার বয়স সেদিন মাত্র ২৩ বছর ৩ মাস।
অতঃপর একটা গরুর গাড়িতে চড়ে সেই অঝোর বাদল মাথায় নিয়ে গ্রামের ভাংগা রাস্তায় আটটি ঘন্টা ঝাঁকি খেতেখেতে আমার গন্তব্যস্থল সাহেবগঞ্জে গিয়ে পৌঁছলাম। Farm Superintendent -এর কাছে গিয়ে জয়েনিং রিপোর্ট দিলাম। সেদিন তারিখ ছিল ১৫ই জুন, ১৯৫৬। গায়ের শার্ট-প্যান্ট বৃষ্টির পানিতে ভিজে সপসপ করছে।
তিনি বললেন, “ওয়েলকাম! আপনার আসার খবর আমি পেয়েছি। আগামীকাল কথাবার্তা হবে। এখন আপনার জন্য রেডি করা বাসায় যান। দারোয়ান আপনাকে সেখানে নিয়ে যাবে, ঘরের চাবিও হাতে পাবেন। ভেজা কাপড়চোপড় খুলে গোসলটা দ্রুত করে নিন। টিউবওয়েলের পানিতে গোসল করতে পারেন, কেউ একজন সাহায্য করবে অথবা সাঁতার জানা থাকলে বাসার সামনের পুকুরে ডুব দিয়েও কাজটা সেরে নিতে পারেন। ব্যাচেলার কোয়ার্টারসের মেসে আপনার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা আছে। রান্না-বান্না করতে হবে না।”
আসসালাম আলাইকুম জানিয়ে বিদায় নিলাম। দারোয়ান পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো। যেতেযেতে লক্ষ্য করলাম যে বিরাট এক জলেভরা পুকুরের চার পাড়ে বাড়িঘর। এক পাড়ে অফিস, অন্য তিন পাড়ে ফ্যামিলি কোয়ার্টারস, ব্যাচেলার কোয়ার্টারস। তারই একটাতে দরজা খুলে দারোয়ান আমাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে অফিসে ফিরে গেল।
ধপ করে ভেজা কাপড়চোপড় সহ-ই পাতা বিছানাতে শুয়ে পড়লাম। মড়ার মত পড়ে রইলাম কিছুক্ষণ। দু’চোখে কান্না। একি অজপাড়াগায়ে ভাগ্য আমার ঠেশে দিলো জীবিকার সন্ধানে? আজীবন শহরের সভ্য সমাজে বাস করে অবশেষে জংগলে ভর্তি সভ্যতার আলোবিহীন অশিক্ষিত সাঁওতালদের মাঝে বাস করতে হবে? হায়রে মোর কপাল!
মনে পড়ে গেল টিভিতে দেখা-শোনা ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া রংপুরের সেই ভাওয়াইয়া গানের প্রথম কলিটা – ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে।
সাইদুল হোসেন
জুন ১৯, ২০২৫
মিসিসাগা, কানাডা
