অভিবাসনের ফলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের সন্তানেরা ভুলে যেতে পারে তাদের ঐতিহ্যবাহী মাতৃভাষা

যেভাবে রক্ষা করা যেতে পারে তাদের মাতৃভাষা

প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, অগাস্ট ৩, ২০২৬ :  অভিবাসনের কারণে প্রবাসে অনেক ঐতিহ্যবাহী ভাষা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ অভিবাসী ও তাদের সন্তানরা নতুন দেশের প্রভাবশালী ভাষা গ্রহণ করে। মূলত অভিবাসী পরিবারের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে থাকে। তারা পর্যায়ক্রমে তাদের মাতৃভাষা ভুলে যেতে থাকে। খবর সিবিসি রেডিও’র।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড বাইলিঙ্গুয়ালিজম ইনস্টিটিউট’-এর অধ্যাপক নিকোলাই স্লাভকভ, যিনি ভাষা শিক্ষা ও বিলুপ্তি নিয়ে গবেষণা করেন, তিনি বলেন যে, অভিবাসীদের সন্তানরা যখন তাদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ভাষায় কথা বলতে শেখে না, তখন তারা তাদের সেই ভাষা ভুলে যেতে পারে—এই বিষয়ে তিনি একমত।

সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি এক পর্যায়ে এমন দাঁড়ায় যে, কিছু পরিবার তাদের মাতৃভাষা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে না পারার জন্য পরে অনুশোচনা করে।

উল্লেখ্য যে, গত দুই বা তিন দশকে বাংলাদেশ থেকে অনেক অভিবাসী এসেছেন কানাডায় তাদের পরিবার নিয়ে। ভারতের পশ্চিম বঙ্গ থেকেও এসেছেন অনেকে। এবং দেখা গেছে এই পরিবারগুলোতে প্রায় শতভাগ ছেলে-মেয়েই ঘরে বাবা মায়ের সঙ্গে বাংলায় কথা বললেও ভাই বা বোনের সঙ্গে বাংলায় কথা বলে না। কাজিনদের সঙ্গেও না। কানাডায় জন্ম হয়ে থাকলে বা শিশু বয়স থেকে কানাডায় বসবাস করা শুরু করলে প্রথম দিকে কয়েক বছর বাংলায় কথা বলে। কিন্তু স্কুলে বা ডে কেয়ারে যাওয়া শুরু হলে ক্রমশ বাংলার চর্চাটা তাদের মধ্যে কমে যায়। তখন শুধু মা-বাবার সাথে কিছুটা বাংলায় কথা বলে। কারণ, অনেক মা-বাবা ইংরেজিতে তাদের মতো ফ্লুয়েন্ট না। বা কিছু কিছু ইংরেজি শব্দের অর্থ তারা বুঝেন না। বাড়িতে দাদা-দাদী বা নানা-নানী থাকলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠে।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, কানাডায় ৫৬.৬ শতাংশ মানুষ ইংরেজি, ২০.২ শতাংশ ফরাসি এবং ২৩.২ শতাংশ মানুষ ২০০টিরও বেশি অন্যান্য ভাষার মধ্যে কোনো একটিকে তাদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কানাডার নোভাস্কোশিয়ায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছে শিশুরা। ছবি: গোলাম কিবরিয়া

ঐতিহ্যবাহী ভাষাগুলো কীভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় 

অধ্যাপক নিকোলাই স্লাভকভ বলেন, ভাষার বিলুপ্তি প্রায়শই অচেতনভাবেই ঘটে থাকে। মানুষ যখন নতুন কোনো দেশে গিয়ে সেখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই চারপাশের প্রভাবশালী ভাষাটির ওপর বেশি মনোযোগ দেয় এবং ধীরে ধীরে নিজেরা তাদের মাতৃভাষার ব্যবহার কমিয়ে দেয়।

অন্যান্য ক্ষেত্রে, বাবা-মায়েরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের মাতৃভাষায় কথা না বলার সিদ্ধান্ত নেন; কখনও কখনও তা তাদের নিজস্ব বিচারবুদ্ধির ওপর ভিত্তি করে, অথবা শিক্ষক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শে এমনটি করেন। তাদের ধারণা, মাতৃভাষায় কথা বলতে গেলে এটি তাদের ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

স্লাভকভ বলেন,  “তারা হয়তো মনে করতে পারেন যে তাদের মূল ভাষার কদর নেই এবং তাদের সন্তানদের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ হলো এ বিষয়ে মনোযোগ না দেওয়া।”

স্লাকভ এর মতে, ঐতিহ্যবাহী ভাষা বজায় রাখার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত একটি ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু পরিবারগুলোকে তিনি উৎসাহিত করেন এই বলে যে, “এটি তারা করবে কি না, তা ভালোভাবে বিবেচনা করা উচিৎ।”

