প্রকাশিত হলো মুস্তফা চৌধুরীর নতুন বই “বাংলাদেশের অভ্যুদয় : কানাডার কূটনৈতিক টানাপড়েন”
গবেষক ও লেখক মুস্তফা চৌধুরীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই “বাংলাদেশের অভ্যুদয় : কানাডার কূটনৈতিক টানাপড়েন” প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছর। বইটি দুই খণ্ডে বিভক্ত। এবারের টরন্টোর বাংলা বই মেলাতেও প্রদর্শিত হয়েছে খণ্ড দুটি। বিক্রিও হয়েছে।
প্রথম খণ্ডটি ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত। এতে কানাডা ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, একটি গোপন সামরিক হামলা, কানাডার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা, কানাডিয়ান জনমতামত, এনজিওগুলোর সম্পৃক্ততা এবং কানাডার হাউস অব কমন্স ও সিনেটে চলা বিতর্কগুলো বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কানাডা সরকার বিশ্বাস করতো যে, এই সংকটে যে কোনো ধরনের সরাসরি অস্থান গ্রহণ করা হলে তাদের জন্য ‘রাজনৈতিকভাবে অশোভন’ হতে পারে।
সামরিক শাসনের সেই উত্তাল সময়ে আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছিল গণতন্ত্র রক্ষা, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, দমনমূলক ব্যবস্থা বন্ধ করা, সাংবিধানিক উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মানবিক সহায়তার মতো বিষয়গুলো-যা মূলত কানাডার গভীর উদ্বেগ ও এক ধরনের অসহায়ত্বকেই প্রতিফলিত করে। কানাডার তৎকালীন মূল লক্ষ্য ছিল বাস্তুচ্যুত বাঙালি ও ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ভুক্তভোগীদের জন্য দ্রুত মানবিক ত্রাণ নিশ্চিত করা।

যদিও সংবাদমাধ্যম, কানাডিয়ান এনজিও এবং প্রবাসী বাঙালিরা বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে জোরালো সমর্থন দিচ্ছিল, তবে কানাডা সরকার সাধারণ কানাডিয়ানদের দবির প্রতি বেশি মনোযোগী ছিল। অধিকাংশ নগরিকের চাওয়া ছিল কানাডা যেন জাতিসংঘকে ব্যবহারের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান খোঁজে। পাকিস্তান ভেঙে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হোক এমনটি কানাডার ভাবনায় কখনোই ছিল না। বরং সাধারণ জনগণের মতোই কানাডা চেয়েছিল পাকিস্তান যেন অখণ্ড, পুনর্গঠিত এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকে।

বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডটি চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এই অধ্যায়গুলোতে কানাডার বিভিন্ন উদ্যোগ ও কূটনৈতিক দোটানা, গৃহীত পদক্ষেপের কালানুক্রমিক বিবরণ, বাংলাদেশের জন্মের পরপরই দেশটির স্বীকৃতি প্রদানের প্রক্রিয়া এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে সম্পদ বরাদ্দের বিষয়গুলো বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির কারণে কানাডা শুরুতে সরাসরি এই সংকটে জড়াতে চায়নি। তবে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমানকে যেভাবে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছিল, তা কানাডাকে ক্ষুব্ধ করেছিল। পাশাপাশি বাঙালিদের ওপর চলমান সামরিক দমন-পীড়নের ভয়াবহ পরিণাম কানাডাকে ব্যথিত করেছিল। তৎকালীন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে কানাডা বেশ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে এবং ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে সরাসরি না জড়িয়ে একটি ‘হস্তক্ষেপহীন নীতি’ বজায় রাখে। তবে তারা স্বাধীনভাবে এই সংকট নিরসনের নানা পথ খুঁজছিল। এর মধ্যে ছিল ভারত ও পাকিস্তানের নেতাদের সংযম প্রদর্শনের পরামর্শ দেওয়া, সম্মিলিতভাবে জাতিসংঘকে আহ্বান জানানো, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোকে তহবিল প্রদান এবং দেশটির ভবিষ্যৎ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য জোরালো লবিং করা। নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে কানাডা একটি স্পষ্ট অবস্থান নিতে দেরি করে এবং কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়নি। কানাডা মূলত আশঙ্কা করেছিল যে, বাংলাদেশ ইস্যুতে কোনো প্রকাশ্য আলোচনা কুইবেক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উসকে দিতে পারে, যারা বাঙালিদের মাতৃভূমি রক্ষার লড়াইয়ের সাথে নিজেদের স্বাধীনতা সংগ্রামের যোগসূত্র খুঁজে পেতে পারত।
