টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া’র কঠিন জীবন সংগ্রাম, পরিবারিক সহিংসতা মোকাবেলা ও সাফল্যের কাহিনী

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, অক্টোবর ২৭, ২০২৬ : চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি আর পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলা করেও ভেঙে পড়েননি মাত্র তেরো বছর বয়সে হংকং থেকে বাবা-মা’র সাথে কানাডায় আসা অলিভিয়া চাও। কঠিন মনোবল আর অদম্য ইচ্ছা শক্তি আজ তাকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে এসেছে। তিনি আজ নর্থ আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর টরন্টোর মেয়র। গত ২৬ অক্টোর সিটি নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন এই পদে।

অলিভিয়া চাও-এর সমর্থনে এবার রেকর্ড সংখ্যক ভোটার উপস্থিত হয়েছিলেন—যা টরন্টোর ইতিহাসে যে কোনো মেয়রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ।

নির্বাচিত মেয়র অলিভিয়া চাও ৫৪.২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড পেয়েছেন ৪১.১ শতাংশ ভোট।

টরন্টোর মেয়র পদে দ্বিতীয়বার জয় পেয়েছেন অলিভিয়া চাও। ছবি : অলিভিয়ার ফেসবুক

মেয়র পদে দ্বিতীয়বার জয়ের পর, সোমবার রাতে ‘দ্য গ্রেট হল’-এ দেওয়া বিজয় বক্তৃতায় চাও ভোটারদের আশ্বস্ত করে বলেন তিনি তাদের আস্থা অর্জনের জন্য প্রতিদিন কাজ করে যাবেন।

অলিভিয়া আরও বলেন, “টরন্টো আমার পরিবারকে যা দিয়েছে, তা আমি কখনোই ভুলিনি। আমার পুরো জীবন আমি ব্যয় করেছি সেই ঋণ শোধ করার প্রচেষ্টায়—কারণ টরন্টো এমন একটি শহর যা মানুষের ওপর আস্থা রাখে; এটি একটি প্রগতিশীল শহর, সহানুভূতিশীল শহর, নবাগতদের স্বাগত জানানোর শহর। এমন একটি শহর যা শ্রমজীবী ​​মানুষের পাশে দাঁড়ায়, আমাদের মধ্যকার বৈচিত্র্যকে উদ্‌যাপন করে এবং বিশ্বাস করে যে প্রত্যেকেরই একটি ন্যায্য সুযোগ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।” বেগুনি রঙের প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বিপুলসংখ্যক সমর্থকের উদ্দেশ্যে তিনি এ কথা বলেন।

ইতিপূর্বে অলিভিয়া টরন্টো স্কুল বোর্ডের ট্রাস্টি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছিলেন সিটি কাউন্সিলর। পরে ফেডারেল এমপি-ও নির্বাচিত হন। এখন মেগা সিটি টরন্টোর মেয়র।

অলিভিয়ার জন্ম হংকং এ। ১৩ বছর বয়সে তিনি বাবা-মা’র সাথে কানাডায় আসেন। কিন্তু এখানে শুরুর জীবনটা সহজ ছিল না। নানান প্রতিকূলতা আর পারিবারিক সহিংসতার পরিস্থিতির মধ্যে কেটেছে তার বালিকা জীবন। অলিভিয়া নিজেই সেই সব দিনের কথা বর্ণনা করেছেন তার My Journey গ্রন্থে। কানাডিয়ানইমিগ্রেন্ট.সিএ সেই গ্রন্থের সূত্র উল্লেখ করে জানায়,  অলিভিয়া চাও তার স্মৃতিকথা মাই জার্নিতে পাঠকদেরকে কেবল তার রাজনৈতিক জীবন এবং এনডিপি নেতা জ্যাক লেটনকে বিয়ের কথাই জানাননি বরং হংকংয়ে তার সুখী শৈশব থেকে শুরু করে  টরন্টোর সেন্ট জেম্স শহরে একটি সহিংস পারিবারিক জীবনে প্রবেশের আবেগঘন কাহিনীও শুনিয়েছেন। ২৬ বছরের বিবাহিত জীবনের পর স্বামীর মৃত্যুর পরেই চৌ-এর স্মৃতিকথা প্রকাশ পেয়েছে এবং এতে তিনি কেবল তার এই ক্ষতির কথাই তুলে ধরেননি বরং তার কাহিনীতে বিরাট ব্যক্তিগত শক্তিমত্তা ও শোক থেকে বেরিয়ে আসার দৃঢ়তার কথাও রয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘‘জ্যাকের মৃত্যুর পর আমি লিখতে শুরু করি। অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছেন, কীভাবে আমি সব সামলে নিয়েছি, আর আমি অনুধাবন করেছি যে, আমার শক্তির উৎস হলো আমার যৌবনকাল এবং কানাডায় আসার পর আমাদেরকে যে কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে সেটিই আমাকে শক্তি জুগিয়েছে।

হংকংয়ে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে চাও বড় হয়ে উঠেছেন। তার বাবা উইলসন ওয়াই সান চাও ছিলেন একজন সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা- একজন স্কুল সুপারিনটেনডেন্ট। তার মা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। তাদের পরিবারটি শহরের উপকণ্ঠে একটি চমৎকার বাড়িতে স্বচ্ছন্দে বসবাস করতো। রান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করার জন্য তাদের সার্বক্ষণিক কাজের লোক ছিলো। ১৯৭০ সালের মধ্যে চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূত্রপাত হয় এবং পরিবারটি হংকং ছেড়ে কানাডায় পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

কানাডায় আসার ফলে তাদের একটি দারুণ সুন্দর নতুন জীবনের সূচনা হবে বলে তারা মনে করলেও চাও-এর কাহিনী অন্য অনেক অভিবাসীর কাহিনীরই প্রতিধ্বনিমাত্র। চাও-এর বাবা শিক্ষিত এবং ইংরেজিতে দক্ষ হলেও কানাডায় কর্মজীবন শুরু করার জন্য তাকে যথেষ্ট সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি প্রথমে ডেলিভারি গাড়ির চালক, পরে ট্যাক্সি চালক এবং মাঝেমধ্যে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেছেন। তার মা একমাত্র যে কাজটি করতে পারতেন সেটি হলো সেলাই করা। চাও নিজেও তার মায়ের পাশাপাশি কিছু কাজ করতেন- তখনকার সময়ের ফ্যাশন অনুযায়ী জিন্স-এর কাপড়ে অলংকৃত বোতাম লাগাতেন। চাওর বাবা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তিক্ততার অনুভূতি প্রকাশে মাঝেমধ্যেই তার মাকে নির্যাতন করতেন এবং এক পর্যায়ে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তার মায়ের উপর বাবার ক্রমবর্ধমান অত্যাচার-নির্যাতন সামাল দেওয়ার মতো কোনো আত্মীয় বা বন্ধু কানাডায় ছিলো না এবং শেষ পর্যন্ত তার বাবাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর চাও তার পরিবার চালানোর জন্য একাধিক খণ্ডকালীন কাজ জুটিয়ে নেন।

ঘরে এতসব প্রতিকূলতার পরও চাও মনে করেন কানাডীয়রা তাকে স্বাগত জানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘  আমরা যখন এখানে আসি তখনই ইংরেজি বলতে পারতাম। আমি এজন্য কার্টুন ছবিকে ধন্যবাদ জানাই- ব্যাটম্যান অ্যান্ড রবিন, বাগস বানি, রোড রানার ইত্যাদি কার্টুন ছবি। আমি এখনও তার বিপ বিপ শব্দ শুনলে হেসে ফেলি। এই  ইংরেজি জানাটা আমার এখানে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়ক হয়েছে যদিও পুরোপুরি কাজ পাওয়ার মত নয়।”  অন্য অনেক অভিবাসী শিশুর মতো চাও কানাডীয় হবার চেষ্টা করেন, আইস স্কেটিং শেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি তার কোলাহলময় বাড়িতে কোনও বন্ধুকে কখনই নিয়ে আসেননি।

কানাডার প্রতি তার ভালোবাসার সৃষ্টি হয় কিন্তু নতুন দেশের জন্য তার এই ভালোবাসাই তাকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে এমন নয়। স্মৃতিকথায় তিনি ১৯৭৯ সালে একটি জোরালো মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনার উল্লেখ করেছেন যখন তিনি ভিয়েতনামী বোট পিপল্-এর দুঃখ-দুর্দশার কথা জানতে পারেন- যুদ্ধ কবলিত ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া থেকে লাখো মানুষ ডুবে মরার কিংবা ডাকাতের হাতে পড়ে মরার ভয় সত্ত্বেও ফুটোফাটা মাছ ধরার নৌকায় করে দেশ ছাড়তে শুরু করে। চাও এসময় উডগ্রিন কমিউনিটি সার্ভিসে একটি চাকরি পান। তাকে ভিয়েতনামী উদ্‌বাস্তু এবং চিনা অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করতে হতো।

চাও বলেন,‘‘আমি সমাজের জন্য কাজ করা এবং বিভিন্ন পরিবারের জীবন কিছুটা হলেও সহজতর করার মূল্য বুঝতে শিখি। আমার মনে হয়, আমি ওই বছরগুলোতে যে শিক্ষাটা অর্জন করেছি সেটা হলো, মানুষ যখন একসঙ্গে কাজ করে তখনই ভাল কাজ সম্পন্ন হয়।

বইটিতে চাও-এর রাজনৈতিক জীবনের অনেক ইতিহাস লেখা হয়েছে – প্রথমে স্কুল বোর্ডের সদস্য, তারপর নগর কাউন্সিলের সদস্য (তিনি ছিলেন নগর কাউন্সিলের আসনে বিজয়ী হওয়া প্রথম এশীয় নারী) এবং এখনকার এমপি হিসাবে তার ভূমিকা উঠে এসেছে বইটিতে। এর পাশাপাশি তার অন্তর্ভুক্তকরণের রাজনীতি; কীভাবে তিনি – নতুন অভিবাসী থেকে শুরু করে ধর্ম, জাতীয়তা ও লৈঙ্গিক বৈষম্যের শিকার হয়ে বহিষ্কারাদেশের মুখোমুখি হওয়া অভিবাসীদের তথা ক্ষমতাহীনদের পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠেন সেসব ইতিহাস রয়েছে বইটিতে। ২৫জন শীর্ষ কানাডীয় অভিবাসী অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী চাও লিখেছেন, ‘‘আমার মনে হয়, এদেশে নবাগতদের জন্য মানবাধিকারের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসাবে কানাডার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনকে ভালভাবে বুঝে নেয়া খুবই জরুরি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *