এবার স্কুল শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় প্রতীক পরিধান নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা কুইবেকে
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ : কুইবেকের নতুন শিক্ষামন্ত্রী জোয়েল আরসেনো বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন যে, তিনি স্কুল শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় প্রতীক পরিধান নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছেন। খবর দি কানাডিয়ান প্রেস এর।
তাঁর এই বক্তব্যের পর ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ কানাডিয়ান মুসলিমস-এর প্রেসিডেন্ট স্টিফেন ব্রাউন কুইবেক সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ক আইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিশুদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ এনেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে স্টিফেন ব্রাউন বলেন। “আমরা শিশুদের আধ্যাত্মিকতা চর্চার এবং স্কুলে যাওয়ার অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপের বিষয়ে কথা বলছি।”

উল্লেখ্য যে, পার্টি কুইবেকোয়া (Parti Québécois) নির্বাচনী প্রচারণার সময় এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; সেই নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতেই দলটি একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে সম্প্রতি।
দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে যে, ধর্মনিরপেক্ষতা “কুইবেকের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষাকেই ধারণ করে, যেখানে ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত পরিসরেই চর্চিত হবে।”
তবে স্টিফেন ব্রাউন বলেছেন যে, সরকার ইতিমধ্যেই “সমস্ত কুইবেকবাসীর সরকার” হওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে। আর শিশুদের ধর্মীয় প্রতীক পরিধান করতে বাধা দেওয়াটা হলো “ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সুস্পষ্ট বৈষম্য।”
নবগঠিত কুইবেকের রাজনৈতিক দল Québec solidaire-এর শিক্ষা ও ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ক সমালোচক রোক্সান মিলো বলেছেন, তাদের বামপন্থী দলটি নতুন শিক্ষামন্ত্রীর প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে ভোট দেবে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রোক্সান বলেন, “শিশুদের একা থাকতে দিন। আমরা জানি শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রাধিকারগুলো কি এখন। এই মুহূর্তে কর্মী সংকট দূর করা, স্কুলগুলোর সংস্কার করা, তিন স্তরবিশিষ্ট স্কুল ব্যবস্থার অবসান ঘটানো এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর দিকে আগে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
পার্টি কুইবেকোয়া সরকার ঠিক কবে এ বিষয়ে একটি বিল উত্থাপন করার পরিকল্পনা করছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। আগামী ১৭ নভেম্বর আইনসভার অধিবেশন পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, কুইবেক সরকার ইতিপূর্বে এমন একটি আইন প্রণয়নের জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে, যা কর্মস্থলে শিক্ষকসহ সরকারি খাতের কর্মীদের ধর্মীয় প্রতীক পরিধান করা নিষিদ্ধ করেছে। কুইবেক সরকার ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঐ Bill 94 পাস করে, যার মাধ্যমে ঐ প্রদেশে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা কেবল শিক্ষক এবং অধ্যক্ষ্যের বেলায়ই সীমাবদ্ধ নয়, স্কুলে কর্মরত সকলের বেলায়ই এই আইন প্রযোজ্য হয়।
মন্ট্রিয়লে একটি ডে-কেয়ারের একজন শিক্ষিকা ছিলেন মারিয়েম ঘারনোগুই। স্থানীয় একটি স্কুল কর্তৃক পরিচালিত ঐ ডে-কেয়ারে কাজ করতেন তিনি। মারিয়েম কর্মস্থলে হিজাব পরতেন। কিন্তু নতুন আইন পাস হওয়ার পর তিনি হিজাব খুলতে অস্বীকৃতি জানান এবং সে কারণে তিনি তার চাকরিটি হারান।
ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ কানাডিয়ান মুসলিমস-এর প্রেসিডেন্ট স্টিফেন ব্রাউন বলেছেন যে, পার্টি কুইবেকোয়া’র প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য প্রস্তুত আছেন।
অন্যদিকে খ্রিস্টান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘কার্ডাস’-এর কুইবেক পরিচালক জঁ-ক্রিস্টোফ জাসমিনও ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ক আইনগুলোর পরিধি বাড়ানোর বিরোধিতা করেন।
পূর্ববর্তী Coalition Avenir Québec পার্টির সরকার যুক্তি দিয়েছিল যে, শিশুরা একজন কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যক্তির অধীনে থাকে; আর সেই ব্যক্তির ধর্মীয় দিক থেকে নিরপেক্ষ হওয়া আবশ্যক, যাতে তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে না পারেন।
জেসমিন বলেন, “আজকের শিশুদের ক্ষেত্রে এই যুক্তি কীভাবে প্রযোজ্য হয়, তা আমার বোধগম্য নয়। শিশুরা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে না, তারা নাগরিক সমাজের অংশ। শিশুদের নিরপেক্ষ থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই যুক্তিটি ধোপে টেকে না।”
ব্রাউন এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন যে, ২০১৮ সালে Coalition Avenir Québec ক্ষমতায় আসার পর থেকে ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত ধর্মনিরপেক্ষতা আইনের পরিধি ক্রমাগত প্রসারিত হয়েছে।
শুরুতে সরকার কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এটি শিক্ষক, ডে-কেয়ার কর্মী, স্কুলের সকল কর্মী এবং স্কুলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করা হয়েছিল।
এরপর Coalition Avenir Québec আইনটির পরিধি জনপরিসরে সম্প্রসারিত করে এবং বাইরে পাবলিক স্পেসে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কর্মক্ষেত্রে প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ করে দেয়।
“আর এখন তো আমরা শিশুদের অধিকারের পেছনেও লেগেছি। তাহলে এর শেষ কোথায়?” এ কথা বললেন ব্রাউন।