বইটির মুখবন্ধে বলা হয়, ‘এই বইয়ে মুস্তফা চৌধুরী ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কাল তুলে ধরেছেন, যে সময়টি পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের সূচনা থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহকে ধারণ করে। একই সঙ্গে এই সময়সীমায় তিনি কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাস এবং পাকিস্তান-বাংলাদেশ যুদ্ধে কানাডা সরকার, মিডিয়া, জনগণ ও এনজিওর ভূমিকা তুলে ধরেছেন।’
‘আমাদের জানা মতে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর অন্য সব রচনার বিপরীতে এটিই প্রথম বই, যেখানে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে কানাডার ভূমিকা আলোচিত হয়েছে। বইটি এক চমৎকার আখ্যান এবং বাস্তব রাজনীতির আকর্ষণীয় কেইস স্টাডি। ১৯৭১ সালে কানাডার কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রকৃত ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচন হয়েছে এখানে। ‘
উল্লেখ্য যে, মুস্তফা চৌধুরী একজন বাংলাদেশি-কানাডিয়ান নাগরিক, যিনি তার কর্মজীবনের পুরোটা সময় শিক্ষা ও জনসেবায় ব্যয় করেছেন। ইংরেজি সাহিত্য, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান এবং কানাডার ইতিহাসের ওপর উচ্চতর ডিগ্রিগুলো তাঁকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার মতো দক্ষ করে তুলেছে। দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ও সংস্থায় সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কাজের প্রতি তাঁর গভীর একাগ্রতা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অসংখ্য পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : Orleans Queen’s Platinum Jubilee Award এবং অরলিন্সের সংসদ সদস্য Marie-France Lalonde এর পক্ষ থেকে বিশেষ পিন। নেপিয়ানের সংসদ সদস্য চন্দ্র আর্যর পক্ষ থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট, যা মূলত `Service to the Bangla community and beyond’ স্বীকৃতি। Royal Canadian Mounted Police (RCMP) এর সংখ্যালঘু বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটি পরামর্শক হিসেবে তার সেবার জন্য বিশেষ প্রশংসাপত্র।
বইটি প্রকাশ করেছে একাডেমিক প্রেস এণ্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি (এপিপিএল)। অনলাইনে বইটি কিনতে হলে https://www.rokomari.com/book/557614/bangladesher-ovuddoy-volume-i এই লিংক এ ক্লিক করা যেতে পারে।
মুস্তফা চৌধুরীর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো, ’৭১-এর যুদ্ধশিশু: অবিদিত ইতিহাস’। ২০১৫ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। বইটি যুদ্ধশিশুদের দত্তক নেয়ার মানবিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। লেখকের দ্বিতীয় বই Picking Up the Pieces : 1971 War Babies’ Odyssey from Bangladesh to Canada. এটিও প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। এই বইতে যুদ্ধশিশুদের বাংলাদেশ থেকে কানাডায় যাওয়ার সংগ্রাম ও জীবনযাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। মুস্তফা চৌধুরীর তৃতীয় বই UNCONDITIONAL LOVE : Story of Adoption of 1971 War Babies. এটি প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে। এই বইতে যুদ্ধশিশুদের দত্তক নেওয়ার মানবিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।
