বাংলাদেশ থেকে নারী পাচার, শোষণ ও ধর্ষণের দায়ে সাসকাচোয়ানের ২ বাংলাদেশি-কানাডিয়ানের কারাদণ্ড
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ : সাসকাচুয়ানে দুই বাংলাদেশি- কানাডিয়ান মোহাম্মদ মাসুম (৪৫) এবং সোহেল হায়দারের হাতে পাচার ও শোষণের শিকার এক বাংলাদেশি নারী জানান, তিনি এখন সবসময় ভয়ে থাকেন এবং কাউকে বিশ্বাস করতে হিমশিম খান। এই নারী বারবার ধর্ষণেরও শিকার হয়েছিলেন মোহাম্মদ মাসুম কর্তৃক। খবর সিবিসি নিউজের।
ঐ নারী আরও বলেন, “আমি তাদের ভুলতে পারি না। তারা আমার স্বপ্ন থামিয়ে দিয়েছে। তারা আমার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা আমার সম্মান, আমার ভবিষ্যৎ, আমার পরিবার ও আমার ক্যারিয়ার—সবকিছুই নষ্ট করে দিয়েছে,” ভুক্তভোগী হিসেবে দেওয়া নিজের জবানবন্দিতে ওই নারী এই কথা লিখেছেন।

মোহাম্মদ মাসুম (৪৫) এবং সোহেল হায়দার (৫৬)-কে চলতি বছরের শুরুর দিকে মানব পাচারের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। গত ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার আদালতে তাঁদের বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণার সময় তাঁরা সাসকাটুন প্রাদেশিক আদালতে হাজির ছিলেন।
মাসুমকে যৌন নিপীড়নের তিনটি ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে—যেসব কর্মকাণ্ডকে বিচারক ‘সাধারণ মানুষের বোধগম্য সহজ ও স্পষ্ট ভাষায়’ ধর্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গত ২২ অক্টোবর সাসকাচোয়ানের প্রাদেশিক আদালতে বিচারক মিগেল মার্টিনেজ তাঁর রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মাসুমকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং হায়দারের সাজা হয় ৪ বছরের।
যদিও ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবুও তিনি ভুক্তভোগী হিসেবে দেওয়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশে তাঁর নিজ এলাকায় প্রচলিত গুজব তাঁর পরিবারের সম্মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তাঁর ভাইবোনদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিয়েছে।
নারীটি জানান যে, আগে তিনি স্বাধীন ও স্বাবলম্বী ছিলেন, কিন্তু এখন টিকে থাকার জন্য তাকে অন্যদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে—যা তার জন্য বেশ কষ্টদায়ক। তিনি কানাডায় আসার সিদ্ধান্তটি নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন; কারণ এখানে তার মনে হয়েছে, যেন তাকে কোনো ক্রেতার কাছে বিক্রির জন্য রাখা একটি পণ্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
গত আগস্ট মাসে সাসকাচোয়ানের প্রাদেশিক আদালতে বিচারক মিগেল মার্টিনেজ তাঁর রায় ঘোষণার পর মোহাম্মদ মাসুম ও সোহেল হায়দারকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।
বিচারক মার্টিনেজ তখন বলেন, “অভিযুক্ত দুজনই নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য মহিলাটির অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছে।”
মাসুম এবং সোহেল দুজনেই ঐ মহিলার নিয়োগকর্তা হিসেবে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেছিল। তাছাড়া মহিলার ভয় ছিল হয়তো তাকে কানাডা ছেড়ে চলে যেতে হতে পারে। আর এই ভয়কে কাজে লাগিয়েছিল মাসুম ও সোহেল। মূলত, তারা মহিলার কাজের অনুমতিপত্র আটকে রাখা বা বাতিল করে দেওয়া, কিংবা কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার হুমকি দিয়ে এটি করেছিল।
বিচারক মার্টিনেজ বলেন, মাসুম আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে মহিলাটির পাসপোর্ট নিয়ে নেয় এবং “যতক্ষণ না সে তার সাথে যৌনমিলনে রাজি হয়” ততক্ষণ সেই পাসপোর্ট তার কাছে আটকে রাখে।
মার্টিনেজ বলেছেন, ওই মহিলা ২০২২ সালের আগস্টে আপাতদৃষ্টিতে স্বল্পকালীন ছুটির জন্য বাংলাদেশ থেকে টরন্টোতে এসেছিলেন, কিন্তু তার ‘আসল উদ্দেশ্য’ ছিল কানাডায় থেকে যাওয়ার একটি উপায় খুঁজে বের করা।
মহিলা এক পর্যায়ে জানতে পারেন যে, অস্থায়ী বিদেশী কর্মী হিসেবে চাকরি পেলে তিনি তার থাকার মেয়াদ বাড়াতে পারবেন এবং অবশেষে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে সাসকাচুয়ানে আসেন সোহেল হায়দারের পরিচালিত একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করার জন্য।
কিন্তু সোহেলের কাছে তখন ঐ মহিলাকে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি অনুমোদন ছিল না। তারপরও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং বলা হয় যে, তার শ্রমের বিনিময়ে সোহেল তাকে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন এবং প্রতি মাসে ১,০০০ ডলার পারিশ্রমিক দেবেন।
মার্টিনেজ বলেছেন, মহিলা সপ্তাহে ছয় দিন দীর্ঘ সময় কাজ করতেন রেস্তোরাঁয়, কিন্তু সোহেল তাকে কখনো পারিশ্রমিক দেননি।
বিশ্বাসভঙ্গ হয়েছে, ক্রাউনের যুক্তি
কানাডায় মানব পাচারের অপরাধে কমপক্ষে চার বছরের কারাদণ্ড বাধ্যতামূলক।
সরকারি কৌঁসুলি লেসলি ডানিং আদালতে যুক্তি উত্থাপন করেন এই বলে যে, মাসুমের অপরাধগুলোর—যার মধ্যে একটি মানব পাচারের ঘটনা এবং তিনটি যৌন নিপীড়নের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত। আর এর জন্য মোট ১৫ বছরের কারাদণ্ড হওয়া উচিত তার। অন্যদিকে মানব পাচারের অপরাধে হায়দারের সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি কৌঁসুলি ডানিং যুক্তি দেখান যে, অপরাধী দুজনই ওই নারীর ওপর বিশ্বাস ও কর্তৃত্বের অবস্থানে ছিলেন এবং সাসকাচুয়ানে আসার পর তার জীবনের “প্রায় প্রতিটি দিক” নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে তারা সেই বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছেন।
ডানিং যুক্তি দেখান যে, মাসুম ওই নারীকে “নিজের যৌন তৃপ্তির জন্য” ব্যবহার করেছেন এবং ধারাবাহিক যৌন নিপীড়ন চালিয়েছেন, যার মধ্যে শারীরিক সহিংসতার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে মাসুমের আইনজীবী জ্যাচারি কার্টার সাত থেকে নয় বছরের কারাদণ্ডের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন; তিনি উল্লেখ করেন যে, এটি একটি “যথেষ্ট” বড় সাজা।
অন্যদিকে হায়দারের আইনজীবী ক্রিস গ্র্যাটন চার বছরের বাধ্যতামূলক ন্যূনতম সাজার পক্ষে যুক্তি দেন। তিনি বলেন, এমন কোনো গুরুতর পরিস্থিতি বা উপাদান (aggravating factors) এখানে নেই, যা সাজাকে এই ন্যূনতম মেয়াদের চেয়ে আরও বাড়ানোর যৌক্তিক কারণ হতে পারে—অথচ এই চার বছরের সাজা নিজেও যথেষ্ট বড় একটি শাস্তি।
ক্ষতিপূরণের আদেশ
বিচারক মিগেল মার্টিনেজ গত ২২ অক্টোবর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে তাঁর দণ্ডাদেশ প্রদান করেন। তিনি গ্র্যাটনের সঙ্গে একমত হন যে, হায়দারের চার বছরের বাধ্যতামূলক ন্যূনতম সাজা ভোগ করা উচিত।
অন্যদিকে মাসুমের ক্ষেত্রে বিচারক মোট ১৪ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন।
বিচারক উভয় ব্যক্তিকে ভুক্তভোগীর পাওনা মজুরি পরিশোধ করারও নির্দেশ দিয়েছেন। হায়দারকে ৫,৮৮৫.১৬ ডলার এবং মাসুমকে ১২,২৬৮ ডলার পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
