কানাডার নির্বাচন থেকে তৃতীয় বিশ্বের শিক্ষণীয়

২০অধিক জল্পনা কল্পনার পর অবশেষে গত ২রা জুন, ২০২২ কানাডায় অন্টারিও প্রাদেশিক নির্বাচন হয়ে গেলো। 

মিসেস ডলি বেগম আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। নিকটতম প্রার্থীর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভোটের ব্যবধানে  দ্বিতীয় বারের মতো এম পি পি  (মেম্বার অব প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্ট) নির্বাচিত হলেন । জয়, জয়, ডলি বেগমের জয়। কানাডার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বাঙ্গালীর মুখে মুখে শুধু ডলি বেগম। কে এই ভাগ্যবান  বাবামা, যাদের মেয়ের নাম বাঙ্গালীদের মুখে মুখে? 

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে ডলি বেগম। ছবি : দ্য কানাডিয়ান প্রেস/লরা প্রোক্টর।

সিলেটের মৌলভীবাজারে জন্ম নেয়া এই ডলি বেগম শিশু অবস্থায় বাবা মায়ের সাথে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য কানাডাতে চলে আসেন। এরপর, স্কুল, ইউনিভার্সিটি পড়া শেষে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ডলি বেগম রাজনীতিতে ঢোকার পূর্বে এ দেশে সমাজ কল্যাণ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সে এ  প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের এ পথে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং অদূর ভবিষ্যতে হয়ত অনেকেই তাঁকে স্বরণ করে এগিয়ে যাবে।  

কানাডা এক  বহু জাতিক উদ্বাস্তু দেশ । এ দেশে সারা পৃথিবীর লোক শান্তিপূর্ণ ভাবে বাস করে; এদের  চেহেরা ও গঠন এক রকম নয় । কারো বৃহত্তর শরীর, লম্বা নাক, সাদা  বা কালো রঙ, আবার করো ছোট চ্যাপ্টা নাক, ছোট শরীর;  হেজেল, নীল বা সবুজ চোখসহ মাঝারি বাদামী থেকে হালকা বাদামী, কালো বা স্বর্ণকেশী চুল। সমস্ত কালো আফ্রিকান/ আমেরিকান প্রাকৃতিকভাবে মিশ্র কোঁকড়ানো চুল। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের লোকদের ভাষা ও  উচ্চারণ  ভিন্ন ভিন্ন রকম  যেমন ব্রিটিশ ইংলিশ আর কানাডিয়ান ইংলিশ স্পিকিং লোকদের কথাবার্তা ভিন্ন রকম।  সবার শিকড় বাইরে, কে মূল কানাডিয়ান বলা মুশকিল; ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করলে বলে ” I  am born Canadian“.  সরাসরি মুখ বন্ধ করে দিলো ; হয়তো তার পেরেন্টস বাংলাদেশি বা শ্রীলঙ্কান বা ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানি বা অন্য কোনো দেশ। কাজেই নিজের দেশের একজন এম পি পি  ( প্রাদেশিক সংসদ সদস্য ) পাওয়া অনেক ভাগ্যের কথা; যদিও আমাদের দেশের মতো কেউ চাকরি (ব্যবসা ) তদবিরের জন্য ধারে কাছেও যায় না বা তার অফিসে ভিড় জমায় না।  এ দেশে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি বহু যুগ থেকে শিকড় গেঁড়ে আছে এবং সংসদে ওদের লোক পাওয়া যায়। এমন কি সোমালিয়ান মন্ত্রী (মিস্টার: হোসাইন) এবং আফগানিস্তানি মন্ত্রী  ( মিসেস: মারিয়াম ) ও এদিক থেকে বেশ এগিয়ে আছে।     

কানাডার ১০টি প্রদেশ  এবং তিনটি টেরিটরির  মোট লোকসংখ্যার (৪০  মিলিয়ন) ৩৮% অন্টারিও প্রদেশে, ২৩ % কুইবেক, ১৩% ব্রিটিশ কলম্বিয়া ও ১২ % আলবার্টায়। বাকি লোক অন্যান্য প্রদেশ ও  তিন টেরিটোরিতে বাস করে।  Yellowknife  0.12%,Nunavut  0.01% ও Yukon  0.01% বাস করে।  অতিরিক্ত বরফ ও  শীতের দরুন এই তিন টেরিটোরিতে  লোক সংখ্যা একেবারেই কম। প্রতিটি প্রদেশ ও টেরিটোরির নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন (autonomy) থাকায় বিভিন্ন সময় নিজেদের সুবিধামতো ইলেকশন করে থাকে।

অন্টারিও প্রিমিয়ার  মিস্টার ড্যাগ ফোর্ড, প্রাদেশিক রক্ষণশীল দল (প্রভিন্সিয়াল কনজারভেটিভ পার্টি ) থেকে আরেকটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করলেন  ।

মে মাসের তিন তারিখ থেকে ২রা জুন পর্যন্ত মোট ২৮ দিন বিভিন্ন পার্টি ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিগণের জন্য সরকারিভাবে ভোট প্রচার করার সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল।  ২০১৮ থেকে ২০২২, এই চার বৎসর প্রাদেশিক রক্ষণশীল দল (কনজারভেটিভ পার্টি) ক্ষমতায় ছিল এবং যেহেতু ড্যাগ ফোর্ড মোটামুটি ভালোই চালিয়েছেন , অনেকেই ধারণা করেছিল আবারও কনজারভেটিভ ক্ষমতায় আসতে পারে এবং বাস্তবেও তাই হলো।   

এ দেশে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনি অর্থায়নের জন্য প্রবিধানের (গভর্নমেন্ট রেগুলেশন্স ) সরকারি নিয়মকানুনের মুখোমুখি হতে হয়; কোনো দল বা ব্যক্তি কত অর্থ প্রচার কাজে খরচ করবে তা সরকার লক্ষ রাখে এবং নির্বাচনের পর প্রার্থীকে তা জানাতে হয় সরকারকে। রাস্তায় বের হলে বিভিন্ন লোকের পোস্টার রাস্তার মোড়ে নজরে পড়েছে, তবে দু/একজনকে বাড়িতে এসে দরজা নক করে প্রচারপত্র দিয়ে যেতে দেখেছি। আমার বাড়ির সামনে কোনো পোস্টার লাগানো হয় নি বা লাগাতে হলে মালিকের অনুমতি দরকার পড়ে । 

সকল ভোটারের জন্য ভোট দান সহজ করার জন্য, এ দেশে  অগ্রিম ভোট দান এবং পোস্ট অফিসের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার  বিকল্প নিয়ম রয়েছে এবং সে জন্য অনেকেই অগ্রিম ভোট দিয়ে থাকে। আমি নিজেও অগ্রিম ভোট দেয়া পছন্দ করি এবং দিয়েছি।    

অন্টারিও প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টি টানা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার জিতেছে, এবং ৮৩ টি রাইডিংয়ে নির্বাচিত হয়েছে। এটি আগের নির্বাচনের চেয়ে বেশি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৬৩ টিরও বেশি।

ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি  আবারও সরকারি বিরোধী দল গঠন করেছে। কারণ তারা দ্বিতীয়-সর্বাধিক আসন পেয়েছে , তবে দলের নেতা মিসেস আন্দ্রেয়া হোরওয়াথের (Andrea Horwath) পক্ষে এটি যথেষ্ট ছিল না, যিনি সরাসরি ঘোষণা করেছেন  যে তিনি তার চতুর্থ নির্বাচনি চক্রে সরকার গঠনে ব্যর্থ হওয়ার পরে নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করবেন।  দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেয়ার পর আন্দ্রেয়া যখন বুঝতে পেরেছেন তাঁর দ্বারা সরকার গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না, বিলম্ব না করে সরাসরি জনগণের নিকট নিজের অক্ষমতা ব্যক্ত করলেন। মিসেস আন্দ্রেয়া কোনোরকম কারণ দেখাতে চাইলেন না এবং অন্যকে নেতৃত্ব দিয়ে সরে পড়বেন বলে অঙ্গীকার করলেন। আন্দ্রিয়া পরিশ্রমী মহিলা এবং জনগণের স্বার্থে সংসদে যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন এবং ভালো নেতৃত্বের জন্য তাঁর যথেষ্ট সুনাম রয়েছে । তাছাড়া সে নিজে পাশ করা সত্ত্বেও পার্টির স্বার্থে নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইলেন না।  তাঁর এই সুন্দর দৃষ্টান্ত থেকে আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অনেক শিক্ষণীয় আছে।

কানাডার রাজনীতিতে কোনোরকম মারামারি (রক্তক্ষরণ) দেখা যায় না।  জনগণ চাইলো না বা সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে সরে পড়েন এবং অন্য কিছু করে জীবনযাপন করেন। এদের অনেকের  যথেষ্ট সাপোর্ট থাকা সত্ত্বেও নিজের মানসম্মান নিয়ে রাজনীতি থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এ দৃষ্টান্ত দেখা যায় না, গদিতে একবার বসলে বিনা রক্তপাতে আর নামতে চায় না ।  

নজরুল ইসলাম

টরন্টো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *