যুক্তরাষ্ট্রে কানাডীয়দের গ্রেপ্তার ও আটকের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, ০৯ অক্টোবর, ২০২৬ : গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা জানিয়েছে যে, গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে কানাডীয় নাগরিকদের গ্রেপ্তার ও আটকের ঘটনা তার আগের বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। খবর দি কানাডিয়ান প্রেস এর।
“অনেক কানাডীয় নাগরিকই এই ব্যাপক ধরপাকড়ের জালে আটকা পড়েছেন,” বলেছেন লেন সন্ডার্স, যিনি ভ্যাঙ্কুভারের ঠিক দক্ষিণে ওয়াশিংটনের ব্লেইন শহরে অবস্থিত একজন অভিবাসন আইনজীবী।
“এরা এমন মানুষ নন যারা কানাডায় থাকেন আর কেনাকাটা করতে এখানে আসেন। এরা আমার মতোই মানুষ—যারা এখানেই থাকেন, এখানেই কাজ করেন এবং যাদের গ্রিন কার্ড আছে; আর তারা এখন নিজেদের মর্যাদা বা আইনি অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন।”
‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’ বৃহস্পতিবার কনস্যুলার সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৫৭৭ জন কানাডীয় নাগরিক গ্রেপ্তার বা আটক হয়েছেন; আগের বছর এই সংখ্যাটি ছিল ৩৬১।
একই সময়ে, কানাডীয়দের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সংখ্যা ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে—২০২৪-২৫ অর্থবছরের ২৬.৮ মিলিয়ন সফর থেকে কমে তা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২০ মিলিয়নে নেমে এসেছে।
গ্রেপ্তার ও আটকের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ কী, তা প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন-সংক্রান্ত ধরপাকড় জোরদার করেন।
তখন থেকেই কানাডীয়রা মার্কিন সীমান্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন; এমনকি ছোটখাটো অপরাধের কারণে কানাডীয় নাগরিকদের মার্কিন অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে আটক হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
অভিবাসন আইনজীবী সন্ডার্স জানান, তাঁর মক্কেলদের অধিকাংশই কানাডীয় এবং নির্বাসনের মুখে থাকা ব্যক্তিদের অনেকেই কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। তিনি আরও বলেন, তাঁর কিছু মক্কেল আমেরিকানদের বিয়ে করেছেন অথবা তাঁদের আমেরিকান সন্তান রয়েছে; আবার কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের পেনশনও পেয়ে থাকেন।
সন্ডার্স বলেন, তিনি যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করতেন যে তারা আইনত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন—যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE)-এর এজেন্টরা তাদের কাছে আসেন। অন্যরা ভ্যাঙ্কুভার বা অন্টারিও’র উইন্ডসরে একদিনের জন্য এসেছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের আলাদা করে থামানো হয়েছিল।
সন্ডার্স বলেছেন, তার ধারণা—ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ স্বল্প-বেতনভোগী কর্মীদের লক্ষ্য করে চালানো অভিযান থেকে সরে এসে এখন ভোটার তালিকা ও ডেটাবেস ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে, যাতে এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায় যাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করা সম্ভব।
তিনি বলেন, মারামারি, মাদক রাখা বা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর মতো অপরাধের জন্য কয়েক দশক আগে পাওয়া সাজার কারণে অনেক কানাডীয় দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়ার মুখে পড়তে পারেন। আবার অনেকে অস্থায়ী ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও—কখনও কখনও কয়েক দশক ধরে—দেশটিতে থেকে গেছেন।
সন্ডার্স বলেন, “আগে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এসব মানুষের বিষয়ে চোখ বন্ধ করে থাকত—যতক্ষণ না বিষয়টি তাদের নজরে আসত। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে যে, আইসিই (ICE) গিয়ে এসব মানুষকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে; অথচ তাদের মধ্যে কেউ কেউ কয়েক দশক ধরে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে এই দেশে বসবাস করছেন।”
সন্ডার্সের ভাষ্যমতে, তাঁর অনেক মক্কেল যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে ভোট দিয়েছেন; বিশেষ করে ওয়াশিংটনের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে, যেখানে ভোটাররা নিজেরাই নিজেদের যোগ্যতার বিষয়ে ঘোষণা দিতে পারেন।
তিনি বলেন, “অনেক কানাডীয়ই সরলবিশ্বাসী এবং তারা বোঝে না যে, স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে তারা আসলে যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দিতে পারে না। গত দুই সপ্তাহে আমার সাথে কানাডার ছয়জন নাগরিক যোগাযোগ করেছেন, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে ভোট দেওয়ার কারণে নির্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে “
উল্লেখ্য যে, গত ৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’ জানিয়েছে যে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ১,৯৮১ জন কানাডীয় নাগরিক গ্রেপ্তার বা আটক হয়েছেন—যা আগের বছরের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশ বেশি এবং দুই বছর আগের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।
গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স আরও জানায়, থাইল্যান্ডে কানাডীয় নাগরিকদের গ্রেপ্তারের সংখ্যা তিন গুণ বেড়েছে। প্রতিবেদনে এই বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডা ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত তিন বছরে শিশু ও পরিবার-সংক্রান্ত কনস্যুলার মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে ৮০৪টি মামলায় সন্তানের হেফাজত নিয়ে বিরোধ, জোরপূর্বক বিয়ে বা সারোগেসির মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব মামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতাই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সারোগেসি (Surrogacy) হলো এমন একটি আধুনিক প্রজনন ব্যবস্থা বা চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে একজন নারী অন্য কোনো দম্পতির বা ব্যক্তির সন্তান নিজের গর্ভে ধারণ করেন এবং প্রসব করেন। সন্তান প্রসবের পর শিশুটিকে তার হবু বাবা-মায়ের কাছে আইনগতভাবে হস্তান্তর করা হয়।
