কানাডার নির্বাচন নিয়ে কিছু আলোচনা
নজরুল ইসলাম
বিশ্বের প্রথম সারির গণতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যে কানাডা একটি। এ দেশের গণতান্ত্রিক নিয়ম কানুন দেখলে মনে হয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির- যাদের গণতন্ত্র প্রাথমিক পর্যায়ে, স্বৈরাচারী সরকার বা মৌলিক গণতন্ত্র নাম দিয়ে দেশ শাসন করে; তাদের উচিত এ সব দেশ থেকে গণতন্ত্রের দীক্ষা নিয়ে নিজেদের দেশে কাজে লাগানো ।
কানাডার প্রদেশ ও অঞ্চল গুলিতে নিজস্ব আইন কানুন (স্বায়ত্তশাসন) অনুযায়ী চলে; যেমন কুইবেক( ফ্রেঞ্চ স্পিকিং) নিজেদের আলাদা জাতি হিসাবে দাবি করে। ১৯৮০ এবং ১৯৯৫ (দুই বার ) ক্যুবেক আলাদা হওয়ার জন্য গণভোট (রেফারেন্ডাম) দিয়ে কানাডা থেকে আলাদা হতে চেয়েছিলো ; ব্লক কুইবেকুয়া (বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ) কেন্দ্রীয় সরকারে যোগদান করলেও ওরা নিজেদের স্বতন্ত্র জাতি হিসাবে দেখে। এ দেশ সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে চলে ; এ দেশের সরকার এবং রাজনীতিবিদ জনগণের মতামতের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
একটা প্রত্যক্ষ উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে : বেশকয়েক বছর আগে কানাডার অ্যালবার্টার প্রিমিয়ার(মুখ্যমন্ত্রী) জেসন কেনি তাঁর জনসমর্থন যাচাই করতে গিয়ে ইউসিপি সদস্যদের কাছ থেকে তার নেতৃত্বের ৫১.৪ শতাংশ অনুমোদন পাওয়ার পর ও ইউনাইটেড কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হিসাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন । অ্যালবার্টা (মুখ্যমন্ত্রী ) প্রাদেশিক রাজনীতিতে প্রবেশের আগে, কেনি ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পারের অধীনে ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রিসভা পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এমন একজন জাদরেল রাজনীতিবিদ যখন বুঝতে পারলেন যে তার জনসমর্থন কমে যাচ্ছে ; কোনোরকম টালবাহানা না করে অন্যকে সুযোগ দিয়ে নিজে প্রিমিয়ার(মুখ্যমন্ত্রী) থেকে সরে পড়লেন । এ দেশে কেউ রাজনীতিতে কাদা ছোড়াছুড়ি করে না, জনসমর্থন না থাকলে নিজ থেকে সরে পড়েন।
কানাডা তিন ধরণের নির্বাচন হয় : পৌর সরকার, প্রাদেশিক সরকার এবং ফেডারেল (জাতীয়) সরকার।
কানাডার কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে দুটি চেম্বার : হাউস অফ কমন্সে ৩৩৮ জন সদস্য, সর্বাধিক চার বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হয় ।
সিনেটে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে গভর্নর জেনারেল (রানীর প্রতিনিধি) ও ১০৫ জন সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়।
বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের , যদিও প্রার্থীরা যে কোনও রাজনৈতিক দলের সাথে সংযুক্ত বা নির্দলীয় হিসাবেও নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন।
বেশ কয়েকটি দল সাধারণত সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে; কানাডায় ঐতিহাসিকভাবে দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল : লিবারেল পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টি, এরা ঘুরেফিরে সরকার গঠন করে। তাছাড়া (এনডিপি) নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ কানাডা, একটি কাছাকাছি দ্বিতীয় দল ।
ব্লক কুয়েবেকোইস (বিকিউ) কানাডার একটি ফেডারেল রাজনৈতিক দল যা কুইবেক জাতীয়তাবাদ এবং কুইবেকের সার্বভৌমত্বের প্রচারের জন্য নিবেদিত এবং অন্য আর একটি গ্রীন পার্টি । কানাডার দশটি প্রদেশ এবং ইউকন ফেডারেল নির্বাচনে একই ভোটিং সিস্টেম ব্যবহৃত হয় ।
তবে প্রদেশ গুলি, স্বাধীন প্রাদেশিক নির্বাচন কমিশন দ্বারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং সংগঠিত হয়; ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে অনুমতি ছাড়া আইনগতভাবে তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারে যদি তারা তা করতে চায়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য কানাডায় পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বেশিরভাগ প্রদেশে একই তারিখে তাদের সমস্ত পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এ দেশের রাজনীতিবিদ রাজনীতি করে ধনী হওয়ার চিন্তা করে না। এদের পিছনে কোনো চাটুকার থাকে না। এ দেশে মানুষ বাঁচার জন্য যে কোনো কাজ-ই করে। চাকরি চলে গেলে, আর একটা কিছু করে খাবে এবং পাছে কে কি বললো, who care ?
এ দেশের নির্বাচনী ভোটিং সিস্টেম বেশ ভালো লাগে; তার কারণ অত্যন্ত নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে ভোট দেয়া হয়। আমি কাকে ভোট দেব এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার ; এ ব্যাপারে কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে না ” তুমি কি আমাকে ভোট দেবে ? “
তার কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে এদের কোনো লুকানো ( হিডেন) এজেন্ডা নেই। ইলেক্শনে পাশ না করলে হেঁসে হেঁসে জনগণকে ধন্যবাদ দিয়ে নিজ থেকে সরে পড়বে; কাদা ছোড়াছুড়ি করবে না।
সিনেট এবং সংসদ:
ক) কানাডা একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকার প্রধানের দায়িত্বগুলি স্বতন্ত্র। গভর্নর জেনারেল রাষ্ট্রপ্রধান, যুক্তরাজ্যের মহামান্য রাজার ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করেন। গভর্নর জেনারেলের সাংবিধানিক দায়িত্বগুলির মধ্যে রয়েছে:
কানাডার প্রধানমন্ত্রী, ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতির শপথ গ্রহণ;
সংসদ ডাকা, মুলতুবি করা এবং ভেঙে দেওয়া;
সিংহাসন থেকে বক্তৃতা প্রদান;
সংসদের কর্মকাণ্ডে রাজকীয় সম্মতি প্রদান;
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য, লেফটেন্যান্ট গভর্নর এবং কিছু বিচারক নিয়োগ করা; সরকারী দস্তাবেজগুলি কার্যকর করার জন্য স্বাক্ষর করা, যেমন অর্ডার-ইন-কাউন্সিল।
খ) দেশের কাজকর্ম এবং ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের এবং প্রধানমন্ত্রী দ্বারা পরিচালিত হয়। ।
ফেডারেল ও প্রাদেশিক নির্বাচন:
কানাডায় প্রতি চার বছর পর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী সমস্ত কানাডিয়ান নাগরিক ভোট দিতে পারেন এবং স্বাধীনভাবে কাকে ভোট দেবেন তা পছন্দ করতে পারেন।
সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল রয়েছে এবং সরকারকে অনেক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তবে এরা সভ্য ভদ্র ভাবে কথা বলে এবং কেউ চেয়ার উঠিয়ে সংসদে মারামারি করে না। সবাই মনে করে আমি জনগণের দেয়া দায়িত্ব পালন করছি; সঠিক ভাবে কাজ না করলে জনগণ আমাকে পরবর্তীতে ভোট দেবে না।
কানাডায় জনগণ যুক্তিসঙ্গত জিনিসপত্রের দর হ্রাস পাওয়ার পক্ষে। গ্যাসের দাম এবং নিত্য ব্যবহার্য জিনিসের দর হ্রাস হলেই জনগণ খুশি। সীমিত আয়ের লোক জীবন যাত্রার ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি নিয়ে বিচলিত ।
অন্টারিও প্রাদেশিক নির্বাচন:
২০১৮ সনের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি প্রধান ড্যাগ ফোর্ড সংখ্যা গরিষ্ঠ ভোটে সরকার গঠন করেছেন । ভোটের পূর্বে ফোর্ড অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন,”আমি এই করবো, সেই করবো” ; কিন্তু বাস্তবে গত ৪ বৎসরে ৫০% প্রতিশ্রুতি ও রক্ষা করতে পারেনি। সে ক্ষমতায় এসেই প্রথমে মিউনিসিপাল সিটি কাউন্সিলর সংখ্যা ৫০% কমিয়ে ২৫ প্লাস মেয়র = ২৬ নামিয়ে আনে। এ নিয়ে অনেক হইচৈ হলেও সে শুনেনি ।এবারও সে অনেক কিছু করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলে ও বাস্তবে কতটা কি করবে বলা মুশকিল।
কিছুদিন পূর্বে গত দুই বৎসরের জনগণের গাড়ি নবায়ন লাইসেন্স ফী ফেরত দিয়েছে; অন্টারিও ভোটার রাস্তার যানবাহন খরচ (গ্যাসের দাম ) এবং জীবনযাত্রার ব্যয়(cost of living) নিয়ে উদ্বিগ্ন। নির্বাচন মাঠে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে ; কে এবারে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করবে, কিছুই বলা যাচ্ছে না। এমন ও হতে পারে সংখ্যা গরিষ্ট না পেলে কেন্দ্রীয় সরকারের মতো জোট ও হতে পারে।
দেশে অর্থনৈতিক স্থবিরতা চলছে; কিছুদিন হয় দোকানপাট, ব্যবসা বাণিজ্য পুরা চালু হয়েছে। কানাডা সরকার গত দুই বৎসর সরকারি সাবসিডি দিয়ে দেশের শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে রেখেছে।
প্রায় ৮৫% জনগণ কভিড-১৯ ভ্যাক্সিন নিয়েছে। বর্তমানে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক না হলেও মানুষ করোনার ভয়ভীতি থেকে এখনো বের হয়ে আসতে পারেনি,এখনোও বাহিরে কলে কারখানায়, অফিস, আদালতে অনেকে সতর্কতা হিসাবে মাস্ক ব্যবহার করে; রেস্টুরেন্ট, কফি শপে আগের মতো ভিড় নেই।
একজনের কাজের পয়সায় এখানে সংসার খরচ চলে না; স্বামী স্ত্রী দুইজনকেই কাজ করতে হয়।
চাহিদা এবং সরবরাহের উপর মূল্য নির্ধারিত হয়। যুদ্ধের কারণে রাশিয়া থেকে গ্যাস এবং উক্রেন থেকে গম সরবরাহ বন্ধ রয়েছে ; এর ফলে সারা পৃথিবীতে দর বেড়ে গিয়েছে। তাছাড়া ব্যাবসায়ীরা ও সুবিধা নিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছে।
চলমান প্রাদেশিক রাজনৈতিক প্রচারণায়, দলগুলি ওন্টারিয়দের আর্থিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেও মানুষের মনে সন্দেহ রয়েছে। অন্টারিও প্রিমিয়ার ড্যাগ ফোর্ড বার্ষিক যানবাহন নিবন্ধন ফি বাতিল করেছে। কিন্তু প্রপার্টি ট্যাক্স, এনব্রিজ গ্যাস বিল ,বিদ্যুৎ বিল, বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, বলতে গেলে সব কিছুর দামই ধরাছোয়ার বাইরে। বাড়ি এবং এপার্টমেন্টের মালিক সংস্কারের নাম করে ভাড়াটিয়াদের উঠিয়ে দিয়ে সংস্কার করে কয়েকগুন ভাড়া বাড়িয়ে পুরাতনের স্থলে নতুন ভাড়াটিয়া বসাচ্ছে। কিন্তু লোকজনের মজুরি সে অনুপাতে বাড়ে নি। নির্বাচনে যদিও সবাই প্রতিজ্ঞা করছে যে নতুন বিল্ডিং তৈরী করে লোকদের চাহিদা মেটানো হবে ; বাস্তবে তা কতখানি সম্ভব, সময়ে দেখা যাবে।
টেলিভিশন খুললে দেখা যায় কোন পার্টি কোথায় কি বলছে। দুইদিন আগে বিভিন্ন পার্টি প্রধানদের সামনা সামনি হাড্ডাহাড্ডি তর্ক বিতর্ক হয়ে গেলো। একদল অন্য দলের সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করছে না। রাস্তা বের হলে এখানে সেখানে বিভিন্ন লোকের পোস্টার নজরে পরে; দুই এক জন বাসা নক করে তাদের পোস্টার দিয়ে গেছে। তবে আমাদের দেশের মতো উত্তেজনা বা মারামারি নেই।
বেশিরভাগ কানাডিয়ানরা যুক্তিসঙ্গত ভাবে চিন্তা করে। এই মুদ্রাস্ফীতির বাজারে যেই পাশ করুক না কেন; অলৌকিক কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না।
এ দেশে অগ্রিম ভোট দেয়ার নিয়ম রয়েছে ; তাছাড়া পোস্ট অফিসের মাধ্যমে ও ভোট দেয়া যায়। যারা কর্ম ব্যস্ত থাকে তারা ব্যালট পেপার নিয়ে অগ্রিম ভোট দিতে পারে। ভোট কেন্দ্রে গেলে নিজের ইচ্ছায় যাকে পছন্দ ভোট দিতে পারা যায়।
নজরুল ইসলাম
টরন্টো
