কুইবেকের মসজিদগুলোতে ভাঙচুর ও মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচারণার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সতর্কতা জোরদার
প্রবাসী কণ্ঠ ডেস্ক, অগাস্ট ২১, ২০২৬ : কুইবেক সিটির ‘ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’-এর মুখপাত্র ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা বুফেলজা বেনআবদাল্লাহ বলেন, গত দেড় বছর ধরে তিনি কুইবেকে মসজিদ ভাঙচুর ও ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচারণা বৃদ্ধি পেতে দেখেছেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন না কেন এমনটি হচ্ছে। খবর সিবিসি নিউজের।
তিনি বলেন, তা সত্ত্বেও তাঁর সম্প্রদায় তাদের সাধ্যমতো সর্বোত্তম উপায়েই পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে—আর তা হলো সতর্কতার সাথে।
তার স্মৃতিতে এই প্রথমবার, গত সপ্তাহে ‘ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে কমিউনিটিকে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে একটি সর্বজনীন সতর্কবার্তা জারি করেছে।

কুইবেকের ত্রোয়া-রিভিয়ের (Trois-Rivières)-এ মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অনলাইন হুমকি ও হয়রানি বেড়ে যাওয়ার পর, গত জুন মাসে এক ভাঙচুরের ঘটনায় ‘মোরিসি ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’-এর জানালাগুলো ভেঙে ফেলা হয়।
এক মাস পর, ভারদুন ইসলামিক সেন্টারের দরজার সামনে মানুষের বিচ্ছিন্ন ও রক্তমাখা একটি কৃত্রিম হাত ফেলে রাখার ঘটনায় মন্ট্রিয়ল পুলিশ একটি ‘হেট ক্রাইম’ বা বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের তদন্ত শুরু করে।
কুইবেকের প্রাদেশিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় একই সময়ে ‘সেন্টার কালচারাল আল-রহমা পোর্টনিফ’-এ ভাঙচুরের ঘটনায় এক তরুণ ও এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে কুইবেক শহরের ৫০ কিলোমিটারেরও কম দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ডনাকোনার একটি ইসলামি কেন্দ্র ও প্রার্থনা কক্ষে।
এই পরিস্থিতিতে কুইবেক সিটিতে পরিচিত মুসলিমদের মনোভাবের বিষয়ে কথা বলার সময় বেনআবদাল্লাহ বলেন, “আমরা এক ধরনের উদ্বেগ অনুভব করছি।”
তিনি বললেন, “আমরা আমাদের মুসল্লি ও সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত।”
বেনআবদাল্লাহ উল্লেখ করেন যে, কুইবেক সিটির মসজিদটি অহেতুক আতঙ্ক ছড়াতে চাইছে না, বরং তারা কেবল সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে চাইছে।
উল্লেখ্য যে, এটি সেই একই মসজিদ যেখানে প্রায় ১০ বছর আগে এক বন্দুকধারীর গুলিবর্ষণের ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছিলেন; সেই হামলায় আরও ১৯ জন আহত এবং ১৭টি শিশু পিতৃহারা হয়েছিল।
বেনআবদাল্লাহ বললেন, “আমরা চাই না যে এমনটা আবার ঘটুক।”
অনলাইন হয়রানি ও বিদ্বেষ
কানাডিয়ান অ্যান্টি-হেট নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক ইভান বালগর্ডের মতে, গত ১০ বছরে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের বিষয়টি আরও খারাপের দিকে গেছে।
ইভান আরো বলেন, “কুইবেকের মুসলিম সম্প্রদায় যে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক আচরণের মাত্রা বৃদ্ধির কথা জানাচ্ছে, তাতে আমি খুব একটা অবাক নই। আর এই সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে সংঘটিত অপরাধের পরিসংখ্যান সঠিকভাবে পরিমাপ করা কঠিন।”
বেনআবদাল্লাহ বলেন, সম্প্রদায়ের সদস্যদের জন্য কেবল ভাঙচুর বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডই উদ্বেগের বিষয় নয়; অনলাইন হয়রানিও এর অন্তর্ভুক্ত। আর আমি এতটাই বিরক্ত হয়েছিলাম যে আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটিই মুছে ফেলেছি।
বেনআবদাল্লাহ আরো বলেন, আমাদের গালিগালাজ করা হচ্ছে, অপমান করা হচ্ছে এবং হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের ঠিক কতজন মানুষ এমন আচরণের শিকার হন, তা জানার মতো প্রয়োজনীয় তথ্য বা উপায় বেনআবদাল্লাহর কাছে না থাকলেও, তিনি ধারণা করেন যে সংখ্যাটা অনেক বড়।
ইসলাম-বিদ্বেষী মানুষ সবসময়ই থাকবে
ডনাকোনা ইসলামিক কালচারাল সেন্টারের কোষাধ্যক্ষ ও সদস্য আবদেলওয়াহাব বেন আবদাল্লাহ অনলাইনে ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচারণার বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন।
বেনআবদাল্লা বলেন, “সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি খোলার পর থেকেই আমরা সবসময়ই আমাদের প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। এবং এখন পর্যন্ত আমরা তা করছি।”
মসজিদ ও কমিউনিটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত এই কেন্দ্রটিতে পরিবারবর্গ ও উপাসকদের জন্য একটি সাপ্তাহিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল; ঠিক তখনই কৃত্রিম, রক্তমাখা ও বিচ্ছিন্ন একটি হাত সেখানে পাওয়া যায়। ঘটনাটি কোনো বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ (হেট ক্রাইম) কি না, তা খতিয়ে দেখতে মন্ট্রিল পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে।
গত মাসে যখন কেন্দ্রটিতে ভাঙচুর চালানো হয়, তখন বেন আবদাল্লাহকে ঘটনাস্থলে ডাকা হয়েছিল। তিনি দেখেন, কেন্দ্রের দরজায় থাকা সাইনবোর্ডের একটি অংশ ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের মধ্যে কেবল একজন যুবকের বিরুদ্ধেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং দরজার লোগো ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আনা হয়েছে—যা ক্রাউন প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
বেন আবদাল্লাহ জানান, ওই ঘটনার পর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটিতে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আর “ইসলাম-বিদ্বেষী মানুষ সবসময়ই থাকবে। তবে আমরা তাদের সাথেই বসবাস করব,” তিনি বললেন।