বছরের পর বছর ধরে স্লাকভ এমন অনেক বাবা-মায়ের কথা শুনেছেন, যাঁরা তাঁদের সন্তানদের নিজেদের ভাষা শেখাতে না পারার জন্য অনুশোচনা করেছেন; পাশাপাশি অভিবাসী পরিবারের এমন প্রাপ্তবয়স্কদের কথাও শুনেছেন, যাঁরা আফসোস করেন যে ছোটবেলায় তাঁদেরও ভাষাটি শেখার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।

স্লাকভ বলেন, তিনি বোঝেন যে নবাগতরা প্রায়শই কাজ খোঁজা এবং নতুন জীবন গড়ার মতো আরও জরুরি বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, যার ফলে মাতৃভাষা সংরক্ষণের কথা ভাবার জন্য খুব কম সময়ই থাকে।

কানাডায় ভাষার পুনরুজ্জীবন

কিন্তু মাতৃভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার অনেক পরেও তার পুনরুজ্জীবন সম্ভব। উদাহরণ হিসাবে নেদারল্যান্ড থেকে আসা অভিবাসীদের কথা বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে বাঁচতে এবং একটি উন্নত জীবন গড়তে নেদারল্যান্ডস থেকে অভিবাসীদের একটি বিশাল স্রোত কানাডায় এসেছিল।

যদিও সেই সময়ে নেদারল্যান্ড থেকে আসা অভিবাসীরা কানাডার অন্যতম বৃহত্তম অভিবাসী সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছিল, অনেকেই দ্রুত সমাজে মিশে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছিল এবং অন্য যেকোনো অভিবাসী গোষ্ঠীর চেয়ে দ্রুত তাদের ডাচ ভাষা ত্যাগ করেছিল।

এর ফলে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বংশধররা সাধারণত আর ডাচ ভাষায় কথা বলেন না।

সেই পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালে, ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে আগ্রহী পরিবারগুলোর জন্য ভ্যাঙ্কুভারে একটি ডাচ ভাষা স্কুল হিসেবে ‘ডি এসডর্ন স্কুল’ যাত্রা শুরু করে।

এর শুরুটা হয়েছিল যখন একদল অভিভাবক একটি লাইব্রেরিতে ছয়জন শিশুকে জড়ো করে তাদের ডাচ ভাষা শেখাতেন। স্কুলের অধ্যক্ষ মারিয়ান কাউয়েলস বলেন, তখন থেকে স্কুলটি তিনটি স্থানে প্রসারিত হয়েছে এবং অনলাইন ক্লাস চালু করেছে, এবং বর্তমানে প্রায় ৭০ জন শিশু ও ২৫ জন প্রাপ্তবয়স্ককে পরিষেবা দিচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিন বছরেরও কম বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৭০-এর দশকের প্রাপ্তবয়স্করাও রয়েছেন। কাউয়েলস বলেন, কেউ কেউ নবাগত পরিবার থেকে এসেছেন যেখানে বাবা-মা দুজনেই ডাচ ভাষায় কথা বলেন, আবার অন্যরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের কানাডিয়ান, যারা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করছেন।

তিনি বলেন, মানুষ নানা কারণে ডাচ ভাষা শেখে, কিন্তু তরুণদের জন্য একটি বড় কারণ হলো নিজেদের শিকড় অন্বেষণ করা।

উল্লেখ্য যে, টরন্টোর বাঙ্গালী অধ্যুষিত এলাকায় কয়েকটি স্কুলে বাংলা ভাষা শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে বিশেষ কোর্স চালু করা হয়েছিল চলতি শতকের গোড়ার দিকে। ছুটির দিনে  টরন্টো ডিস্ট্রিক স্কুল বোর্ডের অধীনে এইসব স্কুলে বাংলাদেশি শিশুদের বাংলা শিক্ষা দেওয়া হতো বিনা খরচেই। কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষার্থীর অভাবে সেই সময় কয়েকটি স্কুলে এই শিক্ষাদানের কর্মসূচি বেশিদূর এগুতে পারেনি।

একটি নতুন প্রজন্ম ক্যান্টনিজ ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করছে

ইউজেনিয়া ম্যাক বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হংকং থেকে অভিবাসীদের একটি নতুন ঢেউ কানাডায় এসেছে।

এই নবাগতদের অনেকেই বিশ থেকে ত্রিশের কোঠায় এবং তাঁরা নিজেদের ভাষা সংরক্ষণে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রবাসে নতুন করে পরিবার শুরু করার সাথে সাথে, তারা তাদের সন্তানদের ক্যান্টনিজ শেখার সুযোগ দিতে চান এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সচেতন প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

ম্যাক অন্টারিওর নর্থ ইয়র্কের কামার ভ্যালি মিডল স্কুলে তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্যান্টনিজ ভাষা শেখান।

তার পাঠদান শুধু শব্দভাণ্ডারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীরা গান, লেখা ও নাচের মতো সৃজনশীল কার্যকলাপের মাধ্যমে শেখে এবং একই সাথে ড্রাগন বোট ফেস্টিভ্যালের মতো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও অন্বেষণ করে।

তার কাছে ক্যান্টনিজ শেখাটা শুধু আরেকটি ভাষা আয়ত্ত করার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।

“এটি আমাদের ইতিহাস, আমাদের মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য এবং আমাদের পরিচয়ও বটে। যদি আমরা এটি হারাই, তবে আমরা আমাদের দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং আমাদের ইতিহাসের সাথে সংযোগ হারাবো,” বলেছেন ম্যাক।

ম্যাক বলেন, এর উদ্দেশ্য সেই বহুভাষিক সমাজকে রক্ষা করাও, যা দীর্ঘকাল ধরে কানাডার পরিচয়ের অংশ।

কানাডায় আমাদের একটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি রয়েছে এবং আমরা আশা করি যে ক্যান্টনিজ ভাষা এর একটি অংশ হতে পারবে।

যোগাযোগের চেয়েও বেশি

যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক মনিকা শ্মিড বলেন, একটি পরিবারের ঐতিহ্যবাহী ভাষা সংরক্ষণের বাইরেও বহুভাষিকতা সকলের জন্য উপকারী।

শ্মিডের মতে, প্রতিটি ভাষা যোগাযোগের একটি মাধ্যমের চেয়েও অনেক বেশি কিছুকে প্রতিনিধিত্ব করে।

তিনি বলেন, “এগুলো তথ্যের ভান্ডার, তাই যখনই আমরা একটি ভাষা হারাই, আমরা প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞানের একটি সম্পূর্ণ ভাণ্ডার, একটি উৎপত্তির গল্প, একগুচ্ছ কবিতা, সাহিত্য হারিয়ে ফেলি।”

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিকোলাই স্লাভকভ বলেন, যদিও তিনি এমন এক ‘বিপর্যয়কর ভবিষ্যৎ’-এর কল্পনা করতে পারেন, যেখানে ইংরেজির মতো বৈশ্বিক ভাষাগুলো ছোট ছোট ভাষাগুলোকে প্রতিস্থাপন করে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দেবে, তবুও তিনি বিশ্বাস করেন যে, প্রাকৃতিক জগতের জীববৈচিত্র্যকে আমরা যেভাবে মূল্যায়ন করি, ভাষার বৈচিত্র্যকেও ঠিক সেভাবেই মূল্যায়ন করা উচিত।

তিনি বলেন, “আমরা প্রাকৃতিক জগতের জীববৈচিত্র্যকে যত বেশি সম্ভব বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আমি চাই, বিশ্ববাসী ভাষা নিয়েও একইভাবে ভাবুক।”

আশার কথা এই যে, ২০২৩ সালে কানাডা স্টাডিজ বিষয়ক অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে লেগার-এর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা যায়, ৮৮ শতাংশ মানুষ তাদের প্রাথমিক ভাষার প্রতি জোরালো অনুভূতির কথা জানিয়েছেন।

কানাডিয়ান স্টাডিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট জ্যাক জেডওয়াব বলেন, সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য মানুষের পরিচয়ের ক্ষেত্রে ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই তুলে ধরে। 

তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, এই ফলাফল অনেক কানাডীয়কে বিস্মিত করেছে, যারা হয়ত সজ্ঞানে ভাবেননি যে, পরিচিতির অন্য সব অভিব্যক্তির মত ভাষা এতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং মনোযোগ আকর্ষণ করে।”

জেডওয়াব বলেন, একটি সম্প্রদায়ের কাছে ভাষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে সেই বিবেচনা থেকে লোকেদের উচিৎ ভাষার গুরুত্বকে খাটো করে না দেখার বিষয়ে সচেতন হওয়া। তিনি বলেন, ভাষার দুটি ভূমিকা আছে, একটি হলো যোগাযোগের সুবিধা সৃষ্টি করা, আরেকটি সংস্কৃতির অভিব্যক্তি ঘটানো।

তিনি বলেন, “মানুষের মধ্যে অন্যের ভাষার গুরুত্ব খর্ব করার একটি প্রবণতা থাকতে পারে।”

আরেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কানাডায় ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের জন্য নিজেদের ভাষা ধরে রাখা দিন দিন অধিকতর কঠিন হলেও অপেক্ষাকৃত নতুন অভিবাসীদের জন্য, যারা স্প্যানিশ, চাইনিজ বা পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলেন, তাদের জন্য নিজেদের ভাষা টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা সাধারণভাবে অনেকটাই বেশি। ১৯৮১ ও ২০০৬ সালের আদমশুমারির সুদীর্ঘ ফরম থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *