যে ঋণ পরিশোধ করা গেল না

সাইদুল হোসেন

মনে পড়ছে ১৯৯১ সনের ২১ মার্চ তারিখটার কথা যেদিন আমরা স্বামীস্ত্রী দু’জন ঢাকা থেকে Visitor’s Visa নিয়ে সর্বপ্রথম ক্যানাডার পিয়ারসন এয়ারপোর্টে (টরন্টো এয়ারপোর্টে) নেমে এদেশের মাটি স্পর্শ করেছিলাম। সে আজ ৩৪ বছরেরও আগের কথা।

কিন্তু একটা কথা স্পষ্ট মনে পড়ছে যে আমাদের সংগের লাগেজ ক্যারি করে Arrival Lounge -এর বাইরে যাওয়ার জন্য Trolly নিতে Canadian one dollar coin (Loony) আমাদের হাতে ছিল না।

ছেলেরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু ওদের কাছে তো পৌঁছা যাচ্ছে না যে একটা Loony চেয়ে আনবো। মহা সমস্যা।

পিয়ারসন এয়ারপোর্টে ট্রলি। ছবি : টরন্টো টেক্সি লিমো

Trolly ভর্তি লাগেজ নিয়ে মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছি। চোখে অসহায়ের দৃষ্টি।

এমনি সময়ে Black এক Porter এগিয়ে এলো। জানতে চাইলো, ” Need any help?”

বললাম ওকে আমাদের সমস্যার কথাটা। শুনে বললো, No problem. Here is the Loony. Get going. Goodluck!!”

Thank you জানিয়ে ওর দেয়া dollar coin -টা হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “But how to pay you back? ”

কালো মুখের সবগুলো সাদা দাঁত বের করে হেসে দিয়ে বললো, “No pay back. Pray for me. OK?”

তারপর আমাদের Trolly -টাকে Gate – এর দিকে ঠেলে দিয়ে বললো, ” Welcome to Canada!”

পুরান ঢাকার মহল্লার কুট্টি সর্দারের ভাষণ

বহু অতীতের গল্প। ১৯৫৪ সন।

ঢাকা শহর। সেখানে আমার প্রথম পদার্পণ ঘটে ১৯৫৩ সনে। উদ্দেশ্য : কলেজে বি.কম. পড়া ও তৎসংগে জীবনধারণের জন্য চাকরি খোঁজা। বসবাস পুরান ঢাকার চক বাজার অঞ্চলের বেচারাম দেউড়িতে। আদি অধিবাসী কুট্টিদের মহল্লায়। “আমি হালায়”, “তুমি হালায়”, “বাপ হালায়” ইত্যাদি স্থানীয় ভাষার সংগে পরিচয় ঘটতে থাকে ক্রমশঃ। তখন পুরান ঢাকা শহরের মহল্লাগুলো স্থানীয় সর্দার সা’বগো কথায় উঠাবসা করতো। সর্দার সা’ব “হ্যাঁ” বললে “হ্যাঁ”, তিনি “না” বললে “না”।

সেই যুগের কথা বলছি।

সর্দার সা’বের উপস্থিতিতে মহল্লার একটা Ping Pong Game Competition -এর সমাপ্তিতে স্থানীয় Sports Committee’র President মহল্লার সর্দারকে সেই উপলক্ষে একটা ভাষণ দিতে বিনীত অনুরোধ জানালো। সর্দার সেই অনুরোধ গ্রহণ করে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বললেন :

“আমার নজরের সামনে অত বড় জমায়েত দেইখ্যা আমার দিল্ডা হালায় খোশ হয়া গেছেগা। লেকিন হালায় এই খেলাডার আমি কিছুই বুঝলাম না। তয় একটা কথা হালায় আমার কইতেই অইবো।”

“আমি সাবাসী দেই না (প্রশংসা করি না) হেই হালারে যে হালায় খেলায় জিতচে, আমি বদনামী করি না হেই হালার যে হালায় হারচে। লেকিন সাবাসী দেই (প্রশংসা করি) আমি হেই হালারে যে হালায় ঐ আন্ডাডারে (সাদা পিং পং বলটাকে) বানাইচে। ওরা দুইজনে মিইলা ওঠারে কত পিটন পিটাইলো মগর হালায় ঐ আন্ডাডারে ভাংগবার পারলো না।”

অবাক মৃত্যু!

১৯৭২ সন থেকে ক্যানাডানিবাসী স্বামীস্ত্রী দু’জন। আমাদের অতি নিকটাত্মীয় ছিলো ওরা, বর্তমানে মৃত। আমরা স্বামীস্ত্রী দু’জন ক্যানাডায় আছি ১৯৯১ সন থেকে। অহরহ যাওয়া-আসা ছিল আমাদের মাঝে। ওদেরই মৃত্যু নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করছি।

বহুদিন লিউকেমিয়াতে ভুগে কষ্টের জীবন কাটিয়ে স্বামী কামাল ও দুই কন্যাকে দুনিয়াতে রেখে মৃত্যুবরণ করে হামিদা ১২ই জানুয়ারী ২০১২ সন।

ওদের ছিলো ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এম.এ. ক্লাস থেকেই প্রেমের বন্ধন, তারপর বিয়ে মা-বাবার সম্মতি নিয়ে। ওদের দু’জনেরই জন্ম মাস ছিলো আগষ্ট, তারিখ ভিন্নভিন্ন। বয়সে ওরা এক বছরের ছোট বড় ছিলো। নিজেদের বাড়িতেই বাস করতো ওরা ব্রাম্পটনে। সুখী পরিবার।

হামিদার মৃত্যুতে গভীর শোক নেমে এলো কামালের জীবনে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে হামিদার লাশবহনকারী খাটিয়াটা চেপে ধরে কামাল বলে উঠলো, Hamida, wait for me for just three years only. I’ll meet you there again.”

এবং অতি আশ্চর্য্যরে ব্যাপার ঘটলো ঠিক তিনটি বছর পরই। ২০১৫ সনের জানুয়ারী মাসের ১৬ তারিখ সকালে হঠাৎ হার্টফেইল করে মারা গেলো কামাল ওর ভবিষ্যদ্বাণীকে সফল করে দিয়ে।

ওদের জন্ম মাস এক, মৃত্যু মাসও এক! এবং ভবিষ্যদ্বাণীও ঠিকঠিক ফলে গেলো। আশ্চর্যের বিষয় নয়কি!

তালাশ

তালাশ। অনুসন্ধান। খোঁজাখুঁজি। Search. ভিন্ন শব্দ, ভিন্ন প্রকাশভংগী, কিন্তু বিষয়টা মূলতঃ এক- কোন একটা নির্দিষ্ট বস্তুর প্রাপ্তি অথবা দর্শন লাভের জন্য নিরন্তর প্রয়াস। সাধনাও বলা যেতে পারে।

Bollywood Hindi movie Life in a Metro –তে একজন অভিনেতার মুখে এই কথাটা শুনেছিলাম-

তালাশ কভি খতম নেহী হোতি

লেকিন ওয়াক্ত খতম হো যাতা হ্যায়।

(তালাশ কখনো শেষ হয় না কিন্তু সময় যায় ফুরিয়ে।)

অতি খাঁটি কথা। বড়ই মূল্যবান বক্তব্য। লাখ কথার এক কথা। কারণ তালাশটা চিরন্তন, কারো জীবনকালের দৈর্ঘ্য দ্বারা সে সীমাবদ্ধ নয়। Search is eternal.

এজগতের সব মানুষই একটা না একটা কিছুর তালাশে (খোঁজে) জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছে। তাদের তালাশের বস্তু ভিন্ন ভিন্ন কারণ নারী অথবা পুরুষ তাদের প্রত্যেকেরই চাহিদার বস্তুটি তার নিজস্ব প্রয়োজন বা রুচি অনুসারে হয়ে থাকে।

–             কেউ খোঁজে ধন-সম্পদ-ক্ষমতা-দাপট;

–             কেউ খোঁজে রূপবতী নারী অথবা গুণবতী

সোহাগিনী স্ত্রী। নারী খোঁজে নির্ভরযোগ্য স্বামী;

–             কেউ খোঁজে নিঃস্বার্থ প্রেম-ভালোবাসা;

–             কেউ খোঁজে আনন্দ (যার মাধ্যম হতে পারে সুরা-

নারী-নৃত্য-সংগীত);

–             কেউ করে সাহিত্য চর্চা, চায় প্রতিষ্ঠা ও সুনাম;

–             কেউবা আধ্যাত্ম্যবাদী হয়ে খোঁজে স্রষ্টাকে;

–             কেউ খোঁজে বেড়ায় শান্তি অথবা সত্যকে;

–             বিজ্ঞানের নানা শাখায় গবেষণায় মত্ত থাকেন

বৈজ্ঞানিক, খোঁজেন নানা প্রশ্নের উত্তর অথবা

নানা সমস্যার সমাধান;

–             কেউ করে নাচে-গানে উৎকর্ষ লাভের সাধনা;

–             কেউ খোঁজে বাধা-বন্ধনহীন নিরবচ্ছিন্ন সুখ;

–             কেউ খোঁজে নেতৃত্ব; দেশ গড়ার সুযোগ;

–             কেউ খোঁজে তার পেশায় অথবা শিল্প-বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠা;

–             কেউ খোঁজে প্রতিযোগিতায় উত্তম সাফল্য;

–             কেউ চায় সঞ্চয়ী হতে;

–             চতুর চরিত্রের অধিকারীরা সদাই খোঁজে বিনা অথবা অল্প

আয়াসে দ্রুত আখের গোছানোর সহজ পন্থা, চোরা গলি, shortcut pat ;

–             কেউ ছোটে আদর্শবাদের/ Perfection -এর পেছনে-  আদর্শ

শিক্ষক, আদর্শ পিতা, আদর্শ মাতা, আদর্শ নাগরিক ইত্যাদি;

–             আবার চাওয়া-পাওয়ার বস্তুটি উপরে বর্ণিত বিষয়গুলোর বাইরেও

হতে পারে কারণ সেটা ব্যক্তিটির মনোজগতের অন্তর্গত।

এই জগতে পাওয়ার অথবা জানার যোগ্য বন্তু অসংখ্য, সীমাহীন। মানুষের আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন। প্রশংসনীয় উচ্চতার কোন গন্তব্যেই হুট করে পৌঁছে যাওয়া যায় না- কারণ সর্বক্ষেত্রেই লক্ষ্যে পোঁছার জন্য আয়াস বা প্রচেষ্টার প্রয়োজন যার জন্য লাগে প্রচুর সময়, ধৈর্য ও মেধা। তাকে হতে হয় একজন আশাবাদী চরিত্রের অধিকারী এবং পরিশ্রমী। অলস ও নিরাশাবাদীরা সচরাচরই জীবন যুদ্ধে হেরে যায় কারণ তারা মাঝপথে হাল ছেড়ে দেয়। ঘটে তালাশের সমাপ্তি।

ব্যক্তিটির মানসিক গঠন, পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা, পারিবারিক/সামাজিক অবস্থান (Status), শিক্ষার মান, স্বাস্থ্য, সুযোগ-সুবিধার (resources -এর) সহজলভ্যতা ইত্যাদি তাকে তার অভীষ্ট অর্জনে প্রভূতভাবে সাহায্য করে। ফলে একজনের জন্য যা অতি সহজলভ্য, অন্যজনের ক্ষেত্রে তা হতে পারে নাগালের বাইরে। সুতরাং তাকে লক্ষ্য অর্জনের উচ্চতাটা তার সাধ্যের সীমানার নীচেই নির্ধারণ করতে হবে, তাকে বাস্তববাদী হতে হবে।

অন্যদিকে প্রতিটি মানুষের চেহারা যেমন আলাদা আলাদা, তেমনি তাদের মানসিক গঠনও আলাদা। তাদের রুচি আলাদা, পছন্দ আলাদা, তাদের জীবনের প্রত্যাশা বা aim ও ভিন্ন ভিন্ন। চরিত্রগতভাবেই একজনের কর্মসম্পাদন পদ্ধতি অন্যের চেয়ে আলাদা কারণ তাদের I.Q.  তাদের level of intelligence তাদের কাজের (performance -এর) গুণগত মান (quality) নির্ধারণ করে থাকে।

কিন্তু উপরোক্ত সব বর্ণনা বা বিশ্লেষণই এক জায়গায় এসে অকেজো হয়ে যায়, তালাশ যায় থেমে। আর সেটা হলো সময়, time , ওয়াক্ত। অর্থাৎ সময় ফুরিয়ে গেলে, মৃত্যুর ডাক এসে উপস্থিত হলে সর্বকর্ম অসমাপ্ত রেখে সেই ডাকে সাড়া দিতে হয়, এর কোনই বিকল্প নেই। অথচ সেই ডাকটা যে কখন আসবে, কোন বয়সে আসবে তা কেউ জানে না একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া। তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন এজগতের সবকিছু। মানুষ সেখানে সম্পূর্ণ অসহায়।

তাই তালাশের গতিটা বাড়াতে হবে, যথাসাধ্য দ্রুত কর্তব্যটা সম্পাদনের, লক্ষ্যে পৌঁছার চেষ্টা করতে হবে যাতে সময় ফুরিয়ে যাবার আগেই পূর্ণরূপে না হলেও অন্ত—তঃ তালাশের কিছুটা সাফল্যের আনন্দটা উপভোগ করে আংশিক তৃপ্তি নিয়ে হলেও পরপারে পাড়ি জমানো যায়। হতাশা নিয়ে নয়।

সাইদুল হোসেন

মিসিসাগা, ক্যানাডা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *