সঙ্গীতা ইমাম এর সাথে কথোপকথন
মানবী মৃধা : ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ : ঠিক সন্ধ্যা আটটায় সুর ও সংলাপের মেলবন্ধনে শুরু হয় এক অনন্য আড্ডা-সঙ্গীতার সাথে কথোপকথন। নামের সঙ্গে তার ভাব ও পরিবেশের এমন সাযুজ্য সচরাচর দেখা যায় না; সত্যিই এটি ছিল ভাবনার আদান-প্রদান, স্মৃতিচারণা, মতবিনিময় আর সংস্কৃতির এক উষ্ণ মিলনমেলা।
প্রারম্ভে সঞ্চালক মৈত্রেয়ী দেবীর কিছু কথা বলার পর ফুলেল শুভেচ্ছা জানান দলের পক্ষে স্বপ্নীল এবং তামান্না রহমান।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই সঙ্গীতা ইমাম একটি ভাবনার উল্লেখ করেন -“বড় গাছের নিচে কি আরেকটি বড় গাছ জন্মায়!” বাংলাদেশের দুই প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব হাসান ইমাম ও লায়লা হাসানের কন্যা হয়েও তিনি যে নিজস্ব পরিচয়ে দীপ্তিমান, তা তার জীবন ও কাজের মধ্যেই স্পষ্ট; ফলে এই প্রশ্নের উত্তর যেন নিজেই দিয়ে দেন তার পথচলায়।
তার জন্ম হয়েছিল যখন তার দাদী তার চুল নখ নিয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে মাটিতে পুঁতে দিয়ে এসেছিলেন। শৈশব থেকেই তার শিক্ষা ও গড়ে ওঠা ঢাকার। পাঁচ বছর বয়স শুরু শিক্ষা জীবন এ স্কুল,আর এখানেই করছেন দীর্ঘ তেত্রিশ বছরের শিক্ষকতা-শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধের যে বীজ তিনি এতদিন বপন করেছেন, তা তার বক্তব্যে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।
নাট্যজীবনের প্রসঙ্গে তিনি স্মরণ করেন আহমেদ হোসেনকে এবং লোকনাট্য দলে তার সূচনার কথা। সংগঠন, দলগত চর্চা ও মানুষের সঙ্গে কাজ করার যে শিক্ষা তিনি সেখানে পেয়েছেন, তা তাঁর পুরো জীবনদর্শনকে প্রভাবিত করেছে।
গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলনের প্রসঙ্গে তার দৃঢ় উচ্চারণ -“রাজপথই আমার আসল জায়গা। বন্ধ ঘরে সমঝোতা হয়, কিন্তু রাজপথেই দাবি আদায় হয়” অনুষ্ঠানজুড়ে এক বিশেষ অনুরণন সৃষ্টি করে।
তিনি আজীবন উদীচীর আদর্শে বিশ্বাসী, সত্যেন সেন ও নরেশ দাশগুপ্তের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত। তার মতে, যে যার অবস্থান থেকে মানুষের জন্য কাজ করলেই সমাজ এগিয়ে যায়-এতে কোনো বিরোধ নেই।
আলোচনায় উঠে আসে সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা, নতুন প্রজন্ম ও দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ। দর্শকসারি থেকে বিন্দু ফাজানা চৌধুরীর প্রশ্ন – আজকের মেয়েদের মধ্যে সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ কতটুকু – এর উত্তরে সঙ্গীতা ইমাম বলেন, মানুষের মন সাদা স্লেটের মতো; সেখানে শিক্ষক ও অভিভাবক যা আঁকেন, তাই ভবিষ্যতে প্রতিফলিত হয়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন আহমেদ হোসেন, যিনি সংগঠন গঠন ও সমাজ সচেতনতা নিয়ে কথা বলেন। বরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৃপন কবিতা আবৃত্তি করেন ইলোরা সাঈদ। কন্ঠশিল্পী সাদমান স্বপ্নীল রবি ঠাকুরের “তোমায় গান শুনাব” সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
স্মৃতিচারণায় অংশ নেন ঈশাত আরা মেরুনা। তাদের একটি কথাই যেন সন্ধ্যার অন্যতম গভীর উপলব্ধি হয়ে ওঠে- “তারা বড় লোক- কিসে বড়? নিরহংকারে, বিনয়ে।”
এই সংজ্ঞা শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি হয়ে রয়ে যায়।
স্মৃতিচারণায় অংশ নেন, শিখা রউফ, আসিফ চৌধুরী, শাওলী চৌধুরী, সুমন সাইয়ীদ, পলাশ, অনুপ, অরুণা হায়দার, আবীর সহ আরও অনেকে। তারা সবাই সঙ্গীতা ইমাম ও তার পরিবারের মানবিকতা, বিনয় ও আন্তরিকতার কথা তুলে ধরেন।
এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় যখন মেহেজাবিন বিনতে ওসমান গান করেন “ফুল ফুটে ফুল ঝরে, ভালোবাসা ঝরে পড়ে না” – যার রচয়িতা সঙ্গীতা ইমামের জীবনের এক বিশেষ মানুষ, তার প্রয়াত সঙ্গী। গানটি স্মৃতির দরজা খুলে দেয়, অশ্রুসজল করে তোলে তাকে এবং উপস্থিত দর্শকদেরও।
অনুষ্ঠানে সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সঙ্গীতা ইমামের বহুমাত্রিক প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। তিনি নিজেও অভিনয় করে দেখান “গোলাপ জান” চরিত্র, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
শিক্ষিকা, নাট্যকর্মী, সংগঠক ও লেখক – এই বহুমুখী পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি শিশুদের নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। তার লেখায় উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধ, ভ্রমণ ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা।
সৈয়দ নওশাদ ইমামের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত – “ভরা থাক্ স্মৃতিসুধায় বিদায়ের পাত্রখানি।” রেশটিই যেন জড়িয়ে রয়েছে স্মৃতিতে।
এই সন্ধ্যা শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল এক জীবনের গল্প, এক আদর্শের প্রকাশ এবং প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণবন্ত উপস্থিতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে গানটির সঙ্গে তাৎক্ষণিক নৃত্য পরিবেশন করেন সঙ্গীতা ইমাম এবং অরুনা হায়দার। অনুষ্ঠানে অন্যস্বর টরন্টো এর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য উপস্থিত ছিল।
বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এর মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
